ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে উত্তাল দেশের রাজনীতি। বিএনপি যথারীতি দাসত্ব চুক্তি বা দেশ বিক্রির ধোঁয়া তুলছে, এটা নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই কারণ এটা তাদের রাজনীতি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কি হয়েছে ভারত সফরে? আর কি চুক্তিই বা হলো? ভারত সফরে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়ার কথা তার অবস্থা আদতে কি? তিস্তার কি খবর? বা বাংলাদেশ কি আদৌ সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে?

প্রথমেই পরিষ্কার করে নেয়া ভালো বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বরং প্রতিরক্ষা খাতে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। অনেক মিডিয়া দেখলাম প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টা এনেছেন এবং এটা নিয়ে চলছে জোর অপপ্রচার। অনেকে বুঝে আবার অনেকে না বুঝেই সেই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়েছেন।

উল্লেখ করা দরকার, চুক্তি আর সমঝোতা স্মারকের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে সেটা সবার বুঝা উচিত। সমঝোতা স্মারক যেকোনো মুহূর্তে বাতিল করা যায় কিন্তু চুক্তির ক্ষেত্রে তা সম্ভব না। সকল চুক্তিই সমঝোতা স্মারক কিন্তু সকল সমঝোতা স্মারক চুক্তি নয়। তাই প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া সবারই জানা উচিত পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রের সাথেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই, ভারতের সাথেও বাংলাদেশ কোন রকম প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। যেহেতু ভারতের দিক থেকে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং এই চুক্তি হলে এটা ভারতের জন্য কোন দেশের সাথে সবচাইতে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো তাই বুঝাই যাচ্ছে এটি ভারতের কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। অপরদিকে বাংলাদেশের গুরুত্ব ছিলো তিস্তা চুক্তি নিয়ে।

এপার বাংলার সাধারণ মানুষের চাহিদা ছিলো এবারই সম্পাদিত হবে বহু কাঙ্ক্ষিত এই তিস্তা চুক্তি, কিন্তু সেই অপেক্ষাটা আরো দীর্ঘ করে দিলো ভারত সরকার। যথারীতি এবারো আমাদের দেয়া হয়নি তিস্তার পানি কেবল আস্থা রাখতে বলেছে ভারত সরকার। কিন্তু আর কতো আস্থা রাখবে বাংলাদেশের জনগণ!

মূলত ১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি সমবণ্টন নিয়ে প্রথম প্রস্তাব ওঠানো হয়। কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের কোন রূপরেখা গ্রহণ করেনি কোন সরকার। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সাথে একটি চমৎকার সম্পর্কের মাধ্যমে অগ্রসর হতে থাকে বাংলাদেশ। তারই ধারাবাহিতায় ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি খসড়া চুক্তি তৈরির জন্য দুই দেশের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় দুই দেশের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় সাধারণ জনগণ। ছিটমহল সমস্যা থেকে শুরু করে সমুদ্রে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় বাংলাদেশ। তবে অধরা রয়ে যায় তিস্তা। কারণ হিসেবে ভারত সরকার দাঁড় করায় মমতা ব্যানার্জিকে। অবশেষে ২০১৭ সালের সফরে আমরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধলাম কেননা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছিলো আমাদের জন্য সুবিধাজনক। সারদা-নারদ কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই এর তদন্ত এবং দমকল মন্ত্রী শোভনসহ তৃণমূলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতার নাম আসাতে বিপাকে আছেন মমতা আর তাই এসব কেলেঙ্কারি থেকে তার দলকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী হয়তো তিস্তার অনড় অবস্থান থেকে সরে আসবেন, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং পূর্বের ন্যায় আমাদের আবারো আস্থা রাখতে বলেছে ভারত যা রেখেই এতোদিন পাড় করেছি আমরা।

আগে থেকেই জানা গিয়েছিলো এবারো হচ্ছে না তিস্তা তবে ঢাকা সুনির্দিষ্ট তারিখ চাইবে দিল্লীর কাছে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের। এই সংবাদেও আমরা ক্ষীণ আশা খুঁজে পেয়েছিলাম এবং তা আরো গভীর হয় যখন ৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একই মঞ্চে বাংলাদেশ সরকার প্রধান এবং পশ্চিমবঙ্গ মুখ্যমন্ত্রীকে রেখে ঘোষণা দেন, ‘‘আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, একমাত্র আমার এবং আপনার সরকারই তিস্তা চুক্তির দ্রুত সমাধান করতে পারবে।’’ -এই বক্তব্যের পর যখন সবমহলে আলোচনা শুরু হয় ২০১৮ এর মধ্যেই স্বাক্ষরিত হবে তিস্তা চুক্তি ঠিক সেই মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জি নতুন এক কূট-প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন।

মমতা ব্যানার্জি তিস্তার পরিবর্তে ভিন্নধর্মী এক প্রস্তাব দেন হায়দরাবাদ হাউসে। তিস্তার বিকল্প হিসেবে তোর্সা ও অন্যান্য নদীর পানি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যা হয়তো বলা সহজ কিন্তু বাস্তবসম্মত কোন সমাধান না। তোর্সার জল অলরেডি উত্তরবঙ্গের অন্য নদী দিয়ে বাংলাদেশেই প্রবাহিত হচ্ছে কোন বাধা বিপত্তি ছাড়া। সেই জল আবার খাল কেটে তিস্তা দিয়ে আনতে হবে কেন?

গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকাতে স্পষ্টভাবেই ভারতের পরিবেশবাদীরা মমতার এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং খাল খননের মাধ্যমে পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বলে মত দিয়েছেন। তাছাড়া প্রস্তাবের আওতায় থাকা নদী খনন করার জন্যও কমপক্ষে ৪-৫ বছর লাগবে। তাই স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে এটা তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না করার কৌশল। তাছাড়া আজকের তিস্তা কিন্তু অতীতে এরকম ছিলো না বরং তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহের উপর বাধা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করার কৌশল নিয়েছিলো দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামফ্রন্ট সরকার। তাই ভারতের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত এবং ভারত সরকার অনিচ্ছুক এই চুক্তির ব্যাপারে এই প্রশ্ন তোলা কিন্তু খুব বেশি অমূলক না।

অনেকের আঙুল উঠছে ভারত সরকারের দিকে যে, মমতাকে পাপেট হিসেবে ব্যবহার করে তিস্তা চুক্তি না করার ব্যাপারে মানসিক অবস্থানে রয়েছে ভারত সরকার। আর তাই দিল্লী আর কলকাতা একে অপরের উপর দায় চাপিয়ে তিস্তা চুক্তি আটকে রাখার কৌশল নিয়েছে।

তবে এই ধারণা ভুল প্রমাণ করার দায়িত্ব ভারত সরকারের। আর তাইতো আমাদের মতো কিছু স্বাপ্নিক মানুষ এখনো ভাবছি অদূর ভবিষ্যতে এই চুক্তি হবে কেননা আশার আলো খুঁজে পাই গতকালের ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতেও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে যখন তিস্তার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন, তখন প্রায় একই সময়ে দ্বিপাক্ষিক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে তিস্তা চুক্তির দ্রুত রূপায়ণে রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের কথা বলছে কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রীর তোর্সা প্রস্তাবকে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়ে দিয়েছে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার। বরং যৌথ বিবৃতিতে ফেনি, মানু, ধরলা-সহ ৭টি নদীর জলবণ্টন নিয়ে চুক্তি সইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হলেও তোর্সার নামই নেই সে তালিকায়।

শেষত, তিস্তা চুক্তি এখন যতোটা না বাংলাদেশের জনগণের জন্য দরকার তার চাইতে বেশি দরকার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান মজবুত করতে। কেননা ২০১৯ সালে কঠিন এক নির্বাচনের মুখে পড়তে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে;আর তখন তিস্তা হবে অন্যতম নির্বাচনী ইস্যু। এর আগে যেভাবেই হোক আওয়ামী লীগ চাচ্ছে তিস্তা চুক্তি করতে কেননা তিস্তা চুক্তি হলো না কেন এই প্রশ্নের উত্তর বিএনপিকে নয় বরং আওয়ামী লীগকেই দিতে হবে।

তাই ২০১৯ এর আগে তিস্তার সমাধান আওয়ামী লীগকেই করতে হবে, আর সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক! হয়তো আমার মতো অনেকেই আশাবাদী ২০১৯ সালের আগেই সম্পাদিত হবে তিস্তা চুক্তি। স্পষ্টভাবেই বাংলাদেশ সরকার ভারতকে বলুক, তিস্তা যেমন ভরবে না তোর্সার জলে ঠিক তেমনি তিস্তার বিকল্প কেবল তিস্তাই।

মমতার শুভবুদ্ধির উদয় হোক, আমাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিক ভারত।

slide