ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

জীবনের একটি বড় অংশ ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে পার করেছি। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবনের শুরুতেও শিক্ষকতাই করেছিলাম। তাই এই পেশাটার প্রতি আমার একটি মোহ আছে, আছে অনাবিল শ্রদ্ধা। দিনাজপুর জেলা স্কুলের শিক্ষক থাকাকালীন  তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি খাতা মূল্যায়নের সময় এক ছাত্রকে ৫০ এর মধ্যে পঞ্চাশ নম্বরই দিয়েছিলাম। এ নিয়ে স্কুলে হৈচৈ পড়ে গেল। এ কেমন কথা, ইংরেজিতে পূর্ণ নম্বর? এটা কি অংক পেয়েছে যে সঠিক হলেই পূর্ণ নম্বর?  হ্যাঁ, ঐ ছাত্রের গোটা খাতার মধ্যে একটিমাত্র বানান ভুল ছিল। তাই হয়তো এর জন্য আধা নম্বর বা তারও কম কর্তন করা যেত। কিন্তু আমি ওর উপর এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম যে ঐ বানানের উপর কলমই বসাইনি।

গোটা ছাত্রজীবনের পরীক্ষায় যা লিখেছিলাম, তাতেই নম্বর পেয়েছিলাম। আমি ভাল লিখেছিলাম, না শিক্ষকরা আমার প্রতি উদার ছিলেন, বলতে পারি না। তবে যাই লিখতাম, ভাল নম্বর পেতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তেমন ভাল করতে পারিনি। তবে যা লিখতাম, যেমন লিখতাম, তেমনিই নম্বর পেতাম।

আমাদের গাণিতিক পদ্ধতি বা Mathematical Method পড়াতেন অধ্যাপক ড. মতিন। স্যারের একটি থিওরেম ছিল পনের পৃষ্ঠার। (কম বেশি হতে পারে। আমার সহপাঠীদের মনে থাকলে হয়তো এ লেখা পড়ে ওরা তা সংশোধন করে দিবেন)। এই থিওরেম মুখস্থ করে লিখলাম, স্যার পূর্ণ নম্বরই দিলেন। অন্যান্য প্রশ্নের উত্তরেও তিনি ভাল নম্বর দিতেন। স্যার বলতেন, যারা ছাত্রজীবনে কম নম্বর পেয়েছিল, শিক্ষক হয়ে তারাই ছাত্রদের কম নম্বর দেয়। আমি স্যারের সাথে একমত।

যে প্রসঙ্গকে সামনে রেখে এ লেখার অবতারণা, তাই এবার বলি। আমার মেয়ে যে স্কুলে পড়ে, সেই স্কুলে নির্ধারিত কিছু ব্যাকরণ বই আছে। এ সব বই ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে কিনতে হয়। অবশ্য বিষয়টি আমাদের সময়ও ছিল। শিক্ষকরা যা পড়াবেন তার সবই এ বই থেকেই থাকবে। তাই ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের সুবিধার জন্যও সেই নির্ধারিত বইগুলোই কিনতে হয়।

কিন্তু কেউ যদি নির্ধারিত বই থেকে প্রশ্নের উত্তর, যেমন রচনা, প্যারাগ্রাফ, পত্রাদি না লিখেন তবে সেইক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের শূন্য দিতে হবে, এমন খবর ছাত্রজীবনে ছিল অকল্পনীয়। এমন কি যখন কর্মজীবনে শিক্ষকতা করতাম তখনও এমনটি ছিল না।  কিন্তু আমার মেয়ে তার নির্ধারিত বই থেকে একটি ইংরেজি লেটার/ইমেইল লিখেনি বলে ইংরেজি শিক্ষক শ্রেণি পরীক্ষায় তাকে শূন্য দিয়েছেন। তার ধারণা ছিল, হয়তো শূন্য দিলে আমার মেয়ে নির্ধারিত বইটি কিনতে বাধ্য হবে। কিন্তু তার এ কৌশল যে ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্রীর জন্য কতাটা হতাশার, তিনি সেটা কি  একবারও চিন্তা করে দেখেছিলেন?

আমাদের সমাজ আগাগোড়াই একটি অশুদ্ধ সমাজ। এখানে ভিক্ষুক থেকে শুরু করে অঢেল টাকার মালিকরাও সামান্য অর্থের জন্য নিজেদের নর্দমার কীটের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। পিয়ন-পেয়াদা, আমলা-কামলা, পুলিশ-প্রশাসক, চিকিৎসক-কৃষক, রাজনীতিবিদ-অর্থনীতিবিদ সবার চরিত্র থেকেই শুদ্ধাচার নির্বাসিত। তাই শিক্ষকরাও যে এর ব্যতিক্রম হবে না, তাই স্বাভাবিক।

কিন্তু সবচেয়ে আহত হই যখন শিক্ষকরা সামান্য কয়েকটা অর্থের জন্য নিজেদের এত নীচে নামায়। ব্যাকরণ বইয়ের লেখক-প্রকাশক স্কুলের শিক্ষক-প্রশাসকদের উৎকোচ দিয়ে তাদের লেখা/প্রকাশিত বইকে স্কুলের বুক লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করান। কিন্তু তাই বলে নির্ধারিত বই অনুসরণ না করলে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের উত্তরে শূন্য দেয়াটা নিচুতার কোন পর্যায়ে পড়ে, আমার মাথায় ঢোকে না।

শিক্ষকদের স্থান ছাত্রছাত্রীদের কাছে সবার উপরে। আমার শিক্ষকদের কেউ যখন কোন সমস্যা নিয়ে আমার স্থানীয় থানায় যান, আমি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি, ভাই, এ বৃদ্ধলোকটি আমার শিক্ষক। তার সমস্যার সমাধান হয়তো আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু তাকে স্যার সম্বোধন করে এক কাপ চা খাওয়ালে বাধিত হব। বলাবাহুল্য, এখন পর্যন্ত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ আমার শিক্ষকদের অসম্মান করেননি।

কিন্তু যে শিক্ষক কেবল প্রাইভেট না পড়ার জন্য তার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কম নম্বর দেন কিংবা নির্ধারিত বই থেকে উত্তর না লেখার জন্য শ্রেণি পরীক্ষায় শূন্য দেন, ছাত্রছাত্রীদের মনে সেই শিক্ষকের জন্য আমাদের শিক্ষকদের মতো শ্রদ্ধার আসন থাকবে কি? শিশুদের মনস্তত্ত্ব যারা বোঝেন না, তাদের শিশু শ্রেণির শিক্ষক হওয়া সাজে না।