ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

অর্থনীতির সূত্র মতে- মানুষের মনে প্রথমে কোন কিছুর জন্য আকাংখা তৈরী হয়! যখন সেই আকাংখা পূরণ করার মত অর্থ বা সক্ষমতা তাদের হাতে আসে; তখন বাজারে এর চাহিদা তৈরী হয়! আর এই চাহিদা পূরণ করতে এগিয়ে আসে ‘যোগান’। যাকে আমরা ‘পণ্যের যোগান’ বলি। বাকী কাজটা বা পণ্যের বাজার দর নির্ভর করে সেই পণ্যের চাহিদা আর যোগানের ভারসাম্যের উপর।

জন্মলগ্ন থেকেই ‘মাদক’ গ্রহণের একটা তীব্র আকাংখা মানুষের আছে! আর এর জন্য তারা তাদের আয়ের একটা অংশ ব্যয় করার জন্য সব সময়ই প্রস্তুত থাকে! এখন যদি সে তার হাতের কাছে সেই মাদক পায়, তাহলে তাকে আটকানোর সার্মথ্য কারো নেই!

আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কেউ বা কোন আইন বা কোন ধর্মও এটাকে হান্ড্রেড পার্সেন্ট আটকাতে পারেনি! আগামীতেও পারবে না! আর যোগান? চাহিদা থাকলে সেই পণ্যের যোগান তার নিজের পথ নিজেই বের করে নিবে! বৈধভাবে আমদানী-রফতানী না করতে পারলে বা সরকারী ব্যবস্থা তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে- আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি এর নিয়ন্ত্রণে নিবে। আর তাই তো তালেবানরা আর সবকিছু মেনে চললেও আফিম চাষ ও তা বিপণন কিন্তু তারা বন্ধ করেনি! কারণ তাদের দরকার অর্থ যা দিয়ে তারা অস্ত্র কিনবে, আর অর্থের দরকার মাদক, কারণ এর রয়েছে বিস্তৃত বাজার। বাকীটাতে কাজ করছে অর্থনিতির সেই রুল; যাকে আমরা ব্যবসা বলি!

আমেরিকা এটা আটকাতে পারেনি! তাই তাকে আজ মেক্সিকোর সীমানায় ওয়াল বানাতে হচ্ছে! কিন্তু এতেও কাজ হবে না, এরপর এই ওয়ালের নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খোড়া হবে আরও বেশী বেশী করে! সোভিয়েত আমলের কম্যুনিস্ট শাসনও মাদককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ইউরোপ, কানাডা এরসাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে গাঁজা সেবনকেই বৈধ করে দিচ্ছে! এমনকি সৌদি আরবও একের পর এক শিরোচ্ছেদ করেও এর যোগানকে শতভাগ নিন্ত্রয়ন করতে পারছে না।

বাংলাদেশে মাদক নিষিদ্ধ কিন্তু তাতে কী ফেন্সিডিল বা ইয়াবা পোলাপান কম খাচ্ছে? ইয়াবার চালান ধরা পড়ার হার যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে করে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, পোলাপান এখন এই মাদক ব্যাপক হারে খাচ্ছে! এর উচ্চমূল্য বা পুরুষের পায়ুপথে বা নারীর যৌনাঙ্গে বহন করার কথা জেনেও তারা তা খাচ্ছে! মাদকের কাছে, এর অতিমূল্য ও খাদ্যদ্রব্যের প্রতি মানুষের যে একধরণের ঘৃণা থাকে; সেটাও হার মেনেছে!

গতকালই প্রথম আলোর একটা খবরে পড়লাম, ইংল্যান্ডে একটা গাঁজার খামার ধরা পড়েছে। আর সেই খামারটা কোথায় ছিল জানেন? ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে আনবিক বোমা হামলা থেকে ইংল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের বাঁচানোর জন্য মাটির নিচে যে বাংকার বানানো হয়েছিল, খামারটা ছিল তার ভিতরে! তাহলে বুঝুন ঠ্যালা? সুযোগ পেলে মানুষ চাঁদে, মঙ্গল গ্রহেও গাঁজা-আফিমের চাষ করবে! কইয়া রাখলাম!

অপরদিকে যদি বলি- কেন ফিলিপাইনের জনগণের জন্য রডরিগো দুতার্তের মত একজন প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন হলো? আসলে এর উত্তর লুকিয়ে আছে নিউটনের সেই তৃতীয় সূত্রের মধ্যে! সেই দেশের সমাজে মাদকের ব্যবহার এত বেড়ে গেছে যে, মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল- “প্রচলিত ব্যবস্থায় এর নির্মূল সম্ভব নয়”। এর জন্য দরকার কিলিং স্কোয়াড! জনগণ যখন দেখলো এই কিলিং স্কোয়াড গত ২২ বছর ধরে জনাব দুতার্ত একজন মেয়র হিসেবে ভালভাবে সামলাচ্ছেন; ঠিক তখনই তারা তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এবং তার সব কাজে সমর্থন দিচ্ছেন! ঠিকই একই ভাবে জন্ম হয়েছিল জার্মানিতে হিটলারের।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে যাওয়ার পর, প্রতিবেশী দেশের চাপিয়ে দেওয়া নানাধরণের বৈষম্যমূলক চুক্তির কারণে যখন জার্মানির মানুষ দেখলো তাদের আসলে এক ধরনের ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা, শিল্প সব ভিনদেশীরা নিয়ে যাচ্ছে! ঠিক তখনই হিটলারের আভির্ভাব ঘটে। এবং তিনি সাথী হিসেবে পান জাতগরিমায় শ্রেষ্ঠ ভাগা একদল মেধাবী মানুষকে। যার ফল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ; কয়েক কোটি মানুষের বিনাশ!

আজ আমেরিকায় যে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় এসেছেন তার জন্য দায়ী কে? আমি বলবো এর জন্য দায়ী গত ত্রিশবছর ধরে আমেরিকায় যারা প্রেসিডেন্ট ছিলেন তারা। যদি বলেন, সেটা কীভাবে হলো? উত্তরে বলবো, যদি ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর দিকে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন, তাদের অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ; যারা নিজেদেরকে তাদের নিজদেশে সংখ্যালঘু হতে দেখছেন। তারা দেখছেন- তাদের চাকুরী, ব্যবসা, শিক্ষার সুযোগ, নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো সব বাইরের লোকজন নিয়ে যাচ্ছেন। আর ট্রাম্প মানুষের মনের সেই কথাগুলোই পড়তে পেরেছিলেন। ফলে সে আজ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। এবার যদি সে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যেমন মেক্সিকোর সীমানায় দেয়াল তৈরী করেন, অবৈধদের সেদেশ থেকে বের করে দেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সেদেশ থেকে বের হতে বাঁধা দিতে পারেন? চীনের অর্থনীতিকে যদি বড় ধরণের ধাক্কা দিতে পারেন, তাহলে আগামীতেও সেইই প্রেসিডেন্ট হবেন বলে ধারণা করি।

গত ত্রিশবছর ধরে আমেরিকার প্রেসিডেন্টগণ অন্যদেশে যুদ্ধ করতে যতটা উৎসাহী ছিলেন, ঠিক ততটাই নিরুৎসাহিত ছিলেন নিজদেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ভাবায়। ফলে তাদের মধ্যে তৈরী হয়েছিল হতাশা! আর এই হতাশাই জনাব ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়ে এসেছে। ঠিক একই ভুল করেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারাও!

যে সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়তন ছিল পৃথিবীর ছয়ভাগের একভাগ। সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা এমনভাবে অস্ত্র বানানোর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন যে, মাত্র দশ-বারো কোটি মানুষের খাবারের ব্যবস্থাই তারা করতে পারলেন না! অথচ আমেরিকার পরে শুরু করেও তাদের হাতে এসে গেলো হাজার দশেক আণবিক বোমা! যা দিয়ে এই পৃথিবীকেই বার কয়েক ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সেই দেশের মানুষ তিনবেলা রুটি খেতে না পেয়ে, নিজদেশই ভেঙ্গে ফেললেন! ভদকার নেশাও তাদের তা করা থেকে ঠেকাতে পারলো না! পেটের ক্ষুধা এমনি মারাত্মক!

আইএস তৈরী ও এর বাড়বাড়ন্ত যদি খেয়াল করেন, তাহলেও দেখবেন সেই একই ফর্মুলা! একটার পর একটা মুসলিম দেশ আক্রান্ত ও ধংস হওয়ায় সেই দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে তীব্র হতাশা কাজ করছিল, ফলে এই গোষ্ঠীর তৈরী হওয়টা একরকম অবশ্যাম্ভাবীই ছিল।

ঠিক একইভাবে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনটা বাংলার মানুষ একবাক্যে মেনে নিয়েছিলেন এই ভেগে যে, শেখ হাসিনার চেয়ে ভালভাবে সরকার পরিচালনা করার মত আর কেউ নেই! তাই ভোট কত পার্সেন্ট পড়েছে? নিজে দিয়েছে কি দেয় নাই? তা নিয়ে মানুষ ভাবে নাই! মানুষ ভেবেছে- তাদের হাতে থাকা সবচেয়ে ভাল অপশনটাই সরকারে আছে। এবং বলে রাখি, আগামীতেও এরা তাইই করবে!

সেই অমরবানী দিয়ে শেষ করতে চাই! যাতে বলা হয়েছে, “প্রয়োজনই সব আবিষ্কারের জননী!” যুগের পরিক্রমায় এই আবিস্কারগুলোকে ভাল ও মন্দ উভয় ভাগেই ভাগ করা যায়! কিন্তু সবকালেই ‘বর্তমানে এর প্রয়োজন আছে’ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে!

তাই রডরিগো দুতার্তেরা কেন বার বার ক্ষমতায় ফিরে আসে? এর উত্তর লেখা থাকে মানুষের সেই প্রয়োজনের মধ্যেই!

২৫/০২/২০১৭