ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

 পুলিশ অফিসার  প্রাক্তন স্বামীর বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন এক নারী। অভিযোগ হল তার স্বামী   মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব, ফ্ল্যাটসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।  আর ওই সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিও তিনি  অনুরোধ জানিয়েছেন। অতি সাধ্বী এই নারীর দাবী তিনি তার স্বামীকে ‘এসব খারাপ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন(’?)

 

বলাবাহুল্য, কেবল পুলিশ অফিসারই নয়, যে কোন   সরকারি কর্মচারীর অসততা, বিশেষ করে আর্থিক অসততার পিছনে তার স্ত্রীসহ পরিবারের বড় ভূমিকা থাকে। অসৎ কর্মচারীদের স্ত্রীদের চাহিদা কেবল অসীমই নয়, অযোক্তিকও  বটে। অনেক অসৎ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীদের বলতে শুনেছি, তার সাহেব যে বেতন পান, তাতে তাদের নাকি কসমেটিকের খরচই কুলায় না। তাই সংসার চালাতে তাদের উপরি আয় করতে হয়। অসৎ কর্মকর্তার সন্তানগণ, সাবালক হোক আর নাবালক হোক, কেউই কখনও প্রশ্ন করে না, তাদের বাবা তাদের বেতনের টাকায় এত প্রাচুর্যের মালিক হয় কিভাবে। বরং তারা তাদের পিতা-মাতার অসৎ উপার্জনের টাকার সমূহ শ্রাদ্ধে নির্বিকার নিয়োজিত থাকে। তাই প্রথম দিকে মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য অসৎ পথে পা বাড়ানো বা উপরি কামানো শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জন্য এক সময় তা বার্ধতামূলক হয়ে পড়ে। তাই এক সময় তারা পান্তার জন্য নুন সংগ্রহ করলেও এখন কোরমা-পোলাওয়ের জন্য ঘি সংগ্রহে তাদের মেধা-মনন নিয়োজিত করে।

 

পক্ষান্তরে, সৎ বলে পরিচিত সরকারি কর্মচারীদের স্ত্রীদের চাহিদা সীমিত না হলেও যুক্তিপূর্ণ।তারা বোঝেন কত ধানে কত চাল হয়। তারা জানেন তাদের স্বামীরা কত বেতন পান। তাদের বেতনের টাকায় কোন হালে সংসার চালাতে হবে সেটা যেমন তারা জানেন, তেমনি স্বামীর কাছে কোন বস্তুর জন্য ধর্ণা দেয়া যাবে, আর কোনটা চাওয়া নিতান্তই অত্যাচার হবে সেটাও তারা বোঝেন। স্বামীকে উপদেশ দিয়ে সৎ পথে রাখার মতো ক্ষমতা আমাদের সমাজের নারীদের নেই।কিন্তু তাদের বিলয়দশন (Conspicuous Consumption tendency) যদি না থাকে, স্বামীর বেতন দিয়েই যদি সংসার চালানোর প্রবণতা থাকে, পারষ্পরিক ভোগ-বিলাশ প্রতিযোগিতা থেকে তিনি যদি বিরত থাকেন, তবে তাদের স্বামীরা অসৎ পথে চলে ধনকুবের হবেন না, সেটা নির্দিধায় বলা যায।

 

আমার গল্পের এ নারী  ১৮ বছর একজন অসৎ পুলিশ অফিসারের সাথে সংসার করে শেষ পর্যন্ত তার সম্পদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমাদের উপরিউক্ত পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ঠ যে উক্ত নারী তার  কথিত অসৎ স্বামীর সকল অপকর্মের সহযোগী না হলেও তার সাক্ষাৎ সেবাভোগী। তাই প্রক্তন হয়ে যাবার পর সাংবাদিক সম্মেলন করে স্বামীকে অসৎ বলে তাকে সৎ পথে রাখার প্রচেষ্টার দাবী ভূতের মুখে রাম নামই বটে।

 

যাহোক, আমার মতে এ ঘটনার  বেশ কয়েকটি ভিন্ন দিকও মাত্রা আছে। এবার আসুন সেগুলো বিশ্লেষণ করি। প্রথমত,  ১৮ বছর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে এ নারী তার স্বামীর সমূদয় অপকর্মেরই সাক্ষী। তাই তিনি চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তে মূল্যবান সহায়তা দিতে পারেন। তার কোন সম্পদ কোথায় আছে, সেগুলো কিভাবে আহরিত হয়েছে এসবই দুদক এখন তার মাধ্যমেই জানতে পারবে। এর ফলে একজন অসৎ ও দুর্নীতিবাজ একজন পুলিশ অফিসারকে দুদক আইনে সাজা দেয়া সহজ হবে।

 

দ্বিতীয়ত, এ নারীর অভিযোগ অনুসারে যদি দুদক অনুসন্ধান শুরু করে তবে কেঁচো খুঁড়তে সাপও বের হয়ে আসতে পারে।বাংলাদেশের দুর্নীতির ঘটনাগুলোর অনুসন্ধানে দেখা যায যে, অসৎ অফিসারগণ তাদের অবৈধ সম্পদের একটি বড় অংশ জমা করেন স্ত্রী ও তদীয় আত্মীয় স্বজনদের নামে। তাই এই নারীর নামেও যে তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ নেই তা অনুসন্ধানের পূর্বে হলফ করে বলা যায় না। প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাংবাদিক সম্মেলনে দেয়া ছবিতে মহিলার হাতে একটি বেশ দামী ঘড়ি দৃশ্যমান। আর এর প্র্ক্ষিতে একজন পাঠক  ইতোমধ্যেই মন্তব্য করেছেন, ‘আপনার হাতের দামী ঘড়িটা আশা করি তার অবৈধ উপার্জন থেকে কেনা নয়?’

 

তৃতীয়ত, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকতাগণ এ ঘটনা জেনে অনেকটাই সাবধান হবে । আমাদের সমাজে, বিশেষ করে মুসলিম পুরুষেদের, স্ত্রী যে কোন সময় ভূতপূর্ব বা প্রাক্তন হয়ে যেতে পারে। আর স্ত্রী একবার প্রাক্তন হয়ে গেলে স্বামীর গোমর এভাবেই ফাঁস হয়ে যাবে।

 

১৮ বছরের সংসার ভেঙ্গে গেলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই মানসিক অশান্তিতে থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনাটি চতুর্থ দিকটি হল এই প্রাক্তন দম্পত্তি একে অপরের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে তাৎক্ষণিক ফল না পেয়ে হয়তো মিডিয়া ট্রায়ালের আশ্রয় নিচ্ছেন যা আমাদের সমাজের চরম অস্থিরতারই প্রমাণ।

 

অতএব একটি স্থীর সমাজের প্রত্যাশি হয়ে বলব, বিষয়টির ফায়সালা আইনের পরিধির মাঝেই হোক। স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে যে মামলা করেছেন তার তদন্ত ও বিচার সঠিকভাবে হোক। আর একই সাথে দুদকও স্বামীর বিরুদ্ধে আনিত দুর্নীতির অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান করুক। আর  ‘মাথা টানলে যদি কানও’ চলে আসে, তবে কানেরও বিহিত করা হোক।

 

(২৯ এপ্রিল, ২০১৭, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)