ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

এই বঙ্গে মানব হয়ে জন্ম নিয়েছেন অথচ বলবেন, “জীবনেও আমি ঘোল খাইনি?” একথা বলামাত্র আপনাকে আমি দু’কথা শুনিয়ে দেব। বলবেন- কেন? কেন দাদা? বলব, আপনি ঘোল নিজে খাইছেন এবং অবশ্যই অপরকেও খাওয়াইছেন! কিন্তু নিজে এত খাইছেন যে আপনি এখন বোধহীন হয়ে গেছেন। তাই এর স্বাদ বুঝতে পারতেছেন না।

ভাইয়েরা আমার, লাইফের প্রতিটা স্তরে স্তরে আপনি-আমি প্রতিনিয়ত একে অপরকে ঘোল খাওয়াচ্ছি ও খাচ্ছি। এর ডিটেইলসের নমুনাটা শোনেন তবে-
ghol-2
আপনি বড়লোক বাপের পোলা। হাত খরচে বাপের দেওয়া ডেইলি দুইলাখ টাকাতেও আপনার পোষায় না। সেই টাকা আর বাপের ক্ষমতার জোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। জীবনে করছেন অনেক। অনেক মেয়েকেই ডেকে এনে ঘোল খাওয়াছেন! এবারো ভাবলেন- এতই তো করলাম, এবার একটু ধর্ষণও করি। এতে আর কীইবা হবে? পরে না হয় ভয়-টয় দেখিয়ে ঠান্ডা করে দেবানি! আপনার সঙ্গী সাথীরাও ম্যালা সাহস দিলো! বলল, করেন বস, আমরা তো আছি!

ভাবলেন না, নারীর একটা চিৎকারের পাওয়ার কত? মেয়েটাকে থানাতে বসিয়ে রেখে আপনি ও আপনার বন্ধুরা মিলে থানার বড়কর্তার সাথে সেললি উৎসবও করলেন। চামে নির্যাতিতা মেয়েটাকে সেই আঙ্কেলদের দিয়ে দুইদিন ঘুড়ালেনও। তারপরও নাছোড়বান্দা মেয়েটা যখন মামলাটা করেই ফেলল, ঠিক তখনই আপনি বুঝতে পারলেন যে আপনিও ঘোল খেয়েছেন।

আপনি বিরাট সোনার ব্যবসায়ী। দেশের নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে থানা-পুলিশ হয়ে এয়ারপোর্টের কুলিটা পর্যন্ত আপনার কেনা গোলাম। এইজীবনে আপনি ম্যালা ম্যালা মানুষকে ঘোল খাওয়াছেন! তাদের পায়ুপথে সোনা আনিয়েছেন? লোভে পরে পায়ুপথ ভাড়া দেওয়া সেসব গরীবের পোলাগুলো একাজ করতে যেয়ে ধরা খাইলে বলেছেন, “ধরা ওদের দোষে খাইছে, আমার কী?” আর নিজে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে থেকেছেন চামে!

একদিন হঠাৎ করেই শুনলেন, পোলায় একটা রেপ করেছে। ভাবলেন, এ আর এমন কী? একাজ তো আমিও কত করেছি। আর তাছাড়া সোনার ব্যবসায় সোনার ব্যবহার তো হবেই। জীবনে সোনায় তো আর কম খাত দিলাম না? এ আর এমনকি? মিউচুয়াল করে দেবানি। একাজে মুরুব্বিদের কাছ থেকে অভয়ও পেলেন।

যখন দেখলেন মেয়েদুটোই নাছোড়বান্দা। অপরদিকে অনলাইনে দেশ-বিদেশের আনাচে-কানাচে থাকা অচেনা-অজানা; আপনার ভাষায় বান্দরের জাত পোলাপানগুলোকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে দেখলেন, আপনারই মাসোহারা খাওয়া সরকারী লোকগুলো চোখপল্টি দিয়ে ‘ঢেউ গোনার’ দায়িত্ব নিয়েছেন! ঠিক তখই বুঝলেন, এবার আপনিও ঘোল খেয়েছেন! আপনার পায়ুপথ ভাড়া না নিয়েই তারা সমানে তা মেরে যাচ্ছেন।

আপনি চিটার হালিম। বয়স অল্প হলেও চিটারিতে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে এক নম্বর হয়ে গেছেন। এই পেশায় আপনি নতুন ডাইমেনশন নিয়ে এসেছেন। নামকরা বাবার ছেলের ‘নাম ভূমিকায়’ অভিনয় করে অনেক মেয়েকেই ঘোল খাওয়াইছেন। ভেবেছিলেন, এবারও পারবেন! ছোটলোকের পোলা হয়ে বড়লোকের পোলার নাম ভূমিকায় রোল প্লে করার মজাটা কী টের পাচ্ছেন? আপনি কী বুঝতে পারছেন, আপনার আশেপাশে থাকা লোকগুলো যত বেশি বিপদে পড়বে আপনার উপর পড়া বেতের লাঠির ওজন ও গতি তত বাড়বে? ইটটা বেঁধে যখন ঘোরানো হবে ঠিক তখনই আপনিও ঘোল খাওয়ার বিষয়টা টের পাবেন বলে জাতি মনে করছে!

বরিশাল থেকে লঞ্চের দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে আপনি ঢাকায় এসেছেন। সেসময় আপনার মাথাগোঁজার জায়গা দূরে থাক সামান্য টয়লেটটা সারতে হলেও রাত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, লাইন-টাইন করে, ব্যাঙ্ক-বীমা মেরে সর্বপরি অনেক মানুষকে ঘোল খাইয়ে এখন বেশ ভাল আছেন। জীবনে কোনদিন সরকারকে একটাকা ট্যাক্স না দিলেও এলাকায় দানবীর নামে আপনার বেশ নামডাক। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়নের রোল মডেলখ্যাত ‘ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের’ একজন স্বনামধন্য ঠিকাদার হিসেবেও আপনার বেশ প্রভাব। তাই এক কোদাল মাটি না কেটেও কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়াটা আপনার জন্য ডালভাত; আছে রাজনীতিতেও হাত!

সেদিন অনিচ্ছা সত্যেও বাড্ডার একটা এলাকায় আত্মীয়বাড়ীতে নিমন্ত্রণ খেতে গেছেন। ফিরতে যেয়ে দেখলেন বৃষ্টিতে ভাঙ্গা রাস্তাটা ডুবে গেছে। সেটা রাস্তা না নদী তা ঠাওর করা যাচ্ছে না, ফলে গাড়ী নিয়ে যাওয়া যাবে না বুঝতে পেরে সেটা ওই বাড়ীর গ্যারেজে রেখে এক রিক্সাওয়ালাকে ডেকে বললেন, চল যাই!

আপনি রিক্সায় চলছেন আর ভাবছেন, এই রাস্তার জন্য একটা ‘কোটি টাকার প্রোজেক্ট’ বানাতে হবে! আরও কী কী করলে এর ভ্যালু আরও বাড়ানো যাবে সেটা নিয়েও চিন্তা করছিলেন। ঠিক তখনই রিক্সার চাকাটা খোলা ম্যানহোলে পড়ে সেটা উল্টে গেল। আর আহ! আহ! করতে করতেই দুই ঢোঁক সুয়ারেজের জল গিলে ফেলে বুঝলেন, আপনিও ঘোল খেলেন।

এতক্ষণ “এ লীগ অফ এক্সট্রা অর্ডিনারী মানুষদের” ঘোল খাওয়া নিয়ে আলাপ করলাম। যারা অন্যদের ঘোল খাওয়াতে খাওয়াতে হঠাৎ করেই নিজেরাও ঘোল খেয়ে ফেলেছেন।

এবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবো, কিভাবে আমাদের মত আমজনতাও নিয়মিত নিজে ঘোল খাচ্ছেন এবং অপরকেও খাওয়াচ্ছেন-

আপনি হঠাৎ করেই প্রেমে পড়েছেন। প্লেটোনিক লাভ আর কি! ভাললেগে যাওয়া মেয়েটার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তারও নজর পেয়ে গেলেন। তারপর থেকেই আপনার কাছে সবকিছুই রঙ্গিন হয়ে গেছে। যা দেখেন তাই ভাল লাগে! মেয়েটির বাসার আশেপাশে থাকা পড়শীদেরকেও আপন বলে মনে হয়। এমনকি গাছের সবুজ পাতাগুলোকেও লাল-নীল দেখছেন? ভাললাগাটা প্রেমের দিকে যাবে যাবে করছে; ঠিক এমনসময় মেয়েটি তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা নীল খাম বের করে আপনার হাতে দিয়ে বললেন, “এই নিন কার্ড! আমার কাজিনটা আমেরিকায় থাকে। সামনের মাসে আসবে আর তখনই বিয়ে! আসবেন কিন্তু!” ঠিক সেইসময়ই আপনিও বুঝলেন যে ‘ঘোল খাওয়াটা’ আসলে কাহাকে বলে!

আপনি সিটিং বাসে উঠেছেন। একটু এগোনোর পরই কান্ডাক্টর এসে ভাড়াটা নিয়ে গেলো। মহাখালির ফ্লাইওভার ওঠার আগেই হঠাৎ করেই ড্রাইভার বাস থামিয়ে নেমে গেলেন। কন্ডাক্টরও তাকে অনুসরণ করলো। বাসের হেলপার হেঁকে বললেন, “বাস আর যাবে না! নেমে যান!” আপনি বড়জোর কেন? কেন? বলতে পেরেছিলেন। ভাড়া ফেরত চাইতে যেয়ে যখন দেখলেন হেলপারও নাই; ঠিক তখনই বুঝলেন আপনারা বাসের সব প্যাসেঞ্জার মিলেই ঘোল খেয়েছেন।

আপনি প্রতিদিন সন্ধ্যায়, অফিস থেকে ফেরার পথে বাসস্ট্যান্ডের বাজারটায় ঢোকেন। এইসময় মাছের দামটা একটু কম পাওয়া যায় বলে আপনার মনে হয়েছে। মাছ বিক্রেতার জ্যান্ত রুইগুলো ঠিক এইসময়ই মরে যায়, ফলে সাড়ে তিনশোর রুই আপনি নিয়মিত আড়াইশোতেই কিনছেন, আর ‘জেলেমশায়কে ঘোল খাওয়াচ্ছি’- এই ভাবনায় পুলকিত হচ্ছেন। কিন্তু গতকালের মাছটা বাসায় নিতেই বৌদি যখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এইডা কী আনছো? কোনটা ভাল মাছ আর কোনটা পচা মাছ সেটাও চেন না? ছাগল মার্কা পুরুষের ঘর করি আমি!” ঠিক তখনই- আপনিও বুঝলেন, এটাকেই বলে ঘোল খাওয়া!
Ghol-1
আর সত্যিই যদি স্বেচ্ছায় ঘোল খেতে চান, তাহলে যেতে হবে আমাদের গ্রামে। সকালের বাজারে ঘুরতে ঘুরতে সলপের একগ্লাস ঘোল খেয়ে আপনিই চিৎকার করে বলে উঠবেন, আমিও ঘোল খেয়েছি।

কসম সে >>>

১৮/০৫/২০১৭