ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

“মনের মধ্যে যা ফাল দিয়ে ওঠে তা!”- এটা একটা গ্রাম্য প্রবাদ। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের একটা পর্যায়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতির লেখা কিছু কথা নিয়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ফালাফালি দেখে সেই প্রবাদটাই প্রথমে মনে পড়লো।

আসুন দেখে নেওয়া যাক- কী বলা হয়েছে সেই রায়ে, যার কারণে আমাদের ক্ষমতাশালীরা এত লম্ফঝম্প দিচ্ছেন?

মোট ৭৯৯ পৃষ্ঠার এই রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি বলেছেন

১) ‘এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি, যেখানে ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখে না, কিন্তু খারাপ লোকেরা আরও লুটপাটের জন্য বেপরোয়া।’ তিনি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোনো নজরদারি বা তদারককারী প্রতিষ্ঠান নেই। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষারও ব্যবস্থা নেই। নির্বাহী দাম্ভিক নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় আমলাতন্ত্র কখনোই দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট হবে না।’

আমার কথাঃ মাননীয় প্রধান বিচারপতি মারাত্মক সত্য কথা বলেছেন! এই তো সেদিন, বরগুনার ইউএনও সালমান সাহেবকে ’৫৭ ধারা’ নামক এক অনুভূতির মামলায় জেল খাটানো হলো, হাতে হ্যান্ডকাফও পড়ানো হলো। পরে জানা গেল- তিনি আওয়ামীলীগের এক বড় নেতার ছেলেকে পরীক্ষায় নকলের দায়ে বহিষ্কার করেছিলেন এবং সেই ছেলে ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে খারাপ আচরণের করলে তাকে জেলেও পুড়েছিলেন। আর তারই কারণে, প্রতিশোধ হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুকে’ ব্যবহার করে ওনাকে ঘাই দেওয়া হলো। আর এতে জড়িত হয়ে আগুনে ধোঁয়া দিলেন, দুই ডিসি ও এক জজ সাহেব! কই আসল লোকের তো টিকিটিও দেখা গেল না? উল্টো ডিসি সাহবেরা ট্র্যান্সফার হলেন। পঙ্গু সাংবাদিক, প্রবীর শিকদারসহ আরও আরও অনেকের কথা নাইবা বললাম।

২) সামরিক শাসনামলের সমালোচনা করে রায়ে বলা হয়, ‘ক্ষমতালোভীরা দুবার আমাদের রাষ্ট্রকে “ব্যানানা রিপাবলিকে” পরিণত করেছিল, যেখানে ক্ষমতালোভীরা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জনগণকে পণ্যরূপে দেখেছে, ধোঁকা দিয়েছে। তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি, অপব্যবহার করেছে। তারা নানা রকম ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়েছে। কখনো ভোটের নামে, কখনো জোরপূর্বক নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো নির্বাচন না করে। এর সবটাই করা হয়েছে তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে। আর এর মধ্য দিয়েই সুস্থ ধারার রাজনীতি পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এসব অগণতান্ত্রিক শাসনামলের নোংরা রাজনীতির চর্চা আমাদের সার্বিক জনরাজনীতিকে মারাত্মক ক্ষতি করেছে।’

আমার কথাঃ আরে এটা তো আরও সত্য কথা। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জিয়া, একদিকে ধর্মের কার্ড খেললেন আর অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসারকে বিনা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিলেন! আবার আমাদের প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব, দেশে একদিকে যেমন রাষ্ট্রধর্ম আমদানী করলেন, তেমনি অপরদিকে তলে তলে সচিবের বউ থেকে শুরুর করে আরও অনেক অনেক সুন্দরী নারী ভোগের আলাদা ব্রাঞ্চও খুলে ফেললেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাঁ/না ভোট দেখিনি, কিন্তু এরশাদেরটা দেখেছি। সকাল নয়টার মধ্যেই ১০০% ‘হাঁ’ ভোট বাক্সে ঢোকানোটা তো নিজের চোখের সামনে ঘটলো। সেদিন ছোট থাকলে কী হবে, আমার স্মৃতি এসবে মারাত্মক কাজ করে। লোহার পাত দিয়ে চেপে চেপে গণ সীল মারা ব্যালটগুলো বাক্সে ঢোকানোরত ‘আদিল ও আসলাম ভাইয়ের’ ছবিটা এখনো চোখে ভাসে। ঘটনা আমাদের প্রাইমারি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে। আর স্কুলের নামঃ “১নং চক সোহাগপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়” যদিও সেই স্কুল নদীতে ভেঙ্গে গেছে। এখন সেটা আছে অন্য এলাকায়।

৩) এখন রাজনীতি মুক্ত নয়। এটি বাণিজ্যিক বিষয়। আর অর্থ রাজনীতি পরিচালনা করে। আর সেটিই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়। এখন মেধা নয়, ক্ষমতাই সব জনপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী।

আমার কথাঃ এটা আর বলতে! আমাদের এলাকায় এখন রাজনৈতিক পরিবারের উদ্ভব হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাসেও ‘যার’ ঢাকার বাসা ভাড়া আমি ক্রেডিট কার্ড থেকে দিয়েছি, যেদিন মন্ত্রী হন- সেদিনও যার নাতির খেলনা কেনার টাকা ‘শর্ট পড়লে’ বসুন্ধরা সিটির অফিস থেকে নেমে এসে আমি দিয়েছি, যে বন্ধুর ছেলের ডেলিভারির টাকা দিয়েছে আমার অন্য বন্ধুরা। এ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া দিয়েছে অন্য এক বন্ধু। যাকে সাহায্য করতে নিজে দেড় লক্ষটাকা’ ব্যাংক লোন করে হাওলাত দিয়েছি। তারাই এখন শত কোটি টাকার মালিক। আর আমাদের সেই ধারের টাকার একটা টাকাও কেউ ফেরত পাইনি! এই হলো অবস্থা! নিজে না খেয়ে সেই ব্যাংকের লোন সুদে-আসলে আমি বেতনের টাকা দিয়ে পরিশোধ করেছি। অনেক বিপদের সময়ও সেই টাকা ফেরত চেয়ে পাইনি। অথচ তাদের এখন কত কিছু গাড়ী-বাড়ী-ব্যবসা-টেণ্ডার-বিদেশ ভ্রমণ সহ আরও কত কিছু! গত ৫-৭ বছর ধরে আমাদের ফোনও ধরে না! অথচ আমরা নাকি ছিলাম ছোটবেলার বন্ধু; অনেকটাই পারিবারিক সম্পর্ক বাবার আমল থেকে!

৪) পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি তাঁর হতাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধের স্পৃহার মাধ্যমে আমরা সামরিক শাসনের থাবা থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু পরাজিত হয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্রে। এমনকি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা আমাদের একটি জনপ্রতিষ্ঠানকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। কোথাও আমাদের ভারসাম্য নেই। তদারককারী নেই। আর এ কারণেই সুবিধাভোগীরা ক্ষমতার অপব্যবহারে উৎসাহিত হন এবং যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের ধৃষ্টতা দেখান। রাষ্ট্রক্ষমতার যা রাজনৈতিক ক্ষমতার আরেক রূপ, সাম্প্রতিক সময়ে তা গুটিকয়েক মানুষের একচ্ছত্র বিষয়ে পরিণত করেছে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণের আত্মঘাতী প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার লিপ্সা মহামারির মতো, যা একবার ধরলে তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দ্বার্থ্যহীন কণ্ঠে বলতে চাই, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, কোনো ক্ষমতাধর দৈত্যের জন্য নয়।’

আমার কথাঃ এটাও চরম সত্য। বেশী কিছু লেখার দরকার নেই। গত বছর এদেশ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। সোনালী, বেসিক, জনতা, আগ্রনী ব্যাংক লুট হয়েছে। শেয়ার বাজার লুটেরা আজ ক্ষমতার মাথায় অবস্থান করেছে। অল্প কথায় প্রধান বিচারপতি আর কীভাবে বলবে? আজ হানিফ সাহেবরা হিন্দুদের জমি দখল করে চিংড়ী ঘের বানায়। পুলিশ সাঁওতালদের ঘরে প্রকাশ্যে আগুন দেয়। পাহাড়ের গ্রামগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কই এসব অপরাধের বিচার? কোথায় প্রশাসন?

৫) প্রধান বিচারপতি তাঁর বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে কথা বলেন। তিনি মত দেন, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে না হতে পারলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হয় না।

আমার কথাঃ এ বিষয়ে কী আর বলবো। এই সংসদ নির্বাচন তো নিজ চোখে দেখিছি, তাই বেশী কিছু বলতে চাই না। তবে ভোটের দিন দুপুরে মেয়েকে নিয়ে বাজার করার ছলে, ঘুরতে ঘুরতে একটা ভোটকেন্দ্রের সামনের রাস্তায়- মোবাইল দিয়ে পোস্টারের ছবি তুলে ফেলায় পুলিশের প্যাদানী খেয়েছিলাম প্রায়! ভাইরে, সেকী হম্মিতম্মি পুলিশের? মনে হইছিল- কেন্দ্রে ভোটার না আসার সব দায় যেন আমারই ছিল!

৬) প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা। আর প্রযুক্তির উন্নতির সহায়তা নিয়ে অপরাধের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ভীষণ রকম ক্ষতিগ্রস্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম নয়। এমন পরিস্থিতে নির্বাহী বিভাগ আরও অসহিষ্ণু ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আর আমলাতন্ত্র দক্ষতা অর্জনে চেষ্টাহীন।’

আমার কথাঃ কী আর বলবো? দেখছি তো সবই। সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাহীনদের বাড়িঘরে যখন সরকারী আমলা-পুলিশ মিলে আগুন দেয়, গুলি করে সাঁওতালদের মেরে ফেলে। পরীক্ষার তারিখের দাবী করতে এসে যখন সিদ্দিকুররা চোখ হারায়। প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে মারলেও যখন খুনিরা ছাত্রলীগ করার কারণে খালাস পায়, পুলিশ-ডাক্তার মিথ্যা কথা লিখে দেয়। তখন আর আমাদের বেশী কিছু জানতে মন চায় না!

৭) প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এই সীমাহীন চ্যালেঞ্জের মুখে বিচার বিভাগই তুলনামূলকভাবে স্বাধীন অঙ্গ হিসেবে কাজ করছে, ডুবতে ডুবতে নাক উঁচিয়ে বেঁচে থাকার মতো। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগও খুব বেশি দিন টিকে থাকবে না। এখন পর্যন্ত উচ্চ আদালতের বিচারকদের নির্বাচন ও নিয়োগের কোনো আইন হলো না। নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা সংকুচিত করতে আগ্রহী। আর যদি তা হয় তাহলে এর চেয়ে ধ্বংসাত্মক আর কিছু হবে না।

আমার কথাঃ এটা উনিই ভাল বলতে পারবেন। আমরা শুধু দেখি- একজন বিচারক অন্যের প্রভাবে, এখতিয়ার না থাকা সত্যেও একজন উইএনওকে ভুয়া মামলায় জেলে পাঠায়।

আর কিছু লেখার নেই! আমি এতি ক্ষুদ্র মানুষ যে, এত বড় বিষয় নিয়ে লেখার সাহস রাখি না! তবুও মনের কিছু কথা বলে রাখলাম। তবে এটুকু বলবো, মাননীয় প্রধান বিচারপতি রায়ে যা বলেছেন, তা আমার মনের কথাই বলেছেন!

খবরের লিংক।

১০/০৮/২০১৭