ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

ককটেল ফাটার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটু পরে আরও কয়েকটি শব্দ পেলাম। শুয়ে শুয়েই শব্দগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম আজ অফিসে যাব কিনা। গতকাল থেকেই ঢাকার অবস্থা কিছুটা থমথমে। বিকালে অফিস থেকে ফেরার সময়ই রাস্তায় গাড়ী কম দেখেছিলাম।

মোবাইলে টাইম দেখলাম সকাল ৭.০৫। এখন আমার বিছানা ছেড়ে অফিসের গমনের প্রিপারেশন নেওয়ার সময়। কিন্তু আমি বিছানা না ছেড়ে লেপটা শরীরের সাথে আরও ভাল করে জড়িয়ে নিলাম এবং মাথা মুড়ে শুয়ে থাকলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ অফিসে যাব না। বসকে মেসেজ দিলাম, সাথে সাথে রিপ্লাই পেলাম, ঝুঁকি থাকলে অফিসে না আসলেও চলবে! থ্যাংকস! জানিয়ে আবার মেসেজ দিয়ে লেপটা আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিলাম। একটু পরই আমাদের গলির মধ্যে কিছু মানুষের দৌড়াদৌড়ি আর চিল্লাচিল্লি শুনেই বুজলাম রাস্তায় পুলিশ পিকেটারদের পেটাচ্ছে! মনে মনে বললাম, পিকেটাররাও নিশ্চয় পুলিশের দিকে ফুল ছুড়ছে না!

বিছানা ছেড়ে এসে, টিভিতে নিউজ চ্যানেল চালু করে দিলাম। তাতে বিজ্ঞাপন চলছে দেখে, পর্দার নিচেরদিকে ব্রেকিং নিউজের দিকে চোখ রেখেই বুজলাম আজ অফিসে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এইসবে দিনে যে “মার খায়” সে তা নগদ পায়, বাদবাকি সব বাকি! মার খাওয়ার পর না দল, না অফিস, না বস, কাউকেই তখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না! আর পুলিশ ও ডাক্তারের চোখে তো আহত মানুষটিই দোষী!

অবরোধ। আজ ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, দেশব্যাপি বিএনপি-জামায়াতের তথা ১৮ দলীয় জোটের ৮ ঘন্টার রাজপথ অবরোধের কর্মসূচী। একদম কড়া অবরোধ করছে বিএনপি-জামায়াতের জোট। ভোরেই টিভির পর্দায় দেখলাম ব্যাপক বাস, গাড়ি, সিএনজি-অটোরিক্সা ভাংচুর ও তাতে আগুন দিতে, আর পুলিশ দ্বারা পিকেটার পেটানোর লাইভ ছবি। অবশ্য এখনো পর্যন্ত পিকেটারদের হাতে পুলিশের পিটুনি খাওয়ার লাইভ ছবি দেখতে পাচ্ছি না! হয়ত দিন গড়ানোর সাথে সাথে এটাও টিভির পর্দায় ভেসে উঠবে! গত কিছুদিনের প্রেক্ষাপটে এটা আমরা আশা করতেই পারি! রাজপথের কিছু কিছু সংঘর্ষে পুলিশকে কাঁদানি গ্যাস ও রাবার বুলেটও ছুঁড়তে দেখলাম! রাস্তায় জ্বলন্ত টায়ারগুলো থেকে লাল টকটকে আগুন আর কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় সরকার সমর্থকরাও মাঠে নেমে গেছে, সরকার দলীয়দের ভাবখানা এমন, “গায়ের শীত ছাড়াতে আমরাও মাঠে নামলাম।” আসলে তারাও অবরোধকে সফল করতে ভূমিকা রাখছে!

ল্যাপটপ ওপেন করে অনলাইন নিউজ পোর্টাল গুলোতে ক্লিক করতে থাকলাম। সব গুলোতেই দেখালাম অবরোধের খবর। একটা অনলাইন পত্রিকায়, জ্বলন্ত টায়ারের একটা সুন্দর আর্টিস্টিটিক ছবি দেখালাম, ফটোগ্রাফারের ছবি তোলার হাত খুবই ভাল! দৌড়াদৌড়ির মুহূর্তে, এই রকম একটা ছবি তোলা খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ! সাধুবাদ জানাই ফটোগ্রাফারকে!

ফেসবুকেও তাই! আমার এক কলিগকে দেখালাম, তার ফেসবুক প্রোফাইলে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের ফাঁকা রাজপথের ছবি পোস্ট করেছে এবং তাতে টপাটপ লাইক পড়ছে। আমিও দেরী না করে লাইক দিলাম! আহা! যানজট মুক্ত ঢাকার রাস্তা, কতদিন দেখি না! ঈশ! এই রকম ফাঁকা রাস্তায় যদি আমরা প্রতিদিন চলতে পারতাম! তাতে করে রোজকার কাজে কতই না সুবিধা হত! বেঁচে যেত কোটি মানুষের কোটি কোটি কর্মঘন্টা আর বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা! পরিবার, সন্তানের জন্য রাখতে পারত পর্যাপ্ত সময়। করতে পারত নিজের কিছু কাজ, পড়তে পারত পছন্দের কিছু বই! আশা! সবই আশা! আমরা আশা নিয়েই বেঁচে আছি! ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে হবে, মেট্রো রেলওয়ে সিস্টেম হবে, হবে আরও কত কিছু! তিনটা ফ্লাইওভার ব্যতীত, দৃশ্যমান তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! তবুও আশায় আছি, আমাদের সব হবে একদিন! সুমতি হবে আমাদের ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি কর্মকর্তা আর নেতাদের। প্রোজেক্টের নামে টাকা লোপাটের কথা ভুলে তারা দেশের কথা ভাববে!

এখন ১২.৩০ টিভির সংবাদ পাঠিকা, পর্দায় এসে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গীতে ঘোষণা দিলেন, “এইমাত্র পাওয়া খবরে জানা গেছে পুরাণ ঢাকায় বিশ্বজিত দাস নামের একজন মারা গেছে!” ভাবখানা এমন, সবাই যেন এই লাশের অপেক্ষাতেই ছিল! “বিশ্বজিত” নামটি অবশ্য বিএনপি-জামাতের জন্য একটু সমস্যা তৈরি করল! তাদের দরকার ছিল লাশ! এর আবার নাম থাকবে কেন?
আহা! বিশ্বজিতের পরিবারে নিশ্চয় এতক্ষণে আহাকার পড়ে গেছে! দেখতে পাচ্ছি, টিভির চ্যানেলগুলো এখন তার পরিচয় খুঁজে বের করতে ব্যস্ত! তাও ভাল, মৃত বিশ্বজিতকে নিয়ে টানাটানি শুরু হওয়ার আগেই তার পরিচয়টা অন্তত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে!

এখন দুপুর ১.১০। এইমাত্র খবর আসলো সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে আরও একটা লাশ পড়েছে, সংবাদ পাঠিকা যেন অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর গ্যারান্টি সহকারে ঘোষণা দিলেন, “তিনি ছিলেন জামায়াতের কর্মী”। আহা! তারও তো মা-বাবা ছিল, ছিল পরিবার পরিজন, এতক্ষণে সবাই নিশ্চয় এই দুঃখের খবর পেয়ে গেছে, পড়ে গেছে কান্নার রোল! সেও তো মানুষ ছিল!

অবশ্য এই লাশ প্রাপ্তিতে জামায়াত লাভবান ও খুশি হয়েছে! ওরা এরই অপেক্ষাতেই ছিল! কতদিন ধরে চেষ্টা করছে! পুলিশকে একটা লাশ “উপহার” দেওয়াতে উৎসাহিত করতে করতে সেটা না পেরে, তাদের মারধরও করছে আর পুলিশ টিগার টেপার কথা বেমালুম ভুলে জামায়াতের পোলাপানদের হাতে-বাঁশে জামাই আদর উপভোগ করছে! ওদের তো লাশ দরকার ছিল! যা তারা আজ ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে, বিশ্বজিতের লাশ নিয়ে তারা খুব একটা “গুড ফিল” করছিল না! এইবার ওরা ওদের কাঙ্ক্ষিত লাশটা পেয়ে গেছে!

আজ এখন পর্যন্ত যে দুইজনের লাশ পড়লো, ক্ষতি কিন্তু হল তাদের দুই পরিবারেরই আর সে ক্ষতি থেকে “মাছের মায়ের পুত্রশোক” দেখাতে দেখাতে লাভ ঘরে তুলবে আমাদের নেতারা, এখানে সরকার আর বিরোধীদল বলে কোন পার্থক্য নেই! একজনের ক্ষতি মানেই অন্যজনের লাভ, লাভ-ক্ষতির হিসাবটা তো এরকমই! তবে আমি একটা জিনিস কখনো দেখিনি, আর তা হলো, নেতাদের কোন সন্তানকে রাজপথের রাজনৈতিক সংঘর্ষে খুন হতে!

লাশ প্রাপ্তি উপলক্ষে এবার আমরা একটা দিনের জন্য হরতাল আশা করতেই পারি! দিনটা হতে পারে ১৪ বা ১৬ ডিসেম্বর! কি বলেন? কি অবাক হচ্ছেন? এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! খবরদার! এর মধ্যে আবার সেলুকাসকে ডেকে আনবেন না! বেচারা আমাদের ডাকাডাকিতে এতদিনে অস্থির হয়ে বোধহয় তার বস, মহামতি আলেকজান্ডারের নিকট কৈফিয়তই তলব করেছেন, “ওই” উক্তিটা করার জন্য!

একটু পরেই টিভির পর্দায় ভেসে উঠল বিএনপি’র মহাসচিব জনাব ফখরুলের প্রিয় মুখখানা, দেখলাম উনি নিঃশঙ্ক চিত্তে ঘোষণা দিচ্ছেন, “আজ আমাদের অবরোধ কর্মসূচী ছিল, হরতাল ছিল না, তাই আমাদের কোন কর্মী পিকেটিং করেনি, এই ভাংচুর, আগুনের জন্য সরকার ও তাদের এজেন্টরা দায়ী আর অবরোধ শান্তিপূর্ণ ভাবে সফল করার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ দিচ্ছি!”

বেচারা সেলুকাসকে আর কতবার ডাকাডাকি করা যায়! আমাদের এত ডাকাডাকির কারণে বোধহয় এতদিনে উনি তার প্রিয় বস’সহ নরকবাসী থেকে প্রমোশন পেয়ে স্বর্গবাসী হয়েছেন। আর আমাদের সেই অবদানের কথা বেমালুম ভুলে যেয়ে অত্যধিক স্মরণে উনি এখন বিরক্ত হচ্ছেন! পাশাপাশি আমাদের আমজনতার দুর্ভাগ্য ও নেতাদের ফাজলামি দেখে বসের সঙ্গে সুরাপাত্রে থ্রি-চিয়ার্স করতে করতে হাসাহাসি করছেন! আর মহামতি অলেকজান্ডার খুশিতে ডগমগ হয়ে বলছে, “আমি তোমাকে বলেছিলাম না, সেলুকাস?”