ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটা শতভাগ গণযুদ্ধ। এই যুদ্ধে বহু মানুষ বহুরকমভাবে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ ভাবেনি তাদের সেই কাজের স্বীকৃতি আদায় করার জন্য তাদেরকে ৪২ বছর পর সাক্ষ্য দিতে হবে? নিজের কাজ প্রমান করতে হবে সেইসব মানুষের কাছে; যারা তাদের চেয়ে বয়সে অর্ধেক এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের যাবতীয় সুবিধাভোগী লুটেরাগোষ্ঠি!

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়াটা যেমন ছিল-

১) প্রথমে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরীর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করা হয়েছে। পরে এটাকে সংগঠিত করার মাধ্যমে বাঙালিদের মধ্যে স্বাধীনতার বীজবপন করা হয়েছে।

২) বাঙালিকে স্বাধীন করার জন্য সংগঠিত করা হয়েছে এবং পাকিস্তানিদের কাছ থেকে বাঙালিদের আলাদা করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

৩) পাকিস্তানিরা সেনা নামিয়ে, হত্যা করে বাঙালিদের থামিয়ে দিতে চেয়েছে এবং বাঙালিরা একটা গণযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এই পর্যায়ে এসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে একটা গণযুদ্ধে রূপ নিয়েছে-

ক) গ্রাম, শহর বন্দরের মানুষেরা নিজেরাই উপযাজক হয়ে বা সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছে।

খ) অত্যাচারিত মানুষেরা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেও, অনেকেই স্থানীয় মানুষদের বাড়িতে আশ্রয় লাভ করেছিলেন। বিশেষ করে অনেক হিন্দু পরিবার তাদের আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় লাভ করেন। সেখান থেকেই তারা প্রথমে রিফিউজি ক্যাম্পে সাহায্য সহযোগিতা করাসহ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তরুণদের সংঘটিত করে তাদের ভারতীয় বাহিনীর পরিচালিত বিভিন্ন ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া ও তাদের সহযোগীতার কাজ করেছে।

গ) এই পর্যায়ে এসে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

এখন যদি বলা হয় শুধুমাত্র যারা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারাই মুক্তিযোদ্ধা আর বাকিরা কিচ্ছু না, তাহলে বলতে হয়-

বিশাল ভুল হচ্ছে! মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষস্তরের কর্মী-যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার নামে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া আরও লাখ লাখ মানুষকে অপমান করা হচ্ছে। এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় যদি বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন সাহেবও আসেন, তারাও কিন্তু কমিটির সামনে অপদস্ত হবেন! তদন্ত করলে দেখা যাবে, কমিটির অধিকাংশই লোকজনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আর দুর্নীতিবাজ। তাই এই পোষ্টের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই, বন্ধ হোক এই যাচাই-বাছাইয়ের নামে মুক্তিযুদ্ধকে ভালাবাসা মানুষদের অপমান করার প্রক্রিয়া। বরং রাজাকারদের তালিকা তৈরী করুন! এটাই কাজে দিবে।  বরং দেখা যাবে, এই তালিকা করতে গেলে সবার আগে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে- আজ যারা মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাইয়ের কাজে নিয়োজিত আছেন তারাই!

আমার বাবার কথা বলি। আমার বাবা রিফিউজি হিসেবে পরিবারসহ ভারতে আশ্রয় নেওয়ার অল্প কয়দিনের মধ্যেই ভারতে থাকা আমাদের আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় পান। পরে তাদেরই সহযোগীতায় ভাড়া বাসায় থেকে মুক্তিযুদ্ধে একজন সংগঠক হিসেবে অংশ নেন! সেই সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আমাদের জাতীয় চার নেতার একজন জনাব ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সাথে মাইকার চর আর ধুবড়ী অঞ্চলের বিভিন্ন রিফিউজি ক্যাম্পে কাজ করেন। পাশাপাশি তিনি আমাদের পাবনা-সিরাজগঞ্জ এলাকা থেকে ভারতে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী তথা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক তরুণদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, কখনো ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন।

পাশাপাশি তিনি আরও অনেক পরিচিত মানুষের সাথে তুরার ক্যাম্পে যেয়ে ট্রেনিং নিয়েছেন। সেই সময় ছদ্মবেশী ভারতীয় বাহিনী, অল্পকিছু বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে গোপন অপারেশনে ঢুকতেন। আমার বাবাও সেই দলে থাকতেন।

এ বিষয়ে বাবার মুখে ছোটবেলা থেকে যা শুনে আসছি তা বলছি-

১) প্রথমদিকে ভারতীয় আর্মি ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একাকি কোন পুরুষ-ছেলেকে দেখামাত্রই ধরে নিয়ে যেতেন বা জিজ্ঞাসাবাদ করতেন পাকিস্তানিদের গুপ্তচর সন্দেহে। সেই অবস্থায় তিনি তার বড় ভাই (নিপেন জেঠা) সহ আরও আত্মীয়ের সহযোগীতা নিয়েছেন, যারা ভারত বিভাগের পরপরই ভারত চলে গিয়েছিলেন। তাদের সহায়তায় অনেককেই ভারতীয় বাহিনীর নিকট থেকে ‘আমরা একে চিনি’ বলে ছাড়িয়ে এনেছেন।

২) অনেকেরই থাকার জায়গা ছিল না! তাদের কমবেশি থাকার জায়গার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন! আর তাদের জন্য আমার মা রান্না করতেন ভাত-তরকারি।

৩) যাদের সাথে তিনি কাজ করেছিলেন তারা হলেন- ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, মোমিন তালুকদার, সোবাহান খাঁ, ডাঃ আবু হেনা, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর নুর বাকী (বাকী সাহেব) সহ আরও অনেকেই। অবশ্য একমাত্র বাকী সাহেব ব্যতীত আর কেউ কোনদিন তা স্বীকার করেননি বা তার প্রয়োজন পড়েনি! যেহেতু আমরা একই ‘দেলুয়া’ গ্রামের মানুষ ছিলাম, তাই আমার মা’র সাথে দেখা হওয়ামাত্রই বাকী সাহেব বলতেন, বৌদি, আপনার সেই ভাত খাওয়ানোর কথা এখনো ভুলিনি! উনি হাসতে হাসতে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে এই কথা বলতেন! আমিও অনেকবার শুনেছি। তিনিও কিছুদিন আগে মারা গেছেন। একমাত্র সাক্ষ্য হিসেবে বেঁচে আছেন ডাঃ আবু হেনা (সাবেক এমএলএ, বঙ্গবন্ধুর এককালের সহচর পরবর্তীতে মোস্তাক সরকারে যোগ দিয়েছিলেন এবং বাকী সাহেবের আপন ছোট ভাই।)

৪) মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং -এর প্রথমদিকে বাঁশ দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ট্রেনিং দিতো, পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতো।

৫) যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে, তখনো মুক্তিযোদ্ধারা পর্যাপ্ত ট্রেনিং পায়নি। সেই সময়ে ভারতীয় বাহিনী ছদ্মবেশে অল্প কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাতের আঁধারে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নাম না জানা কোন পাকিস্তানি সেনাঘাঁটিকে টার্গেট করে গুলি ও মর্টার ছুঁড়ে আবারো ভারতে চলে যেত। অতি উৎসাহীদের সেইদলে আমার বাবা আরও অনেকের সাথে থাকতেন আর গোলাবারুদ বহন করতেন!

৬) সেই সময়ে রিফিউজি ক্যাম্পে কাজ করার সুবিধার্তে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও ডাঃ আবু হেনার দেওয়া একটা পরিচিতিপত্র বা সার্টিফিকেট ছিল যেটা আমাদের নদীভাঙ্গনের কোনো এক সময়ে বাবা হারিয়ে ফেলেছেন।

৭) আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় এবং ব্যবসায়ী পরিবার হওয়ায় পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের অনেক মানুষের সাথেই আমাদের পরিচিতি ছিল। তাছাড়া আমার তালই মশায় শ্রী সন্তোষ প্রামাণিক আওয়ামীলীগের নেতা (পরবর্তীতে বাকশালের বেলকুচি থানা সভাপতি) হওয়ার ফলে ন্যাচারলী আমাদের পরিবার মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যায়। যেমন আমার রতন মেসো ও নিখিল দা (আমার জেঠাত দাদা, বর্তমানে ভারতবাসী) সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আমার দুলাল কাকা, বাকী সাহেবের যোদ্ধাদলের সাথে ভারত থেকে নৌকায় করে সিরাজগঞ্জে আসার পথে হাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গানবোট থেকে ছোড়া গুলি খেয়েছেন।

আমি কেন এসব কথা বলছি?

১৯৯৬ সাল। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি আমাদের আদালত পাড়ার গদি ঘরে বসে আছি। সাথে আছে আমার বাবা আর আমার তালই মশায় সন্তোষ প্রামাণিক। পত্রিকায় সেই সময়ের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা বক্তৃতা নিয়ে কথা বলতে যেয়ে আমি, বাবা ও তালই মশায়কে বললাম, “তোমরা বলো- মুক্তিযুদ্ধে তোমাদের ভূমিকা ছিল! তাহলে তোমরাও তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করতে পারো।“ এখানে বলে রাখি সেই সময়ে এই বিষয়ে যে নীতিমালা করা হয়েছিল তাতে করে তারা অবশ্যই একজন ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারতেন। আমার বাবা না করলেন, কিন্তু তালই মশায় বললেন, “হ্যাঁ! তুই তোর বাবার জন্য আবেদন কর!” যে কথা সেই কাজ, আমি গদিঘর থেকে দশ গজ দূরে মুক্তিযোদ্ধা অফিসে গেলাম আর কমান্ডারকে ধরে নীতিমালাটা সংগ্রহ করে পড়লাম এবং আমার বাবা বারবার না করা সত্ত্বেও আমি আবেদন করলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাবার সঙ্গী আমাদের মনু কাকাও (মুক্তিযোদ্ধা) সাহস দিলেন এবং সাক্ষ্যও দিলেন।

তারপর নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লতিফ মির্জার (বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক) নেতৃত্বে যাচাই বাচাই করে বাবা তালিকাভুক্ত হলেন।

এবার শুরু হলো আসল খেলা। শুরু হলো আসল-নকলের অভিযোগ। এই অভিযোগ বেশি আসতে থাকলো যারা আসলে কোনদিনই ‘মুক্তিযুদ্ধ করা’ দূরের কথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও ছিলেন না তাদের কাছ থেকে।

এলো ২০০১ বিএনপি’র আমল। আবার যাচাই-বাছাই হলো, আমার বাবা আবারো টিকে গেলেন। যদিও সেই সময়ে আমার বাবা বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং আমাদের এলাকায় বাঘ-ভাল্লুকরূপী সব আওয়ামী লীগের নেতা-পাতিনেতারা পলাতক।

আবার এলো ১/১১ সরকার তখনও আবারও যাচাই বাছাইয়ের ধোঁয়া। শুরু হলো দুর্নীতি। আবারো আওয়ামী লীগের আমল আবারো যাচাই-বাছাইয়ের ধোঁয়া। সরকারের হুমকি-ধামকি যত বেশি হয় গ্রামেগঞ্জে ঘুষের টাকার রেট তত বাড়ে। এবার শোনা যাচ্ছে প্রতি সার্টিফিকেটের জন্য দিতে হবে পাঁচ লাখ টাকা!

এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় যেটা হয়-

১) প্রতিবার আমার বাবার নাম অভিযোগের আগে রাখে এবং এটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে হতেই তালিকার নীচে থাকা ‘ভুয়া’ নাম নিয়ে আর আলোচনায় হয় না।

২) প্রতিবার টাকা খাওয়া বাড়ে।

৩) আর প্রতিবার আমার বাবা আমাকে বকা দেন এই বলে যে, তোর কারণেই শেষ বয়সে আমি মানুষের কাছে অপদস্থ হচ্ছি। ‘তুই -ই আমাকে মারবি বলে’ আক্ষেপ করেন তিনি।

কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা। বাবাকে বলি, তুমি তোমার অধিকার ছেড়েছো বলে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়ার অধিকার ছাড়বো না! প্রয়োজনে মা’র নামেও আবেদন করবো!

৪) আমার বাবাকে অপদস্থ করার জন্য যারা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকেন- তারা সবাই আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা এবং একসময় এরা সবাই আমাদের বাড়িতে খেয়েছেন, আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন।

৫) আমার অভিজ্ঞতা বলে, আওয়ামী লীগের গ্রাম্য নেতারা তাদের দলীয় মানুষদের ‘অপদস্থ’ করতে পছন্দ করে! আর তারা যদি হয় ‘হিন্দু সমাজের মানুষ” তাহলে তো কথাই নেই! তারা যেন হাতে আকাশের চাঁদ পান! এবং এদের দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় থাকে- আত্মীয় আর বিরোধীদলের মানুষেরা!

সবশেষে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই যে, এই যাচাই-বাছাইয়ের নামে গরীব-দুঃখী মুক্তিযোদ্ধাদের সবার সামনে বসিয়ে অপমান অপদস্ত করা হচ্ছে। কিন্তু  ভুয়া যারা, তার ক্ষমতার জোরে আছে বহাল তবিয়তে।

তাই অনুরোধ, যারা ইতিমধ্যেই কয়েকবার যাচাই-বাছাইয়ে পরীক্ষিত হয়েছেন তাদের এই প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখুন এবং এই তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বা নিয়ম কী হবে কারা কারা যোগ্য হবে, কে আবেদন করতে পারবে তা যেন জনগণ জানে এবং  সরকারের তরফে গঠিত কমিটি যেন সেটা মানে।

যারা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে, আর যারা বর্তমান সময়ে ক্ষমতাবান তারাই মুক্তিযোদ্ধা আর বাকী সবাই ‘কিচ্ছু না’! সেটা আমরা মানি না!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এ বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি চাই।

আপনাকে ধন্যবাদ!

পূর্বের লেখাঃ আমার বাবা-মায়ের মুক্তিযুদ্ধের গল্প

০৭/০২/২০১৭