ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

নারী ও শিশু নির্যাতনের হাজারো খবরের মধ্যে অনেক খবরই আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়ার মতো হলেও আমরা আসলে বাস্তবে ততোটা নড়েচড়ে উঠি না। অনেক সময় কিছু কিছু ঘটনা নিয়ে আমরা হইচই করি বটে। কিন্তু এ হইচই খানা বাধানোর জন্যও কোন না কোন মহল থেকে অনেক পরিমাণ কাঠখড়ি পোড়াতে হয়। এমনি একটি খবর নিয়ে আজকের এ নিবন্ধের সূত্রপাত করছি যা নিয়ে আমাদের অনেক হইচই হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি।

খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ৬ ই ডিসেম্বর বিবিসি বাংলায়২০১৬ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকের ঘটনা। কাজের লোভ দেখিয়ে মেয়েটিকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো প্রতিবেশী এক নারী। একদিন নিখোঁজ থাকার পর তাকে অচেতন অবস্থায় বাহুবলের একটি বাজারের কাছে রাস্তায় খুঁজে পায় স্থানীয় লোকজন। এর পর নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের আধীন একটি মামলা হয়। মামলায় দুই জনকে গ্রেফতার করে বাহুবল থানা পুলিশ।

কিন্তু বিষয়টির মোড় ঘোরে অন্য স্থানে। ধর্ষিতা মেয়েটিকে নষ্টা মেয়ে আখায়িত করে স্থানীয় লোকজন। তার যেমন বাড়ি থেকে আর বের হওয়া হয় না, তেমনি তার স্কুলেও যাওয়া হয় না। এমনকি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতেও দেয়া হয় না। এ নিষেধাজ্ঞার হোতারা গ্রামের মাতব্বর, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি এবং চূড়ান্তভাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

মেয়ের বাবা হরিধন ঘটনা ঘটার দশদিন পর স্কুল গিয়ে হেডমাস্টার সাহেবের সাথে দেখা করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক বলেন, হরিধনের মেয়ে স্কুলে আসতে পারবে না। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারবে। স্কুলে আসলে বহুজন বহু কথা বলবে। স্কুলটা অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই সে শুধু পরীক্ষা সময় পরীক্ষা দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক স্কুল অপবিত্র হয়ে যাওয়ার ভয়ে মেয়েটিকে স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা দিতেও দেননি।

এরই এক পর্যায়ে বিষয়টি বিবিসি বাংলার নজরে আসে। খবর প্রকাশিত হলে প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসন কিছুটা নড়ে চড়ে বসে। আলাপে বসে উপজেলার প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের কর্মকর্তারা। খবরটি গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের। ঐ মেয়েটি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে পেরেছিল কিনা এবং তার ভাগ্যে আসলে কি ঘটেছিল তার ফলোআপ পত্রিকায় আসেনি। কারণ বিষয়টিকে সবাই প্রাত্যহিক জীবনের আটপৌরে ঘটনা বলেই মনে করে থাকবেন।

আমার অভিজ্ঞতা মতে গ্রাম-বাংলার জঘন্যতম কুসংস্কারগুলোর মধ্যে ধর্ষণের শিকার নারীদের সমাজে ঘৃণ্য চোখে দেখা অন্যতম। ধর্ষক সমাজে বুক ফুলিয়ে বেড়ায়, কিন্তু ধর্ষিতার সমাজে স্থান হয়না। তাকে আত্মহত্যা করতে হয়। আমি তো মনে করেছিলাম, এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের সমাজ বিরল হয়ে পড়েছে। কিন্তু হবিগঞ্জের বাহুবল থানার শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া ঐ কিশোরীর প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষ যে আচরণ করেছে তাতে মনে হল, এ ধরনের কুসংস্কার আমাদের সমাজে এখনও পুরোমাত্রাই বিরাজ করছে। তাই হয়তো এ নিয়ে আর বেশি আগ্রহ দেখায়নি আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলো।

এবার আসুন আমরা হবিগঞ্জের ঐ ঘটনার প্রশাসনিক ও পুলিশি প্রতিক্রিয়ার একটা পোস্ট মর্টেম করি। বাহুবল থানা আমার অত্যন্ত পরিচিত। পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম কর্তৃক এই থানাকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে। নতুন ভবন-কমপ্লেক্স উদ্বোধনের সময় আমিসহ গোটা পিআরপি তো বটেই সেখানে কয়েকজন মন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে বড় অংকের আর্থিক সহায়তাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হরিধন চক্রবর্তীর কিশোরী মেয়ের স্কুলের পরীক্ষা দিতে না পারার কাহিনীটা যে এতদূর পর্যন্ত গড়াল, এ থেকে আমার মনে হয়, এ থানার অফিসারগণ কমিউনিটি পুলিশিং বলতে যা বোঝায় সেটা এখন আত্মস্থ করতে পারেনি। আবার এমনও হতে পারে এখন যেসব কর্মকর্তা এই থানায় কর্মরত আছেন, তারা আর যাই করেন, কমিউনিটি পুলিশিং করেন না। যদি তাই করতেন, তাহরে অফিসারগণ স্কুল পরিদর্শন করতেন, গ্রামে গ্রামে গিয়ে বৈঠক করতেন। আর এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে হরিধন চক্রবর্তীর মেয়েকে পরীক্ষা দিতে না দেবার ঘটনাটি পুলিশ অফিসারদের প্রথমেই নজরে আসত। বিবিসির খবর পড়ে তাদের সেটা জানতে হত না।

এ ব্যাপারে পুলিশি দায়-দায়িত্ব আলোচনা করতে গেলে আরো একটি বিষয় সামনে চলে আসে। হরিধন চক্রবর্তীর মেয়েকে ধর্ষণের জন্য যদি থানায় মামলা হয় আর সেই মামলায় যদি দুজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হয় তাহলে বুঝব এই ধর্ষণের ভিকটিমকে নিয়ে পুলিশের কোন মাথা ব্যথাই ছিল না। নিয়ম অনুসারে যদি মামলাটি তদন্তাধীন থাকে, তাহলে তো ঐ ভিকটিমের সাথে বা তার পরিবারের সাথে পুলিশের নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করার কথা। কিন্তু থানা পুলিশ সেটা হয়তো করেনি।

আর যদি মামলার চার্জসিট দেয়া হয়ে থাকে তবে পুলিশ অন্যান্য মামলার মতো এ মামলার ভিকটিমদেরও রুটিন মতো ভুলে গেছেন। বলা বাহুল্য আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মামলার চার্জসিট দেয়ার পর ভিকটিমদের প্রতি পুলিশের আর কোন দায় দায়িত্ব থাকে না। আর এজন্যই তো ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য নতুন করে আইন তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে। জানিনা, সেই আইনে হরিধনের মেয়ের মতো ভিকটিমদের কিভাবে সুরক্ষা দেয়া হবে এবং সেখানে পুলিশের দায়দায়িত্ব কিরূপ হবে। তবে আধুনিক পুলিশিং এর যে নীতি তাতে পুলিশ যে ভিকটিমদের প্রতি দায়িত্বহীন হতে পারে না সেটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি।

কমিউনিটি পুলিশিং এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল অপরাধের শিকার মানুষগুলো থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মন থেকে অপরাধ-ভীতি দূর করা। অপরাধের শিকার ব্যক্তিগণ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সব সময় পুনর্বার ভিকটিম হবার ভয়ে ভীতু থাকেন। অপরাধীগণ তাদের নানাভাবে হুমকী দিয়া থাকে, প্রলোভন দিতে থাকে যা মামলার তদন্তে প্রভাব ফেলে। আবার যদি মামলাটির চার্জসিট দিয়ে দেয়া হয়, সেই মামলায় অপরাধীর সাজাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তা বড় প্রভাব ফেলে। অথচ পুলিশের কর্মকাণ্ডের, বিশেষ করে তদন্তের মান ও সাফল্য মুল্যায়নের একটি বড় মাপকাঠি হল মামলায় অপরাধিদের সাজার হার। এখন পুলিশ যদি ভিকটিম ও তাদের পরিবারের সাথে কোন সম্পর্কই না রাখে, যদি ভিকটিম ও সাক্ষিরা সুরক্ষিত না থাকে তবে মামলায় তো সাজা হবার কথা নয়। এমতাবস্থায়, হবিগঞ্জের বাহুবল থানার হরিধন চক্রবর্তীর মেয়ের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, পুলিশিং দায়িত্বের মানদণ্ডে তা কখনই মেনে নেয়া যায় না।

পুলিশ ও জনগণের সাথে একটি কার্যকরী সুসম্পর্ক গড়ে তোলা কমিউনিটি পুলিশিং এর অন্যতম কর্মকৌশল। আমাদের পুলিশ অফিসারগণ মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং এর নামে যা করে বেড়ান তার সিংহভাগ কর্মকাণ্ডই এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। কিন্তু ভিকটিমগণ যে অতি সহজেই পুলিশের সেই কার্যকরী সম্পর্কের নেটওয়ার্কে চলে আসে, সেটা পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকতাগণ উপলব্ধিই করতে পারেন না। সাধারণভাবে বলা যায় যে কোন প্রকার প্রয়োজন না থাকলে মানুষ পুলিশের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চায় না। আমাদের সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থার এটি একটি সাধারণ বৈশিষ্ট। কিন্তু কোন অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যখন পুলিশের কাছে সাহায্যের জন্য আসে তখন উভয় পক্ষের মধ্যে একটি কার্যকরী সম্পর্ক বাস্তব ক্ষেত্রেই তৈরি হয়। আমাদের পুলিশ অফিসারদের উচিৎ হল সামান্য কিছু বাড়তি কার্যক্রম পরিচালনা করে এ ভিকটিমদের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা যায়।

এ বাড়তি কাজটুকুর নাম দেয়া যায় ভিকটিম রিকন্টাক বা ভিকটিম পুনর্যোগাযোগ। অপরাধের শিকার ব্যক্তিগণ মামলার তদন্ত পর্যায় পর্যন্ত পুলিশের সংস্পর্শে থাকেন। সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য পুলিশকে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল হলে ঐ ভিকটিমের বাসার দিকে পুলিশ আর পা বাড়ায় না। যার ফলে তদন্ত পর্যায়ে তৈরি হওয়া সম্পর্কটির দ্রুতই মৃত্যু ঘটে।

ভিকটিম রিকন্টাক কর্মসূচিটি চালু করা এবং তা অব্যহত রাখা খুব কঠিন কিছু নয়। নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ভিকটিম রিকন্টাক্ট কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১.গুরুত্বপূর্ণ মামলার ভিকটিমদের নিয়ে থানায় একটি আলাদা ডাটা বেইজ তৈরি করা যায়। এ ডাটাবেইজে ভিকটিমের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। পুলিশের সিডিএমএস ডাটা বেইজ থেকে তথ্য নিয়ে কিংবা এ সফ্টওয়ারে সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেও এটা করা যেতে পারে। 

২. পুলিশ অফিসারগণ কোন এলাকায় পরিদর্শনে গেলে বা মামলা তদন্ত কিংবা অন্য কোন উপলক্ষে সেই এলাকায় গেলে ভিকটিম পরিবারের সাথে সশরীরে কথা বলতে পারেন। সেটা সম্ভব না হলে ভিকটিমের বাড়ির কাছাকাছি কোন এলাকায় গেলেও তাদের সম্পর্কে স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে হাল অবস্থা জেনে নেয়া যায়।

৩. চৌকিদারি প্যারেডে ভিমটিমদের সম্পর্কে স্থানীয় চৌকিদারদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেয়া যায় কিংবা তাদের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য কাজ দেয়া(tasking) করা যায়।

৪. থানায় একজন অফিসারকে ভিকটিম রিকন্টাক্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে তাকে সরেজমিনে ভিকটিমদের বাসায়/ কর্মস্থলে পাঠিয়ে তাদের খোঁজখবর নেয়া যায়।

৫. ভিকটিম রিকন্টাক্ট অফিসারসহ থানার অন্যান্য অফিসারগণ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাঝে মাঝে ফোন করে ভিকটিমের খোঁজ খবর নিতে পারেন।

৬. কেবল ভিকটিম ও তাদের পরিবারদের নিয়ে থানার কোন মাসের উন্মুক্ত দিবসকে নির্দিষ্ট্ করা যায়। ঐ উন্মুক্ত দিবসে কেবল ভিকটি বা তাদের পরিবারদেরই নিমন্ত্রণ করা হবে।

৭. ভিকটিমদের সাথে যোগাযোগ স্থায়ী করার জন্য ফেইসবুকে একটি ডেডিকেইটেড পাতা খোলা যায়।

কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে আমাদের পুলিশ-প্রশাসক মহলে  সময় সময় কথার তুবড়ি ছুটলেও কমিউনিটি পুলিশিং এর মর্মবাণীটুকু হয়তো খুব কম সংখ্যক পুলিশ অফিসারই বোঝেন। তাই তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির আশায় বিভোর থাকেন। আলোচিত খবরে হরিধন চক্রবর্তীর মেয়ের ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশ যা করেছে তা ঐ সময়ের জন্য অবশ্য যথেষ্ঠ ছিল। তারা মামলা নিয়েছে, আসামী গ্রেফতার করেছে, সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং ইতোমধ্যে হয়তো মামলার অভিযোগপত্রও দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু যে ভিকটিমের জন্য পুলিশ এত কিছু  করেছে সে যে  ইতোমধ্যেই গোটা সমাজের ধর্ষণের শিকারে পরিণত হয়েছে পুলিশ তার কোন খবরই রাখেনি। আর যেহেতু আমাদের পুলিশিং ব্যবস্থা এখনও সনাতনী স্টাইলে চলমান, তাই বাহুবল থানা পুলিশকে কেউ দোষারোপের কোন কারণই খুঁজে পায়নি। কিন্তু পুলিশের কাজই যদি হয় জনগণের কল্যাণসাধণ ভিকটিম তথা শিষ্টের  সুরক্ষা, তাহলে কি বাহুবল থানার পুলিশ তাদের দায়িত্বের শতভাগ পালন করেছে? (০৯ মার্চ, ২০১৭/ ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)