ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমার প্রিয় একজন ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাই ঢাকার শাহবাগে। তারপর আমরা পুরান ঢাকার দিকে হেটে রওনা হই। ঠিক সেই সময়ে ভাইয়া হঠাৎ করে আমাকে বললেন যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এ যাবেন। আমি একটু চমকে গেলেও পরে তার সাথে যাই।

যাওয়ার আগে বললেন যে, “চল হাসপাতালে যাই, গিয়ে দেখে আসি আমরা কেমন আছি?”

আমি বললাম, “আমরাতো ভালো আছি।”

উনি হেসে বললেন, “চল আগে যাই।”

তারপর আমি হাসপাতাল এর কিছুটা দিক ঘুরে দেখতেই বুঝতে পারলাম যে আমি কেমন আছি এবং আল্লাহ আমাকে কেমন রেখেছেন। বলা বাহুল্য যে, হাসপাতালে না গেলে বুঝতে পারতাম না যে আমি মানে আমরা যারা সুস্থ আছি তারা কেমন আছি? সেখানে মানুষের যে দুঃখ-দুর্দশা দেখলাম তা বলার নয়। গরীব রোগীদের কথা নাই বা বললাম।

আরো একবার গিয়েছিলাম আমার ছোট ভাইকে নিয়ে রক্ত দিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ঘটনাটি এইরকম ছিল যে, ছেলেকে হাসপাতালে দেখতে আসার সময় বাবা রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে বাবা ছেলে একসাথে একই ওয়ার্ড এ ভর্তি হয়। দুর্ভাগ্যবশত বাবা ছেলের দুজনেরই একটা পা কেটে ফেলতে হয়। তাদেরই রক্তে দিতে আমরাদের যাওয়া হয়েছিল।

রক্ত দিয়ে দেখে আসার সময় আমি কৌতূহলবশতঃ জিজ্ঞেস করেছিলাম, “চাচা এখন তো আপনি হাসপাতাল এর বিছানায় আছেন, তো এখন আপনাকে কোনও কিছু চাইতে বললে আপনার চাওয়া টা কি হবে?”

একটু হেসে উনি আমাকে বললেন, “আমি যতদিন বেঁচে থাকবো যদিও আমি এখন পঙ্গু, তবুও যেন আল্লাহ আমাকে বাকি জীবনটা সুস্থ রাখেন। এ ছাড়া আমার জীবনের আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, এটাই আমার একমাত্র ও শেষ চাওয়া পাওয়া।”

উনার উত্তর শুনে বুকের বাম পাশে একটু বোধহয় ঝাঁপটা লাগলো।

উনার কথা শুনে বুঝলাম যে মানুষের চাওয়া পাওয়ার হিসাব শুধুই বাড়ে তা নয় সময়ে সেটা কমতেও পারে।

বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছিলাম যে, মাধ্যাকর্ষণের শক্তি উপরের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গেলে শূন্য হয়ে যায় যেখানে শূন্য একেবারেই শূন্য। কিন্তু পরিসংখ্যানের ভাষায় জীবিতকালে মানুষের চাহিদা কখনোই শূন্য হবার নয়, যেখানে “শূন্য একেবারে শূন্য নয়”। 

মানুষের চাহিদার ব্যাপকতা থেকে শূন্যতে না হলেও, এক এ এসে ঠেকার জন্য সাত আসমানের উপর যেতে হবেনা, সামান্য হাসপাতালের একটি রাতই যথেষ্ট। মানুষের জীবনের সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে সুস্থতা। অথচ এত বড় একটি প্রাপ্তি নিয়ে আমরা সব সময় অপ্রাপ্তির দুশ্চিন্তায় সারাক্ষণ ভুগে থাকি।

অনেক মানুষ কে দেখেছি অপ্রাপ্তি নিয়ে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছে, কাঁদিয়েছে বাবা-মা সহ আপনজনদের। আমি এও দেখেছি যে সামান্য কিছু অপ্রাপ্তির জন্য একটা সুস্থ মানুষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে গেছে। আমি মনে করি সেই মানুষটা বোধয় বোকা সব চেয়ে বেশি।

আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য কোনো শুকরিয়া আদায় করি না। বিশ্বাস করুন এই আপনি বা আমি যখন সুস্থ থাকি তখন আমাদের কত চাওয়া পাওয়া থাকে। আবার এই আমি বা আপনি যদি কোনো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকি তাহলে আমাদের চাওয়া পাওয়া একটি মাত্র তালিকাতে এসে ঠেকে যাবে। আর সেটা হলো শুধুমাত্র সুস্থভাবে বেঁচে থাকা।

এই কথাগুলো যেহেতু আমার অভিজ্ঞতায় লিখছি, তাই আমাকে আর একটা বার বিশ্বাস করুন এই কারণে যে, আপনি যদি কোনো সময় অসুস্থ থাকেন, আপনাকে ওই সময়ে পৃথিবীর সব কিছু দিতে চাইলেও আপনি একটা কিছুও নেবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সুস্থ হোন। তাই বলছি কি লাভ এত চাওয়া-পাওয়া বা প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করে? আপনি আমি সুস্থ আছি এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি।

আমরা পরিশ্রম করে যাবো, সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখবো, নিশ্চয় উনি সবার ভালোটাই ভেবে রেখেছেন। মিছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করে কেনো সময় নষ্ট করা।

আসুন আমরা একটি বার বুকের বাম পাশে ডান হাতটি রেখে একাগ্রচিত্তে আরও একবার শুকরিয়া আদায় করি সৃষ্টিকর্তার কাছে এবং ধন্যবাদ জানাই নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য। শক্তি চেয়ে নেই পরিশ্রম করবার জন্য।

দেখবেন এক সময় সবচেয়ে তৃপ্তির হাসিটা আপনার ঠোঁটে লেগে আছে এবং থাকবে। এই হাসিটার জন্য আমরা সবাই বদলে নিতেই পারি আমাদের জীবন, কি নিচ্ছি তো?