ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ফরহাদ ‘মজহার অপহরণ বিতর্ক’ থেকে আমি দূরে থাকতে চেয়েছিলাম। এর কারণ ছিল দুটো। গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া এই সম্পর্কীয় দেশিয় ট্রেন্ড দেখে- ’এটা সত্যও হতে পারে’ আবার ’মজহার ও তার সমর্থকগোষ্ঠীর সাজানোও হতে পারে’ বলে মনে হয়েছিল। তাই ব্লগ, ফেসবুক আর পত্রিকায় এ সম্পর্কীয় পক্ষ-বিপক্ষ সব খবরই পড়ছিলাম কিন্তু কোথাও আমি নিজের কোন মতামত দেইনি। এমনকি ফেসবুকের কোন পোষ্টে লাইকও দেইনি। বলতে গেলে- আমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ আলাদা থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গত দুইদিনের ঘটনাগুলো জেনে এবং ভিডিওগুলো দেখে আমি এই পোষ্ট লিখতে বসেছি।

মূল বিষয় লেখার আগে আমি আমার নিজের কিছু কথা বলে নিই। আমি খুব ছোটবেলা থেকে পত্রিকা পড়ি। সেটা হতে পারে আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই। প্রথমদিকে সেটা ছিল মূলত ইত্তেফাকের টারজান সিরিজ আর সিনেমার বিজ্ঞাপনের ছবি দেখার জন্য। তারপর আমাদের ‘দেওয়ানজী দাদু’ আর বড়দের কাছ থেকে বানান করে করে পড়তে শিখেছিলাম। আমি এখনো সেই সময়ের টারজান সিরিজের “টারজান ও নাওমী” পর্বের ঘটনাগুলো এক এক করে বলে যেতে পারি। অথচ সেগুলো প্রকাশিত হয়ে থাকবে ১৯৮০-১৯৮২ সালের দিকে। সেই সময়ে আমাদের দেলুয়া বাড়িতে নিয়মিত ইত্তেফাক পত্রিকা রাখা হতো কিন্তু মাঝে মাঝেই হকার বাংলার বানী, ইনকিলাব আর সংবাদ পত্রিকাও দিতো। ইত্তেফাক না দিলে আমি হকার কাকুর সাথে গ্যাঞ্জাম করতাম কারণ সেক্ষেত্রে আমি টারজান সিরিজ মিস করতাম।

যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সে সময়টায় একসাথে দুই-তিন দিনের পত্রিকা দেওয়া হতো আর কার আগে কে কোনটা পড়বে সেটা নিয়ে আমাদের গদি ঘরে কাড়াকাড়ি লেগে যেত! আমার লোভ ছিল ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠার উপর কারণ ওটাতেই ছিল টারজান সিরিজ। ফলে ওই পেজ নিতে আমি বড়দের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। এমনকি হকার আসার সময়টা যেহেতু আমার জানা ছিল, তাই সেই সময়টায় আমি বাড়ির প্রবেশ পথের দিকে চেয়ে টরে টরে থাকতাম। আমার পত্রিকা পড়ার এই নেশা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আজ পর্যন্ত একই আছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে যখন সবাই দুপুরে খেয়ে ঘুমাতে যেত, ঠিক সেই সময়টায় আমি হলের লাইব্রেরিতে যেয়ে সেখানে থাকা সব পত্রিকা গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম।

আমার এই কথাগুলো বলার কারণটা হলো- ফরহাদ মজহারের লেখা আমি সেই সময় থেকেই পড়ছি। এক এক পত্রিকায় এক এক সময় তার ভিন্ন ধরনের লেখাগুলো পড়ে আমি রীতিমত বিভ্রান্ত হতাম। এক পত্রিকায় সে কার্লমার্স্কের কথা তথা কম্যুনিস্ট আদর্শের কথা বলতো, আবার ইনকিলাব- নয়া দিগন্তে ‘আরব থেকে বাংলামূলকে আসা দখলকারীদের বীরত্ব’ ইনিয়ে বিনিয়ে প্রচার করত। যখন বুঝতে পারলাম তার আসল মতলব। ঠিক তখন থেকেই তার লেখাপড়া বাদ দিলাম। বলতে গেলে আমি গত কয় বছরে তার একটা লেখাও পড়িনি। কারণ একটাই, সেগুলো পড়ে নিজের হাতে থাকা সময়ের অপচয় করতে চাইনি। ওনার লেখার চেয়েও অনেক ভাল লেখা আমার সামনে ছিল এবং আছে!

এতদিন তার লেখা পড়ে তাকে ’একজন বিভ্রান্ত মানুষ’ বলে মনে হলেও।  বিডিনিউজে প্রকাশিত “অর্চনা-ফরহাদে দিশা খুঁজছে পুলিশ” লেখাটা পড়ে ও ভিডিওগুলো দেখে জনাব মজহারকে একটা ‘ফাতরা প্রজাতির মানুষ’ বলে মনে হয়েছে। একই সাথে নিজেকে তিনি ’ইতর বাঙালির মুখোচ্ছবি’ হিসেবে ব্রান্ডিং করেছেন।

গত ৩ জুলাই সকালে নিখোঁজ হওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর নাটকীয়ভাবে যশোরে বাস থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করে র‌্যাব-পুলিশ। পরদিন ঢাকায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তাকে অপহরণ করে খুলনায় নেওয়া হয়েছিল।

আধুনিক বিপণনের ভাষায়, জনাব ফরহাদ মজহারকে অবলীলায় ইতর বাঙালির ‘ব্রান্ড এম্বাসেডর’ বলা যায়। গরীব দুঃখী একটা মেয়েকে যদি সে ফুসলিয়ে ভোগ করে থাকে এবং সে যদি সত্যিই ‘অপহরণের নাটক’ করে থাকে, তাহলে আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। দেশে-বিদেশে, জনমনে সে যে বিভ্রান্তি তৈরী করেছে, সেটার জন্য না হোক, অন্তত একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার জন্য তার যেন শাস্তি হয়!

যা বলেছেন অর্চনা-

নিজেকে বাউলভক্ত ফরহাদ মজহারের ‘ভক্ত’ ও ‘সেবাদাসী’ দাবি করে তাকে ‘গুরুদেব’ সম্বোধন করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন অর্চনা।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তার বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া। বাবা শংকর কুমার মিত্রের সঙ্গে ঝগড়ার কারণে তিনি ২০০৫ সালের শেষ দিকে মামার বাড়ি চলে যান। ২০০৬-০৭ সালের মাঝামাঝি ফরহাদ মজহারের এনজিও উবিনীগে যোগ দেন। উবিনীগের কক্সবাজার শাখায় থাকার সময় ফরহাদ মজহারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল।এরপর ফরহাদ মজহারের কাছে ‘ফকির ও বৈষ্ণব আদর্শে’ দীক্ষা নেওয়ার পর তার ‘সেবাদাসী’ হন বলে এই নারী জানান। ঈশ্বরদীতে থাকার সময়ে ফরহাদ মজহারের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে দাবি করেন এই নারী।তিনি বলেন, ২০০৯ সালে সেই সম্পর্ক ফরিদা আখতার জেনে ফেলার পর তাকে উবিনীগ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তবে ফরহাদ মজহার তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ও টাকা দিয়ে সহায়তা করতেন। এই নারী জবানবন্দিতে বলেন, “একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার পর প্রায় দুই বছর আগে তিনি অন্তঃস্বত্বা হলে ফরহাদ মজহারের টাকায় তিনি মালিবাগের একটি ক্লিনিকে গর্ভপাত করিয়েছিলেন। সেখানে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা ফরহাদ মজহার করেছিলেন। ”আবার ‘গর্ভবতী’ হলে গত এপ্রিল মাসে তিনি ফরহাদ মজহারের কাছে টাকা চেয়েছিলেন জানিয়ে অর্চনা বলেছেন, তার কাছে টাকা না থাকায় ‘চিন্তিত ছিলেন ফরহাদ মজহার’।

একই সাথে বাম আদর্শ-ধর্মীয় জিগির আর তলে তলে নারী ভোগকারীদের কোনভাবেই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়! এরা একই সাথে দেশ, সমাজ, ধর্ম আর মানবতার কীট। তাই কোন মাপ নাই!

সে যেমন অর্চনা নামের মেয়েটার ক্ষতি করেছে; তেমনি ক্ষতি করেছে নিজ সমাজ ও ধর্মের! তাই একে ‘কঠোরভাবে চেপা’ দেওয়া উচিত!

১৩/০৬/২০১৭