ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

এটা শুনতে শুনতে আমরা প্রায়ই বেদবাক্য বলেই ধরে নিয়েছি যে, বাংলাদেশি টিভি নাটক মানেই সেই লেভেলের একটা জিনিস।  কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সত্য ছিলো, কিন্তু অনেকেই আর সেই জৌলুস খুঁজে পান না। আমার দেশের গ্রাম বাংলা বলুন, আর শহুরে মধ্যবিত্তের নাগরিক অন্দরমহল সবখানেই বিদেশি চ্যানেলের আধিপত্য। এলিটরা বোধহয় বাংলা কিছু দেখলে নাক সিঁটকে চলে যান। তাদের ল্যাপটপের তের ইঞ্চি পর্দায় নেটফ্লিক্স, এইচবিও টিভি সিরিজের আধিপত্য চলতে থাকে। আমাদের নতুন দিনের কাণ্ডারিরাও সেই হাওয়ায় ভেসে গেছে। গ্লোবালাইজেশন হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিযোগিতাও বিশ্বজনীন হবে সন্দেহ নেই।

কিন্তু এক বিশাল দর্শক শ্রেণির সাথে নাটকের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়াতেই নাটকেরই ক্ষতি হয়েছে বেশি। আর দেশিয় এক শিল্পমাধ্যমের দীনতা সত্যিই আমাদের ভাবায়। এই ধরুন, ঈদ আসলেই অনেকে পনের সতেরটা চ্যানেল জুড়ে কোথায় ছয়-সাত দিন ধরে কী কী নাটক প্রচার হচ্ছে তার তালিকা করতে বসেন অনেকেই। অনেক পত্রিকা বিজ্ঞাপনও এই কাজটি করে নিয়মিত জানান দেয়, টিভির পর্দায় মহানাটকীয় মহাউপভোগ্য প্রোগ্রামের তালিকা। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। ঘুরে ফিরে সেই চেনা মুখগুলো চেনা প্লটে অচেনা পোশাকে ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে। সব নাটকগুলোকেই বড়জোর দুটো ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া যায়। মোশাররফ করিম মার্কা ক্লিশেইড কমেডি অথবা সাবিলা নূর জাতীয় লুতুপুতু হাই ক্লাস ন্যাকামিতে ভরা অদ্ভুত অখাদ্য বস্তু।

প্রথম শ্রেণিটার দর্শকপ্রিয়তা আছে। কিন্তু ওই যে একই লেবু কচলাতে কচলাতে তেতো হয়ে যায়। দিনশেষে পুনঃ মুষিক ভব! আর দ্বিতীয় শ্রেণিটা গুলশান বনানী কেন্দ্রিক কিছু তরুণ-তরুণীর প্রেম, ক্রাশ, ন্যাকামোতে ভরপুর বেশি ভাজা হয়ে যাওয়া স্বাদহীন চানাচুর। সুন্দরী অভিনয়ে শিশুতোষ মডেলদের লং ড্রাইভ, রুম ডেটের গল্প। আপন জুয়েলার্স কেলেংকারি নাহলে আমরা জানতামই না, বাংলাদেশে এমন তরুণও আছে যাদের দৈনন্দিন হাত খরচা দু’লাখ টাকা। এখন CMB_ Batash পেইজের কল্যাণে স্যাটায়ারিকাল সত্যিগুলোও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। ভেতরে যাই থাকুক, মোড়ক ভালো হলে জিনিস চলে যায়। ভুলভাল বাংলার সাথে খুব কমন কিছু ইংলিশের খিঁচুড়ি বানিয়ে তৈরি করে ফেলা যায় এই বিশেষ নাটক।

নাটকে অভিজাততন্ত্র নিয়ে আমার আক্ষেপ করার সুযোগ আছে। কিন্তু এর অস্তিত্ব নেই কোথায়? নাটক গণমানুষের মাধ্যম, গণমানুষের গল্প যদি না বলে তবে তার মার্কেটটা ছোট হয়ে আসে।  যতই এয়ারটেল দিনে চার-পাঁচটা মেসেজ দেক, ওই নাটক এয়ারটেলের টার্গেট কাস্টোমারকেই স্যাটিসফাই করবে। কখনো নির্মাণশৈলী বা শৈল্পিক মূল্য পেতে পারে বলে মনে হয় না।

অনেকে বলতে পারেন, গণতন্ত্র বিষয়টাই তো গণমানুষের শাসন হতে পারেনি কোথাও? ঠিকই একটি মুষ্টিমেয় ধনীশ্রেণী নির্বাচিত হন। শাসন করেন। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হতো তবে কৃষকরাই এদেশের সংসদেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হতো।  কিন্তু নাটকে কেন সেইম পোলারাইজেশন গ্রহণ করছি না?

movie1

কারণ একটা বিনোদন মাধ্যম এভাবে নিজেকে সংকোচিত করে ফেললে, দেশের অধিকাংশ মানুষ না দেখলে সেটি বেশিদিন টিকতে পারবে না। যতই স্টারপ্লাস, জি বাংলার আগ্রাসন বলি না কেন, আগ্রাসন চলতেই থাকবে। এই দায় আমাদের নির্মাতাদের। যারা ব্যর্থ হয়েছেন দর্শক তৈরিতে এবং ওই যে নাটক তৈরিতেও। এবারও আশায় থাকব, ভালো কিছু দেখতে পাব। দশটার মাঝে একটা ভালো পাব সেই ’অজ্ঞাতনামা’ খুঁজে পাব নিশ্চয়ই।