ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

চলতি বছরের শুরুতেই আমার ছেলে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে নবম শ্রেণির কলা বিভাগে ভর্তির জন্য মৌখিক পরীক্ষা দিতে গেল। আমার নিজ জেলা বা গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলায় জানতে পেরে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী শিক্ষকগণ অন্যান্য বিষয়ের বাইরেও প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘মরিচকে  রংপুরের মানুষ কি যেন বলে? আমার ছেলে উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সে মরিচ খায়, আকালী খায় না। মরিচের রংপুরি ভাষার নাম হল ‘আকালী’। এ নামটি কোথা থেকে কিভাবে এসেছে, আমার জানা নেই। অনেক জেলায় মরিচের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ‘ঝাল’। যেমন ‘কাঁচা ঝাল’, ‘পাকা ঝাল’, ‘চৈ ঝাল’ ইত্যাদি। কিন্তু মরিচকে অন্য কোথাও ‘আকালী’ ডাকে বলে আমার জানা নেই।

রংপুরের মানুষের কথার মধ্যে উচ্চারণের বিকৃতি থেকে শুরু করে কিছু নিজস্ব শব্দাবলীর অস্তিত্ব উৎকটভাবে চোখে পড়ে। তারা জেলার নামটিই সঠিকভাবে বলতে পারে না। র-কে তারা অ- উচ্চারণ করে। তাই রংপুর হয়ে যায়, ‘অংপুর’, রক্ত হয়ে যায়, ‘অক্ত’। আদাকে বলে এরা ‘আদ্রক’, হলুদকে বলে ‘হলদি’। এমনকি উত্তরের দিকের, নীলফামারী বা লালমনির হাটের মানুষ মেয়েদের ‘বিয়ে দেয় না’, ‘বেচিয়া খায়’। মানে বিক্রি করে। বাংলা গানের এক বিশেষ ধারা ভাওয়াইয়ার প্রবর্তন, প্রতিপালন ও প্রসার এ রংপুর এলাকা থেকেই।

আমার ছেলের কথায় রংপুরের আঞ্চলিকতার টান অবশ্যই আছে। কিন্তু তাই বলে সে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারে না। কারণ, আঞ্চলিক ভাষা মানুষ তার পরিবেশ থেকেই শেখে। আমার ছেলে  ভাষা শেখার জন্য তেমন অনুকুল পরিবেশ পায়নি। আমার গ্রামের বাড়িতে আমার ছেলে খুব একটা থাকেনি। রংপুর শহরে তার নানার বাড়িতে আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন থাকলেও আমার ছেলেমেয়েরা সে ভাষায় অভ্যস্ত হতে পারেনি। আর আমার কর্মস্থল শুরু থেকেই ভিন্ন ভিন্ন জেলায় হওয়ায়, আমি পরিবারে না করতে পেরেছি সেই জেলার স্থানীয় ভাষার ব্যবহার, না করেছি আমার রংপুরের ভাষার অনুশীলন।

অনেকে হয়তো বলবেন, বাহ! আপনার ছেলেতো দারুণ। সে আঞ্চলিক ভাষায় অভ্যস্ত হয়নি! আপনি তাদের সুশিক্ষাই দিয়েছেন। অনেকেরই তো আঞ্চলিকতার বড় দোষ আছে? আমরা, আধুনিকরা, আঞ্চলিকতাকে ঝেড়ে ফেলার জন্য কতই না চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। আর আপনার ছেলে সেটা সাবলিলভাবেই পেরেছে। 

কিন্তু আমি বলি, না। আমার ছেলে আসলে ভাষা শিক্ষায় একটু পিছিয়েই পড়েছে। কেননা, সে মরিচ শব্দের অন্তত একটা প্রতিশব্দ কম জানে। ধরুন, আমার ছেলে ‘আকালী’ শব্দটা জানে না। এর পর সেও যখন বাবা হবে, হয়তো তার ছেলেও এ শব্দটি জানবে না বা শিখবে না। এমনিভাবে একদিন মরিচের প্রতিশব্দ আকালী আমাদের মুখের ভাষা থেকে হারিয়ে যাবে। আর যা আমাদের মুখ থেকে হারিয়ে যায়, তা কালক্রমে আমাদের অভিধান থেকেও হারিয়ে যাবে। আর এভাবেই হয়তো মৃত্যু ঘটবে একটি শব্দ ‘আকালীর’।

কোন ভাষার প্রাচুর্য পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি হল সেই ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ ভাণ্ডারের বিস্তৃতি বা বিশালত্ব। যে ভাষার শব্দ ভান্ডার যত বড়, সে ভাষা ততো বেশি উন্নত। কারণ শব্দভাণ্ডার বেশি হওয়া মানেই মানুষের ভাব প্রকাশের সাবলিলতা। যদি মনের কোন ভাব প্রকাশে কিংবা মানুষের কোন আচরণ বা অভ্যাসকে বর্ণনা করার জন্য কোন ভাষায় উপযুক্ত সংখ্যক শব্দ খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সেই ভাষা অনেকাংশে অপূর্ণ। যেসব ভাষা উন্নত, তার শব্দ ভাণ্ডারও ততো বড়।

মনের ভাব বা কোন আচরণ কিংবা কোন বস্তুকে বোঝানোর জন্য আমাদের ভাষায় পর্যাপ্ত শব্দ থাকা চাই। যেমন, ইংরেজি ভাষায় ‘চলা’ বা movement আচরণটি প্রকাশের জন্য walk, saunter, trail, limp  কিংবা ‘বসা’ কাজটিকে বোঝানোর জন্য Sit, squat, squattle এ ধরনের আরো কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়। এগুলো হল একই শব্দের ভিন্ন ভিন্নরূপ বা প্রতিশব্দ। কিন্তু এদেরকে যতই প্রতিশব্দ বলি না কেন এগুলোর ব্যবহারিক প্রকাশে যথেষ্ঠ ভিন্নতা আছে। যেমন walk মানে হাঁটা, saunter মানে কষ্ট করে হাঁটা, trail মানে কোন প্রকারে পা টেনে টেনে হাঁটা কিংবা  limp মানে লাফাতে লাফাতে চলা।

এখন আমি যদি পাঠকদের প্রশ্ন করি, বাংলার ‘জট’ শব্দটির কয়েকটি প্রতিশব্দ বলুন তো। তখন অনেকেই হাঁফিয়ে উঠবেন। কেউ হয়তো বা কয়েকটা বলেও ফেলবেন। কিন্তু আমি রংপুরের ছাওয়া/চ্যাংড়া অন্যদের চেয়ে অন্তত একটি শব্দ বেশি বলব, সেটা হল ‘দ্যাবড়া’। একই ভাবে অন্যান্য জেলা বা অঞ্চলেরও এমন অনেক প্রতিশব্দ আছে যেগুলো হয়তো আমাদের মূল অভিধানে স্থান পায়নি কিংবা মানুষ জানে না অথবা আমরা সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলি। কেন? আঞ্চলিকতা প্রকাশের মেকি ভীতি আছে আমাদের।

কোন ভাষার শব্দাবলীকে পরিচিত করানোর জন্য ঐ ভাষায় রচিত সাহিত্যে আঞ্চলিক শব্দাবলীর সফল প্রয়োগ অতি জরুরি। কিন্তু এর জন্য দরকার শক্তিশালী প্রকাশ ক্ষমতার মেধাবী সাহিত্যিক, গবেষক, চিন্তাবিদ কিংবা দার্শনিক। আমাদের সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগের ভুরিভুরি উদাহরণ আছে। সৈয়দ সামসুল হকের নুরুলদিনের সারা জীবনে, রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগ ঘটেছে; চট্টগ্রামসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার যাদুকরী প্রয়োগ হয়েছে আলাউদ্দীন আল আজাদের কর্ণফুলী উপন্যাসে। শওকত আলী তার চিলেকোঠার সিপাইতে কেবল আঞ্চলিক শব্দই নয়, আমাদের চোখে অশ্লিল কিছু শব্দেরও শৈল্পিক ব্যবহার করেছেন। আল মাহমুদ তার কবিতায় নিয়ে এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাকে। কিন্তু হাল আমলে আমরা আঞ্চলিক ভাষা বা শব্দগুলোর এমন শৈল্পিক প্রকাশ দেখি না।

কেবল বিশেষ কোন অঞ্চলের বাইরে ব্যবহার করা হয়না বলেই আমরা আমাদের ভাষায় ব্যবহৃত কোন শব্দকেই মোটাদাগে পরিত্যাগ করতে পারি না, পরিহার করতে পারি না। কোন স্থানে কি ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে হবে সেটা  তার পরিবেশই নির্ধারণ করে। কিন্তু যখন পরিবেশ উপযুক্ত হয় তখন যদি উপযুক্ত শব্দ খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে আমরা তো মনের ভাব প্রকাশের অপূর্ণতায় ভুগবো। এ অপূর্ণতা হতে পারে কবিতায়, গানে, গল্পে, নাটকে, উপন্যাসে এমনকি গালাগালি করতেও। তাই আমাদের আঞ্চলিক শব্দগুলোকে সযত্নে রক্ষা করা দরকার। আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলোতে ও প্রচারের মাধ্যমগুলো দিয়ে আঞ্চলিক ভাষার শব্দগুলোর প্রচার প্রসার ও সংরক্ষণ করা দরকার আমাদের ভাষার প্রাচুর্যের স্বার্থেই।

মরিচ তার নিজ স্থানেই থাকুক। কিন্তু আমাদের আকালী যেন হারিয়ে না যায়। আমরা মাইয়া, পোলা, ছ্যামড়া, ছেমড়ি, পোয়া, গ্যাদা, হোলা, মনু কোনটাই পরিত্যাগ করব না। কারণ উপুক্ত পরিবেশে, উপযুক্ত শব্দ আমাদের দারুণ দরকার। ( ২৬ ফেব্রুয়ারি/ ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান।)