ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

হেরেশিম লেবেডফ নামে যে রুশ বনিক ১৭৯৫ খ্রীষ্টাব্দে দু’টি ইংরেজী নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে তিনদিক বন্ধ একদিক খোলা মঞ্চ ব্যবহারের প্রথা শুরু করেন, বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ১৯৮৯ সালে এসে এই মঞ্চের ব্যবহার পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হলেও এর মূল ধারাটির কোন পরিবর্তন হয়নি। সিলেটের নাট্যচর্চায় মঞ্চ ও আলোবিন্যাস সহ অন্যান্য বিষয়ে কলকাতার নাট্যচর্চার এক বিরাট সঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। অবিভক্ত ভারতের নাট্য আন্দোলনের পীঠস্থান কলকাতার সঙ্গে এই সঙ্গতি রক্ষা করার জন্য যাঁরা কাজ করেছেন সিলেটবাসী আজও তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। এছাড়াও সিলেটের ঢাকা দক্ষিণের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেব ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে নবদ্বীপে অনুষ্ঠিত ‘কৃষ্ণলীলা’-য় নিজে অভিনয় করেন। যদিও হেরেশিম লেবেডফ দ্বারা ব্যবহৃত মঞ্চের প্রচলন তখন ছিল না।

সিলেটের মঞ্চে আধুনিক মঞ্চ স্থাপত্যের ব্যবহার শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কুমার বাহাদুর গোপীকা রমণ রায়-এঁর মাধ্যমে। তাঁর পূর্বে আর কেউ আধুনিক নাট্যমঞ্চের ব্যবহারের প্রথা চালু করেছেন বলে জানা নেই। এই নাট্য পাগল মানুষটি ছিলেন তৎকালীন নাট্যজগতের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

কলকাতার ষ্টার থিয়েটারের সাহায্যে কুমার বাহাদুর গোপীকা রমণ রায় তাঁদের বাড়ীর নাঠ্যমঞ্চে সবধরনের মঞ্চ স্থাপত্য সামগ্রী এবং আলোকসজ্জা ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৫০ সাল থেকে পর্যন্ত কুমার বাহাদুর দ্বারা পরিচালিত নাটকে এই সকল মঞ্চ সামগ্রী ব্যবহৃত হয়। সেই সময়ে বাস্তব দৃশ্য দেখাবার প্রয়োজনবোধে ঘোড়ায় চড়া, পুকুরে নৌকা চালানো বা সাঁতার কাটা ইত্যাদি দৃশ্য মঞ্চে দেখানো হত। কুমার বাহাদুর এমন নাটক-পাগল লোক ছিলেন যে, বর্তমানে বন্দর বাজারস্থ রাজা গিরীশ চন্দ্র হই স্কুলের পিছনে লালাদিঘীর উপর মঞ্চ নির্মাণ করে একটি নৌকা চালানো দৃশ্য দেখান। এইসব কৌশলগত প্রয়োগ কুমার বাহাদুর দ্বারা পরিচালিত নাটকে বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত হয়। একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, সিলেটের মঞ্চ নাটকে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি কুমার বাহাদুর গোপীকা রমণ রায়-এর আনুকুল্যে ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বিকাশ লাভ করে।

১৯৩৫ সালের পর আরো কিছু তরুণ নাট্যকর্মী আধুনিক মঞ্চ নির্মাণে নতুন নতুন প্রয়োগ কৌশলের ব্যবহার শুরু করেন। এঁদের মধ্যে শ্রী বীরেন্দ্র চন্দ্র সোম এবং শ্রী যশোদা রঞ্জনদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একটি ঘটনা থেকে জানা যায় যে, সিলেটের ক’জন উৎসাহী যুবকের আমন্ত্রণে নৃত্যসম্রাট উদয় শঙ্কর ১৯৪০ সালের দিকে যখন সিলেট আসেন তখন তাঁর নির্দেশে শ্রী বীরেন সোম বাজারস্থ দুর্গাকুমার পাটশালার ভিতরের প্রাঙ্গনে রড, সিমেন্ট ও বালির তৈরী পায়ার উপর একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় মঞ্চ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। নৃত্যসম্রাট উদয় শঙ্কর মঞ্চের নির্মাণ কৌশলের খুব প্রশংসা করেন। এই অনুষ্ঠানে মঞ্চের সম্মুখ ভাগ থেকে দু’টি উজ্জ্বল বাতি দ্বারা নির্মিত অনেকটা আজকের স্পট লাইটের মত বাতি নিক্ষেপ করা হয়। সিলেটের মঞ্চে এই ধরনের বাতির ছিল এই প্রথম। এখানে উল্লেখ্য, সিলেটের মঞ্চে ব্যবহৃত সামগ্রী আলো, শব্দ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সহ অন্যান্য ব্যবহারিক পরিবর্তন কলকাতার মঞ্চের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বিবর্তিত হয়েছে ! এর একটাই মাত্র কারণ হতে পারে যে, সিলেটের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল আজকালকার তুলনায় অনেক সহজ এবং স্বল্পব্যয়ী। ১৯২০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সিলেটের নাট্যাঙ্গনের ক্রম বিকাশের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ১৯৩৪ সালের পূর্বপর্যন্ত মঞ্চে আলো বিন্যাসের মূখ্য ভূমিকায় ছিল ‘হ্যাজাক বাতি’। ১৯৩৪ সালে সিলেটে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা চালু হবার পর হ্যাজাক বাতির ব্যবহার কমে আসে। তবে গ্রামাঞ্চলে এ ব্যবস্থা আজও চালু আছে। ১৯৫০ সালের পর থেকে মঞ্চে আলো নিক্ষেপের কিছু কিছু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। যেমন- ফুট লাইট, স্কাই লাইট ইত্যাদি। সাধারণ আলোকমালাকে শেড দিয়ে বসিয়ে মঞ্চের উপর থেকেও নিক্ষেপ করা হয়।

মধ্যসজ্জায় ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মূল পরিবেশক ছিলেন কুমার বাহাদুর গোপীকারমণ রায়। দেশ বিভক্তির পর এই সকল জিনিসপত্র শিবগঞ্জের ‘জগীবাবু’-র বাড়ীর শ্রী যশোদা রঞ্জন দে ও তাঁর সহকর্মী সাগর সিংহের সহায়তায় নিজ বাড়ীতে তৈরী করাতেন। যেমন, বিভিন্ন দৃশ্য সম্বলিত ‘ব্যাক সীন’, ‘উইংস’, ‘ড্রপসীন’, ঝালর, তলোয়ার, রাজকীয় কাপড়-চোপড় সহ অন্যান্য তৈজসপত্র। এই সকল জিনিসপত্র সিলেটে মঞ্চস্থ নাটকে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া দিতেন। কোন নাট্যগোষ্ঠী আর্থিক অনটনে থাকলে শ্রী যশোদা রঞ্জন দে এই সকল সামগ্রী বিনাভাড়ায়ও প্রদান করতেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, কুমার বাহাদুরের মৃত্যুর পরও ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কুমার বাহাদুর কর্তৃক নির্মিত বিভিন্ন ধরনের মঞ্চ সামগ্রী সিলেটের নাট্যকর্মীরা বিনাভাড়ায় তাঁদের মঞ্চায়িত নাটকে ব্যবহার করেছেন।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক জান্ডারা অত্যন্ত সুকৌশলে বাঙালীর প্রকৃত সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল ধারাটিকে অন্যখাতে বইয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, যে কারণে ১৮৩৬ সালে ইংরেজ শাসকরা সুস্থ নাট্য আন্দোলনকে ব্যহত করার জন্য ‘সেন্সরশীপ’ প্রথা নামে যে ঘৃণ্য প্রথা চালু করেছিল সেই প্রথাকে পাক শাসকরা অব্যাহত রাখে এবং সারা পৃথিবীব্যাপী যে সুস্থ নাট্য আন্দোলন বিকাশ লাভ করছিল এখানে আমাদের দেশে তা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রাম এবং ১৬ই ডিসেম্বরের সূচিত বিজয় পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করালো। সুদীর্ঘ ২৫ বছরের অন্ধকার যুগ থেকে বেরিয়ে এসে বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি দাঁড়ালো চিরউজ্জ্বল এক সূর্যের মুখোমুখি।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত সিলেটের নাট্যাঙ্গনেও এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের জোয়ার বইতে শুরু করলো। ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী নাট্য আন্দোলনের যে বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তার ছোঁয়া এসে লাগলো সিলেটের নাট্যঙ্গনেও। মঞ্চ স্থাপত্য, মঞ্চে আলো নিক্ষেপ, সহধ্বনি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠলো। ১৯৭২ সালের মধ্যে একাডেমিক স্টেইজ, সাজেস্টিভ স্টেইজ, মঞ্চে আলোকসজ্জায় ফ্লাড বাতি, প্রদীপ ভান্ডার বা মেগাজিন ব্যবস্থা, ফোকাস লণ্ঠন, বিভিন্ন ধরনের ডিমার ইত্যাদির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

56761

সিলেটে ৮০’র দশকে প্রায় ১৫টি নাট্য সংগঠন হয়েছে। তাছাড়া সিলেট সহ সারা বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য যৌথ প্রয়াসে গঠিত হয়েছে ‘সম্মিলিত নাট্য পরিষদ’। এই পরিষদ বিগত প্রায় ৩৫ বছর থেকে সিলেটের নাট্য আন্দোলনে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সম্প্রতি নির্মিত সিলেটের নাট্যগৃহ সিলেট কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে’ মঞ্চ, স্থাপত্য ও আলো বিন্যাসের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিলেটের সকল নাট্য কর্মীদের বলিষ্ঠ আন্দোলনের মুখে স্থানীয় প্রশাসন বাধ্য হয়েছে। সিলেটে সাংস্কৃতি কর্মীদের দীঘদিনের দাবি ছিল কবি নজরুল অডিটোরিয়াম সংস্কার করা, সিলেটে একটি নাট্যমঞ্চ তৈরী করাসহ সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য একটি নির্ধারিত ভবন নির্মাণ করা। কবি নজরুল একাডেমি সংস্কার করা ও ওই অডিটরিয়ামে একটি নাট্যমঞ্চ তৈরী করায় সিলেটের সাংস্কৃতি বিকাশে এক ধাপ এগিয়েছে। অডিটোরিয়ামের পূর্ব পাশে একটি নাট্যমঞ্চ তৈরী করা হয়েছে। পশ্চিম পাশে একটি গেইট তৈরী ও পুরো অডিটোরিয়ামটি রং করা হয়েছে।  সিলেট জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপির  একান্ত প্রচেষ্টায় ও সিলেট জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে কবি নজরুল ইসলাম অডিয়ামের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সাথে কবি নজরুল অডিটরিয়ামের সংস্কার কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরে সংস্কার কাজের সাথে একটি নাট্যমঞ্চও নির্মাণ করা হয়। সংস্কার কাজের মধ্যে অডিটোরিয়ামের ভেতরে নতুন চেয়ার, বাথরুম মেরামত, দরজা-জানালা মেরামত, পুরো অডিটরিয়াম রং করা, দুটি গেইট নির্মাণ করা হয়েছে। ২ কোটি টাকা ব্যায়ে সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরর কেন্দ্রস্থল সিলেট নগরীর রিকাবীবাজারস্থ কবি নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়ামের সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে নতুন করে একটি নাট্যমঞ্চও তৈরী করা হয়েছে ০৩ এপ্রিল ২০১৫ সালে উদ্বোধনের মাধ্যমে। অডিটোরিয়ামটি সংস্কার করায় সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সাংস্কৃতি ব্যক্তিত্বরা। তারা বলছেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো নাট্যকর্মীদের জন্য একটি মঞ্চ নির্মাণ করা। অবশেষে সেটি হয়েছে। এতে সাংস্কৃতি কর্মীদের একটি স্বপ্নও পূরণ হলো। যদিও কিছু কিছু ত্রুটি ও অভাব এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

2979

পরিশেষে এটা আশা করা অযৌক্তিক হবে না, সিলেটের নাট্যাঙ্গনে মঞ্চে ব্যবহৃত আলোক সামগ্রী সহ অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার আরো উন্নততর ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

তথ্যসুত্র: হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য, বর্ণালী নাট্য সাহিত্য ম্যাগাজিন, প্রকাশ ১৯৮০ সাল।