ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

মিশনের যে কোন কম্পোনেন্ট প্রশিক্ষণ শুরু করলে একটি বিষয়ের উপর লেকচার দেয়ার জন্য আমার ডাক পড়ে। এটা হল, Problems Solving বা ‘সমাস্যার সমাধান’। না, না, সকল সমস্যার সমাধান বলে দেয়া কিংবা সমাধান শেখানোর লেকচার এটা নয়। এটা হল সমস্যার সমাধানমূলক পুলিশিং সম্পর্কে খুব সাধারণ ধারণা।

আমাদের ঘটনাতাড়িত পুলিশিং ব্যবস্থাকে বিদায় দিয়ে কিংবা কিছু সময়ের জন্য হলেও এক পাশে রেখে দিয়ে স্বপ্রণোদিত পুলিশিং ব্যবস্থায় উন্নীত হতে হলে অপরাধকে একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে সেগুলোর কারণ খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধানে প্রবৃত্ত হতে হবে। এ সাধারণ নীতিটিকে কিভাবে কাজে প্রয়োগ করা যেতে পারে, আমার লেকচারে তারই কিছু গাইডলাইন থাকে, থাকে কিছু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত একটি মডেল হল SARA মডেল। এ মডেলের আ্ওতায় প্রথমে সমাধানের জন্য কোন সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়(Scaning)। এর পর সমস্যাটিকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তার অন্তর্নিহিত কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় (Analysis)। বিশ্লেষণের পর সুনির্দিষ্ট কারণগুলো দূর করার জন্য যথোপযুক্ত দূরীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ বা সাড়াদান করতে হয়(Response)। সর্বশেষ চলে মূল্যায়ন। মানে গৃহীত ব্যবস্থাবলী বা সাড়াগুলো কি প্রত্যাশিত ফল বয়ে নিয়ে আসছে, না আমাদের সাড়াদান আসলে কোন কাজই দেয়নি (Assesment)। যদি কারণগুলো দূর করার জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাজ দেয় তবে এগুলো অব্যহত রাখতে হবে, প্রয়োজনবোধে এর তীব্রতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর যদি এটা প্রত্যাশিত ফল বয়ে নিয়ে না আসে তবে আমাদের ভিন্নরকম সাড়ার কথা চিন্তা করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে মডেলটি প্রথম থেকেই পুনরাবৃত্তি করতে হবে।

আমার প্রবলেম সলভিং লেকচারটি আমজনতার কাছে আপতত একটু জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু যদি আমার লেকচারটি অন্তত ১৫ মিনিট চালিয়ে যেতে পারি তবে এটা গড় আইকিউ এর অধিকারী যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কাছেই পরিষ্কার হবে। কারণ আমি আমার প্রশিক্ষণার্থীদের বোঝার সামর্থ্যের উপর নির্ভর করেই আমার লেকচার পরিকল্পনা গ্রহণ করি ও সেভাবেই তা উপস্থাপন করি।

IMG20170329113616

এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে। সাধারণভাবে ব্যভিচার বলতে বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারকেই বোঝায়। তবে সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভেদে এ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের সাথে আরো কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কোন কোন সমাজে বিবাহিত নারী পুরুষের অবৈধ যৌনাচারই ব্যভিচার। আবার কোন কোন সমাজে বিবাহিতা নারীর সাথে স্বামী ভিন্ন অন্য কোন পুরুষের যৌনাচার যা ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে না অর্থাৎ বিবাহিতা নারীর সাথে স্বামী ভিন্ন অন্যপুুরুষের সম্মতিসূচক যৌনাচারই ব্যভিচার।

ব্যভিচার নামের কর্মটি আসলেই একটি অপরাধ কি না, এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। বিতর্কের বিস্তৃতি জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানুষের অন্দর মহল পর্যন্ত। প্রয়োগ কিংবা প্রভাবের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আইনসমূহ শনাক্ত করার জন্য জাতিসংঘ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করেিছল। এ কমিটির সভাপতি কমলা চন্দ্রকিরণের মতে, ব্যভিচারকে কোন শ্রেণিভূক্ত অপরাধই নয়। অন্যদিকে এ গ্রুপের এক যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে ব্যভিচারকে ফৌজদারি অপরাধ বানিয়ে নারীদের মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করা হয়েছে।

বস্তুত ব্যভিচারের সংজ্ঞায় সরাসরি না হলেও নারীদের সম্পূর্ণ জড়বস্তুর মতোই কল্পনা করা হয় যেখানে নারী পুরুষ তথা স্বামী ও তার অবিভাবকদের সম্পত্তিমাত্র। বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে ব্যভিচারের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ

যদি কেউ (পুরুষ) এমন কোন নারীর সাথে যৌন মিলন করে যে নারীকে সে (পুরষ) অন্যের স্ত্রী হিসেবে জানে বা বিশ্বাস করে এবং এ যৌন মিলন যদি স্ত্রীলোকের স্বামীর সম্মতি বা সহযোগিতা ছাড়াই ঘটে অধিকন্তু এ কর্মটি যদি ধর্ষণের পর্যায়ভুক্ত না হয় তবে সেই পুরুষটি ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হবে যার সাজা হবে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল, কিংবা জরিমানা বা উভয়ই। এক্ষেত্রে নারীটিকে অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। (দণ্ডবিধি, ধারা ৪৯৭)

লক্ষণীয় বিষয় হল, এ সংজ্ঞায় নারীকে অপরাধী কিংবা অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এ অদ্ভুত বিধানের পিছনে দণ্ডবিধি প্রণেতাদের বিবেচনা যাই থাকুক না কেন, এতে প্রমাণিত হয় যে নারীর সম্মতি মূল্যহীন এবং ব্যভিচারী পুরুষটিই কেবল দায়ী। তবে আইনের বিধান যাই থাকুন না কেন আমাদের সমাজ পুরুষটিকে বাদ দিয়ে নারীটিকেই ভ্রষ্টা ভেবে শাস্তি দিয়ে থাকে। কোন নারীকে যদি অপর তিনজন নারীর সাথেও তার স্বামীকে ভাগাভাগি করতে হয়, তবুও তাকে সন্তুষ্টির ভান করেই থাকতে হবে।

মানবেতিহাসের পরতে পরতে ব্যভিচারের জন্য নারীদেরই দায়ি করা হয়েছে। সামাজিক,সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও ব্যভিচারকে নারী প্রবৃত্তির একান্ত নিজস্ব দোষ বলেই চালিয়ে দেয়া হয়। কোন কোন সমাজে ব্যভিচারের জন্য নারী-পুরুষ উভয়কেই আইনে সোপর্দ করার বিধান থাকলেও অবস্থাগত কারণে পুরুষগণ প্রায়সই পার পেয়ে যায়। কিন্তু নারীর সাজার কোন পরিবর্তন হয় না।

দক্ষিণ সুদানের সামাজিক বা প্রচলিত আইন ও রষ্ট্রীয় আইনে ব্যভিচারকে নারী-পুরুষ উভয় কর্তক কৃত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যভিচারের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমান সাজার ব্যবস্থা আছে। দুই বছর পর্যন্ত জেল ও তার সাথে জরিমানাও। তবে এখানে অন্যান্য অপরাধের মতো ব্যভিচারের অপরাধও ক্ষতিপূরণসহ মীমাংসাযোগ্য। কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে বিবাহ বহির্ভূত যৌন মিলনে লিপ্ত হলে কিংবা মহিলাকে গর্ভবতী করলে সেই পুরুষ মহিলার স্বামী কিংবা পিতামাতাকে ক্ষতিপুরণ দিয়ে জেলে যাওয়া থেকে বাঁচতে পারে। একই ভাবে অনেক ট্রাইবে ব্যভিচারের জন্য নারীকেও দায়ী করে তার কাছ থেকেও ক্ষতিপুরণ দাবী করা হয়। কিন্তু এখানে মহিলাদের হাতে যেহেতু সম্পদ থাকে না, তাই তাদের শেষ পর্যন্ত জেলে গিয়েই সাজা খাটতে হয়।

আজকের ক্লাসে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশিক্ষণার্থীরা গ্রহণ করলেন ব্যভিচারকে। এর অর্থ হল, বর্তমানে দক্ষিণ সুদানের এই আইডিপি ক্যাম্পের অন্যতম বড় সমস্যা হল ব্যভিচার। এরপর সমস্যাকে বিশ্লেষণ করে জানা গেল ১. বহু বিবাহ, ২. অবিবাহ, ৩. পুরুষদের প্রবাস জীবন/যুদ্ধরত থাকা, ৪. আর্থিক সংকট, ইত্যাদি হল ব্যভিচারের পিছনে প্রধানতম কারণ।

প্রথমেই বিশ্লেষণ করা হল বহুবিবাহের বিষয়টি। এ সমাজে একজন পুরুষ কতজন বিয়ে করতে পারে তার কোন ঊর্ধ্বসীমা নেই। যারা আর্থিক সঙ্গতি আছে তারা চাইলে কয়েকশ বিয়েও করতে পারে। এখন কোন পুরুষের যদি ৩০ জন স্ত্রী থাকে আর তিনি প্রতি দিন একজন করে স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে থাকেন তবে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে পেতে গেলে অন্তত ৩০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এখন বিষয়টির দুটো মাত্রা আছে। প্রথমত, কোন মানুষের পক্ষে তো দূরের কথা, কোন পশুর পক্ষেও প্রতিদিন যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, ৩০ জন নারীর সাথে মাত্র একজন স্বামীকে ভাগাভাগি করে কোন নারীই যৌনতৃপ্তি পেতে পারে না। এমতাবস্থায়, ব্যাপকভাবে বহুবিবাহ চর্চিত সমাজে বিবাহিতা নারীগণ যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়, অতি স্বাভাবিক।

এরপর বিশ্লেষণে আসা যাক ‘অবিবাহ’। অবিবাহ মানে হল প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকদের বিবাহ করতে না পারার বিষয়। দক্ষিণ সুদানে নারীরা অত্যন্ত দামী। মানে বিয়ে করতে হলে একজন পুরুষকে পাত্রীর জন্য উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়। কোন কোন ট্রাইবে এটা অর্থ বিনিময়েও চলে। তবে সবচেয়ে বড় দুটো ট্রাইব ডিংকা ও নুয়েরদের মধ্যে বিয়ের সময় ছেলে পরিবার কর্তৃক মেয়ের পরিবারকে গরু উপহার দিতে হয়। অবস্থা ভেদে এ গরুর সংখ্যা কয়েকটি থেকে শুরু করে কয়েক শত এমনকি কয়েক হাজারও হতে পারে। একদিকে ধনী পুরুষদের শতাধিক বিয়ে করা, অন্য দিকে গরু পরিশোধ করতে না পারার জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক দরিদ্র পুরুষদের বিয়ে করতে না পারা– এই দুই কারণে দক্ষিণ সুদানে হাজার হাজার যুবক বৈধ স্ত্রীকে নিয়ে যৌনক্ষুধা নিবারণ করতে পারছে না। এমতাবস্থায়, এসব যুবকদের যৌনক্ষুধা মেটানোর উপায় হয়, পতিতালয়ে যাওয়া কিংবা পরস্ত্রী কিংবা অবিবাহিতা নারীদের কাছে যাওয়ার বাইরে অকল্পনীয়।

যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ সুদানের হাজার হাজার পুরুষ তাদের পরিবার থেকে দূরে থাকছেন। কেউ কেউ উদ্বাস্তু হয়ে দেশের মধ্যেই কিংবা দেশের বাইরে শরণার্থী শিবিরে বিচ্ছিন্নভাবে আশ্রয় নিয়েছে। তাই তারা নিজেরা যেমন স্ত্রীসঙ্গলাভে অপারগ, তেমনি তাদের স্ত্রীরাও স্বামীসঙ্গলাভে বঞ্চিত। এমতাবস্থায়, বিবাহিত নারীপুরুষ উভয়েই বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

এবার আসা যাক সমাধানের দিকে। এখানে বহুবিবাহ ও পাত্রী ক্রয়ের প্রথাটি সামাজিক বিন্যাসের প্রতিটি স্তরে এতটাই সুপ্রথিত যে এদের মূলোৎপাটন তো দূরের কথা এটার বিরুদ্ধে কথা বলাই বিপদ। অনেকে অভিযোগ করেন যে এটা খারাপ। কিন্তু একটু পরেই আবার বলবেন, এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ এটা। তাই এটা থাকবে। এমনকি নারীরাও বলেন, প্রাকৃতিক কারণে পুরুষদের একাধিক স্ত্রী জরুরি। কেউ কেউ বলেন, নারীর বয়স ৪৫ এর বেশি হলে তারা যৌনক্ষমতা হারায়। কিন্তু পুরুষ আমৃত্যু যৌনক্ষমতার অধিকারী। তাই প্রথম দিকে না হলেও শেষ দিকে তাদের আরো স্ত্রী দরকার। এর বাইরেও রয়েছে অধিক সন্তানের কামনা। এখানে মানুষ সব কিছুই সংখ্যার বিচারে পরিমাপ করে। যে পুরুষের অনেক সন্তান সন্ততি আছে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাই উচ্চবিত্তের পুরুষগণ কয়েক ডজন বিয়ে করে করে কয়েক শত সন্তানের পিতা হয়ে নিজেই একটি গোষ্ঠীর জন্ম দিতে চান।

তারপরও আমার প্রশিক্ষণার্থীগণ নিমরাজি হয়ে মেনে নিলেন যে এখানে একজন পুরুষ যদি ৫টার বেশি বিয়ে না করে এবং বিয়ে করার সময় বরকে যদি মেয়ের বাবার অনুকুলে ৫টির বেশি গরু দিতে না হয় তবে ব্যভিচারের অপরাধ কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।

একটিমাত্র ক্লাসে একটি সমস্যার কিছু তাত্ত্বিক সমাধান দেয়া যায়। কিন্তু সেই সমস্যাটি সমাধানের সূত্রগুলি বাস্তবে প্রয়োগ করা যে অত্যন্ত কঠিন সেটা বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন। তারপরও আমাদের ক্লাস চালিয়ে যেতে হয়, সমস্যা সমাধানের সূত্রগুলো কমিউনিটির সদস্যদের শিখিয়ে দিতে হয়।

(৩১ মার্চ, ২০১৭; ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)