ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

জিপিএ ৫-এর ভিডিওটা দেখে খুব মজা পেয়েছেন, তাই না? আজকালকার জেনারেশন কি গাধা! শেয়ার বাটনে ক্লিক করতে একটুও দেরি হয় নি নিশ্চয়ই! আচ্ছা, স্মার্টফোন থেকে চোখ সরিয়ে এইমাত্র বাচ্চার দিকে তাকিয়ে কী বললেন? “বাবা, তোমাকে না বলেছি গল্পের বই ধরবা না? সামনে এক্সাম। পড়া কর।” হাহাহা! গল্পের বই। এ্রই বাঙালির কাছে ‘তিন গোয়েন্দা’ থেকে শুরু করে ‘প্লেটোর সংলাপ’- সবই গল্পের বই। একটু নিজের ঘরের দিকে তাকান তো! এ বছর পাঠ্য বই ছাড়া আর কয়টা বই কিনে দিয়েছেন আপনার বাচ্চাকে? গল্পে গল্পে কোনদিন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছেন? আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশের ৯৫% বাড়িতে আর কেউ ছেলেমেয়েদের সাথে এসব গল্প করে না। করবে কখন? বাচ্চাকে দিয়ে রাখে ৬/৭টা টিউটরের কাছে। আর অবসর সময়ে বাচ্চা ভিডিও গেইম খেলে। মা সিরিয়াল দেখে। বাবা ফোনে ফেইসবুক গুতায়।

তাহলে, শুধুমাত্র বাচ্চাগুলোকে দোষ দিয়ে কেন এই অসুস্থ উল্লাস? একটা ফুলটাইম শিক্ষার্থী শিক্ষাঙ্গনে থাকে ৫/৬ ঘন্টা। বাসায় থাকে ১৮ ঘন্টা। তাহলে বাসায় কী করেন আপনারা? মা-বাবার কি কোনই দায় নেই?

ভাল কথা, জিপিএ ৫ শীর্ষক নাটকটা মন্দ হয়নি। নাট্যকারের রসবোধের অভাব ছিল না। তবে মাত্রাবোধের সামান্য কমতির কারণে ব্যাপারটা ম্যাচাকার হয়ে গেল। ভীষণ সহজ সহজ প্রশ্ন। আর ইডিয়ট মার্কা সব উত্তর। স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস নিয়ে তালগোল পাকানো থেকে জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা পর্যন্ত সবক’টা ভুলই আমি বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু খটকা লাগল একটা জায়গায়। সদ্য এসএসসি পেরোনো একটি ছাত্র যখন পীথাগোরাসের পরিচয় দিল ঔপন্যাসিক বলে। কেউ যদি হুবুহু নকল করেও পরীক্ষা দেয়, তবু তাকে জীবনে কম করেও হলেও পঞ্চাশবার পিথাগোরাসের নামটা দেখতে হয়েছে। উপপাদ্যটা না জানুক, এই নামটা নিয়ে তার ভুল কোনদিনই হবে না। আচ্ছা, ধরেই নিলাম যে সে পীথাগোরাসের নাম না জানার মত স্টুডেন্ট। তাহলে, ওই লেভেলের একটা মর্কট মার্কা স্টুডেন্ট ‘ঔপন্যাসিক’-এর মত একটা জটিল শব্দ মুখ দিয়ে কীভাবে বের করল? খুব জোর সে লেখক শব্দটা বলতে পারত। ‘ঔপন্যাসিক’-এর মত একটা শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরোনো দূরের কথা, মাথাতেও আসবে না।
এই শব্দ আসতে পারে কেবল সুচতুর চিত্রনাট্যকারের মাথায়। একটা নাটকের প্রাণ হল ডায়ালগ। ডায়ালগের মধ্য দিয়েই আসে সাসপেন্স, ক্ল্যাইম্যাক্স, হিউমার, কমিক রিলিফ। ডায়ালগ সাজানোর সময় আমরা চেষ্টা করি যথাসম্ভব সারপ্রাইজ বজায় রাখার। কোন চরিত্র কী উত্তর দেবে সেটা যদি দর্শক আগেই ধরে ফেলে তাহলে আর নাটক দেখবে কেন?

মনে পড়ে, Drama-এর ক্লাস নিতে গিয়ে মঞ্জুউরুল স্যার জিজ্ঞেস করেছিলেন, বল তো ড্রামা কখন হয় জান? তুমি যদি এখন এই ক্লাসরুমে আমার অনুমতি নিয়ে গুটিসুটি মেরে ঢোকো, তাহলে সেটা ড্রামা হবে না। কিন্তু যদি ক্লাস চলাকালীন ঠাস করে দরজাটা খুলে বলে ওঠ, “স্যার, আয়া পড়লাম।”- তাহলে সেটা ড্রামা। অর্থ্যাৎ Drama হতে হবে Heightened. আর Comedy আনতে হলে একটু absurdity আনতে হবে। Theory-গুলো গুলে খেয়ে এই চিত্রনাট্যটা লেখা হয়েছে। ভুল উত্তরগুলো অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বানানো। পীথাগোরাস আর ঔপন্যাসিক- দুটো শব্দের মধ্যে যোজন যোজন দুরত্ব। এই absurditiy-টুকুর কারণেই হাসি পাবে। আর তাই আমার দৃঢ বিশ্বাস, এটি একটি সুলিখিত নাটক। তবে নাট্যকার ভুলে গিয়েছিলেন যে, মোশাররফ করিমের নাটক আর প্রতিবেদন এক জিনিস নয়।

অনেক ফাঁক ফোঁকর আছে ভিডিওটায়। শাম্স রশীদ জয় ভাইয়া একটা দারুণ বিশ্লেষণ দিয়েছেন ফেইসবুকে। মাছরাঙা নিজেই শিক্ষিত হতে পারেনি, আর দোষ ধরছে নিরীহ ছাত্র ছাত্রীর! এমনকি যদি এটা সত্যিও হয়, তবু পাবলিকলি কাউকে হিউমিলিয়েট করার অধিকার মাছরাঙা রাখে না।

আসলে মাছরাঙা টিভির ওই ভিডিওটা একটু মোড়কে ঢাকা লাইক ভিক্ষা ছাড়া আর কিছুই না। জীবনে কেউ কোনদিন শুধুই মাছরাঙা চ্যানেল দেখার জন্য টিভির সামনে বসে নি। এই ভিডিওটার শেয়ার সংখ্যাই বোধহয় ওদের জীবনের সেরা অর্জন। ‘মাছরাঙা’-র কাঙালিপনার জন্য করুণা।

কেউ আবার ভেবে বসবেন না যে, আমি এই শিক্ষা ব্যবস্থার সাফাই গাইছি। বেহাল দশার কথা আমরা সবাই জানি। মূল্যহীন জিপিএ ৫-এর কথাও জানি। সেটার জন্য এই ভিডিও দেখা লাগবে না। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনার নামে ওই একটা জেনারেশনকে নিয়ে সাজানো মিথ্যে নাটকের প্রতিবাদ জানাই।