ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

ফিলিপাইনের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রডরিগো দুতার্তকে আপনি চিনেন না, তা কি হয়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে ‘খানকির পোলা’, জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিবকে ‘আহম্মক’ বলে অবিহিত করা ৭১ বছর বয়সী এ রাজনীতিবিদটি ইতোমধ্যেই বিশ্বগণমাধ্যমের অন্যতম আকর্ষণবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। দুতার্তে  ২০১৬ সালের ৩০ জুন ফিলিপাইন দ্বিপপুঞ্জের ১৬তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ইতোপূর্বে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও প্রদেশের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন দীর্ঘ ২২ বছর। মিন্দানাও ফিলিপাইনের মুসলিম সংখ্যাগরীষ্ঠ প্রদেশ। এ প্রদেশের দাভাও শহরটি ছিল মাদক চোরাচালানীদের আখড়া। মাদক এমন একটি বস্তু যা অন্যান্য সকল প্রকার অপরাধের জন্ম দেয় ও লালনপালন করে। তাই দাভাও শহরটিও ছিল সর্বপ্রকার অপরাধের আখড়াস্থল। কিন্তু দুতার্তের  দুই দশকের নিরবিচ্ছিন্ন মেয়রগিরিতে দাভাও শহরটি এখন ফিলিপাইনের অন্যতম নিরাপদ শহর। বলতে কি দাভাও শহরের মেয়রগিরির সাফল্যই দুতার্তেকে গোটা দেশের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায়  ৬৬ লাখ ভোট বেশি পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরই দুতার্তে দ্রুত বিশ্ব-প্রচার মাধ্যমে এক আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হন তার চাঁচাছোলা কথায় ও নির্দয় কিন্তু সমাজের মঙ্গলের জন্য করা কিছু কাজে কর্মে।Rodrigo Duterte, Philippine president-elect, in a press conference on May 26, 2016 in Davao City.

 

ক্ষমতা গ্রহণের পরের মাসেই রডরিগো দুতার্তে  দেশব্যাপী মাদক ব্যবসা নির্মূল অভিযানের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার অভিযান মানেই তো হল একটা কঠিন কিছু যেখানে মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকসেবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা হয় না। যেখানে মানবাধিকার বা আইনের শাসনের সূত্রগুলো অকার্যকর।  সারা দেশে শুরু হয়  কথিত মাদক-সন্ত্রাসীদের হত্যাকাণ্ড। প্রথম ছয় মাসেই এ অভিযানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায়  পাঁচহাজার। আর ২০১৭ সাালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ তা ছড়িয়ে গেছে সাত হাজার

 

দুতার্তে অবশ্য নির্বাচনী প্রচারকালেই ঘোষণা করেছিলেন যে নির্বাচিত হলে তিনি দুই লাখ মাদক ব্যবসায়ীকে সোজাসুজি হত্যা করবেন। মাদক বিরোধী অভিযানের সূচনা বক্তব্যে তিনি দেশবাসিকে বলেছিলেন, আপনারা লাশ সৎকারের জন্য প্রস্তুত হন, আমি লাশ পাঠাচ্ছি। যে কথা সেই কাজ।  মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর মাত্র দুই মাস পরে যখন কয়েক হাজার কথিত মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়, তখন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। আর এ সময় পুলিশের কাজকে বৈধ বলে ঘোষণা করে তিনি আফসোস করেন যে ফিলিপাইনের ত্রিশলাখ মাদকসেবীকে তিনি হত্যা কারতে পারলে খুশি হতেন। তার এ মাদক বিরোধী অভিযানকে তিনি নিজেই হিটলারের ইহুদি নিধনের সাথে তুলনা করে বিশ্বব্যাপী ইহুদি জনগোষ্ঠীর সমালোচনার মধ্যেও পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘হিটলার যতো ইহুদি হত্যা করেছিলেন, আমিও ততো সংখ্যক মাদক ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীকে হত্যা করবো। হিটলার ৩০ লাখ ইহুদি মেরেছিল… মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যাও ৩০ লাখ। আমি আনন্দের সাথে তাদের হত্যা করব।’

গত জুলা্ই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পূর্বেও পুলিশ বা অন্যান্য সরকারি বাহিনী/সংস্থাগুলো স্বউদ্যোগে গঠন করে ‘হিট টিম’ যার মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও ছিল। তারা পুলিশের নির্দেশক্রমে তালিকাভুক্ত বা নির্ধারিত কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থের বিনিময়ে হত্যা করে। এ ধরনের একজন মহিলা খুনির সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা যিনি তার স্বামীর প্ররোচনায় হত্যার খেলায় নেমেছিলেন। কিন্তু এ হিট টিমে একবার প্রবেশ করলে যে নিজে নিহত হওয়া ছাড়া এখান থেকে বের হয়ে আসার কোন উপায় নেই, মারিয়া নামের সেই নারী তা জানতেন না। যারা এ ভাড়াটে খুনির টিম থেকে বের হয়ে আসতে চাইছেন তাদের যেমন হত্যার হুমকী দেয়া হচেছ তেমনি হত্যা করারও হচেছ। অধিকন্তু এ অভিযান যখন শেষ হয়ে যাবে তখন ঐসব সৌখিন ভাড়াটে খুনিরা হয়তো ঝুলবেন নিয়মিত খুনের মামলায়। বলাবাহুল্য, প্রতি খুনের জন্য  পুলিশের পক্ষ থেকে  এই নারীকে নাকি মাত্র ৪৩০ ডলার পরিশোধ করা হয়।

 

house

রাষ্ট্রপতি রডরিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে সবচে গুরুতর অভিযোগ করেছেন  অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আর্তুরো লাসকানাস। যে নগরীতে ২২ বছর ধরে মেয়রগিরি করেছেন রাষ্ট্রপতি দুতার্তে সেই দাভাওয়ের এক সময় তিনি পুলিশের চাকরি করতেন। সিনেটে দেয়া এক স্বীকারোক্তিতে লাসকানাস বলেন, দাভাও শহরের মেয়র থাকাকালে দুতার্তে পুলিশকে পয়সাকড়ি দিয়ে তাঁর বহু সমালোচককে মেরে ফেলেছেন। তাঁর নিশানা থেকে সাংবাদিক থেকে শুরু করে গর্ভবতী নারীও বাদ পড়েননি।

আর্তুরো লাসকানাস বলেন, তিনি নিজে দুতার্তের ‘দাভাও ডেথ স্কোয়াডের’ একজন সদস্য ছিলেন। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘দুতার্তের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিজের দুই ভাইকে পর্যন্ত তিনি হত্যা করেছিলেন।’ এ পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট দুতার্তে মেয়র থাকাকালে তাঁর সমালোচক একজন বেতারকর্মীকেও তিনি (লাসকানাস) হত্যা করেন। এর জন্য দুতার্তে পুলিশকে অর্থ দিয়েছিলেন।

ফিলিপাইনের পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেসের’ উচ্চকক্ষ সিনেটে এক সংবাদ সম্মেলনে লাসকানাস বলেন, ‘দাভাও শহরে আমরা যতগুলো হত্যাকাণ্ড চালিয়েছি, তাঁদের লাশ আমরা হয় মাটিতে পুঁতে দিয়েছি, নয় সমুদ্রে ছুড়ে ফেলেছি। এর জন্য অর্থ শোধ করতেন তৎকালীন মেয়র দুতার্তে।’ লাসকানাস আরও বলেন, ‘অধিকাংশ সময় একজনকে হত্যার বিনিময়ে ২০ হাজার পেসো, কখনো ৫০ হাজার পেসো ও নিশানা বানানো ব্যক্তির গুরুত্ব-মর্যাদা অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষে ১ লাখ পেসো করে দিতেন দুতার্তে।’ তবে অবসরপ্রাপ্ত এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবিকে মুহূর্তের মধ্যেই উড়িয়ে দিয়েছেন ফিলিপিনো রাষ্ট্রপতি রডরিগো দুতার্তে।

 

তবে পুলিশের এক কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি যে একেবারেই অমূলক ও অসত্য নয় তারও প্রমাণ ইতোমধ্যেই ফিলিপাইনবাসী বুঝতে পেরেছেন। সম্প্রতি দুতার্তের প্রধান সমালোচক, সাবেক বিচার মন্ত্রী ও বর্তমানে অন্যতম সিনেটর লাইলা দে লিমাকে তার সিনেট ভবনের অফিস থেকেই গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে নিহত মাদকব্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচারমন্ত্রী থাকাকালে দে লিমার দুতার্তের দাভাওয়ের মেয়র থাকাকালীন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মাত্র কয়দিন আগে তিনি দুতার্তেকে সোসিওপেথিক সিরিয়াল কিলার বলে অভিহিত করে তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরানো উচিৎ বলে মন্তব্য করেছিলেন।তাই দে লিমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি যে নিতান্তই প্রতিশোধমূলক এবং সমালোচনাকারীদের মুখ বন্ধ করার অন্যতম কৌশল তা  সজজেই অনুমান করা যায়। দে

Rodrigo Duterte

 

মাদকবিরোধী অভিযানের নেতৃত্বে ছিল ফিলিপাইনের পুলিশ বাহিনী। কিন্তু আইনকে হাতে নিয়ে আইন প্রয়োগ করার অবিসম্ভাবী ফলস্বরূপ পুলিশ জড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের অপকর্মে।  তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক দুর্নীতির । দক্ষিণ কোরিয়ার এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও হত্যায় ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ফিলিপাইনের জাতীয় পুলিশ সদর দফতরে একজন ব্যবসায়ীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে

মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও চোরাচালানীর নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন যে একটি দেশ বা সমাজকে কত নিচে নামিয়ে দেয় তার প্রমাণ ফিলিপিন্স দ্বীপপুঞ্জ। মাদক সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি দুতার্তের চাঁচাছোলা কর্তাবার্তা ও অমানবিক অভিযান সম্পর্কে ফিলিপাইনের জনগণ অনেক দিন ধরেই পরিচিত। ক্ষমতায় গেলে তিনি যে মাদক বিরোধী অভিযানে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করতে পারেন, এ ধারণা ফিলিপাইনবাসীরা হয়তো পূর্বেই করেছিলেন। তাই গত জুনে অভিযানটি শুরু হওয়ার পর যখন বিশ্বমিডিয়া একটার পর একটা লাশ গুণতে থাকল তখন রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ডে বিরক্ত বা সঙ্কিত হওয়ার বদলে জনগণ সেটাকে বিপুলভাবে স্বাগত জানাল। আর নানা জরিপে দেখান হচ্ছে যে দুতার্তের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বা্ড়তেই আছে।

রাষ্ট্রপতি রডরিগো দুতার্তের অমানবিক ও নিষ্ঠুর এ মাদকবিরোধী অভিযানে অবস্থার যে সাময়িক উন্নতি হবে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার, চোরাচালান ও মাদকসেবীতার পিছনের কারণগুলো সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখে তার এ অভিযান যে কতটুক স্থায়ী প্রভাব ফেলবে তা কেবল সময়ই বলে দিবে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধের ইতিহাস এর স্থায়ীত্বের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়না।olarias

 

মাইকেল সিয়েরন নামের এক মাদকসেবী মাদকবিরোধী অভিযানের প্রথম দিকেই পুলিশের গুলিতে নিহত হলে তার স্ত্রী দৌড়ে গিয়ে তার নিহত স্বামীর মৃতদেহ কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই সাংবাদিকদের ক্যামেরাবন্দী হয়  মাইকেল এন্জেলোর তৈরি পিয়েটা ভাসকর্যের স্টাইলে এ ছবিটি যা  প্রচার মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে নিহত এ মাদককাসক্ত/ব্যবসায়ী বিধবা স্ত্রী ওলারিস  রাষ্ট্রপতি দুতার্তের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, মানুষকে নয়, মাদককে হত্যা করুন। আমার মনে হয়, ফিলিপাইনের জনপ্রিয় তুঘলক রাষ্ট্রপতি রডরিগো দুতার্তে তার অভিযানের স্থায়ী সাফল্যের জন্য ওলারিসের এ উপদেশটি গ্রহণ করতে পারেন। (২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান।)