ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

shakib-suvosree

ঈদ মানেই খুশি। ঈদ আনন্দের মাত্রা যোগ করে দেয় ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত বিশেষ বাংলা সিনেমাগুলি। বাংলাদেশে বিগ বাজেটের বাংলা সিনেমা গুলো সম্ভবত ঈদের মধ্যেই মুক্তি পায়। এবারের আকর্ষণ ছিল বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ঢাকায় সিনেমার সুপারস্টার নায়ক শাকিব খানের ছবি ‘নবাব’। তবে ঈদ এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহের প্রেক্ষাপট কিন্তু অনেকটায় ভিন্ন থাকে। যারা ইতিমধ্যে ঈদে ছবি দেখতে গিয়েছেন তারা আমার সাথে একমত হবেন। প্রচুর ভিড়, লম্বা টিকেটের লাইন, ব্ল্যাক টিকেট, টিকেট না পাওয়া, অগ্রিম টিকেট সমস্যা, আরও অনেক কিছু আছে। তবে নিরাপত্তার দিকটা অন্য সময়ের চেয়ে বেশ ভালো থাকে বলতে হবে। শ্যামলী সিনেমাতে লাইনে দাঁড়িয়ে বেশ কষ্ট করে পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই সিনেমার টিকেট। আনন্দ যেন ধরেই না!

সিনেমা হলে আসন গ্রহণ করতেই দর্শকদের উচ্ছ্বাস ও করতালি দেখতে পেলাম। সবার আগ্রহ যে নবাবে ডুবে ছিল বুঝতে আর বাকি রইল না। অতঃপর পর্দা উঠে গেলো, জাতীয় পতাকা প্রদর্শন। সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম জাতীয় পতাকা ও সঙ্গীতের সম্মান প্রদর্শন করতে।

একটি কথা বলে রাখি যে, ’নবাব’ সিনেমাটি যৌথ প্রযোজনা নাকি যৌথ প্রতারণা এই তর্ককে একটু অগ্রাহ্য করেই পুরো সিনেমাটি দেখতে বসেছিলাম। বিনোদনটাকে মুখ্য রেখেই পুরোটা উপভোগ করেছি এবং করেছে বাকি অন্য দর্শক যারা প্রেক্ষাগৃহে ছিলেন বলে মনে করি।

’নবাব’ পুরো সিনেমাটি দেখে আমার মনে হয়নি যে এটি দেশিয় পরিচালকদের নির্মিত কোন ছবি। বাংলাদেশের মুল ধারার সিনেমা মানে বাণিজ্যিক ছবি বলতে যা বোঝায় এতোটা পরিচ্ছন্ন সাধারণত হয়না। এটা কেবল ওপার বাংলার সিনেমার পরিচালকদের পক্ষেই সম্ভব। তবে বাংলাদেশে অনেক গুণি নির্মাতা রয়েছেন যারা চাইলেই অনেক ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন। কেন করছেন না এটা তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা রইল। তাদের কাছে অনুরোধও রইলও ভালো কিছু নির্মাণ করে আমদের কাছে তুলে ধরার। আমাদের দেশিয় সিনেমা বিকাশে আমাদের দর্শক শ্রোতাদের অনেক ভূমিকা আছে বলে মনে করেন সিনেমা শিল্পের সাথে জড়িত সবাই। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের উপস্থিতিই বিকশিত করে সব দেশের চলচ্চিত্র শিল্পটির।

 

এবার সিনেমাটির কাহিনী বৃত্তান্তে আসা যাক। আমরা এখন ওপার বাংলা এবং এপার বাংলার যে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমাগুলো দেখে থাকি সেগুলো খুব কমই মৌলিক কাহিনীর হয়ে থাকে। বেশির ভাগই ভারতের তামিল বা তেলেগু ছবির নকল হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো হিন্দি ছবিরও নকল দেখা যায়। এই নকলের হার কলকাতা ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই বোধহয় বেশি হয়ে থাকে। তবে হিন্দি ছবিতেও কাহিনীর নকল হয় কিন্তু পরিচ্ছন্ন নির্মাণ শৈলীর কারণে  এই নকলের বিষয়টা তেমন কারো মাথায় আসে না।

নবাব সিনেমাটির কাহিনী পুরনো দুটি হিন্দি ছবির যৌথ মিশ্রণে নির্মিত বলে আমার মনে হয়েছে। আপনারা যদি আমির খানের ’সারফারশ’ ও শাহরুখ খানের ’বাদশা’ সিনেমা দুটি দেখে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন। তবে কেউ যদি না দেখে থাকেন তাহলে দরকার নেই দেখবার। আপনার জন্য নবাব সিনেমাটিই যথেষ্ট। আফসোসের কোন কারণ থাকবেনা। যৌথকাহিনীর মইয়ে চড়েই দর্শক উপভোগ করেছে ‘নবাব’,  যা আমার দেখা শোতে বুঝতে পেরেছি। তাহলে কাহিনী নিয়ে কিছু বলা যাক।

শাকিব খানকে সিনেমায় দেখা যায় বাংলাদেশের ইন্টেলিজেন্স  বিভাগের একজন দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে। যিনি কলকাতায় শিক্ষাজীবন কাটিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছেন বাংলাদেশে। এখানে পরিচালক বাংলাদেশের প্রতি একটু মমতা দেখিয়েছেন। সিনেমাতে তার বাবাকেও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্য হিসাবে দেখানো হয়েছে। যিনি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। নায়কের মাকেও দেখা গেল আততায়ীর হামলায় আহত হতে। কলকাতায় সুচিকিৎসার জন্য ভারতে ভর্তি হওয়া মাকে দেখতে আসেন নায়ক। রাস্তায় যাত্রা বিরতি-কালে আততায়ীর হাত থেকে বাংলাদেশের এই পুলিশ কর্মকর্তা বাঁচিয়ে দেন কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর জীবন। পরে মন্ত্রীর অনুরোধেই চক্রান্তের কিনারা করতে কলকাতায়ই গোপন মিশনে থেকে যান ছবির নায়ক শাকিব খান। এরপরেই ঘটতে থাকে  সিনেমাটির  নানা কাহিনীর মোড়, যাকে আমরা সাসপেন্স বলে থাকি।

সবচেয়ে বড় চমক ছিল সিনেমার শেষে দৃশ্যে। বলতে পারেন সিকুয়েল ছবির শেষ দৃশ্যের মতো। নবাবকে দেখা গেছে নতুন মিশন এর জন্য এগিয়ে যেতে। নবাবের সিক্যুয়েল আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এ বাপারে ভালো বলতে পারেন। আমি বেশি কিছু না বলি!

শাকিব খান! মানতেই হবে বাংলাদেশের একজন সুপারস্টার। উনার নবাব সিনেমাটি দেখে আমার একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের কথা মনে পড়ছে। যিনি তার একটি লেখায় বলেছিলেন, ’কাদামাটি দিয়ে শিবও গড়া যায় আবার বাঁদরও গড়া যায়’। উনি যথার্থই বলেছেন। অভিনেতার অভিনয় বের করে আনাটায় পরিচালকের সার্থকতা বলতে হবে। বাংলাদেশের সিনেমা পরিচালকগণ যে শাকিব খানকে ঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারে নাই এই কথাটা এখন মানতেই হবে সবার। পুরো নবাব সিনেমাটিতে আমি অন্যরকম শাকিব খানকে দেখেছি।  তার ভালো অভিনয় ও বাচন ভঙ্গি একেবারেই আলাদা। তবে নাচের দিকটা ভালো করতে হবে। শাকিব খানের কাছে আরও ভালো কিছু প্রত্যাশা থাকবে আমাদের দেশিয় দর্শকদের।

এবার আসি সিনেমাটির চরিত্রগুলো ও তাদের রুপদানকারী অভিনয়শিল্পীর কথা নিয়ে। পুরো ছবিতে শাকিব খানসহ ৩-৪ জন বাংলাদেশি শিল্পীর উপস্থিতি ছিলো। বাকিটা ওপার বাংলার শিল্পী ও কলাকুশলী। সিনেমার নায়িকা হিসাবে শুভশ্রী ভালই ছিল বলতে হবে। তবে তারও নাচের দিকটা আরও মনযোগী হতে হবে বলে আমার মনে হয়েছে। কিছু দৃশ্যে একেবারেই তেমন কোন অভিনয়ের রসায়ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

খল চরিত্রে বাংলাদেশের অমিত হাসান উতরেই গেছেন তার চরিত্রে। ভালো করছেন খল চরিত্রে এই গুণি শিল্পী। উনিও এক সময়ের বাংলাদেশের সিনেমাতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নায়ক ছিলেন। বাংলাদেশ অনুযায়ী উনি নিজেও অনেক বিগ বাজেটের ছবি করেছেন। অভিনেতা সব চরিত্রেই মানানসই থাকবে এটাই চাওয়া অভিনেতার প্রতি আমাদের দর্শকদের। মার চরিত্রে রেবেকার তেমন কিছু অভিনয় দেয়ার জায়গা ছিল না। তবে সিনেমাটিতে তাকে সুস্থ্য দেখিয়ে কাহিনিতে নতুন মোড় আনা যেত।

ছবির বিশেষ খল চরিত্রে ওপার বাংলার গুণী অভিনেতা খরাজ মুখারজি বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। খল চরিত্রে অভিনয় করলেও তারমধ্যেই উনি দর্শকদের দিয়েছেন কিছু হাসির খোরাক। ছবিতে নায়কের সহকারী পার্শ্ববর্তী চরিত্রে বিশ্বজিতের কাজ ছিল অনেক ভালো। সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করবার পরও বেশ কিছুটা হাসির খোরাক যুগিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর চরিত্রে স্টার জলসার “জলনুপুর” সিরিয়ালের পারি পাগলী খ্যাত অপরাজিতা বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।

পত্রিকার সম্পাদকের ভূমিকায় ফেলুদা খ্যাত সব্যসাচী ভালো অভিনয় করেছে বলতে হয়। তবে এই চরিত্রের ব্যাপ্তিকাল ছিল খুবই সামান্য। পুলিশ কমিশনার এর চরিত্রে ছিলেন রজতাভ দত্ত। উনিও বেশ মানান সই ছিলেন তবে উনার অভিনয়ের জায়গাটা অনেক কম মনে হয়েছে। এবার সিনেমার আরও একটি বিশেষ চরিত্রে ছিলেন অরিন্দম গাঙ্গুলি। এই চরিত্রে একেবারেই আমার বেমানান লেগেছে। অন্য কাউকে নেয়া যেতো বলে মনে করছি। ছবির সাসপেন্সের চরিত্র অনুযায়ী তেমন মুনশিয়ানা দেখা যায়নি তার চরিত্রে।

এবার ছবির অন্যান্য দিক নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। ছবির চিত্রনাট্য আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। সিনেমাটিতে চারটি গান রয়েছে। পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক সিনেমা হিসাবে গানগুলো মানানসই মনে হয়েছে আমার কাছে। গানের দৃশ্য দেখানোর সময়ে দর্শকের উচ্ছ্বাস ছিল। সিনেমাটি দেখার সময় এক দর্শক চিৎকার করে বলেছিলেন যে, “বাংলা সিনেমার জান আমাদের শাকিব খান”।

আলোকসজ্জা ও রূপসজ্জা ছিল বেশ ভালো। আউটডোরের শুটিং বেশ ভালো ছিলো। কলকাতার নিউ মার্কেটসহ অনান্য জায়গার দৃশ্যগুলো বেশ লোক সমাগম ছিলো। তবে সিনেমাটির আবহ দৃশ্যের মিউজিক তেমনটা ভালো  ছিলনা বললেই চলে। করুণ দৃশ্যগুলোতে ভালো মিউজিক সংযোজন করা যেতো। তবে ছবির সংলাপগুলো কাহিনীর সাথে মানানসই ছিল। দর্শক শ্রোতা বেশ আনন্দ নিয়ে দেখেছেন। সিনেমা হলে থাকা প্রতি দর্শক সিনেমা শেষে বেশ আনন্দ নিয়েই বের হয়েছেন, আমি যা দেখেছি।

 

সবশেষে কিছু কথা। ভালো ও পরিচ্ছন্ন ছবি দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনে। আয়নাবাজি, শিকারি, নবাবসহ এই সব ছবি প্রমাণ করে বিষয়টি। বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের সাথে জড়িত সবাইকে একটি কথা বলতে ইচ্ছে করছে। এখন সময় হয়েছে সুস্থ বিনোদন ছবি নির্মাণের। প্রতি অভিনেতা, অভিনেত্রী, কলাকুশলী, পরিচালক, প্রযোজকসহ অন্যান্য সব বিভাগের সবাই যদি নিজ কাজের প্রতি মনোযোগী হোন, তাহলেই বাংলাদেশে সিনেমার সোনালী অতীত খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি।