ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

সৃষ্টি তথা স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই ভারত ও পাকিস্তান চির প্রতিদ্বন্দ্বীই কেবল নয়, চিরবৈরি দুটো দেশও বটে। তবে এ প্রতিদ্বন্দ্বীতার নির্দোষ প্রকাশ হল, দুই দেশের ক্রিকেট দলের মুখোমুখি হওয়া। বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচে যেমন, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেও তারা মরিয়া হয়ে লড়াই করে। তবে ক্রিড়ার প্রতিদ্বন্দ্বীতা যে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা নয়, সেটা দুই দেশের খেলোয়াড়গণও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। তাই এ দুই দল যখন মুখোমুখি হয় তখন তাদের মধ্যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না। বরং এরা যখন মাঠে থাকে, তখন মনে হয়, একমাত্র খেলার হারজিত ছাড়া এদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই, হিংসা নেই, বিদ্বেষ নেই, কোন হানাহানি বা একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার কোন চিন্তাও নেই।

0.+Top-pik

কিন্ত গোলটা বাঁধায় এদের সমর্থকগোষ্ঠীরা। খেলার মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত গোল বাঁধায় এরা। আমাদের দেশেও ভারত ও পাকিস্তানকে নিয়ে পরষ্পর বিরোধি দুইটি সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে কতিপয় গোঁড়া গোষ্ঠীও আছে যারা এই দুই দেশের যে কোন দল যে কোন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলতে নামলেই নিজেদের দলের জন্য হৈ-হুল্লোড় শুরু করে, মারামারিও করে। আর যদি এ দুই দেশের দুই ক্রিকেটদল  মুখোমুখি হয়, তো কথাই নেই। তারা বেডরুমের কাঁথাবালিশ দিয়েও যুদ্ধ করে, গ্যালারির রেলিং দিয়েও একে অপরকে আহত করে।

একমাত্র নিজ দেশের, নিজ দলের পক্ষে ছাড়া ভিন্ন কোন দেশের ভিন্ন কোন দলের জন্য রক্তক্ষণ, তা হৃদয়ের রক্তই হোক আর দেহের রক্তই হোক, সুস্থতার লক্ষণ নয়। কিন্তু কষ্ট হল, এমন অসুস্থ ক্রিড়ামোদি, খেলার সমর্থকের সংখ্যাও নিতান্তই কম নয়।

ভারত-পাকিস্তানের সর্বশেষ আইসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা চলছে তা বিকারগ্রস্তদের বালখিল্যপনার চেয়েও বেশি। ভারতকে সমর্থন করায় কেউ কেউ ঐ সমর্থকদের ভারতের দাস বলছেন। কেউ আবার পাকিস্তানকে সমর্থন করায় ঐ সমর্থকদের দেশদ্রোহি, রাজাকার ইত্যাদি অভিধায় অভিযুক্ত করছেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে এ দু’দলই যে বিকারগ্রস্ত সেটা ক্ষুণাক্ষরেও তারা বুঝতে পারছেন না।

এই বিতর্কের মাঝখানে আবার ভারতের একটি খবর বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।  ভারতের মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর জেলার পুলিশ ১৫ জন পাকিস্তান সমর্থককে গ্রেফতার করেছে। তারা নাকি কেবল পাকিস্তানকে সমর্থনের মধ্যেই  সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা রাস্তায় নেমে ভারতবিরোধী স্লোগানও দিয়েছে। ভারতের আদালত আবার তাদের জামিনও না মঞ্জুর করেছে। কারণ ভারতের নাগরিক হয়ে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ভারত বিরোধি শ্লোগান তো দেশদ্রোহিতারই বহিঃপ্রকাশ! অবশ্য এই গ্রেফতারের পিছনে কতটা দেশের ইজ্জত রক্ষা আর কতটা মুসলিম বিদ্বেষ আছে সেটা একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারবে।

নিজ দেশের ও নিজ দলের বাইরে গিয়ে কেউ যদি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বা দলকে সমর্থন করে, সেটা আপাত দৃষ্টিতে যতন নির্দোষই হোক, চূড়ান্ত বিচারে যে দেশপ্রেমের ঘাটতি প্রমাণ করে সেটা বুদ্ধিমানমাত্রই বোঝেন। আর আমি মনে করি, এমন মানুষের বা সমর্থকের সংখ্যা হাতে গোনার বেশি হবে না। বাংলাদেশের সাথে পকিস্তানের বা ভারতের ক্রিকেট খেলা হবে, আর আমি বাংলাদেশি হয়ে আমার দলকে সমর্থন না করে, আমার দলের জিত কামনা না করে ভারত-পাকিস্তানের জয় কামনা করব, এটা আমার সমর্থনের স্বাধীনতা হতে পারে। তবে আমার নিজের স্বাধীনতা হতে পারে না। হতে পারে আমার দল পৃথিবীর দুর্বলতম দল, হতে পারে আমার খেলোয়াড়গণ শূন্য রানে সাজঘরে ফিরে আসে কিংবা আমার বোলারগণ ডাংগুলি খেলোয়াড়দের চেয়েও জঘণ্য। কিন্তু তাই বলে আমি কি আমার দলকে পরিত্যাগ করব? কিছুতেই না।

রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে রাবণের ভাই বিভীষণকে অত্যন্ত ধার্মিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পূর্বজনমের কাহিনী টেনে দেখান হয়েছে যে সে পূর্বজনমে দেবতাদের কাছে ধার্মিকতার বর প্রার্থণা করেছিল। সীতাকে অপহরণ করা রাবণের জন্য পাপ ছিল, মূর্খতা ছিল, রামায়ণের কাহিনীতে এটা ইনিয়ে বিনিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু বিভীষণ কর্তৃক লক্ষ্ণণকে পথ দেখিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে নিয়ে গিয়ে অপ্রস্তু্ত মেঘনাদকে হত্যা করার সুযোগ করে দেয়া কোন ক্রমেই ধার্মিকতা হতে পারে না।

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাই বা সভাসদগণ রাজার শত্রুকে আহব্বান করে রাজ্য দখল করিয়েছে রাজ্যলাভের জন্য। কিন্তু রামায়ণের বিভিষণ কখনও রাজ্যলোভ করেননি। তিনি যা করেছেন, তা কেবল ধর্মের খাতিরেই করেছেন। কিন্তু বিভীষণ যত ধার্মিকই হোক, তিন যে একজন আগাগোড়া দেশদ্রোহি এবং দেশপ্রেমের বিচারে একটি চিরায়ত ঘৃণ্য চরিত্র সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। তাই খেলাধুলার রাজ্যেও যদি কিছু বিভীষণ থাকে তবে তাদের গ্রেফতার না করে চিকিৎসা করান দরকার।