ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

1459

স্মৃতি শুধু মেঘলা মৃদু, আজো খুঁজে হারানো সুর…

আজো বুকে আঁচর কাঁটে, সাদা কালোয় সুচিত্রা সেন। 

সুচিত্রা সেন। মহানায়িকা, কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক সময়ের একচ্ছত্র অধীশ্বরী সুচিত্রা সেন। আজ ১৭ জানুয়ারি, তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবস। পর্দা জুড়ে তাঁর অপরূপ মুখশ্রীর স্বর্গীয় দ্যুতি। তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্ব, স্বকীয়তা, সম্ভ্রম আর আভিজাত্যের বিস্ফারে সম্মোহিত দর্শক। দুই চোখই বলে দেয় কে তিনি? সুচিত্রা সেন (৬ এপ্রিল, ১৯৩১ – ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪) একজন ভারতীয় অভিনেত্রী ছিলেন। তাঁর জন্মগত নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত

তিনি মূলত বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।  আবার সেই বিশাল খ্যাতি, বৈভব, পাদপ্রদীপের আলো থেকে চিরতরে নিজেকে সরিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অন্তরালবর্তিনী হয়েছেন সুচিত্রা সেন। হয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদা অনুরাগিনী। একটা সময় তো বহুবার গিয়েছেন বেলুড়ের মঠে। বহু উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন মহানায়িকা। তাঁর নিজের জীবন সে-ও এক উপন্যাস বটে। গত ১৭ জানুয়ারি মহানায়িকার প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হল। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিকথনে কলম ধরেছি আজ। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল তাঁর জন্ম অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। ভারত ভাগের সময় এ পার বাংলায় সপরিবার চলে যান ভারতে। সে দিনের কিশোর মেয়েটি রমা দাশগুপ্ত। হ্যাঁ, তখন তিনি এই নামেই পরিচিত ছিলেন। তার পর ১৯৪৭ সালে বিবাহ তৎকালীন ধনী শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। বিবাহের কয়েক বছর পর স্বামী দিবানাথ সেনের আগ্রহেই সিনেমার নায়িকা হওয়া এবং সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠা। সুচিত্রা সেনের প্রথম সিনেমা ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’, যেটি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে ‘সাত নম্ব কয়েদি’ সিনেমার তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। সেই বছরই বিশাল হিট ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, যে ছায়াছবিতে সুচিত্রা-উত্তম জুটির দেখা পায় দর্শক। ১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু এবং ১৯৭৮ সালে শেষ চলচ্চিত্র ‘প্রণয় পাশা’। পঁচিশ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন বাংলা হিন্দি মিলিয়ে ষাটটি ছবিতে যার মধ্যে তিরিশটি সিনেমায় তাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন উত্তমকুমার। বাস্তবিক সুচিত্রা-উত্তমের জুটি বাংলা সিনেমার সর্বকালের সেরা জুটি। যেন একে অপরের জন্যই তৈরি হয়েছিলেন। সুচিত্রা-উত্তমের এই রোমান্টিক জুটির বিকল্প আর পাইনি আমরা। অগ্নিপরীক্ষা, হারানো সুর, সপ্তপদী, পথে হল দেরি, কমললতা, ইন্দ্রাণী, সবার উপরে, জীবন তৃষ্ণা, সদানন্দের মেলা, সূর্যতোরণ, শাপমোচন, চাওয়া পাওয়া, একটি রাত, ত্রিযামা, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, বিপাশা, হার মানা হার, আলো আমার আলো প্রভৃতি সিনেমা সুচিত্রা-উত্তমের সার্থক জুটির ফসল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকের এই সব সিনেমা আজও জনপ্রিয়তা হারায়নি। যখন কোনও শিল্পী মানুষের মনের গভীরতম জায়গাটা স্পর্শ করতে পারেন, তখনই তিনি সার্থক। সুচিত্রা সেন এমনই শিল্পী ছিলেন, আমরা সাধারণ মানুষ মুগ্ধ দর্শক তাঁর মায়াবী জাদুর ছোঁয়ায় বিমোহিত হই বারবার। গ্ল্যামারে ধুয়ে যেত তাঁর গোটা শরীর, ব্যক্তিত্ব।

১৯৬৩ সালে এই সিনেমার জন্য তিনি মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট অ্যাকট্রেস পুরস্কার লাভ করেন। ভারতীয় অভিনেত্রীদের মধ্যে সুচিত্রা সেনই প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন। সুচিত্রা সেন আমাদের চিরকালের নায়িকা। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে।শোনা যায়, ২০০৫ সালে তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল; কিন্তু সুচিত্রা সেন জনসমক্ষে আসতে চান না বলে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন নি। ২০১২ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গবিভূষণ প্রদান করা হয়। ১৯৭৮ সালে প্রণয় পাশায় অভিনয়ের পর ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে নিয়ে যান। নায়িকার ভূমিকাতেই আমরা তাঁকে দেখেছি। এর পর আর কখনও তিনি স্বেচ্ছায় জনসমক্ষে আসেননি। এ যেন এক রকম সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করা। একই জীবনে বিপুল খ্যাতি এবং সে খ্যাতি হেলায় ত্যাগ করে নির্জনবাস এমন মানুষ বিরল। তাই সুচিত্রা সেন অসাধারণ কী নায়িকার ভূমিকায়, কী জীবন দর্শনে। কার সঙ্গে তাঁর তুলনা করব?