ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

a44th6j9
একদিকে হিমু। অন্যদিকে মিসির আলী। আবার শুভ্র। এই তিন ঘরানার তিন চরিত্রের স্রস্টা নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। এই স্রস্টার তৃতীয় প্রয়াণ দিবস আজ।

২০১২ সালের এই দিনে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন। সেসময় তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ূন আহমেদের শরীরে ধরা পড়ে মরনব্যাধি ক্যান্সার। এরপর উন্নত চিকিৎসার ড্রয়োজনে তাকে যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে।

নিউইয়র্কে ২০১২ সালের ১৬ জুলাই তিনি চলে যান লাইফ সাপোর্টে। সে অবস্থাতেই ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে এগারোটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আকাশচুম্বী জনপ্রিয় এ লেখকের মৃত্যুতে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছিলো, যা আজো তার লক্ষ-কোটি ভক্তদের অন্তর সে শোক ধারণ করছে।

নিউইয়র্ক থেকে ২০১২ সালের ২৩ জুন দেশে ফিরিয়ে আনা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। এরপর বিমানবন্দর থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-জ্ঞাপনের জন্য তার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে।

শহীদ মিনারে লাখো মানুষের আঁখি জলে ভেজা পুষ্পতে সিক্ত হন হিমু, মিসর আলী ও শুভ্রর স্রস্টা হুমায়ূন আহমেদ। এর পরের দিন তাকে সমাহিত করা হয় তার নিজ হাতে গড়ে তোলা মমতার চাদরে ঢাকা নুহাশ পল্লীর লিচু-তলায়। সেখানেই এখন শায়িত আছেন নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ডাক নাম ছিলো কাজল। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা ছিলেন গৃহিণী।

১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করেন হুমায়ূন আহমেদ।

এছাড়া ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন হুমায়ূন আহমেদ। নব্বই দশকের মাঝামাঝি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে লেখালেখিতে মনোযোগ দেন।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে বিয়ে করেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিন খানকে। হুমায়ূন এবং গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলে-মেয়ে। তিন মেয়ে নোভা, শীলা ও বিপাশ আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। তাদের ৩২ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ২০০৫ সালে। এরপর হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে। এ দম্পতির দুই ছেলে- নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদ সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটলেও তার শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর।

‘নন্দিত নরকে’ ১৯৭২ সালে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস তার। এটি প্রকাশের পরই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এর পর দু’হাত ভরেই তিনি রচনা করেছেন একের পর এক জনপ্রিয় সব উপন্যাস।

হুমায়ুন আহমেদের লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, ‘নন্দিত নরকে’, ‘লীলাবতী’, ‘কবি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘গৌরিপুর জংশন’, ‘নৃপতি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘শুভ্র’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ প্রভৃতি।

তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’ ও ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’।

টিভি নাট্যকার হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় ছিরেন হুমায়ূন আহমেদ। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় নির্মাণ করেন প্রথম টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’। এ নাটকটি তাকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। এছাড়াও তার হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং সৃষ্টির অনবদ্য ইতিহাস ‘অয়োময়’ ছিলো বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। এছাড়াও তিনি নির্মাণ করেন নাগরিক ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’ এর চরিত্র বাকের ভাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল টিভি দর্শকদের কাছে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদিও স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন।

শুধু তাই নয়। নন্দিত এই লখেককে নিয়ে দেশের বাইরেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তার প্রমাণ জাপান টেলিভিশন ‘এনএইচকে’ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছে পনের মিনিটের তথ্যচিত্র ‘হু ইজ হু ইন এশিয়া’।