ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বহুল আলোচিত দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়টি পড়লাম। ২০০৪ সালের ০২ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্ণফুলী থানাধীন চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লি. (সিইউএফএল) ঘাটে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের একটি চালান ধরা পড়ে। চালানে অস্ত্রের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে সেগুলো ১০টি ট্রাকে করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দামপাড়া লাইনে নেয়া হয়। এই জন্যই এ মামলাটি মিডিয়ায় ‘দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। আসলে মামলাটির কিতাবি নাম হল রাষ্ট্র বনাম মতিউর রহমান নিজামী গং।

৩০ জানুয়ারি ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের মহানগর স্পেশাল ট্রাইবুনাল-১ এর  বিজ্ঞ বিচারক জনাব এস এম মজিবুর রহমান এ মামলার রায়ে ৫০ জন আসামীর মধ্যে প্রথম ১৪ জনের প্রত্যেককে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র মামলার ১৯ (সি) ও ১৯ (এফ) ধারায় সর্বমোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

Ten-Truck-Verdict-2

মামলাটি বাংলাদেশের এ যাবৎকালের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র চোরাচালান ও হেফাজতে রাখার ঘটনা ছিল, যার সাথে জড়িত ছিল তৎকালীন সরকারেরই দুটো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ আরো কিছু কর্মকর্তা। একই সাথে এ অপরাধের মাঠ পর্যায়ের অপারেটরগণও ছিলেন দেশের দুইটি প্রধান গোয়েন্দা দফতরের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তা। দেশের অভিযুক্তদের সাথে অভিযুক্ত হয়েছেন ভারতের আসাম রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া।

চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর রায় পড়ার আগ্রহ আমার অনেক দিনের। জেমবি নেতা শাইখ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের যে মামলায় ফাঁসি হয়েছিল, আমি ঝালকাঠিতে ভারপ্রাপ্ত এসপি থাকাকালীন সেই মামলার রায়ও পড়ে দেখেছিলাম। তবে সে মামলার রায় ছিল বেশ ছোট। সম্ভবত ৫০/৬০ পৃষ্ঠা। কিন্তু দশট্রাক অস্ত্র মামলার রায়টি অনেক বড় ৪১২ পৃষ্ঠার।

অবৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে দখল ও জ্ঞান অপরাধ প্রমাণের জন্য অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এ মামলার অধিকাংশ আসামীরই অস্ত্রের সরাসরি দখলী সত্ব ছিল না। কোন প্রকার বাহ্যিক দখল ছাড়াই কিভাবে এ অভিযোগের দায় উচ্চ পর্যায়ের আসামীদের উপর বর্তাবে? এটিই ছিল আমার প্রধানতম কৌতুহল। কিন্তু রায়টি শেষ পর্যন্ত পড়ে সে কৌতুহলের নিবারণ হল। রায় অনুসারে, ‘অস্ত্রগুলো সম্পর্কে উল্লেখিত আসামীদের এই যৌথ জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণকেই এগুলোর উপর তাদের দখল ছিল বলে গন্য করা যায়’। (৪০৩ পৃষ্ঠা)

ঘটনাটি প্রথম থেকেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তথা খোদ সরকারই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। চেষ্টার প্রথম পদক্ষেপই ছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব জনাব ওমর ফারুককে আহবায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি তৈরি করে সেই কমিটির মাধ্যমে তদন্তকে সামান্য কিছু গোবেচারা অপারেটরের মধ্যে সীমিত রাখা। বলাবাহুল্য, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব তা সুচারুরূপেই করতে পেরেছিলেন। অনুসন্ধান কমিটির অন্যতম সদস্য ও ডিজিএফআইয়ের পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার নিজেই এ ঘটনার মূল হোতাদের অন্যতম ছিলেন ও পরে আসামী হয়ে ১৪ বছরের সাজা লাভ করেছিলেন। আর এনএসআইয়ের তৎকালীন ডিজি আব্দুর রহিমসহ চারজন কর্মকর্তা তো এ অপরাধ কাজের  মূল অপারেটরই ছিলেন।

অনুসন্ধান কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের তৎকাীন প্রধান ডিআইজি সামশুল ইসলাম। নিয়ম হল, অনুসন্ধান কমিটির সকল কাগজপত্র সদস্য সচিবের কাছে থাকবে, তিনি খসড়া প্রতিবেদনও তৈরি করবেন যা সদস্যদের পরামর্শক্রমে চূড়ান্ত হবে। কিন্তু প্রতিবেদন তৈরি করা তো দূরের কথা স্বরাষ্ট্র সচিব ওমর ফারুক একাই গোপনে নিজের মতো করেছিলেন। তাকে ডিকটেশন দিয়েছিলেন খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীই।  তৈরি করা অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি সদস্য সচিবসহ কমিটির কোন সদস্যকেই তিনি দেখতেও দেননি। সদস্য সচিবসহ অন্য সদস্যরা ঐ প্রতিবেদন না দেখেই  সেখানে কানার মতো সই করেছেন কিংবা করতে বাধ্য হয়েছেন। বিষয়টি যে মামলার সাজাপ্রাপ্ত দুই নম্বর আসামী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পালন ও সহযোগিতার জন্যই করেছিলেন, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই চতুর আমলাটি নিজে সাক্ষী হয়ে তার সহযোগিতার দায় থেকে অবলিলায় বেরিয়ে এসেছেন।

এ ঘটনার সবচেয়ে করুণ ও মর্মন্তুদ দিক ছিল, অপরাধ উদঘাটন তথা অস্ত্র চালান আটক করার সাফল্যের প্রাথমিক দাবীদার পুলিশ কর্মকর্তা সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও সার্জেন্ট হেলালউদ্দীনকে ঘটনার এক বছর পরে অন্য দুটো অস্ত্র মামলায় আটক, নির্যাতন ও বিচারের মুখোমুখি করা।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার ঘটনা ধামাচাপা দিতে ক্ষমতাসীন আসামীরা যখন হিমসিম খাচ্ছিল সেই সময় তারা ফেনী ও নোয়াখালীর সুধারাম থানায় দুটো অস্ত্র মামলা সাজায়। এ মামলায় ধৃত আসামীদের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি নেয়া হয় যে তাদের কাছে প্রাপ্ত একে-৪৭ এসএমজিগুলো ছিল সেই  দশ ট্রাক অস্ত্রের অংশ এবং ওগুলো তাদের কাছে আলাউদ্দীন ও হেলালউদ্দীনই বিক্রয় করেছিল। আদালতের মতে,

তাদের এই মামলায় অস্ত্র চুরি করে হেফাজতে রাখা ও বিক্রি করার দায়ে অভিযুক্ত করা হলেও তাদেরকে একে-৪৭ অস্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই মামলার আলামতের মধ্যে একে-৪৭ টাইপের কোন অস্ত্রই ছিল না (পৃষ্ঠা-৪০১)

সাজানো এ দুটো মামলায় সার্জেন্ট আলাল ও হেলালকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব চট্টগ্রামের পরিচালক লে. কর্নেল এমদাদ নিজেই লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে মারপিট করে আলাদ্দীনের এক পা ভেঙ্গে দেন। তবে এ শাস্তি অস্ত্র চুরির জন্য ছিল না, ছিল দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। তাদের আহম্মকীর জন্য দেশের বড় ক্ষতি হয়েছিল বলে লে. কর্নেল এমদাদের মন্তব্য ছিল।

ঘটনাচক্রে এ দুই পুলিশ সার্জেন্ট ছাড়া পেয়েছিলেন। তাদের প্রতি অবিচারের কিছুটা ক্ষতিপূরণ হয়েছে পরবর্তীতে তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল ও পুরস্কৃত করার মাধ্যমে। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাদের উপর যে নির্মম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়েছিল তার কোন প্রতিকার তারা পাননি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সরকারি হেফাজতে নির্যাতনের জন্য ক্ষতিপূরণের মামলা করা হয়। বাংলাদেশেও সেটা অসম্ভব নয়। কিন্তু এমন দুঃসাহস কত জনের আছে?

(ঢাকা, ৩০ জুন, ২০১৭)