ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

পড়ে শেষ করলাম সুপ্তিকণা মজুমদারের লেখা ‘বাংলাদেশের প্রাচীন সমাজ’ বইটি। অতিরিক্ত ডিআইজি (সংস্থাপন) হাবিব স্যারের অফিস লাইব্রেরিতে রাখা বইটি দেখে পড়ার লোভ হল। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে সামান্য কিছু পড়াশোনা আছে। এই তো ক’দিন আগেই পড়ে শেষ করলাম নিহাররঞ্জন রায়ের লেখা বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব) বইটির একটি সারানুবাদ। এ বইয়ের লেখিকাকে সম্পূর্ণ নতুন মনে হল। পড়ে দেখলাম, লেখিকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। ভাবলাম, বাংলার প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে তার লেখায় কিছু নতুন উপাদান পাওয়া যেতে পারে।

বইটি পড়ে, ইতোপূর্বে জানার সাথে যে বিষয়টি বাড়তি জানার সুযোগ হল, তা প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর অন্যতম  পট্টিকেরা’। এ রাজ্যটি খ্রিস্টীয় সপ্তম/অষ্টম এবং কোন কোন মতে খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে নাকি বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা অঞ্চলে  টিকেছিল। এ রাজ্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ পাওয়া যায় মায়ানমার তথা বার্মার সূত্রগুলো থেকে।

অধিকন্তু  ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ নামের একটি বৌদ্ধ পুঁথিতেও নাকি এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে। আর এ পুঁথিটি সংরক্ষিত আছে ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। এর বাইরেও ময়নামতিতে প্রাপ্ত তাম্রলিপিতেও পট্টিকেরা জনপদের উল্লেখ আছে।

বইটিতে প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর সুন্দর সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যাবে। সেই সময় বাংলার হিন্দু সমাজে বিয়ে থেকে শুরু করে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম ও তার পরের যৌবন পর্যন্ত যেসব অনুষ্ঠান পালন করত সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া আছে।

শিশুর জন্মের পূর্বেই তার মঙ্গলের জন্য গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, শোষ্যন্তীহোম অনুষ্ঠান হতো। জন্মের পর জাতকর্ম, নিষ্ক্রমণ, নামকরণ, পোষ্টিককর্ম,  অন্নপ্রাশন,  চূড়াকরণ ও উপননয়ন অনুষ্ঠান হতো। তারপর ছাত্রজীবনের আরম্ভ (হাতে খড়ি) অনুষ্ঠান, শিক্ষা সমাপনান্তে সমাবর্তন অনুষ্ঠান হতো। এরপর অনুষ্ঠিত হত বিবাহ ও নতুন গৃহে প্রবেশ উপলক্ষে শালাকর্ম অনুষ্ঠান।

বর্তমানেও আমাদের সমাজে বিশেষ করে হিন্দু সমাজে এ ধরনের অনেক সংস্কারই বিদ্যমান আছে। কিছু কিছু সংস্কার বা অনুষ্ঠানকে আধুনিকতার আবরণে ঢেকে দেয়া হলেও একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এগুলোর মূল আসলে প্রাচীন বঙ্গ সমাজেই।

আজকাল আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান করি। আমরা স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। কিন্তু এগুলো হয়ে গেছে অনেকটাই অনুষ্ঠান সর্বস্ব ও সার্বজনীন। কিন্তু প্রাচীনকালে এসব অনুষ্ঠান ছাত্রের পরিবারের সাথে গুরুগৃহেরই সমন্বয় থাকত। গুরুগৃহে সর্বোচ্চ শিক্ষা লাভের পর শিষ্য স্নান করে নতুন সাজে সাজত। এটাই হল স্নাতক হওয়ার প্রাচীন রূপ।

পাল রাজাদের বিচার ব্যবস্থার সাথে  রাজস্ব আদায়ের একটি সুন্দর সমন্বয় ছিল। শাস্ত্র নির্দেশিত ১০টি অপরাধের দণ্ড স্বরূপ রাজা অপরাধীদের জরিমানা করে সেই জরিমানার অর্থ কোষাগারে নিয়ে আসতেন।  এ দণ্ডের অর্থ আদায়ের জন্য একজন রাজকর্মচারী থাকতেন যার পদবী ছিল দশাপরাধীক। আর অপরাধগুলো ছিল নিম্নরূপঃ

১. অন্যের অপ্রদত্ত দ্রব্য হরণ করা, ২. কাউকে অনুশাসন বহির্ভূতভাবে হত্যা করা, ৩. পরস্ত্রীগমন, ৪.কর্কশ বাক্য ব্যবহার করা, ৫. মিথ্যাচার, ৬. অন্যের দুর্নাম রটানো, ৭. অসংলগ্ন কথা বলা, ৮.অপরের সম্পদে লোভ করা, ৯.অন্যায় ও ক্ষতিকর চিন্তা করা এবং ১০. অসত্যকে গ্রহণ করা।

.

মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের আধুনিক ধারণার সাথে মেলালে পাল রাজাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বিচার ব্যবস্থাকে অত্যন্ত রুঢ় মনে হতে পারে। ১০ অপরাধের মধ্যে প্রথম তিনটি ছাড়া বাকী সাতটিই বর্তমান জগতে সরাসরি কোন অপরাধকর্ম নয়। কর্কশ ব্যবহার, মিথ্যাচার, অন্যের দুর্নাম রটান, অসংলগ্ন কথা বলা, অপরের সম্পদের প্রতি লোভ করা, অন্যায় ও ক্ষতিকর চিন্তা করা কিংবা অসত্যকে গ্রহণ করার অপরাধগুলো কিভাবে প্রমাণ করা হত, ইতিহাসে তার কোন বিবরণ আমরা পাই না। তবে এসব অপরাধের জরিমানা থেকে রাজকোষে বড় অংকের কর আসত সেটা বলাই বাহুল্য। কারণ রাজকোষে টাকা না আসলে তো রাজকর্মচারীর পদই থাকার কথা নয়।

আবার এ সাথে এটাও বলতে হবে যে ১০ অপরাধের বিচারের ব্যাপারে সমসাময়িক কালে পাল রাজারা বড়ই উদার ছিলেন।  কারণ দণ্ড কেবল জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ অষ্টাদশ শতকে খোদ ইংল্যান্ডেও সামান্য রুমাল চুরির অপরাথে নাবালকেরও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হত।

.

প্রাচীন বাংলায় একটি লাঠির মতো উদ্ভিদ জন্মাত। যে লাঠির রস নিংড়িয়ে বাঙালিরা এক প্রকার মধু তৈরি করত। বলাবাহুল্য, এই যষ্ঠী বা লাঠিই হল আখ বা ইক্ষু বা কুসার। যদিও বর্তমানে আমরা বিদেশ থেকে চিনি আমদানী করি। কিন্তু প্রাচীন বাংলায় চিনি বা গুড় ছিল বর্হিবাণিজ্যের প্রধানতম পণ্য। রোম সাম্রাজ্য যখন আখ সস্পর্কে এক প্রকার অজ্ঞ ছিল, সেই সময় বাঙালিরা বিদেশের সাথে চিনি বাণিজ্য করত। যদিও সেই সময় আখের চিনি বর্তমান অবস্থায় ছিল না। কিন্তু এ চিনি যে গুড়ের চেয়ে ভিন্ন ছিল সেটা বোঝা যায়। কারণ ঐ সময় আরব বণিকদের মাধ্যমে যখন চিনি রোম সাম্রাজ্য তথা ইউরোপে যায় তখন ইউরোপের মানুষ এটাকে মিষ্টি লবণ বলত। আর এটা ব্যবহার হত ঔষধ হিসেবে।

বলাবাহুল্য, আখ সম্পূর্ণ রূপেই একটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ফসল। বলা হয়ে থাকে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৭/৮ হাজার বছর আগে নিউ গিনি দ্বীপের মানুষ আখকে প্রথম গার্হস্থ্য পর্ণ হিসেবে আবাদ করা শুরু করে। এ সময় গিনিতে যে আখ হত বঙ্গ ভারতে হত তার চেয়ে ভিন্ন জাতের আখ। আর খ্রিস্টীয় শতকের প্রথম দিকেই বাঙালিরা আখের রসের রাসায়নিক পরিবর্তনে চিনি তৈরি করার কৌশল আবিষ্কার করেছিল। যদিও চিনি শব্দটি চিন দেশ থেকে এসেছে কিন্তু আখ বা গুড়ের আবাদ ও ব্যবহার বাংলা থেকে চিন দেশে গিয়েছিল তিব্বতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে।