ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

বিষয়টা যদি কখনো ‘খাওয়া বিষয়ক’ হয়; তাহলে আমি এক্ষেত্রে দুটো টাউটামী থিয়োরি মেনে চলি! এর প্রথমটা হলো- “সুকান্ত তুঁই খেয়েই মরবি”! আর দ্বিতীয়টা হলো- “সুকান্ত, তুঁই না খেলেও মরবি”!

এই থিয়োরি দুটো মেনে চলতে যেয়ে আমি মাঝে মাঝেই ভেজালে পড়ি! কেউ খাওয়াতে চাইলেও মুখের উপরে তাকে যেমন ‘না’ করি। আবার কেউ না খাওয়াতে চাইলেও তাকে প্যাঁচে ফেলে রাজী করাই! আর এই কারণেই আমাকে সবাই এড়িয়ে চলে! তবে এক্ষেত্রে রূপা ব্যতিক্রম! সে সবসময় ওর নিত্যনতুন রান্নাগুলোর ‘স্বাদের পরীক্ষক’ হিসেবে আমাকেই রাখছে! নীচের ক্ষীরের কুলি পিঠাগুলো তারই নমুনা ছবি!
Khir Pitha
এই যেমন যহরত ভাই! তিনি আমার খাওয়া বিষয়ক পোস্টগুলো দেখে খুবই ভয়ে আছেন, কখন যেন তার কাছে আমি চা’য়ের নিমন্ত্রণ দাবি করি এই ভেবে! আবার নিতাইদা সেই কবে থেকেই আমাকে খাওয়াতে চাচ্ছেন কিন্তু আমি কিছুতেই ঘাড় কাত করছি না! এই সেদিন, ওস্তাদ এতো করে খেতে বললেন, অথচ আমি কিছুই খেলাম না! আর এই সুযোগ জুজু ভাই সব মেরে দিলেন! আবার আমার সুপ্রিয় ব্লগারদের কাছেও চায়ের নিমন্ত্রণ চাইবো না; কারণ ওস্তাদে না করেছে!

আমি আসলে আমার খাওয়া নিয়ে লিখে ব্লগে নিজেকে হাইলাইট করতে চাচ্ছি না কারণ এতে বাংগাল ক্ষিপ্ত হয়ে ভাগ চাইতে পারেন! সেক্ষেত্রে রাজ্জাক স্যার আমাকে বাঁচানো চেষ্টা করেও লাভ করতে পারবেন না, কারণ উনি দূরে থাকেন!

তাই আমি বাঙালি জীবনে চায়ের নিমন্ত্রণ ও এর মাহাত্য নিয়েই এই পোস্টে লিখবো-

সাগর-রুনী বিষয়ক চা নিমন্ত্রণঃ
একটা সময় এই ‘চা নিমন্ত্রণ’টা এই বঙ্গদেশে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল! আমাদের সমাজের গণ্যমান্য মানুষদের যখনই আমার মত চা খেতে ইচ্ছে করতো তখনই তারা সাগর-রুনির হত্যা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে দিতো! ফলাফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে চা’য়ের নিমন্ত্রণ! আবার কেউ যদি, চায়ের প্রতি লোভ না দেখিয়েও এবিষয়ে কথা বলতো; তখনো সে একই জায়গা থেকে খাঁড়ার উপর চা খাওয়ার ডাক পেত! সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল যখনই কেউ সেই চা খেতো, সাথে সাথেই সে মূলবিষয়টা ভুলে যেয়ে অন্য গীত গাইতে শুরু করে দিতো! ভাবখানা এমন- তাদেরকে খাওয়ানো চায়ের সাথে যেন ‘আফিম’ মেশানো ছিল? আমার অবশ্য এই বিষয়ক একটা অভিজ্ঞতা আছে! সেটা নিয়ে অন্য পোস্টে আলোচনায় যাবো! তবে শুনেছি- কোন দোকানের চা খেতে বেশি ভাল লাগলে ধরে নিতে হবে সেই চায়ের দুধে আফিম মেশানো আছে!

না! গল্পটা বলেই ফেলি-

আমরা তখন ইউনির থার্ড ইয়ারে পড়ি! থাকি রাজশাহীর সাধুর মোড়ের ডিসেন্ট ছাত্রাবাস নামক এক মেসে! রাত দুটোই আমি, রাশেদ আর কঙ্কর মিলে চা খেতে বের হলাম, কিন্তু শীতের রাতে কোন চায়ের দোকানই খোলা পেলাম না! হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম মন্নাফের মোড়ে! দেখি মোড়ের একটা ঝুপড়ি ঘরের সামনে লোকাল কিছু পোলাপান চা খেতে খেতে ধুমছে সিগারেট টানছে! আমরাও এগিয়ে গিয়ে বললাম, মামা তিনটা চা দ্যান, স্পেশাল করে দিয়েন! আমার বলা- এই স্পেশাল করে দেওয়ার কথাটাই আমাদের কাল হলো। ঘরের ভিতরে চা বানানোরত এক বৃদ্ধকে একজন হাঁক দিয়ে বললেন, মামাদের চা ‘স্পেশাল’ হবে! তখনই আমাদের ভিতরে যেয়ে বসতে বললো বাইরে চা সার্ভ করতে থাকা ছেলেটি!

ঝুপড়ির ভিতরে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই আমি তাকালাম রাশেদের দিকে, আর রাশেদ তাকালো আমার দিকে। হঠাৎ করেই সেই চায়ে এক অজানা ফ্লেভার পেলাম! কঙ্কর কিছু না বুঝেই কাপে সমানে চুমুক দিতে থাকলো! আমি আর রাশেদ ‘কী আর হবে’ ভেবে চা শেষ করে ঝুপড়ি থেকে বের হলাম!

স্পেশাল বলায় আমাদের চা’তে ডোজ বেশি দেওয়া হয়েছে! তিনজনে হাঁটছি! হটাৎ খেয়াল করলাম আমার ডান পা বাঁ’দিকে আর বাম পা ডানদিকে যাচ্ছে! কঙ্কর চেঁচিয়ে উঠে কইলো, “ক্যারে আমার এম্বা ঠ্যাকে ক্যা”? রাশেদ ওরে গাইল দিয়া কইলো, শালা, সিরাজগঞ্জ্যা ভূত, খাওয়ার সময় মনে আছিলো না? এখন জলদী হাঁট! তারপরের ঘটনা আমাদের কারও মনে নেই! তবে পরের তিনদিন আমার ঘাড় বাঁকা ছিল, সেই রাতে বেকাদায় বেহুঁশ হয়ে শোয়ার কারণে!

ফেন্সি চাঃ
ইউনি জীবনে কাউকে যদি বলতে শুনতাম, “মামা চায়ে দুধ চিনি বেশি হবে”! তাহলে আমরা তাকে না দেখেই বুঝে যেতাম, শালা ফেন্সীখোর! আর এদের তালে পরে দুধ চা’র নামই হয়ে গেল ‘ফেন্সী চা’! অবশ্য গাঁজাখোরগুলোও দুধ চা পছন্দ করতো!

এই দুধ চা নিয়েও আছে এক মজার ঘটনা! মাঝে মাঝেই দেখি, ‘খাঁটি গরুর দুধের চা’ বা ‘গরুর দুধের খাঁটি চা’ লেখা চা স্টল! দুটো লেখা নিয়েই বিতর্ক হয়! মুরগী আগে না ডিম আগের মত করে! সসপেনে জ্বাল দিতে থাকা গরুর দুধ যত ঘন হবে সেই দোকানের দুধ চা তত ভাল বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই দুধ চা’ই হোক আর ফেন্সি চাই হোক সেটা খেতে হয় দুধ দেখে। দুধ যত ক্ষীর ক্ষীর হবে মজা তত বেশি হবে!
D-2
ভোলা সা’র চার দোকানঃ
আমাদের দেলুয়া গ্রামে ছিল একটাই চা স্টল। তার মালিকের নাম অনুযায়ী সেই চায়ের দোকানের নাম হয়ে গেল ভোলা সা’র চায়ের দোকান। যদিও নাম হওয়া উচিত ছিল ‘ভোলা সাহা’র চা দোকান’! এই বৃদ্ধ সাহা বাবুর বিশেষত্ব ছিল- কেউ যদি তার দোকানে বাকীতে নিয়মিত চা খেতো, তাহলে সে অন্য কারণে তার দোকানের সামনে দিয়ে গেলেই খাতায় তার নামে এক কাপ চা আর বিস্কুটের দাম লেখা হয়ে যেত! এই দোকানেই প্রথম আমার চায়ে হাতেখড়ি হয় বড়দের সাথে! আর গ্রামের পোলাপান এই ভোলার সাহা’র খেপানোর নামকরন করে ‘গরম চা’ বলে!

তারপর বাবার কল্যাণে বাড়িতে এলো সকালের চা পর্ব। পরবর্তীতে সারাদিনের চা পর্ব! আমাদের ছিল একটা বড় গদিঘর আর ছিল পালিত গরু! তাই দুধ চা’র অভাব আমাদের বাড়িতে কোনদিনই হয়নি!
d-3

আমাদের গরুঃ
এদের নাম যদি এই পোস্টে না লিখি তাহলে দুধ চায়ের মাহাত্ম কিছু কমে যায়! আমাদের বাড়ীতে প্রথম গরু আসে বড়মা’র বাবাবাড়ি থেকে উপহার হয়ে! তারপর সেটার সঙ্গী হিসেবে পাবনার বাথান থেকে কিনে আনা হয় একটা সাদা গাভী। তার নাম ছিল ‘ভালবাসা’। এই ভালবাসা যেদিন আমাদের বাড়ীতে আসে সেদিন আমাদের বাড়ীতে ছিল একটা ছোটখাট অনুষ্ঠান। তাকে এক কুলা ধান খাইয়ে, ধান-দূর্বা, সিঁদুর দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়! ওকে এই নামে ডাক দিলে সে বুঝতে পারতো এবং সাড়াও দিতো।

একদিন, আমাদের এলাকার পশু ডাক্তারের বুদ্ধিতে এই ভালবাসার সাথে ক্রসব্রিডিং করে প্রথম আস্ট্রেলিয়ান জার্সি প্রজাতির বাছুর জন্ম দেওয়া হয়! সেটা ছিল ষাঁড় বাছুর। কিন্তু জন্মের অল্প পরেই সেটা মারা গেল। তারপর তার একটা লাল রঙের গাভী বাচ্চা হলো। সেটা বড় হলে তাকে আবারো ক্রসব্রিডিং করে করে আসল ‘অস্ট্রেলিয়ান বাছুর’ জন্ম দেওয়া হলো আমাদের বাড়ীতে। সেই আশির দশকে সবে এদেশে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছিল। আর তার প্রাথমিক প্রয়োগ হয়েছিল আমাদের ‘ভালোবাসা’র উপর।

দেলুয়া-সোহাগপুর বাড়ী হয়ে আমাদের গোয়ালে ছিল টোটাল বিশটার মত গরু। এর মধ্যে একটা ছিল পিওর অস্ট্রেলিয়ান ষাঁড়! সে ছিল আমাদের ছোটবেলার খেলার সাথী! কালোর সাথে হালকা লালের ষাঁড়টা ছিল বিশালদেহী কিন্তু গুঁতা দিতো না কখনো। আর সাঁতার না জেনেও, আমার ভাগ্নে তাপস ওর লেজ ধরে যমুনা পার হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে হাত ফসকে নদীতে ডুবে প্রায়ই মারা গেছিলো। নেহাতই ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে সে।

গরুরা সাধারণতঃ নদীতে নামতে চায় না! ওরা গায়ে জল লাগাটা পছন্দ করে না! কিন্তু আমাদের এডিসন ওদেরকে এক এক করে ডেকে নদীতে নেমে যেতে বলতো আর ওরা সুর সুর করে তাতে নেমে স্নান করে, সাঁতার কেটে পারে উঠে আসতো।

এদেরই দুধ খেয়ে বড় হয়েছি আমি। আর খেয়েছি দুধের সর। ক্লাস টেন পর্যন্ত আমার প্রধান খাবারই ছিল দুধ-রুটি। এ নিয়ে আমার মায়ের ছিল অনেক জ্বালা! ডাক্তার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে, “আমি অন্যকিছু তেমন একটা খাই না কেন”? তার জন্য!
d-1

সবুজের চাঃ
ইউনিভার্সিটি জীবনে রাবির টুকিটাকির মোড়ে ছিল সবুজের চায়ের দোকান। ওর দোকানটাই ছিল আমাদের মূল আড্ডাকেন্দ্র। সবুজ ছেলেটা আমাদের তালে পরে দুধের চা বানানো বন্ধ করে দিয়ে শুরু করেছিল ‘গন চা’ বানানো! গরম জলে জাস্ট একটু লিকার আর একটুখানি চিনি দিয়েই সে বানিয়ে ফেলতো এই চা। আর আমরাও তাকে বিল দিতাম মাস চুক্তিতে।

এছাড়াও কবে কোন ক্লাস হবে, বা হবে না? পরীক্ষা আগাবে, না পিছাবে? তার যাবতীয় খবরাখবর পাওয়া যেত এই স্টলে। আমি যেহেতু ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম আর ছিলাম ৯৫% ফাঁকিবাজ, তাই একটু এগিয়ে ডিপার্মেন্টে না যেয়ে সবুজের দোকানেই ক্লাসের, পরীক্ষার রুটিন ঝুলিয়ে দিতাম! এতে আমার বন্ধুরাও বেদম খুশি হতো। অবশ্য মাঝে মাঝে সেলিম স্যার এখান থেকেই আমাদের ডেকে ক্লাসে নিয়ে যেতেন।

আর তাইতো বিদায়বেলায়, বন্ধু-বড় ভাইরা মিলে সেই এলাকাতে আমাদের দুষ্টামির চিহ্ন রাখতেই একটা মেহগনির চারা লাগিয়ে রেখে এসেছিলাম, যা এখন বৃক্ষে পরিণত হয়েছে এবং আমাদের শয়তানীর স্মৃতিচিহ্ন সহ হাওয়া দিচ্ছে। যদিও বর্তমানে আমাদের সেই চায়ের স্টলটা নেই, নেই সেই দুধ চা, কিন্তু জায়গাটা এখনো আছে; আছে গাছটাও!
d-4

যে ‘টাউটামি থিয়োরি’ নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম তা থেকে অনেকদূর সরে এসেছি। ল্যাপটপ হারানোর ফলে আমার চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে! লেখাটাকে গুছিয়ে লিখতে পারলাম না বলে দুঃখিত!

তারচেয়ে আসুন কীভাবে দুধ চা বানানো হয় তা দেখে নিই!

ভিডিও লিংক

 

## নিজের ও প্রিয় বন্ধুর তোলা ছবি।

২৫/০১/২০১৭