ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

খবরে দেখলাম, ঢাকার উত্তরার মডেল টাউনের সাত নম্বর সেক্টরের সানরাইজ কলেজের অধ্যক্ষসহ কয়েকজনকে প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, তিনি বা তার কলেজ কিছু অনিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীকে তার কলেজ থেকে চলতি বছর (২০১৭) ফরম পূরণ করিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও প্রায় ৩৭ জন পরীক্ষার্থীর জন্য বোর্ড থেকে প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। তাই তারা পরীক্ষা দিতে পারেনি। এদের মধ্যে অনেকেই দুশ্চিন্তা আর হতাশায় অজ্ঞান বা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এমনি এক ছাত্রের বাবা কলেজ কর্তৃপক্ষ তথা অধ্যক্ষসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছেন।

এ মামলার সূত্র ধরেই উত্তরা-পশ্চিম থানার পুলিশ অধ্যক্ষসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। এরা এখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আছেন। মামলার বাদী ও অন্যান্য অবিভাবকদের ভাষ্যমতে, ৬২ জন অনিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে পরীক্ষার ফরম পূরণ ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য এক লাখ করে টাকা নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঐ টাকার বিপরীতে অধ্যক্ষ কোন কাজ না করেই, মানে বোর্ডে জমা না দিয়েই সব টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাই তাদের সন্তানরা প্রবেশ পত্র পায়নি, পরীক্ষা দিতে পারছে না।

শিক্ষাঙ্গণে যে একটা অনিয়ম আছে সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। আমরা ছাত্রাবস্থাতেই তা জানতাম। আমাদের এলাকার অনেক স্কুল কলেজেও  পরীক্ষা দেয়ার সময় কোত্থকে যে কিছু ছাত্রের আবির্ভাব হত সেটা আমরা জানতাম না। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় আমাদের বয়সের চেয়ে অনেক বড় বড় ছাত্ররা আসত। এসব ছাত্র হয়তো অন্য কোন স্কুল/কলেজ থেকে ঝরে পড়েছিল, প্রি-টেস্টে পাশ করতে পারেনি। তাই তাদের নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেত না। এমতাবস্থায়, তারা এমন কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজতো যেখানে প্রিটেস্টে, এমনকি কোন দিন ক্লাসে উপস্থিত না থেকেও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমন নাম করেছিল যে ঐ তল্লাটের সকল বখাটে ও ঝড়ে পড়া কিংবা গর্দভ ছাত্ররা সেইসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দেয়ার জন্য ভীড় জমাত। দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ এবং আরো কয়েকটি জেলায় এমন কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা আমি বাস্তব অভিজ্ঞতায় জেনেছি যেখান থেকে পরীক্ষা দিলে নাকি গর্দভও পাশ করে। সিরাজগঞ্জে চাকরি করতে গিয়ে গ্রামের পথে এক রিকসা ভ্যানে কয়েকজন ছাত্রকে পেয়ে তাদের কাছ থেকে আমি ঐ কলেজটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিলাম। আমার সাক্ষাৎ করা ঐসব ছাত্র ছিল অন্য জেলার। তারা পরীক্ষা দেয়ার পূর্বে ঐ কলেজে কোনদিন পা-ই রাখেনি। কিন্তু এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষই যে সব মন্দ কাজের জন্য দায়ী তা নয়। এক শ্রেণির অবিভাবক ও ছাত্রছাত্রী সরল পথে পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়ে বাঁকা পথে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ খোঁজে। কেউ কেউ আবার পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে পাশ করার জন্য নিশ্চিত কোন ঠিকানা খোঁজে।

যদি অর্থনীতির বাজার-ক্রেতা কিংবা ভোগ ও সরবরাহ নীতির কথা বলি তবে দেখা যাবে এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হল বাজার আর এ ধরনের অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীরা হল ক্রেতা। এখন প্রশ্ন হল বাজার ও খদ্দেরের মধ্যে কোনটা প্রথম অস্তিত্ববান হয়। আমি তো মনে করি প্রথমে ক্রেতার অস্তিত্ব; তারপর আসে দোকান বা বাজারের অস্তিত্ব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাই বলে আমি দোকান বলছি না। বাস্তব প্রয়োজনে বৈধভাবে শিক্ষাদান ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করার জন্যই এদের আবির্ভাব। কিন্তু যখন ক্রেতারূপী অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীরা এসব প্রতিষ্ঠানে এসে ভীড় জমায় তখন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের মহৎকর্মের পাশাপাশি দোকানদারীও শুরু করে।সানরাইজ কলেজেও হয়তো তাই ঘটেছিল।

মামলা যখন প্রতারণা কিংবা আত্মসাতের তখন বাদী বা প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের নিজের দোষ অনেকটাই লাঘব হয়। কিন্তু যখন এটা দুর্নীতি বা উৎকোচের পর্যায়ে পড়ে তখন উৎকোচ দাতাও কিন্তু সমানভাবে দোষী হয়ে পড়ে। সানরাইজ কলেজের অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীগণ তাদের নিয়মিত ফি এর বাইরে অনেক বেশি টাকা খরচ করেছে। আমার জানামতে বাংলাদেশের এমন কোন কলেজ নেই যেখানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য এক লাখ টাকার প্রয়োজন পড়ে।  এই যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের ফরম পূরণের জন্য এত বেশি টাকা বিনিয়োগ করল, সেটা কি তারা সরল বিশ্বাসে করেছেন? নিশ্চয়ই না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে তারা নিজেরাও কি দুষ্কর্মের সহযোগী নন? ‘অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে’ তারা উভয়েই কি সমান দোষী নন?

(৩ এপ্রিল, ২০১৭; ইউএন হাউজ, জুবা , দক্ষিণ সুদান)।