ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু কিছু মানুষের হৃদয় আর মস্তিষ্কটা সৃষ্টিকর্তা স্রেফ ডেকোরেশনের জন্য দিয়েছেন। ও দুটো জিনিস ইহজন্মে ওদের কোন কাজে লাগে না। ওদের শরীরে একটাই অঙ্গ সক্রিয়- সেটা হল লিঙ্গ।

বাসে, ট্রেনে, হাটেবাজারে যেদিকেই তাকাই- লিঙ্গচালিত জীবের অভাব নেই। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রিপারেটরি স্কুলের রেক্টর পদে অধিষ্ঠিত, কেউ আবার আলেম বলে পরিচিত।

এতসব সজীব, চলন্ত লিঙ্গসর্বস্ব জন্তু দেখতে দেখতে নিজেও ওদের মত করে ভাবার চেষ্টা করছি। বুঝে গেছি- এ দেশে হৃদয় এবং মস্তিষ্ক স্রেফ বিলাসিতার নাম। ও দুটো জিনিস থাকতে নেই। যাদের আছে, তাদের লোকে বড় সন্দেহের চোখে দেখে। কেউ কেউ আবার ওইসব আপদগুলোকে ব্লগার বলে ডাকে।

আমার বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, রুচি, ইচ্ছে-এসব মূল্যহীন। আমার Essential quality হল আমার তেঁতুলত্ব। আর আ্মার প্রতি পুরুষের একমাত্র রেসপন্স হল- তার তেঁতুলায়িত তাড়না। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত আমার ডাকনাম তেঁতুল ওরফে ফুল ওরফে নরকের দ্বার।

মেনে নিয়েছি। মেনে নিয়েই সেদিন লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার চারপাশে গিজগিজ করছে পুরুষ। আমি একা একটা মেয়ে এতগুলো পুরুষের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। ছোটবেলা থেকে ভীড়ে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা কম হয় নি। গা বাঁচিয়ে চলার বিভিন্ন কৌশল সেই কৈশোরেই রপ্ত করেছি। দুহাত ভাঁজ করে সামনে রাখি। কাঁধের ব্যাগটা পেছনে রাখি। অত্যন্ত দুর্বল ব্যারিকেড যদিও। ভীড় এবং ধস্তাধস্তিতে এই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকে না।

কিন্তু সেদিন কপাল একটু বেশিই খারাপ ছিল। এই প্রতিরোধটুকু গড়ারও সুযোগ ছিল না। হাত মাথার উপরে উঁচু করে দাঁড়াতে হল। হাতে ফর্ম, সত্যায়িত করা কাগজপত্র। ধস্তাধস্তিতে এই আবেদনপত্র যদি ছিঁড়ে যায়! এই ভীড়ে, গরমে, নিরাপত্তাহীনতায় আমি ঘামতে লাগলাম। পাবলিক বাসে অভিজ্ঞতা থেকে জানা আছে-যে যেমন খুশি ছুঁয়ে যাবে। আমি হাজার উশখুশ করেও কোন লাভ হবে না।

হঠাৎই শুনতে পেলাম-কেউ একজন বলে উঠল- “এই, আপুটাকে ওই পিলারটার পাশে দাঁড়াতে বল। এই ভীড়ের মধ্যে কীভাবে দাঁড়াবে? উনার অসুবিধা হচ্ছে তো!” বেশ কয়েকজন সায় দিয়ে উঠল। কনফিউজড হয়ে আমি বললাম, “সিরিয়াল হারিয়ে ফেলব যে!” ওরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘আপনি কার পরে আমাদের মনে আছে। অসুবিধা নেই।” কৃতজ্ঞ মুখে পিলারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুব একটা লাভ হল না। সবাই ওই দিকটা দিয়ে বের হচ্ছে। তবু কী আশ্চর্য! এই জঘন্য ভীড়ের মধ্যেও একটাও অসুস্থ হাতের স্পর্শ আমার শরীরে লাগে নি!

ওখানে দাঁড়িয়েই চারপাশে তাকাতে লাগলাম- একটা ছেলেও তো আমার পরিচিত নয়।  বয়সে সবাই যে ছোট, তাও নয়। কিন্তু প্রত্যেকের চোখের দিকে তাকালেই সহযোগিতার নীরব আশ্বাস পাচ্ছি। এদের কাউকে তো এই মুহুর্তে ফুলপিয়াসী ভোমরা মনে হচ্ছে না!

বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফর্ম জমা দিতে আসা এই ছেলেগুলো কারা? এরা পুরুষ নয়? কারো কারো ভাষ্যমতে, এই বিসিএস পরিক্ষার্থীগুলো তবে ধ্বজভঙ্গ রোগী আর টিএসসি-এর ওই জন্তুগুলো হল সুস্থ সবল পুরুষ!

সেটাই। পৌরুষ শুধু দুই পায়ের সংযোগস্থলে সীমাবদ্ধ থাকার জিনিস। হৃদয় দিয়ে কারো অস্বস্তি অনুভব করার নাম পৌরুষ নয়। মস্তিষ্ক খাটিয়ে কারো অসুবিধে দূর করার নামও পৌরুষ নয়। কোন একজন অনাত্মীয়কে ঘাতকের চাপাতির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে দেখে প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে তাকে ধরতে যাওয়ার নাম তো পৌরুষ নয়ই ( দুপায়ের সংযোগস্থলে পৌরুষের নিশানা নেই কীনা)।   শুধু লোলুপ দৃষ্টিতে কারো শরীরের দিকে তাকিয়ে তেঁতুলায়িত হওয়ার নাম পৌরুষ। একটি নারীশরীরের লিঙ্গের সাথে জোরপূর্বক আরেকজনের মহালিঙ্গের সংযোগ ঘটানোর নাম পৌরুষ।

ফর্ম জমা দিতে গিয়ে সেদিন অদ্ভূত একটা উপলব্ধি হল। একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল- যেসব মানুষ Identity Crisis-এ ভোগে, তারাই এইসব তত্ত্ব চালু করে। যাদের মস্তিষ্কে কোন ধার নেই, হৃদয়ের বদলে হৃদয় লাভের কোন উপায় জানা নেই- তারাই কেবল লিঙ্গ বাগিয়ে তেড়ে আসে। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাদের আমি ঘৃণা করি।

রাষ্ট্রের কাছে আবেদন- হয় লিঙ্গসর্বস্ব প্রতিটি অসুস্থ ব্যক্তির মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন, নতুবা, সংবিধানে একটা নতুন ধারা যোগ করে নিন- “স্বাধীন দেশের প্রতিটি নারী লোকালয়ে দৃশ্যমান হইবা মাত্র পুরুষের বিনোদনের উতসে পরিণত হইতে বাধ্য থাকিবে। প্রতিটি পুরুষ তাহার শরীরের আপাদমস্তক চক্ষু বুলাইতে পারিবে। নিকটে পাইলে হস্ত বুলাইতে পারিবে। এমনকি পরিবহনে চলাচলকালে, কিংবা কোন জনবহুল স্থানে অপেক্ষমান থাকাকালে পুরুষ তার নিজের শরীরের বিশেষ কোন একটি সংবেদনশীল অংশ নারীর শরীরে ঠেকাইয়া রাখিতে পারিবে।”

তাই করুন বরং। এতে করে আমরা সবাই পাশবিকতার ক্ষেত্রে অন্তত একমত হতে পারব। সবরকম কনফিউশন থেকে মুক্ত থাকতে পারব। যে কয়জন দুর্বলচিত্ত পুরুষ লিঙ্গের চাইতে হৃদয় আর মস্তিষ্কের চর্চাতে বেশি আগ্রহী, তারাও ঠিক পথে ফিরতে পারবেন।