ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দেশে জঙ্গি তৎপরতা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এর বিস্তৃতি একেবারেই থেমে নেই ।১ জুলাই ২০১৬ সালের রাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানের জিম্মি ঘটনার পর থেকেই পুলিশের কাছে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে নব্য জেএমবি নামে একটি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়া জঙ্গিগ্রুপের প্রাণঘাতি কার্যক্রম। হলি আর্টিজানের পরপরই হামলা হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদগা মাঠের কাছাকাছি এলাকায়। পুলিশের কড়া পাহারা ও নজরদারিতে যদিও জঙ্গিরা মূল ঈদগায় ঢুকতে পারেনি, তবুও তারা কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু এর পরের ঘটনাগুলোতে জঙ্গিরা কোন সাফল্য পায়নি। হলি আর্টিজানসহ গত ৯ মাসে পুলিশ বড় বড় ৭ অভিযান পরিচালনা করে যেখানে নিহত জঙ্গির সংখ্যা ৩২ জন।
ঢাকার শ্যামলী, আজিমপুর, পল্লবী, আসকোনা, নারায়ণগঞ্জ শহর, গাজিপুরের পাতারটেক হাড়িনাল, এমনকি ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ছোট শহর সীতাকুণ্ডেও জঙ্গিরা গড়ে তুলেছিল তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের সম্ভার। কিন্তু পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সময় মতো হস্তক্ষেপে এসব ঘটনার সবগুলিতেই জঙ্গিদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়েছিল। পুলিশের গুলি কিংবা আত্মঘাতি হামলায় কিছু জঙ্গি নিহত হলেও এসব ঘটনায় পুলিশ বা সাধারণ মানুষের বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

জঙ্গি দমনের জন্য সরকার ইতোমধ্যেই পুলিশের অভ্যন্তরে কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম নামের একটি বিশেষ ইউনিটও গঠন করেছে। ইতোপূর্বে জঙ্গি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য গঠিত হয়েছিল স্পেশাল ইউপোনস এন্ড টেকটিক্স বা সোয়াট টিম। এক কথায়, জঙ্গি দমনের ব্যাপারে সরকার তথা পুলিশের প্রস্তুতি ও অনুশীলন প্রত্যাশিত গতিতেই চলছে। পুলিশও দেখিয়ে যাচ্ছে তাদের দক্ষতার উৎকর্ষ।

কিন্তু দেশের আপামর জনগণের সমর্থন ও সক্রিয় সহযোগিতা ভিন্ন একটি আদর্শিক অপরাধী গোষ্ঠীকে নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের বিশ্বাস, বাংলা দেশের সাধারণ জনগণ এক্ষেত্রে পুলিশকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কেমন হতে পারে বা হওয়া উচিৎ এ ধরনেরই একটি বাস্তব ঘটনার বিশ্লেষণ করা হবে আলোচ্য নিবন্ধে।

গত ১৫ মার্চ, ২০১৭ তারিখ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জেলার সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ ও প্রেমতলা এলাকা থেকে একজন নারীসহ কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা, বোমা তৈরি সরঞ্জাম ও অস্ত্র পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক কালের যে কোন জঙ্গি অভিযানের চেয়ে এ অভিযানটি বিশেষ কারণে অনন্য। কারণ এ জঙ্গি আস্তানার সন্ধান দিয়েছে সাধারণ মানুষ যা আপামর জনসাধারণের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এ জঙ্গি অভিযানের সূত্রপাত একটি বাসার মালিক কর্তৃক তার ভাড়াটিয়াদের সন্দেহের মাধ্যমে। পত্রিকার খবর অনুসারে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি টেলিফোনে যোগাযোগ করে জসিম নামের ত্রিশ বছর বয়স্ক এক যুবক নিজেকে কাপড় ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনাব সুবাস চন্দ্র দাসের কাছ থেকে তার ‘সাধনা কুটির’ নামের বাসার নিচ তলার একটি ইউনিট ভাড়া নিতে আসে। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে তিনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি গ্রহণ করেন। এনআইডিতে জসিমের বাড়ির ঠিকানা লেখা ছিল কক্সবাজারের রামু। তাই তার বাসার মালামাল আসার কথা ছিল রামু থেকেই। কিন্তু ৪ মার্চ মালামাল আনার সময় বাসার মালপত্র রামু থেকে না এসে যখন সীতাকুণ্ড পৌরসভারই পাশের ওয়ার্ড প্রেমতলা থেকে তখনই বিষয়টিতে সন্দেহ করা শুরু করেন সুবাস চন্দ্র। তিনি তার স্ত্রীকে ভাড়াটিয়া জসিম ও তার পরিবারের উপর নজর রাখার জন্য বলেন।

এর মধ্যে জসিম পরিবার নিয়ে ১২ মার্চ বাসায় ওঠেন। বাসাওয়ালা লক্ষ করেন ভাড়াটিয়ার বাসার দরজা-জানালা দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকত এবং রাতের বেলায় লোকজন আসা-যাওয়া করত।। গত ১২ মার্চ, ২০১৭ বাথরুমের ত্রুটি ঠিক করার জন্য জনাব সুবাস ওই বাসায় গিয়ে দুইজন ছেলেকে দেখতে পান। জসিম বলেন তারা তার স্ত্রীর ছোট ভাই। এর পর এক জায়গায় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা দেখে বাড়িওয়ালা সুবাসের সন্দেহ হয়। তাই কাপড় সরিয়ে তিনি উকিঁ মেরে ভেতরে অনেক সার্কিট আর গোলাকার ধাতব বস্তু দেখতে পান । এসব সার্কিট সম্পর্কে প্র্রশ্ন করলে ভাড়াটিয়া জসিম দাবি করেন, কাপড়ের পাশাপাশি তার লাইটিংয়েরও ব্যবসা রয়েছে। সেখানেই এসব সার্কিট কাজে লাগে।

কিন্তু বাড়িওয়ার সন্দেহ তাতেও দূর হয় না। বরং তা বাড়তেই থাকে। তিনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে একটি সার্কিটের নমুনা নিয়ে পরিচিত এক মেকানিককে দেখান। মেকানিক সেগুলো পরীক্ষা করে জানান, এগুলো টাইম কার্ড; ফ্রিজে কিংবা রিমোর্ট তৈরির কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়।

বাড়িওয়ালা সুবাস চন্দ্রের সন্দেহ আরো ঘনিভূত হয়। বুধবার জসিমের দেওয়া সেই এনআইডির কপি নিয়ে শহরের একটি কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে দোকানের ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করে জানতে পারেন ওই আইডি নম্বরটি ভূয়া। জাতীয় পরিচয় পত্রের সার্ভারে এ নম্বরের বিপরীতে জসিম নয়, অন্য একজনের নাম আছে। তার মানে তাকে ভাড়াটিয়া একটি জাল বা ভূয়া পরিচয় পত্র দিয়ে তার আসল পরিচয় গোপন করেছে।

এরপর দুই বন্ধু ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িওয়ালা সুবাস ভাড়াটিয়া জসিমের বাসায় গিয়ে তাদের তখুনি বাসা ছেড়ে দিতে বলেন সুভাষ চন্দ্র। কিন্তু জসিম বাসা ছাড়তে রাজি হচ্ছিল না। সে তার কাছ থেকে কয়েকদিন সময় চায়। কিন্তু বাড়িওয়ালা তাকে সময় দিতে নারাজ। জসিমকে সে জোর করেই বাসা থেকে বের করে দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। এসময় সামনের ঘরের খাটের নিচে একটি সুটকেস দেখে সেটা টেনে বাইরে আনেন বাড়িওয়ালা সুবাস। এখানেয় এক জোড়া গামবুট পান সুবাস। গামবুট হাতে নিয়েই তার চক্ষু ছানাবড়া। ওই বুটের ভেতরে ছিল একটি অত্যাধুনিক পিস্তল। আগ্নেয়াস্ত্র দেখেই তিনি চিৎকার দিলে এলাকার লোকজন ছুটে আসে। ঘরের ভেতরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে আসে। এর পর বিষয়টি চলে যায় পুলিশের হাতে।

এ বাসা থেকে জসিম ও তার কথিত স্ত্রী আর্জিনাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদের সাথে একটি দুই/তিন মাস বয়সের শিশুও ছিল। কিন্তু এ নারী মা হলেও জঙ্গি। তার কোমরে বাঁধা ছিল একটি আত্মঘাতি বেল্ট। গ্রেফতারের সময় সে তার কোমরে হাত দিয়ে বোমা বিষ্ফোরণ কিংবা বেল্টটি খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু বাড়িওয়ালা সুবাস ও তার স্ত্রী সাহসিকতার সাথে মহিলার দুই হাত শক্ত করে ধরে ফেলেন। এর পর পুলিশ বেলটি খুলে ফেলে। আত্মঘাতি হামলার হাত থেকে কেবল জঙ্গিরাই নয়, বেঁচে যায় পুলিশসহ কাছের সকল মানুষও।

এই ধৃত জঙ্গি জসিম ও তার স্ত্রীর দেয়া তথ্য মতে পুলিশ সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রেমতলা এলাকায় আর একটি বাসায় একটি জঙ্গি আস্তানার খরব পান। কিন্তু সেই আস্তানার জঙ্গিরা শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতি হয়। দীর্ঘ ১৯ ঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষ হয় পুলিশের গুলি ও জঙ্গিদের আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণের ফলে ৫ জঙ্গির মৃত্যুর মাধ্যমে।

জঙ্গি দমনের ইতিহাসে সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি নিসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কিন্তু এ ঘটনাকে অনন্যতা দান করেছে বাড়িওয়ালা সুবাস চন্দ্রের সক্রিয় সহযোগিতা। ভাড়াটিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি সেই সব তথ্য যাচাই বাছাই করার জন্য যে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সেটা একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারের অনুসন্ধিৎসু তদন্তকেও ছড়িয়ে গেছে। তিনি প্রথম থেকেই তার ভাড়াটিয়াকে সন্দেহ করে এসেছেন এবং তার সন্দেহ নিরসনের জন্য ইলেকট্রিক ম্যাকানিকের দরোজা থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার পর্যন্ত পরীক্ষা করেছেন। অতঃপর তিনি সক্রিয়ভাবে তল্লাশি চালিয়ে জঙ্গিদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভাণ্ডার পর্যন্ত আবিষ্কার করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হল, জনাব সুবাস ও তার স্ত্রী ছবির তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে মহিলা জঙ্গি আর্জিনা তার কোমরে থাকা আত্মঘাতি বেল্টের নিয়ন্ত্রণ হারান যার ফলে একটি আত্মঘাতি হামলা থেকে পুলিশসহ অন্যরা বেঁচে যান।

জঙ্গিবাদসহ অন্যান্য অপরাধ দমনের ব্যাপারে সুবাস চন্দ্রের এ কার্যক্রম একটি অনুসরণীয় উদাহরণ। তার মতো যদি দেশের সকল বাসার মালিকগণ তাদের ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে পুলিশের দেয়া নির্ধারিত তথ্যসমূহ সংগ্রহে উদ্যোগী হন তাহলে জঙ্গিরা যেমন তাদের গোপন আস্তানা তৈরি করতে পারবে না, তেমনি তাদের গোপন কর্মকাণ্ড চালাতেও পারবেন না।

ইতোপূর্বেও আমি আমার এক নিবন্ধে অপরাধ দমন বা এ ক্ষেত্রে সাহসিকতাপূর্ণ সহযোগিতার জন্য পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পুরস্কার প্রদানের অভিমত ব্যক্ত করেছিলাম। সীতাকুণ্ডের এ জঙ্গিবিরোধী অভযানটি একটি সাধারণ ঘটনার মাধ্যমে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এখানে এক নারীসহ পাঁচজন জঙ্গি আত্মঘাতি বিষ্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। সীতাকুণ্ড থানার ইন্সপেক্টর(তদন্ত) জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে আহত হন। ঢাকা থেকে কাউন্টার টেরোরিজম, সোয়াট ও বোম্ব ডিস্পোজাল টিমের সদস্যগণ এ অভিযানে অংশগ্রহণ করে। দুই সোয়াট সদস্য জঙ্গিদের আত্মঘাতি বিষ্ফোরণের ফলে মারাত্মকভাবে আহত হন। এ অভিযানের সাফল্যের জন্য পুলিশের অনেক সদস্যই সাহসিকতার পুরস্কারে ভূষিত হবেন। কিন্তু সুবাস চন্দ্রের মতো যারা ঝুঁকি নিয়ে পুলিশকে সক্রিয় সহযোগিতা দিয়েছিল তারা তলিয়ে যাবে বিস্তৃতির অতলে রয়ে যাবে স্বীকৃতিহীন, পুরস্কারহীন। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার প্রাথমিক দায়িত্ব তো জনগণের নিজেরই। তাই সুবাস চন্দ্রের মতো মানুষরা পুলিশকে সহায়তা দিতেই থাকবেন, পুলিশের সহায়তা নিতেই থাকবেন। ( ১৬ মার্চ, ২০১৭/ ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)