ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

14203354_304337556599837_7780120457121033381_n
যৌনকর্মী! না না, তারা এই সমাজ ও সমাজপতি এবং অতিশয় ভদ্দরনোকদের দৃষ্টিতে বেশ্যা, পতিতা, বারবনিতা, দেহপসারিণি কিংবা খানকি, ছিনাল, মাগি- এর ‘চে বেশি কিছু নয়। কারণ, সে একাধিক পুরুষের সাথে বিছানায় যায়, যখন-তখন অল্প-বিস্তর টাকার জন্য নিজ দেহটাকে বিলিয়ে দেয়। যা সমাজ স্বীকৃত নয়। যা সমাজের দৃষ্টিতে বেশ্যাবৃত্তি। এরা তথাকথিত ভদ্দরনোকদের দৃষ্টিতে কুলটা, নষ্টা, পথভ্রষ্টটা নর্দমার কীট। সমাজ এদের ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয়। সমাজে এদের ঠাঁই নেই। এই সমাজ তাদের জন্য নয়। এই সমাজ অতি সুশীল ভদ্দরনোকদের।

বেশ। এসব কিছুই মেনে নিচ্ছি। এদেরকে সমাজে ঠাঁই দেয়ার দরকার নেই। কী দরকার তাদের মত নষ্ট-ভ্রষ্টদের? তার ‘চে বরং এদের আস্তা-কুড়ে ফেলে দেয়া হোক। আমিও এর সাথে একমত, তবে এর আগে আমাকে কিছু উত্তর দিতে হবে। এবং তাদেরকেও সমাজচ্যুত করতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে তাদেরও। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, কাদের?

আজ যারা আপনাদের দৃষ্টিতে বেশ্যা বা পতিতা, তারা কি করে এমন হল? কারা যাচ্ছে তাদের কাছে? নিশ্চয় কোন নারী নয়। অবশ্যই পুরুষ? ধরা যাক, একজন যৌনকর্মী যদি পাঁচ বছর এ পেশায় থাকে, তবে তার খদ্দের প্রতিদিন কম করে হলেও ৭ থেকে ৮ জন। সে হিসেবে ১ মাস তথা ৩০ দিনে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২ ‘শ ১০ থেকে ২ ‘শ ৪০ জনে? এ হিসেবে ১ বছর তথা ৩ ‘শ ৬৫ দিন তথা ১২ মাসে এর সংখ্যা দাঁড়াবে ২ হাজার ৫ ‘শ ২০ জন থেকে ২ হাজার ৮ ‘শ ৮০ জনে? আর আমাদের মোট হিসেব ৫ বছরে এ সংখ্যাটা দাঁড়াবে ১২ হাজার ৬ ‘শ থেকে ১৪ হাজার ৪ ‘শ জনে? অর্থাৎ, একজন যৌনকর্মীর বিপরীতে এত সংখ্যক পুরুষ! মানে নষ্ট পুরুষ। বেশ্যার বিপরীত লিঙ্গ।

এবার আসি একটু যোগ বিয়োগে। আমরা জানি, বাংলাদেশে মোট যৌনকর্মীর সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩ ‘শ (সর্বশেষ জরিপ – নভেম্বর ২০১১) জন। তাহলে এত সংখ্যক যৌনকর্মীর বিপরীতে উপরোক্ত হিসেব মতে কতজন পুরুষ খদ্দের হয়? এ হিসেব মতে (৫ বছর) মোট সংখ্যাটা দাঁড়াবে ৯৩ কোটি ৬১ লক্ষ ৮০ হাজার! তবে এর অর্থ কী দাঁড়ালো? বাংলাদেশে যে সংখ্যক যৌনকর্মী আছে তার থেকে ১০ গুণ বেশি পুরুষ খদ্দের, তাই তো?

তাহলে একজন নারী তথা যৌনকর্মী যে দোষে দোষী সে একই দোষে কী একজন পুরুষ তথা খদ্দের পুরুষ দোষী নয়? অবশ্যই দোষী। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে এ সংখ্যক পুরুষ কী করে সমাজ-সংসারে ঠাঁই পায়? যদি তারা সমাজ-সংসারে ঠাঁই পায়, তবে যৌনকর্মীরা কেন সমাজচ্যুত হবে? ধর্মীয়ভাবে এসব নিষিদ্ধ, তাই যৌনকর্মীরা সমাজচ্যুত? সব দায় তবে নারীর একারই! পুরুষের কী কোন দায় নেই? তার জন্য কী ধর্মানুভূতি অঘাতপ্রাপ্ত হয় না?

এবার আসি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে। লালন ফকির বলেছিলেন, ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’? হ্যাঁ, গোপনে গোপনে যারা যৌনকর্মী লালন-পালন করছেন, যারা তাদের দিয়ে টাকা রোজগার করে গাড়ি-বাড়ির মালিক হচ্ছেন, তারা কিন্তু এই সমাজেরই সমাজপতি (!) হয়ে আছেন। এই সমাজ কিন্তু তাদের অঙুলি হেলনেই হেলে আর দুলে। অথচ তাদের কোন ক্ষতিই হয় না। তাদের ধর্মেরও কোন ক্ষতি হয় না। তাদের কোন দোষও নেই!

কে তারা? কেমন তারা? কী ভাবে তারা গোপনে গোপনে বেশ্যার ভাত খায়? এবার আসুন লালন ফকিরের গানে ইংগিত করা সেই গোপনে বেশ্যার ভাত খাওয়া মানুষদের সাথে একটু পরিচয় হয়ে নিই। জেনে নিই কী ভাবে কী ভাবে তারা এই সমাজে যৌনকর্মীদের মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভরছে আর রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে?
14232493_304337596599833_3240268209428573394_n
বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ থেকে ১০টি (সম্ভবত) যৌন-পল্লী রয়েছে (যদিও আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক যৌন-পল্লী বৈধ)। আর এসব যৌন-পল্লীগুলো এমনি এমনিই টিকে নেই। এর পিছনে ক্ষমতাসীন নেতা-কর্মী, মাস্তান, পুলিশ এমনকি জনপ্রতিনিধিদের আশীর্বাদ রয়েছে। বিনিময়ে এখান থেকে এই শ্রেণী মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন। এসব মাসোয়ারায় এরা বিলাসিতা করে, কেউ সংসার চালায়, কেউ বাড়ি করে, কেউ আবার গাড়িও কিনে।

আবার, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে অসংখ্য আবাসিক হোটেল আছে যেখানে যৌনকর্মীদের উপর নির্ভর করেই এসব আবাসিক হোটেলগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এখানেও চলে যৌন ব্যবসা। যদিও আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক যৌন-পল্লী বৈধ। কিন্তু, হোটেলগুলো তো একেবারেই অবৈধ! তাহলে এবার আমায় বলুন তো, এসব আবাসিক হোটেলে কী ভাবে যৌন ব্যবসা হচ্ছে? পুলিশ প্রশাসন কী এসব জানে না?

হ্যাঁ, পুলিশ জানে। এদেশের কোথায় কী হচ্ছে তা সবই পুলিশ জানে। আবাসিক হোটেলগুলোতে কী হয় (?) সে খবরও পুলিশ রাখে। তবে ওভার লুক করে যায়। বিনিময়ে তারা পেয়ে থাকেন মাসোয়ারা। আর তাদের ওভার লুক করার পিছনের কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক। কেন না, এসব ব্যবসা থেকে ক্ষমতাসীন দলের (যখন যে সরকার আসে) ছিচকে নেতা থেকে ধরে হাই প্রোফাইল নেতারাও ভাগ-বাটোয়ারা পেয়ে থাকে! যার কারণে সগৌরবে আবাসিক হোটেলের অন্তরালে যৌন ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে।

এবার আসুন যে সমস্ত আবাসিক হোটেলগুলোতে এমন ব্যবসা চলে আসছে, সে হোটেলগুলোর মালিক কী কোন যৌনকর্মী? না। এরা সমাজের কোটিপতি। অঢেল সম্পদের মালিক। এদের মধ্যে কেউ হাজী কেউ আবার আলহাজ্ব। কেউ জনপ্রতিনিধি কেউ আবার মসজিদ, মন্দির কমিটির নেতা! তাহলে কী এবার জানলেন তো, লালন ফকিরের কথায় গোপনে বেশ্যার ভাত খাওয়া লোক কারা? অথচ এরা সমাজে নিষিদ্ধ নয়! এরা সমাজপতি হয়! এরা জনপ্রতিনিধি হয়! এরা সংসদে যায়! এরা আইন প্রণেতা হয়! এরাই হাজী আর আলহাজ্ব হয়ে ফতোয়া জারি করে সমাজচ্যুত করে যৌনকর্মীদের! এরাই যৌনকর্মীদের ললাটে বেশ্যা, কুলটা, খানকি, ছিনাল, মাগির তিলক এঁটে দেয়! এরা এই সমাজে নিষিদ্ধ নয়। এরাই সমাজ নিয়ন্ত্রক!

এবার কেউ কেউ বলতে পারেন, ‘আমি কী তবে যৌন ব্যবসাকে সমর্থন করি’? হ্যাঁ, আমি সমর্থন করি। সমর্থন এ জন্য করি যে, এই সমাজে আমার মত কিংবা আপনার মতো অথবা অন্য কোন পুরুষ দ্বারায় এরা যৌনকর্মী হয়, হতে বাধ্য হয়। কেন না, কোন নারীই চায় না যৌনকর্মী হতে। প্রতিটি মেয়েই শিশুকাল থেকে স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর ঘর আর সুন্দর বরের। তারপরও এরা এই অন্ধকার গলিতে কেন (!) সে প্রশ্ন কী কখনো আমরা আমাদের করেছি? তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে, যৌনকর্মী তৈরির কারিগর আমরা পুরুষরা অথবা এই সমাজ?

আমিও চাই এই অন্ধকার গলিতে আর কোন মেয়ে না আসুক। আর কেউ যৌনকর্মী না হোক। এটা বললে মুখের কথাই হবে। বাস্তবতা ঠুঁটোজগন্নাথ। কেন না, আমরা মুখে যত বড় বড় কথাই বলি না কেন, এই সমাজের সিস্টেম ভাঙতে পারি না। সিস্টেম ভেঙে কোন যৌনকর্মীকে সমাজ-সংসারে ঠাঁই দিতে পারি না। এতে করে আমাদের জাত যায় যায় বলে চিৎকার করি। আবার এই আমরাই বিভিন্ন সভা সেমিনারে তাদের জন্য মায়াকান্না কেঁদে বুক ভাসাই! সত্যি, বড্ড বিচিত্র সেলুকাস।