ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

Taki (2)20160214152010
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার না হওয়া। তাহলে কী নারায়ণগঞ্জের মেধাবী স্কুল ছাত্র তানভীর মাহমুদ ত্বকী হত্যার বিচার হবে না! আর যদি ধরে নিই বিচার হবে, তাহলে— সে বিচার কতদূর? বিচার পাওয়ার জন্য আর কতটা পথ অপেক্ষা করতে হবে?

মেধাবী স্কুল ছাত্র ত্বকী হত্যাকা-ের চার বছর হতে চললেও এই মামলার অভিযোগপত্র এখনও প্রদান করা হয় নি। অদৃশ্য কোন ইশারায় থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া। ত্বকী হত্যা মামলাটি তদন্ত করছে র‌্যাব। তদন্তে হত্যাকারীরাও চিহ্নিত হয়েছে। চার্জশিটও প্রায় প্রস্তুত। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, “আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১জন ত্বকীকে হত্যা করেছে।” তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সে হত্যার একটি খসড়া অভিযোগ পত্রও প্রদান করেন। সেসময় তিনি এ-ও বলেছিলেন, “যেকোনো দিন অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।” এরপর কেটেগেছে প্রায় পোনে তিন বছর। সেই ‘যেকোনো দিন’ আজও আসে নি!

ত্বকী হত্যাকা-ে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের যোগসূত্র থাকায় বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে বলেই অভিযোগ উঠেছে। এই অবস্থায় বিচার নিয়ে হতাশা বিরাজ করছে বিচারপ্রার্থী সবার মধ্যে। তবুও বিচার পাবে— এমন আশায় বুক বেঁধে আছে নিহত এই স্কুল ছাত্রের পিতা রফিউর রাব্বী।

সম্প্রতি সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে নূর হোসেন ও র‌্যাবের উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তাসহ ছাব্বিশ জনকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের দায়রা ও জেলা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন। এ রায়ের এক প্রতিক্রিয়া পুত্রহারা পিতা রফিউর রাব্বী অনেকটা আক্ষেপের স্বরেই বললেছিলেন, “সরকারের সদিচ্ছার কারণে অল্প-সময়ের মধ্যেই এই হত্যার বিচার হয়েছে। যা বিরল। ত্বকী হত্যায় সরকারের সদিচ্ছা নেই; তাই বিচার পাচ্ছি না।”

রফিউর রাব্বীর এমন অভিযোগ অমূলক নয়। সরকার সদিচ্ছা পোষণ করেছেন বলেই সাত খুন মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। একইভাবে সরকারের সদিচ্ছা নেই বলে ত্বকী হত্যার চার বছর হতে চললেও এ মামলার অভিযোগপত্র এখনও দাখিল হয় নি! এমন কী যাদের নাম উঠে এসেছে সে সমস্ত অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার করে নি।

আমরা দেখেছি, প্রশাসন যদি চায়, তাহলে যে কোনো ঘটনার বিচার কাজ দ্রুত করা সম্ভব। যার প্রমাণ রাজন ও রাকিব হত্যা ঘটনা। কিন্তু; ত্বকীর ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না কেন? এ হত্যা মামলায় বিচারের ব্যাপারে সরকার পক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে অনেক আগে থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। বলা হচ্ছিল, দলীয় অন্ধত্বকে প্রশ্রয় দেয়ার কারণেই ত্বকী হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। আমরা জানি, অপরাধের বিচার না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই থাকে। আর অপরাধিরাও নতুন অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত হয়। তাহলে কী ত্বকী হত্যাকারীরা তেমন উৎসাহিত হচ্ছে না?

আমাদের উচ্চ আদালত তো স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সমাধানে রুল জারি করেছেন জনস্বার্থ বিবেচনায়। সেসব উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে কী তাঁরা পারেন না— এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের পক্ষে জোরালো দাবি তুলে রুল জারি করতে? তাহলে হয়তো তদন্ত কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানী তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেত। থমকে যেত না তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলসহ বিচার প্রক্রিয়া।

একমাস পরেই ত্বকী হত্যার চারবছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হয় ত্বকী। নির্মমভাবে খুন হওয়ার দুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে মেধাবী এই কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ উদ্ধারের পর থেকেই নিহতের পিতাসহ বিশিষ্টজনরা নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেন। র‌্যাবের তদন্তেও তেমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার আটককৃত সুলতান শওকত ভ্রমরের জবানবন্দিতেও ওই পরিবারের নাম উঠে আসে।

নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বলেছেন, “ত্বকী হত্যায় গ্রেপ্তারকৃত সুলতান শওকত ভ্রমর ২০১৩ সালের ১২ই নভেম্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, ‘৬ই মার্চ ২০১৩ রাত ৯টায় আজমেরী ওসমানের গাড়িতে করে ত্বকীকে আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আজমেরীর উপস্থিতিতে তাঁরই নির্দেশে তাঁরা ত্বকী হত্যায় অংশ নেয়। হত্যার পর তাঁরা আজমেরীর গাড়িতে করেই ত্বকীর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।”

এছাড়াও একটি দৈনিক এর ২০১৪ সালের ৬ মার্চ ‘ত্বকী হত্যায় অংশ নেয় ১১ জন : নির্দেশক আজমেরী’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছিল, ঘাতকরা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে সুপরিকল্পিতভাবে তিনটি পর্বে এ হত্যা ঘটায়। প্রথম পর্বে বেশ কিছুদিন ধরে আজমেরীর ছয় সহযোগী ত্বকীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় পর্বে কিলিং পয়েন্ট হিসেবে ওসমান পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘উইনার ফ্যাশন’ ভবনকে বেছে নেয়া হয়। অপরাধ সংঘটনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে দ্রুত গাড়ি নিয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্য ভবনের পাশের রাস্তায় বাঁশ ফেলে বাধা তৈরি করে রাখা হয়। তৃতীয় পর্বে সাত ব্যক্তি ত্বকীকে তুলে আনে এবং হত্যাকা-ের পর লাশ কুমুদিনী খালে ফেলে দেয়া হয়।

ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি অভিযোগ করে বলেছেন, “ত্বকীসহ নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর পাঁচটি হত্যাকা-ের ইংগিত প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দিকে। তাঁরা অভিযুক্ত থাকায় এ হত্যাকা-গুলির তদন্ত ও বিচার পক্রিয়া সঠিক পথে এগুচ্ছে না। সাত খুন মামলার রায় প্রমাণ করে, সরকার চাইলে বিচার হবে। সাত খুন জটিল একটা প্রক্রিয়া ছিল। তারপরও সে বিচার ৩২ মাসের ৩৮ কর্মদিবসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিকে ঘোষণা দিয়েছিল এটা (সাত খুন) আমরা সম্পন্ন করবো। তাঁর সদিচ্ছায় তা সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে বোঝা যায় সরকার সদিচ্ছা পোষণ করলে এই হত্যাকা-গুলোরও বিচার হবে, না চাইলে হবে না।”

খুন, গুমের উপর্যুপরি ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ যেন খুনের শহরে পরিণত হয়েছিল। যার ফলে পুরো দেশবাসীর কাছেই নারায়ণগঞ্জ ‘আতঙ্ক’র শহর হয়ে উঠেছিল। খুন-সন্ত্রাস এবং আইনের শাসনের অভাবে এসব ঘটনা— এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, রিপোর্ট কম লেখা হয় নি। জেলাবাসীও এসব ঘটনায় দারুণভাবে বিমর্ষ আর লজ্জিত ছিল। বর্তমানে আলোচিত সাত খুনের রায় ঘোষণায় সে লজ্জা কিছুটা হলেও ঘুচেছে। যা সরকারেরই সফলতা। তবে, ত্বকী হত্যাসহ নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর হত্যাকা- রয়েছে সেগুলোর বিচার যদি ত্বরান্বিত করা না হয়, সে ক্ষেত্রে সাত খুনের এই সফলতা ‘ফুটো বেলুন’ হয়ে চুপসেই যাবে।

সরকার যদি মনে করে সাত খুনের বিচার ত্বরান্বিত করে বাহবা কুড়িয়ে ত্বকী হত্যাসহ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিবে, তবে সে ভুল। সাত খুন মামলার মত মেধাবী স্কুল ছাত্র ত্বকী হত্যাকা-টিও নারায়ণগঞ্জবাসীসহ পুরো দেশের মানুষের মনে দাগ কেটেছিল। যে দাগ দিনে দিনে ক্ষতে পরিণিত হচ্ছে। একসময় হয় তো দগদগে ঘা হয়ে উঠবে। তখন কী হতে পারে, সে ভাবনা কিন্তু এখনই ভাবা দরকার।

আমরা অনেকেই স্বজন হারিয়েছি। যাদের স্বজনদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তাঁরা মেনে নিয়েছেন। মেন নিতেও হয়। কিন্তু; অস্বভাবিক মৃত্যু কেমন করে মেনে নেয়া যায়? স্বজনদের অস্বভাবিক মৃত্যু কখনোই কোনো স্বজন মেনে নিতে পারেন না। মেনে নেয়ার কথাও নয়। স্বজন হারানোর যন্ত্রণাটা কী (?) তা আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন। কেন না, তিনিও স্বজন হারিয়েছিলেন। একদল ঘাতক তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল তাঁর স্বজনদের।

স্বজন হারানো যন্ত্রণা দীর্ঘদিন বুকে বয়ে চলেছিলেন আমাদের আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনের শাসন না থাকায় দীর্ঘদিনেও বিচার পান নি তিনি। এ যে কতটা যন্ত্রণার, তা তিনি ছাড়া ভালো কেউই বলতে পারবে না। ত্বকী হত্যায় তাঁর পরিবারের যন্ত্রণা কতটুকু— সে নিশ্চয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হলেও বুঝতে পারছেন? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছেন? নাকি তিনি দলীয় অন্ধত্বকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? যদি তা না হবে, তাহলে ত্বকী হত্যার বিচার কেন করছেন না? প্রশাসনকে কেন কঠোরভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন না— “অপরাধী যে-ই হোক তাঁদের গ্রেপ্তার কর। বিচারের মুখোমুখি করো।”

পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে আমরা দেখেছি, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছিল। যা ছিল প্রশংসনীয়। ঘটনার মাত্র এক বছরের মধ্যেই র‌্যাব অভিযোগপত্র-ও তৈরি করে ফেলেছিল। কিন্তু; ত্বকী হত্যায় যে পরিবার অভিযুক্ত সেই ওসমান পরিবারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পাশে থাকার ঘোষণার পর থেকেই মামলার অগ্রগতি একটা পর্যায় এসে থেমে যায়।

আমরা জানি বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক বিচার হয় না। এক সময় আসামিরা মারা যান, খুঁজে পাওয়া যায় না সাক্ষী, তদন্তকারী কর্মকর্তাও অনেক সময় থাকেন না কিংবা অনেকে অবসরে চলে যান। এভাবেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ন্যয়বিচার। সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সে সুযোগে অপরাধিরা আরও বেশি করে অপরাধে জড়িয়ে পরে। বৃদ্ধি পায় নানা অপরাধ প্রবণতা। বিঘিœত হয় আইনের শাসন। ব্যর্থতার দায়ভার গিয়ে বর্তায় সরকারের উপর।

সরকার সে ব্যর্থতার দায়ভার কেন নিতে যাবেন? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে যে সরকার, সে সরকার কেন একটি পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হবেন? তবে কী সরকার ত্বকী হত্যার ক্ষেত্রে দলীয় অন্ধত্বকেই আষ্কারা দিচ্ছে? যদি তা না হবে; তাহলে সাত খুনের বিচার ত্বরান্বিত হলেও ত্বকী হত্যার বিচারে বাধা কোথায়?

তবুও আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সরকার ও রাজনীতি অঙ্গনের নীতিনির্ধারকদের বোধোদয় ঘটবে। ত্বকী হত্যার মতো নৃশংস অপরাধে অপরাধীদের সমুচিত শাস্তি নিশ্চিত করতে তাঁরা আন্তরিক হবেন। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করবেন। খেয়াল রাখতে হবে, কোনো স্বার্থ বিবেচনাতে প্রকৃত দোষী কেউ যেন পার পেয়ে না যায়। বছরের পর বছর যেন বিচার প্রার্থী রফিউর রাব্বীর মত অন্যসব বিচারপ্রার্থীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়। এ জন্য সকল ধরণের মামলা নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।