ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিশ্বজিৎ তুমি নিশ্চিত থাক, দ্রুততম সময়ে আমরা তোমার কথা ভুলে যাব। ভুলে যাব ছাত্রলীগ নামধারী কিছু খুনিদের কথা, যারা তোমাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে, রড দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করছে। আমরা টিভিতে দেখেছি, তুমি ওদের হাত থেকে যতভাবে সম্ভব বাঁচার চেষ্টা করেছ, অনুনয়–বিনুনয় করেছে কিন্তু কিছুই তাদের স্পর্শ করেনি। পত্র-পত্রিকা, টিভি-ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে কিভাবে ছাত্রলীগের ওই হায়েনাগুলো তোমাকে ঘিরে ধরে হাসতে হাসতে কোপাচ্ছিল আর পেটাচ্ছিল। ঘটনাটা আমরা সবাই দিনের আলোতে দেখেছি। তুমি কি জান তোমার হত্যাকাণ্ডটি এখনও কারা কারা দেখেননি? জান না, তাহলে বলছি, তারা হলেন; আমাদের মহান দেশের মহান প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রীরা আর তার পারিবারিক দল আওয়ামী লীগের লোকজন! কি বিশ্বাস হচ্ছে ন? না হওয়ারই কথা! কারণ ওদেরই তো তোমার বাবা-মা সারাজীবন ভোট দিয়ে এসেছে! মনে হয় গত ভোটে তুমিও দিয়েছিলে। তাই না?

শুধুমাত্র আর একটা বড় ঘটনার অপেক্ষা! আর সেটা ঘটলেই তোমাকে আমরা ভুলে যাব, যেভাবে আমরা ভুলে গেছি, ৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের পা চাটা রাজাকারদের হত্যা, নির্যাতন ও অত্যাচারের কথা। সেইসব রাজাকার নামধারী পিশাচরা নিজেরদের মা-বোনদের ধরে নিয়ে এসে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দিত ধর্ষণ করার জন্য, আর পৈশাচিক আনন্দে পাশে দাড়িয়ে তা উপভোগ করত! ওদের ধারণা ছিল এই করেই নাকি ওরা স্বর্গে যাবে! যদি তাই হয়, তাহলে আমি বলব, “সৃষ্টিকর্তা সবাইকে এক কথা বলেননি!”

ছোটবেলা থেকেই, অনেকবার মা’র কাছে শোনার পরেও, ব্যক্তিগত ভাবে আমিও ভুলে গেছি, আমার দাদু, মানে আমার মা’র বড় মামা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বর্গীয় শ্রী রাখাল চন্দ্র সাহা’র (দানবীর শ্রী রনদা প্রসাদ সাহা’র বন্ধু, যাকেও পরবর্তীতে রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে তার একমাত্র ছেলে সহ হত্যা করেছিল) কথা। যাকে তারই বন্ধু নামধারী শয়তান “মির্জাপুর থানার দারগা”, যে কিনা তাকে (আমার দাদু) দিয়ে পাড়ার সব হিন্দু পুরুষদের মিটিং করার কথা বলে থানায় ডেকে নিয়ে এসে আটকিয়ে রেখে পরদিন পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয় সবাইকে হত্যা করার জন্য! আমরা ভুলে গেছি সেই দারগার নাম!

আমার দাদুর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু (!) ছিল, যিনি হলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন মির্জাপুর, টাঙ্গাইল থানার দারগা। দাদু’রা সবাই দেশত্যাগ করতে চাইলে, ওই দারগা তা করতে না দিয়ে বলেছিল, রাখাল, তোরা দেশত্যাগ করিস না, আমি আছি না, তোদের কোন ভয় নেই! আর সেই দারগা বন্ধুই তাকে হত্যা করেছিল, আর তার দুর্ভাগা পরিবারের উপর এমন একটা আজীবন অপরাধ চাপিয়ে দিয়েছিল যে, হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্যান্য পরিবারের গুলোর ধারনা হল, “রাখালের কারণেই তাদের বাবা-দাদুদের খুন হতে হয়েছিল!” কারণ ওনার কথার উপর ভরসা করেই সবাই থানায় গিয়েছিল মিটিং করতে! পরদিন ধলেশ্বরী নদীতে সবার মৃতদেহের সাথে আমার দাদু’রও মৃতদেহ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, তখনও দাদু’র বুক পকেটে টাকাসহ তার প্রিয় কলমটি ছিল। একরাতের মধ্যেই কোটিপতি একটা পরিবারকে নিঃস্ব প্রায় ভিখিরি একটা পরিবারে পরিণত করেছিল সেই জানোয়ারটি! আমি আরও ভুলে গেছি, আমাদের সেইসব আত্মীয়-স্বজনদের নাম, যারা পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারের হাতে সেই সময় খুন হয়েছিলেন।

আমি ভুলে গেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পরিবারের সবাই যখন দেশত্যাগ করে “ভারতের মানকার চরে” শরণার্থী হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, তখন আমাদের বাড়ি যে সব রাজাকাররা লুট করেছিল, পাশাপাশি আমাদের বাড়িতে হাল চাষ দিয়ে “হর্ষে খেত” বানিয়েছিল, তাদের নাম! এইসব ঘটনার কথা, আমি অনেকবার আমার বাবা-ম’র কাছে শুনেছি, তার পরেও ভুলে গেছি!

আমরা ভুলে গেছি, ১৫ই আগস্টে আমাদের মহান নেতা, জাতির জনককে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ও পরবর্তীতে সেইসব শয়তানদের নাম, যারা তার নামে কালিমা লেপন করেছিল এবং তার হত্যার বিচার বন্ধ করেছিল! আমরা এটাও ভুলে গেছি, যারা সেইসব খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেশে তথাকথিত বীরে পরিণত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে পার্লামেন্টের এমপি, বিরোধীদলের নেতা পর্যন্ত বানিয়েছিল, তাদের নাম!

আমরা ভুলে গেছি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী শাসনামলে তথা জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের সময়ে আমাদের দেশে সংগঠিত হাজার হাজার অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের কথা! “ছাত্র রাজনীতিকে” “অপ ছাত্র রাজনীতি”তে রূপান্তরকারীর নামও আমরা ভুলে গেছি!

আমরা ভুলে গেছি, আমাদের নিকট অতীতের ২০০১ সনের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশে হিন্দু ও আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খুন, অত্যাচার, ধর্ষণের ও লুটপাটের কথা! ভুলে গেছি পূর্ণিমাদের ধর্ষণকারীদের নাম! ভুলে গেছি হাওয়া ভবনের “মুই কি হনু রে” রূপি সেই পারিবারিক নেতার কথা, যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্যারালাল আর একটা সরকার চালানোর পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলকে একটা “হরর” আমলে পরিণত করেছিল! আমরা ভুলে গেছি শিবিরের রগ কাটার কথাও!

ভুলে গেছি, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে শেয়ার মার্কেট লুটকারী ও তাদের প্রশ্রয় দাতাদের নাম। হলমার্ক, তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডে মারা যাওয়া শ্রমিকদের নাম ও তাদের পরিবারের কথাও আমরা ভুলে গেছি। শিশু পরাগকে অপহরণ-কান্ডের নাটের গুরু যুবলীগের নেতা ও তাকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দানকারীর নামও কিন্তু এখন আমাদের মনে করতে কষ্ট হয়! যথারীতি ধামাচাপা পড়ে গেছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কথা!

বিশ্বজিৎ! আমরা সবকিছুই ভুলে যাই, তাই বলছি, আমরা তোমাকেও যথাসময়ে ভুলে যাব! ভুলে যাব তোমার হত্যার বিচার চাওয়ার কথা! কারণ ভুলে যাওয়া জাতি হিসেবে বিশ্বে আমাদের সুনাম সর্বজনবিদিত! আর এই সুযোগটাই নিয়েছে আমাদের নেতারা! ওনারা এখন অপেক্ষায় আছে পরবর্তী বিশ্বজিৎ-এর লাশ কখন পড়ছে?

তাই বলছি, ভাই! তুমি রাগ করো না, আমরা তোমাকে নিশ্চিত ভুলে যাব!