ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

যদিও আমরা চিঠি লেখালেখি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। তারপরেও বলতে গেলে বলতে হয়, আমরাই কাগজে-কলমে চিঠি লেখার শেষ প্রজন্ম। আমি বিশ্বাস করি, আজ যাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছর, সেইসব যুবক-যুবতীরা কাগজের চিঠি কখনো লিখেনি। দুই-একটা লিখলেও সেটা তারা লিখেছে ফেসবুকের ইনবক্সে। তাই জানা যায় না তাদের চিঠি লেখার ভাষা।

যদি এযুগে ছেলেমেয়েরা চিঠি লিখত, তাহলে কেমন হতো তাদের ভাষা? এমনকি আমরাও যদি সেই সব চিঠির উত্তর দিতাম, তাহলে সেগুলোইবা কেমন হতো? আসুন দেখে নেওয়া যাক-

আজকের বিষয়ঃ টাকা চাহিয়া পিতার নিকট পত্র।

শ্রী চরণেষু বাবা,
পত্রের প্রথমেই আমার হাজারখানেক লাইক থুক্কু প্রণাম গ্রহণ করিবে। সামনেই পরীক্ষা, সেই কারণে চরম বিজি আছি! তাই কমেন্টে বেশী সময় নষ্ট করার মত টাইম নাই! বলছি কী, জরুরী ভিত্তিতে হাজার পাঁচেক টাকা না পাঠালেই নয়! গতমাসে পাঁচশত কম পাঠিয়েছিলে এই মাসে সেটা ভরে দিয়ো!

আর একটা কথা, ডাটার অভাবে দিনকাল খুব খারাপ যাচ্ছে। ২০০ টাকা বেশী পেলে ডাটা কিনতাম। মায়ের জন্য শত কোটি প্রণাম। পড়াশোনা সেরাম চলছে, টেনশন নিয়ো না!

ইতি তোমার প্রাণপ্রিয় ছেলে।

পুত্রের কাছে বাবার প্রতিউত্তরঃ

স্নেহের পুত্রধন,

রাখ! রাখ! চাপা কম মার! গতবছরও কইছিলি পড়ালেখা ভাল চলছে কিন্তু রেজাল্টে দেখলাম আগের বছরের চেয়েও খারাপ। আর শোন, টাকা গাছে ধরে না যে ঝাঁকি দিয়েই তোর নামে বিকাশ করুম, এটা কামাই করতে হয়। তোকে প্রতিমাসে যা দেই এই মাসেও তাই পাবি। একটাকাও বেশী দিমু না! তুঁই ছাড়াও আমার আরও ছেলেমেয়ে আছে তাদের পড়াতে হবে না? বাপ হইলে বুঝতি!

আর শোন! ডাটা কেনার কি দরকার? ক্ষেতে ডাটা বুনেছি, বাড়ীতে এসে খেয়ে যা! তোর মা তোর জন্য খালি চিন্তা করে!

ভাল থাকিস! পড়াশোনায় মনযোগ দে! খালি মোবাইল টেপাটেপি করিস না!

ইতি তোর বাবা

পিতাকে পুত্রের প্রতিউত্তরঃ

শ্রদ্ধেয় বাবা,
তুমি আমার টায়ার পাংচার করে দিছো! চিঠিতে কী উল্টাপাল্ট লিখছো? আমি লিখলাম ‘নেটের ডাটার’ কথা আর তুমি আমাকে শোনাইল্যা ‘ডাটা খেয়ে যা’! তুমি বোঝ কিছু? তোমার চিঠি আমার রুমমেট পড়েই সেটা ওর ফেসবুকে দিয়ে দিছে। বন্ধুরা আমাকে এখন সমানে পচাইতেছে! এখন কী করি! নেক্সট টাইমে আমার চিঠির উত্তরে তুমি কিছু লিখবা না! খালি টাকা পাঠাইবা! ঠিকাছে?

আমার বাবা হয়েও তুমি এখনো ক্যামনে ক্ষ্যাত থাকলা? মনে রাখবা, তুমি একজন সেলিব্রেটির বাবা! যত্তসব!

ইতি নাই

পিতার প্রতিউত্তরঃ

স্নেহের পুত্রধন,
একজনের ফেলে দেওয়া ডাটা আর একজন জল থেকে জাল দিয়ে তুলে বাজার বিক্রি করবে, আর সেই পচা ডাটা তুঁই কিনে খাবি? আমার বাড়ীতে এত ডাটা থাকতে তুঁই কিনা মানুষের ফেলে দেওয়া ডাটা খাবি? এটাও আমাকে শুনতে হইলো? সেটা কেনার টাকা দিমু না কইছি বইলা তুঁই আমাকে এমন কইরা গালি দিলি? পারলি?

আর কী কইলি? সেলিব্রেটি? তুঁই কী লেখাপড়া বাদ দিয়ে সিনেমা করা ধরছোস? থাপড়াইয়া তোর কানের পর্দা ফাটাইয়া দিমু! আয় শয়তান, বাড়ী আয়! টাকা পাঠানো বন্ধ!

এই নে তোর মায়ের চিঠি! পড়!

ইতি আমিও নাই

মায়ের চিঠিঃ

স্নেহের সুকান্ত,
পত্রের প্রথমেই আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করিবে। আমরা ঈশ্বরের কৃপায় মঙ্গলমতই আছি! পরসমাচার এই যে, তোমার বাবার কাছে শুনিতে পাইলাম, তুমি নাকি পড়ালেখা বাদ দিয়ে সিনেমা করা ধরছো? ছি! ছি! বাবা! এইটা তুমি কি করিতেছো? তোমার এই কথা শোনার পর থেকে তোমার বাবা শয্যা নিয়েছে। গত দুইদিন ক্ষেতি কাজে যায় নাই! আমিও না খেয়ে আছি! চিন্তায় আমার ভাল লাগে না! কত আশা নিয়ে তোমাকে আমরা খেয়ে, না খেয়ে মানুষ করছি; আর তুমি নাকি শেষকালে নায়ক হইতে গেছো! পাড়ার মানুষ শুনলে তো আমাদের মাথা কাটা যাবে!

আমার কথা মন দিয়ে শোন ছেলে! যদি তুমি এই পথ থেকে না ফেরো তাহলে তোমার পড়ালেখা বন্ধ! আমি তোমার বাবাকে টাকা পাঠাতে নিষেধ করে দিয়েছি! দেখি কত ধানে কত চাল? তোমাকে কে খাওয়ায়! আসো বাড়ীতে; তারপর দেখাচ্ছি মজা!

তোমার ঠাকুমা’র চিঠি পড়!

ভাল থেকো।

ইতি তোমার মা

ঠাকুমার চিঠিঃ

ওই মুখপোড়া,
তুঁই শেষকালে এই করলি? বংশের মান সম্মান তুঁই সব খাবি! মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা কর। দেখবি কত নায়িকা তোর পিছনে ঘুর ঘুর করতেছে!

হ্যাঁরে! কোন নায়িকার সাথে সিনেমা করতেছোস? আমি চিনি? টিভিতে দেখায়? স্টার জলসায় আছে? আমাদের সময়ের নায়িকারা কত সুন্দর ছিল! কত সুন্দর সুন্দর নায়কও ছিল! রাজ্জাক, আলমগীর, শাবানা, ববিতা’রা কত ভাল অভিনয় করতো! সুচিত্রা সেনের কথা কী আর কমুরে ভাই! যদি উত্তম কুমারের মত হইতে পারোস তাইলে মাপ! আর না হইলে ঝাঁটা!

বাড়ীতে আয়! আগে শুনি সব কথা! তারপর টাকা পাঠানোতে ছাড় হবে! তার আগে না! ভাল থাকিস রে ভাই!

আমার হয়েছে যত জ্বালা!

ইতি তোর মুখপুড়ী