ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বলা হয় মানব জীবনের প্রতিটা ঘটনার মধ্যেই একটা করে ছোট গল্প থাকে। তেমনি ছোট একটা গল্প আছে আমাদের বাড়ির এই আম গাছটাতেও। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমের সিজনে প্রতিবারই বাড়িতে আসার সময় ঝাঁকা বোঝাই করে আম নিয়ে আসতাম। এর উদ্দেশ্য যেমন ছিল বাড়ির সবাইকে রাজশাহীর আম খাওয়ানো, তেমনি বাড়িতে আঁটি থেকে উন্নত জাতের আমগাছ বোনারও উদ্দেশ্য ছিল।
am
আমার বাবা কলমের গাছে বিশ্বাসী না। তার কথা হলো- না দেখে, না জেনে খারাপ প্রজাতির একটা গাছ বুনে ফেললে পরে পস্তাতে হবে। কারণ একবার বড় হয়ে গেলে সেটা আর কেটে ফেলা যায় না। আর কাটলেও সেই জায়গায় অন্যকোন গাছ হবে না, কারণ সেই জায়গায় তখন পাশের গাছের ছায়া এসে পড়বে। নতুন চারাগাছ আর বড় হবে না। এর প্রমাণও আমাদের এই বাড়িতেই আছে। বাড়ি করার প্রথমদিকে, অনেক বেছে এলাকার একটা নার্সারি থেকে কয়েকটা আমের চারা কিনে এনে বুনেছিলাম। এর মধ্যে একটা আম গাছ বেঁচে আছে কিন্তু সেটার আম এত টক যে রাস্তার পোলাপান সেটা টানা কয়েকমাস ধরে খেয়েও যুৎ করতে পারে না। ফলে এই গাছের নামই হয়ে গেছে ‘টকগাছ’। আবার প্রতিবছর এই গাছে আমও আসে প্রচুর। অথচ এটাকে ল্যাংড়া বা গোপালভোগের চারা জেনে কিনেছিলাম।

নদীভাঙ্গনে আমাদের সোহাগপুরের বাড়িটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর নতুন বাড়িতে তখন একটার পর একটা গাছ বোনা চলছে। অনেক গাছ বোনা হয়ে গেছেও। তাদের মধ্যে কিছু ইতিমধ্যেই বড় হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার ফলও দিতে শুরু করেছে। তেমনি একদিনে আমি রাজশাহীর সাহেব বাজারের আমের আড়ত থেকে খিরসা প্রজাতির বড় বড় আম নিয়ে এলাম। সবচেয়ে বড় আমটাকে দেখেই বাবা বললেন, এটার আঁটিটা বুনে ফেল।

আমের আঁটি বোনায় একটা প্রচলিত আচার আছে। আর সেটা হলো- আম এঁটো করে খেলে সেই আঁটি থেকে গাছ হওয়ার পর যে আম হবে সেগুলো টক হবে। সেই চিন্তা থেকেই সাধারণত না খেয়ে পুড়ো আমটাই চারার জন্য বুনে ফেলা হয়। কিন্তু এই খিরসা আমটা এত বড় ছিল যে, সেটা না খেয়ে বোনায় আমার মন সায় দিলো না। এই পর্যায়ে মা বললেন, ’দে, আমটা আমার কাছে দে! রেখে দেই। ভাল করে পাকলে দুধে গুলে খেয়ে তারপর বুনিস!’ মা’র কথায় সবাই সম্মতি দিলো। তারপর একদিন আমটা দুধে গুলে খেয়ে ফেলার পর পড়ে থাকলো আঁটি। এবার আঁটি থেকে চারা করার জন্য মা একটা খালি দইয়ের পাতিলে মাটি ভড়ে তাতে সেটা রেখে দিলেন। আবার গরু-ছাগলে যেন চারাটা খেয়ে ফেলতে না পারে, সেইজন্য পালিতটাকে রান্না ঘরের চালে তুলে রাখলেন।

বছর দুই পরে। যখন লিকলিকে চারাটা বড় বড় পাতা নিয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, ঠিক সেইসময়- এক বৃষ্টির দিনে আমাদের ঘরের সামনের বাগানে সেটাকে বুনে ফেললাম। আমার মা-বাবাসহ আমার ছোট বোন বিউটিও তাতে হাত লাগালো। কারণ বাগানটা ছিল ওরই।

আজ আরও অনেক গাছের সাথে এই গাছটাও অনেক বড় হয়েছে। অন্যগুলোর মত করে কয়েক বছর ধরে এটা আমও দিচ্ছে প্রচুর। সাইজে ওটার মাতৃবীজের মত বড় না হলেও মিস্টতায় কাছাকাছি আছে। আমার বাবা-মায়ের শুধুই আফসোস, ’বাড়িতে এত এত আম-কাঁঠাল থাকতে, তোরা ঢাকায় কিছুই খেতে পাস না!’

মনে মনে বললাম, ঢাকার বাড়ির মালিকেরা আমাদের উদ্বাস্তু মনে করে; ভাবে আমাদের কিছুই নাই, ফকির!

১৮/০৫/২০১৭