ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

usabarni58_pic2
নারীবাদ বা নারী আন্দোলনের পক্ষে ইতিপূর্বে যারা কাজ করেছেন, তারা ‘লিঙ্গ বৈষম্যহীন’ সুন্দর পৃথিবীর জন্যই লড়েছেন। যেখানে পুরুষ আর নারীর জন্য সব কিছুরই সুষম বণ্টন হবে। কেউ কারো কর্তৃত্ব করবে না। এক কথায় বলা যায় ‘সমাধিকার’। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই ‘সমাধিকার’ প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনও ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ প্রকট। সেটি ঘর-বাহির, সর্বত্রই। এসব ক্ষেত্রে নারী এখনও দাসী আর কর্তা পুরুষ! একচেটিয়া কর্তৃত্ব করছে পুরুষ আর নারী বরণ করেছে দাসত্ব!

অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, আমাদের বাঙালি সমাজে নারীরা নারীই থাকতে পছন্দ করেন, পুরুষরা পুরুষত্ব জাহির করেই চলেন। যার ফলে এ সমাজে মানুষ তৈরি জায়গাটা এখনও তৈরি হয় নি। ঘুচে নি ‘লিঙ্গ বৈষম্য’। তাই এ সমাজে ধর্মের মতোই খুবই স্পর্শকাতর একটি অনুভূতি, ‘লিঙ্গ অনুভূতি’। নারী থেকে মানুষ কিংবা পুরুষ থেকে মানুষ হতে হলে যতটুকু জ্ঞান বা দর্শন দরকার, সেদিকে এখনও আমরা পৌঁছাতে পারে নি। শুধু তাই নয়, অধিকাংশের ভেতরে লিঙ্গ পরিচয় ভেদে শুধু মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসটুকুও দেখা যায় না। তাই এ জাতী আজও পৌছতে পারেনি মনুষ্যত্ব-লোকে। এ জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তৈরি শিক্ষাই দায়ী।

ছোটবেলা থেকেই একটি ছেলে আর একটি মেয়ের ভেতরে পই পই করে ঢুকিয়ে দেয়া হয় ‘লিঙ্গ বৈষম্যে’। আবার ছোটবেলা থেকেই দেখে দেখে শিখেন, কিভাবে তাদের বাবা কর্তৃত্ব করছেন আর মা দাসত্ব! সংসার পরম্পরায় এমন শিক্ষাটাই তারা মগজে ধারণ করে এবং পরবর্তীতে তা নিজস্ব জীবনে প্রয়োগ করেন। ফলে এমন ধ্যান ধারণা থেকে কখনোই বেরিয়ে আসতে পারে না তারা। বরং এসব আঁকড়ে ধরেই জীবন চালনা করেন। যার জন্য এ সমাজে পুরুষ দর্শক না হয়ে হয় ধর্ষক আর নারী হয় ধর্ষিত।

বাস্তবিক অর্থে আমাদের পুরুষরা যেমন চায় না নারী মুক্তি, একই ভাবে নারীরাও চায় না তাদের মুক্তি। নারীরা তাদের কড়াই খুন্তির সংসার আর শোবার ঘরে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে বসে সাজুগুজু করতেই ভালোবাসেন। নারীরা ভালোবাসেন পুরুষের জন্য রেঁধে-বেড়ে না খেয়ে বসে থাকতে। পুরুষের সন্তুষ্টির জন্য নানা রঙে নিজেকে সাজাতে। এতে করেই বোঝা যায়, নারী মানেই পুরুষের জন্য খাদ্য সামগ্রী আর স্বেচ্ছায় দাসত্ব বরণ করা কোন প্রাণী! এর কিছু নমুনাও আমরা পেয়ে থাকি চলমান বিশ্বে সব ‘চে প্রচলিত ফেসবুকে। এখানে নারী নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে গারো মেক-আপ, লিপস্টিক, কাজল পরে নানা রঙের ছবি দিয়ে তা-ই প্রমাণ করে।
index
যেমন কোরবানির গরুকে ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করার প্রয়াসে ওই বস্তুটিকে সুন্দর করে সাজানো হয়। একই ভাবে এ সমাজের ভোক্তা পুরুষের জন্য নারীকে তেমন করে সাজতে শেখানো হয়! যা একসময় নারীও নিজেকে তেমন আকর্ষণীয় করে তুলতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় স্নো, পাউডার, মেক-আপ আর লিপস্টিকে! এখানেই স্পষ্ট হয়, নারী খাদ্য আর পুরুষ ভোক্তা? আবার পুরুষ খাদ্য নন, নারী ভোক্তাও নন, যার জন্য পুরুষকে নারীর জন্য সাজতে বা উপোষ বসে থাকতে হয় না। এ সুযোগটা পুরুষ যেমন চেয়েছে তেমনি নারীরাও স্বেচ্ছায় তা দিয়ে দাসত্ব বরণ করেছে!

এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কিভাবে নারী নিজেকে পুরুষের খাদ্য হিসেবে গড়ে তুললেন? শুধু গড়ে তুলেছেন বললে ভুল হবে, আমাদের নারীরা বরাবরই নিজেকে যৌন-বস্তু বা পুরুষের খাদ্য ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারেন না। আচ্ছা বলুন তো, নারী খুব সুন্দর করে তার ঠোঁট রাঙায় কেন? কারণ পুরুষ ভোক্তা হয়ে নারীর সে ঠোঁট খাবে, তাই! এবার তবে উত্তর দিন, পুরুষ ঠোঁট রাঙায় না কেন? কারণ সে ভোক্তা, খাদ্য নন, তাই!

আচ্ছা ধরুন, কোন পুরুষ যদি লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট রাঙায়, তবে কোন পক্ষ থেকে নিন্দা বা নানা উপমা উঠে আসবে? হ্যাঁ, নারীদের পক্ষ থেকেই নানা ধরণের কথা উঠবে সবার আগে। সর্বপ্রথম যে কথাটি উঠবে, তা হলো ‘হিজড়া’! কারণ, লিপস্টিক নারীদের বস্তু এটা নারীদেরকেই মানায়, পুরুষকে নয়, তবে হিজড়ারাও পরে থাকেন, যার জন্য পুরুষ লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙালে ‘হিজড়া’ শব্দটি তাতে শুনতেই হয়।

আবার নারীরাও চায় না, তাদের কোন জিনিস পুরুষরা ব্যবহার করুক। তারা চায় পুরুষ থাকুক পুরুষত্বে ভরপুর। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চুল এলেবেলে, কিছুটা অগুছালো, কিছুটা উদাসীন আর পুরোটা রোমান্টিক! আমাদের নারীরা এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেই পারে না। আর এ ধারণাটাই হচ্ছে পুরুষ-তন্ত্র। যা অশ্লীল একটি প্রথা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
0423_single-at-work-question-1_392x392
অথচ নারী পুরুষের খাদ্য নয় কিংবা পুরুষ নারীর ভোক্তা নয়, এমনটি কবে বুঝবো, আমরা? কবে এই দু’টি শব্দকে তাড়িয়ে দিয়ে কেবল ‘মানুষ’ শব্দেই পরিচিত হব? হ্যাঁ, নারী হতে চাইলেও পুরুষ সে ক্ষমতা নারীকে দিবে না, দিতে চাইবে না। পুরুষ চাইবে না, নারী থেকে মানুষ হয়ে উঠুক তারা। পুরুষ চাইবে না, নিজেদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া করতে। তাই এই সাজুগুজ প্রসাধনী, বিউটি পার্লারের প্রতি নারীকে পুরুষরাই উৎসাহিত করে তুলে। আর নারীরাও তাদের সন্তুষ্টি আর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ধেই ধেই করে পার্লার এবং ঘরের ড্রেসিংটেবিলকে প্রিয় স্থান হিসেবে বেছে নেন!

তাহলে কী আমাদের নারীরা মানুষ হবে না? পুরুষগুলাও কী মানুষ হবে না, কখনো? হ্যাঁ হবে, এজন্য নারীকেই প্রথম বোধ করতে হবে, ‘আমি মানুষ’। আর নারী যদি মানুষ হয়ে উঠে, তবে পুরুষগুলা এমনিতেই মানুষ হয়ে যাবে। কারণ, নারী কখনো পুরুষের অণ্ডকোষে লাথি কষতে পারে না। এ কাজটি কেবল যারা মানুষরাই পারে। সুতরাং পুরুষের অণ্ডকোষে লাথি কষে না দিলে এই পুরুষগুলা কখনোই শুধরবে না, মানুষ হবে না।জয়তু নারী।