ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

মাঝে মাঝে বিপদের সময়েও মজা করতে হয়। যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রদ্ধেয় এম আক্তার মুকুল, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে যুদ্ধের নিত্যকার তথ্যে নিয়ে ‘চরম পত্র’ নামের একটা রম্য পাঠ করতেন। এটা করে তিনি মৃত্যুর মুখে থাকা বাঙালি আর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতেন। ঠিক একইভাবে প্রতিটা সেনাদলেই একটা করে বাধ্যযন্ত্র দল থাকে। টাইটানিক ছবিতে আমরা দেখেছি- জাহাজটা যখন ডুবছিল তখনও সেই জাহাজে থাকা বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা নিজেরা মারা যাচ্ছে জেনেও সুরে-সুরে জাহাজ ডোবার করুণ পরিণতি উদযাপন করছিলেন।

এছাড়াও কয়েকবছর আগে আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী তার নির্বাচনী বক্তৃতায় বলেছিলেন, “যখন ধর্ষণকে ঠেকাতে পারবে না বলে মনে করবে, ঠিক তখনই সেটাকে উপভোগ করবে!” এই কথা বলার পর- জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ওনার মন্ডুপাত করেছিল। ওই মন্ডুপাতের দলে আমিও ছিলাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই বঙ্গদেশে বসবাস করে বুঝেছি- উনি আসলে একটা বিশাল ‘মোটিভেশনের কথা’ বলেছিলেন! অন্তত আমাদের মত আমজনতার জন্য তা ছিল পারফেক্ট! আসলেই তো ধর্ষণ যখন ঘটবেই তখন তো তা উপভোগই করা উচিত! ধর্ষিতার শুধু শুধু কান্নাকাটি বা মন খারাপ করে থাকার দরকারটা কী? বরঞ্চ উপভোগ করে বেঁচে থাকলে, কোন না কোনদিন- ধর্ষকের উথিত লিঙ্গে ব্লেড চালানোর একটা সুযোগ পাওয়া গেলেও যেতে পারে! সেই সাথে ‘প্রতিশোধ আর উপভোগ’ একই সাথেও হতে পারবে!

ঘুষ, দুর্নীতি, ধর্মীয় বিদ্বেষ, লুটপাট, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, খাদ্যে ভেজাল-বিষ, যান-জলজট, কাঁদা-সুয়ারেজ, রোগে-শোকের হাতে ধর্ষণ হতে হতে একসময় মেনে নেওয়া একটা জাতির জন্য চিকনগুনিয়া একটা নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। আর সেই বার্তাটা হচ্ছে- “আরও উপভোগ কর!” আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা, মেয়ররাও তাতে উৎসাহ দিচ্ছেন। আর সবাই যেহেতু এত এত করে উপভোগের বার্তা দিচ্ছেন, তখন আমি আর বাদ থাকবো কেন? আসুন আমিও আপনাদের উৎসাহ দেই। দেখাই চিকনগুনিয়া এই বঙ্গদেশে কী কী উপকার নিয়ে এসেছেন-

সমতাঃ

এডিস মশা একটা জাতীয় বীর; কিউটের ডিব্বা! তিনি আমাদের জাতীয় জীবনে এক আশ্চর্যজনক সমতা নিয়ে এসেছেন। এই যেমন-

১) ব্লগার থেকে পুরোহিত সাহেব, মেয়রের মা থেকে কাজের বুয়া, শিল্পপতি থেকে চাকুরে, ফ্ল্যাট মালকিন থেকে ভাড়াটিয়া, নারী থেকে পুরুষ, বৃদ্ধ থেকে শিশু, দেশপ্রেমিক থেকে দেশবিদ্বেষী, ধার্মিক থেকে অধার্মিক, নির্যাতনকারী থেকে নির্যাতিতা- সবাইকেই এক লাইনে দাঁড় করিয়ে উনি চিকনগুনিয়া দান করছেন। পায়ের নিচে চাপা পরে এখনো একজনেরও মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায় নাই। সুন্দর ডিসিপ্লিনে কাজটা করছেন উনি।

২) জ্বরে-ব্যাথায় ভুগে আমাদের মত একটা শ্রেণী, যারা ভাবতো “মুই কী হনুরে!” তারা অন্ততঃ বুঝতে পারছে- “এই জীবনটাকে নিয়ে তুমি যা ভেবেছো সেটা তা না! গাড়ী-বাড়ী, এসি, বিএমডবলু, সুইসে ব্যাংক ব্যালেস থাকা সত্যেও তুমি ও তোমার পরিবার নিরাপদ না! যখন-তখন তুমিও দেখে ফেলবে জীবনের কালো রঙ!” আমাদের স্টার শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়, ওরফে ইমরানের শ্বশুর, ওরফে আমাদের তালই সাহেব যে শিক্ষা দান করতে পারেননি, আমাদের নতুন হিরো এডিসজী তা দিয়েছেন।

৩) শরীরের প্রতিটা বাঁকে-বাঁকে, মোচড়ে-মোচড়ে, গিরায়-গিরায় ব্যথায় কুকাতে কুকাতে যখন কেউ বলে ওঠে “উঃ মা!” তখন এই ডাক একই সাথে মায়ের প্রতি তার ভালবাসাটাকে আরও পোক্ত করে! মাসে একবারও মায়ের খোঁজ না নেওয়া সন্তানের কাছ থেকে বার বার ‘মা’ ডাক শুনে আমাদের মা জননীরাও খুশি হচ্ছেন!

৪) ফেসবুকে যারা সারাদিন বিদ্বেষ খুঁজে বেড়াতো আর নিজেরা তাতে ধোঁয়া দিতো। ৫৭ ধারা যাদেরকে থামানো দুরে থাক সামান্য কাছে যেতেও লজ্জা পেত। তারাও এখন সেসব ভুলে গিয়ে ‘মাগো’, ‘ওহ মা’ শব্দে চিকনগুনিয়ার সংবাদ পরিবেশন করছেন। জাতির জন্য এটা একটা বিরাট পাওয়া। রাস্ট্র যখন ব্যর্থ তখন আমাদের মহান ত্রাতা এডিস সাহেব এই অসাধ্য সাধন করেছেন।

৫) ফেসবুকে চিকনগুনিয়ার ভুয়া স্ট্যাটাস দিয়ে ‘লাইক-কমেন্টস’ কামানোর একটা নতুন ধান্দার ব্যবস্থা করে দিয়েছে মহামতি এডিস!

একটা গল্পঃ মাদারস অফ অল চিকনগুনিয়া

চিকিৎসা নিতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের চার্টারড বিমানে চড়ে তিন কাক্কী আর এক কাক্কু কুকাতে কুকাতে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন। ওভার লোডেড বিমানটাতে ওনাদের সাথে যাচ্ছে দেশের চাটুকার আর লুটেরা দলের অল্পকিছু ভাগ্যবানও। চাটুকাররা এখানেও তেল মারার লোভ ছাড়তে চাচ্ছে না। তাদের ম্যাডাম-স্যারদের মত শরীরের প্রতিটা কম্পাউন্ডে ব্যথা না থাকা সত্যেও তারাও সমানে কুকাচ্ছে।

একটা বিষয় এখানে না বললেই নয়, উক্ত চারজনের মধ্যে সর্ববিষয়ে তীব্র মতবিরোধ থাকলেও, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে সর্বদা ঐক্যমত্য দেখা যায়। পাশাপাশি তাঁদের সবাই দেশীয় ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে ভয় পান। এর কারণ হলো- যদি দেশীয় ডাক্তারগণ ভুল চিকিৎসা দেয়? তাহলে তো তাদের এত এত আরামের জীবন, আমজনতাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানোর ‘মজা’ শেষ হয়ে যাবে? এছাড়াও জীবনের উচ্চস্তরে পৌঁছে যাওয়ার পর, কোনদিন কি তাঁরা দেশের ডাক্তার দেখিয়েছেন? তাহলে কি কুক্ষণে এই ভয়াবহ ব্যাথার রোগে এদের কাছে নিজেদেরকে সপে দিবেন? যদি ওরা ভুল চিকিৎসা দেয়?

যেই ভাবা সেই কাজ, লাটবহর নিয়ে ফার্স্ট ক্লাসের সীটে বসে-শুয়ে ওনারা সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন। দেশের বিমানে মশা আর নোংরা দেখে ওনারা সেই যান অনেক আগেই পরিত্যাগ করেছেন। আফটার অল, ওনারা হলেন আপার ক্লাসের মানুষ!

সীটে বসে ওনারা কুকাচ্ছে দেখে বিমানবালারা তাদের কর্তব্যজ্ঞানে একযোগে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হইছে ম্যাডাম? কী হইছে স্যার? উত্তরে চারজনের তিনজনই একযোগে বললেন, কিচ্ছু না! চতুর্থজন বললেন, কুছ নেহী হুয়ী! কারণ তাঁরা জানেন, আসল কথা বললে- সিঙ্গাপুরে তাদের ঢুকতে দেওয়া হবে না! কিন্তু এক তেলবাজ এই সুযোগেও তেল দেওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলো না, বলে ফেলবো- ‘চিকনগুনিয়া আফা’! সাথে সাথেই বিমানের ক্রুদের মধ্যে হুলস্থূল বেঁধে গেল। বিমানের ক্যাপ্টেন তাদের গ্রাউন্ড স্টেশন ম্যাসেজ পাঠাল, তাদের ফ্লাইটে ‘এক ঝাঁক চিকনগুনিয়া’ আছে!

তারপর আর কী? সিঙ্গাপুরের স্টেশন থেকে ফিরতি মেসেজ এলো, “কোনভাবেই চিকনগুনিয়ার ঝাঁককে আমাদের দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না! ইমার্জেন্সী দরজা খুলে এখনই ওদের বের করে দাও। আর তা না পারলে- নিজে সহ বঙ্গোপ্রসাগরে একটা নোজড্রাইভ মারো! তোমাদের পরিবারের সবদায়িত্ব সিঙ্গাপুরের সরকার নিচ্ছে। প্রিয় বীরেরা, চিকনগুনিয়ার হাত থেকে তোমাদের মাতৃভূমি আর জনগণকে বাঁচাও!”

তারপর হঠাৎ করেই মাদারদের সাথে সাথে বঙ্গদেশ থেকেও সব চিকনগুনিয়া নাই হয়ে গেল! তাতে করে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত জনগণ ‘এক অজানা’ আরাম পেল! পাশাপাশি মুফতে পাওয়া সময়টাকেও তারা উপভোগ করতে থাকলো!

২৪/০৭/২০১৭