ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

গার্মেন্টস কর্মীদের জীবন যেন মশা-মাছির জীবন । আমদের গায়ে মশা বসলে যেমন আমরা কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই এক থাপ্পড়ে যে কয়টা পারি মেরে ফেলি, তেমনি গার্মেন্টস এ আগুন লাগলে শ্রমিকদের জীবনের পরিনতি হয় মশামাছিদের চেয়েও করুন । জীবিত অবস্থায় পুড়তে পুড়তে একজনের চোখের সামনে আরেকজন, তারপর আরেকজন,তারপর আরেকজন ছাই হয়ে যায় অথচ তাদের কিছুই করার থাকেনা । কারন তারা থাকে চিড়িয়াখানার হিংস্র জন্ত-জানোয়ারের মতো লোহার কাচায় বন্দি । দেশের অর্থনীতির চাকা অনবরত ঘুর্ণায়মান রাখে যারা, তাদের কি না এই পরিনতি ! হায়! নিয়তির কি নির্মম পরিহাস । গরীব হয়ে জন্ম নেওয়াই যেন তাদের আজন্ম পাপ । স্বয়ং রাষ্ট্রেরও যেন নাই কোন দায়-দায়িত্ব তাদের প্রতি । একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য অমূল্য রতন যে জীবন অথচ রাষ্ট্রের কোনই পরিকল্পনা নাই এই অকালে নির্মমতার শিকার হয়ে ঝরে যাওয়া জীবন গুলির অকালে ঝরে যাওয়া রোধকল্পে । কিছুই যেন করার নেই হত দরীদ্র এই মানব সন্তানদের জন্য । সামান্য একটু লোক দেখানো শোক ও সহানুভুতিই যেন তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া । অথচ সামান্য একটু চিন্তা করলেই এই সকল অপমৃত্যুগুলি খুব সহজেই ঠেকানোর ব্যবস্থা করা যায় । তাতে হয়ত গার্মেন্টস মালিকদের বিনিয়োগ কিছুটা বাড়াতে হবে । কিন্ত তাতে যদি অনেক গুলি জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তবে তা অনেক বড় রিটার্ণ হয়ে আসতে পারে মালিকের জন্য ।

গার্মেন্টসগুলিতে আগুন লাগলে মূলত দুইভাবে জীবনহানির শংকা তৈরী হয় যথা:
(১)গার্মেন্টস এ আগুন লাগলে প্রথমেই যে সমস্যাটি তৈরী হয়, তা হলো, তাড়াহুড়া করে সংকীর্ণ সিড়ি বেয়ে একসংগে অনেক লোক নামতে গিয়ে পদ্দলিত হয়ে অনেক জীবনহানি ঘটার সম্ভাবনা তৈরী হয় এবং অতীতে এইরকম অনেক দূর্ঘটনা ঘটিয়াছে,
(২)গার্মেন্টস এ আগুন লাগলে সবচেয়ে ভয়াবহ যে ঘটনাটি ঘটে,তা হলো আগুনে পুড়ে অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে শ্রমিকদের করুন মৃত্যু হয়,যা সকলের জন্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়ায় । আমার মতে এই দুই রকম অপমৃত্যুই এবং আগুন লাগলে ভিতরে যে বিশৃংখলা তৈরী হয়, তা ঠেকানো যায় ফ্যাক্টরী বিল্ডিং এর নকশায় সামান্য একটু বর্ধিতাংশ সংযোজনের মাধ্যমে যার আমি নাম দিয়েছি ‘সেফটি কর্ণার’। এই সেফটি কর্ণারটি তৈরী হবে মূলত মূল বিল্ডিং থেকে অনধিক দশ ফুট দূরে এবং মূল বিল্ডিং থেকে সেফটি কর্নারে যাওয়ার জন্য একটি করিডোর থাকবে । এই সেফটি কর্নার গুলি তৈরী হবে ঐ সকল ফ্লোরগুলিতে, যে গুলিতে মূলত শ্রমিকরা কাজ করে। সেফটি কর্নারগুলির আয়তন হবে ততসংশ্লিষ্ট ফ্লোরে যত সংখ্যক শ্রমিক কাজ করে, তারা যাতে অন্তত বিপদের সময় গাদাগাদি করে দাড়াতে পারে তার সমপরিমান জায়গা নিয়ে।

সাধারনত ছাদে যে পরিমান নিরাপত্তা দেয়াল বা গ্রীল থাকে শুধুমাত্র তার সমপরিমান নিরাপত্তা দেয়াল সেফটি কর্নারে থাকবে এবং অবশিষ্ট উপরাংশ উম্মুক্ত থাকবে । কিন্ত মূল বিল্ডিং থেকে সেফটি কর্নারে আসার যে করিডোর থাকবে তাদের সংযোগস্থলে নিরাপত্তার জন্য একটি মাত্র গেইট থাকবে । ফ্যাক্টরী বিল্ডিংয়ের যতগুলি ফ্লোরে শ্রমিকেরা কাজ করবে ততগুলি ফ্লোরেই প্রয়োজনানুযায়ী সেফটি কর্নার নির্মান করতে হবে, যাতে আগুন লাগলে শ্রমিকদের আর সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে বা নীচে নামতে না হয় । ফ্যাক্টরী বিল্ডিংয়ের যে ফ্লোরে শ্রমিকেরা কাজ করবে সেই ফ্লোরে মেশিনারীগুলি এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে আগুন লাগলে শ্রমিকেরা সহজেই দৌড়ে সেফটি কর্নারে পৌছতে পারে। সেফটি কর্নারে যথেষ্ট পরিমান অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে যাতে, আগুন লাগলে শ্রমিকেরা নিজেদের জীবন বাচানোর পাশাপাশি তাদের কর্মস্থলকেও আগুনের যথেষ্ট ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, কারন আগুন শুধু শ্রমিকের জীবনই কেড়ে নেয়না,সেই সাথে মালিককেও পথের ভিখারী বানিয়ে ছাড়ে । এই সকল সেফটি কর্নারগুলিতে কোন বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকবে না এবং এই সকল সেফটি কর্নারের প্রতিটিই সর্বদাই সম্পূর্ণ খালি থাকবে । এইসকল সেফটি কর্নারগুলি অন্যান্য সময়ে শ্রমিকদের নামাজের জায়গা ও মধ্যাহ্নভোজের জন্য ব্যবহার হতে পারে । অবশেষে আমার এই প্রস্তাবটি ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি এবং সেই সাথে আরো আহবান জানাচ্ছি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ।


৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Masum বলেছেনঃ

    ক্ষমা করবেন পোড়া লাশ গুলোকে
    ক্ষমা চেয়ে শুরু করছি, আমার স্বজনের লাশের পোড়া গন্ধে আপনার পরিবেশ দূষনের জন্য । আমার স্বজন যখন পুড়ে ছাই হচ্ছিল তার আত্ম চিৎকারে আপনাদের ঘুম বা বিশ্রামে ব্যাঘাতের জন্য । ক্ষমা চাচ্ছি লাশ উদ্ধ্যার ও সনাক্তে ফায়ার সার্ভিস, আর্মি, বর্ডার গার্ড ও পুলিশ নিয়োগে রাষ্ট্রের বাড়তি খরচে । লাশ সনাক্তে আপনাদের কষ্ট দিতে চাইনা । সবিনয় অনুরোধ করছি- আমার স্বজন সনাক্তের প্রয়োজন নেই । পোড়া লাশের কংকাল গুলি সারিবদ্ধ করে সাজিয়ে একএক করে আমাকে ও আমার অন্য স্বজনদের বুঝিয়ে দিন । নিয়ে যাব বিনা বাক্য ব্যয়ে । দোহাই আপনাদের ডি এন এ টেষ্টের মাধ্যমে স্বজনদের ঋণের বোঝা বাড়াবেন না । তবে ডি এন এ টেষ্টে যদি আপনাদের পকেট অর্থনীতি স্বচল হয় তাহলে আমার স্বজনের পক্ষ থেকে আপত্তি করব না । একটি অনুরোধ করছি- পোড়া দুর্গন্ধময় লাশের ছবি, গগন বিধারী স্বজনদের কান্না বিলাপের স্বচল চিত্রায়ন ও স্থির চিত্রায়নের ছবি প্রিন্ট মিডিয়া বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখাবেন না । না দেখালে কোন অনুযোগ অভিযোগ করব না । ইতিমধ্যে পোড়া দুর্গন্ধময় লাশের ছবি খবর প্রকাশে আপনাদের ছোট্ট সোনামনিরা ভয় পেয়ে থাকলে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি । টিভি পত্রিকার অনেকটুকু জায়গা দখল করেছে লাশ গুলো । ওদের লাশ গুলো আপনাদের নিয়মিত সুখ আনন্দের মিডিয়ায় অনাহুত ব্যাঘাতে ক্ষমা চাচ্ছি ।
    মূর্খ্য হলেও বুঝতে পারি,তদন্ত চলবে ঘটা করে । ফলাফল মিলিয়ে যাবে লাশের পোড়া গন্ধের আগে । দোহাই আপনাদের দোষটা আমার স্বজনের-আমার স্বজন সস্তা শ্রমের সস্তা প্রান । অশিক্ষিত অদক্ষতায় স্বজন আমার পুঁড়িয়ে দিয়েছে মূল্যবান মেশিন পত্র উৎপাদনের সব কাঁচামাল । দোহাই আপনাদের সিঁড়ি তৈরীর নামে খরচ বাড়াবেন না প্রভুসম মালিকের । শ্রমিক মরলে শ্রমিক পাব । মালিক মরলে কোথায় যাব । ট্রেনিংয়ের নামে খরচ বাড়ালে গার্মেন্টস আমার বাজার হারাবে । মালিক প্রেমী জোট মহাজোটের আঁতেল সুশীল সবাই এখন ভাবছে তবে ঘটনাটা গুলিয়ে দেব রাজনীতির কোন এক ককটেল চালে ।
    বোকা নির্বোধ লাশের স্বজন বলে কথা দিচ্ছি । ওদের মত বোকামী আমরা করব না । পোড়া লাশে পরিবেশ দূষন করব না । রাষ্ট্রের কোষাগারের অর্থাপোচয় করব না । প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জায়গা ও সময় দখল করব না । বোকামীতে বিল্ডিং মেশিন পত্র উৎপাদনের কাঁচামাল নষ্ট হতে দেব না । নিজে পুড়লেও মালিকের ক্ষয়-ক্ষতি হতে দেব না । কেন না ক্ষতি পূরনের সামর্থ্য যে আমরা রাখি না ।
    তবে আমরা পোড়া লাশে স্বজন হিসেবে কথা দিচ্ছি উৎপাদনকে গতিশীল করতে সর্বোচ্চ সময় দিয়ে মাথা নত করে কাজ করে যাব । একটি টু-শব্দ করব না নিজেদের স্বার্থে । পোড়া লাশের গরীব দুঃখি স্বজন হিসেবে বলছি ওদের লাশগুলো যদি আপনাদের সহজ ঋণ প্রাপ্তিতে,ঋণ মওকুপে ব্যবহার উপযোগী হয়- ব্যবহার করবেন । রাজনীতির মঞ্চে- বক্তৃতা, নির্বাচনী রাজনীতির- লিফলেট ব্যানারে ব্যবহার উপযোগী হলে- দয়া করে ব্যবহার করবেন । ওদের পোড়া লাশ গুলো যথোপযুক্ত ব্যবহারে আপনাদের ব্যবসা-বানিজ্য, রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারলে-ওদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে । পোড়া লাশের উত্তরাধীকারী স্বজন হিসেবে আবারো ক্ষমা চেয়ে শেষ করছি ।

    মোঃ মহিউদ্দিন মজুমদার মাসুম ।
    প্রবাসী, জাপান ।

  2. জিনিয়া বলেছেনঃ

    স্বপন ভাই, চমত্কার প্রস্তাব। আশা করি সরকার আমলে নিয়ে সব গার্মেন্টস মালিকদের সেইফটি কর্ণার নির্মাণের আদেশজারি করবে। খুব বেশি খরচ না, অথচ অনায়াসে এ রকম দুর্ঘটনা থেকে শ্রমিকদের বাঁচান সম্ভব। চাই শুধু একটু সদিচ্ছা।

    সুন্দর এই পোস্টের জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। শুভকামনা।

  3. সুকান্ত কুমার সাহা বলেছেনঃ

    লেখকে ধন্যবাদ!
    আপনার বর্ণীত সমস্যা গুলোর সাথে আমি আপনার সাথে একমত।
    কিন্তু আপনার সাজেশন মত “সেফটি কর্নার” বিষয়ে আমি আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করছোল। কারণ গুলো হলঃ
    ১। যখন আগুন লাগবে তখন সেফটি কর্নার আগুণের তাপ ও ধোঁয়া থেকে মুক্ত থাকবে না। এটা হবে এক গরম কড়াই!
    ২। ধোঁয়াতেই, এখানে যারা থাকবে তাদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়বে বা দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে!
    ৩। বাংলাদেশের কোন গারমেন্টস ফ্যাক্টরিতেই এত ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে না! ধরুন একটা বড় ফ্যাক্টরিতে ৫,০০০ শ্রমিক কাজ করে, তাহলে কত স্কয়ার ফিট ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে ফ্লোরে ফ্লোরে?

    আমার মতে, সবচেয়ে ভাল সমাধান হল, মালিকদের নিজ থেকে সচেতন হওয়া, শ্রমিকদের মানুষ মনে করা এবং শতভাগ কমপ্লায়েনস মেনে চলা।

    শুভকামনা!

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...