ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে জনশক্তি রফতানির পূর্বে তাদের সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে আমার আগের একটি লেখায় কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছিলাম। কাজের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এই সব মানুষগুলোর দৈনন্দিন আচার আচরণের বিষয়েও যে কিছু প্রশিক্ষণের দরকার আছে তা আমি সেই লেখায় উল্লেখ করেছিলাম। আজকে এমন একজন মানুষের কথা বলতে চাই, যে অন্যদের থেকে আলাদা এবং যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। যে তার মানবিকতা, কর্মপরায়ণতা এবং চারিত্রিক প্রশিক্ষণ পেয়েছে তার পরিবার থেকে। এর নাম আব্দুর রহমান।

আব্দুর রহমানের কথা বলার আগে একটু প্রাক বর্ণনার দরকার আছে। আমি এরবিল শহরে আছি আজ প্রায় চার বছর। এখানে বাংলাদেশী ছাড়াও ভারতীয়, নেপালী, পাকিস্তানী, ফিলিপিনো এবং অন্যান্য দেশের লোকজন আছে। কর্পোরেট চাকুরীতে খুবই অল্প সংখ্যক বাংলাদেশী দেখা যায়। বেশীরভাগ বাংলাদেশীই শ্রমিক শ্রেণীর এবং অবৈধ ভাবে বসবাসকারী। শিক্ষার এবং শিষ্টাচারের যথেষ্ট অভাব এদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। এখানে যখন একজন বাংলাদেশী আরেকজন বাংলাদেশীকে প্রথম দেখে তখন আলাপের শুরুতেই থাকবে তিনটি  প্রশ্ন। আমি প্রত্যেকবার প্রত্যেকের কাছ থেকে এই তিনটি প্রশ্নেরই সম্মুখীন হয়েছি।

প্রথম প্রশ্ন: আমনের নাম কি?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: কোন শরিকায় (কোম্পানি) কাম করেন?

তৃতীয় প্রশ্ন: ব্যাতন কত?

তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে আমি প্রতিবারই একই জবাব দেই, `বাবারা, মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের বেতন জিজ্ঞেস করতে হয় না, এটা অভদ্রতা’।  আমার উত্তর এদের তুষ্ট করতে পারে না।  মনে মনে হয়তো বলে `ব্যাডা পন্ডিত আইসে’।

এদের আরেকটা স্বভাব হলো বকশিশ চাওয়া। না চাইলেও এখানে বকশিশ দেওয়ার রেয়াজ আছে কিন্তু এদের ধৈর্যের বড়ই অভাব। বকশিশ দাতাকে বেশী সময় দেয়ার পক্ষপাতী এরা নয়। একদিনের ঘটনা বলি। মাস তিনেক আগে আমার লাংসে ইনফেকশন হওয়াতে আমাকে একটা ছোট খাটো হাসপাতালে যেতে হলো।  ডাক্তার আমাকে দেখে একদিনের জন্য ভর্তি হতে বললেন।  চিকিৎসা চলছে। স্থানীয় একজন নার্স সার্বক্ষণিক ভাবে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। সাধারণ আলাপচারিতার মাঝে ঝাড়ু হাতে একটি ছেলে এসে ঢুকলো।  নার্সটি ছেলেটিকে বললো তোমার দেশের রুগী।  ছেলেটি আমার কাছ এসে প্রথম যে প্রশ্নটি করলো তাতে বড়ই লজ্জা বোধ হলো।  `চিকিৎসার ট্যাহা কি আপনে দিবেন নাকি আপনের শরিকায় দিবো’? আমি থতমত খেয়ে সহসা কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে পরের অতি প্রয়োজনীয় বাক্যটি ঝেড়ে দিলেন – `আমরার ব্যাতন কম, রুগীরা বকশিশ টোকশিশ দেয়’।

মানুষ ঠকানোতেও এদের জুড়ি নেই। আরেকজন বাংলাদেশীর কাছ থেকে শোনা ঘটনা। এখানে যেসব বাংলাদেশীরা অফিস আদালতে কাজ পায়না তারা বলতে পারেন `ফ্রি ল্যান্সার’। মানুষের বাড়িতে বাগান পরিষ্কার করা এদের পছন্দনীয় কাজ।  অল্প পরিশ্রমে ভালো উপার্জন। আর এদেশের লোকগুলো তেমন চালাক চতুর নয়। মানুষকে ঠকানো বা কেউ তাকে ঠকাবে এইটা সম্ভবত এরা চিন্তাও করে না। দারিদ্রতা নেই বলে ধান্দাবাজিও নেই।  সেইরকম একজন  ফ্রি ল্যান্সার এক বাড়িতে বাগান পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখলো বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে পিঁপড়ার লম্বা লাইন। গৃহকর্ত্রীকে বোঝানো হলো এই পিঁপড়াতো তোমার বাড়ি ধ্বংস করে দিবে।  ভদ্র মহিলা লোকটিকে বললেন কিভাবে এই আপদ দূর করা যায়? লোকটি বললো আমাকে একশো ডলার দাও আমি সব পিঁপড়া মেরে দিচ্ছি। ভদ্রমহিলা কাল বিলম্ব না করে লোকটির হাতে একশো ডলার দিয়ে দিলে, লোকটি দোকান থেকে এক ডলার দিয়ে দই কিনে অন্য একটা কৌটায় ভরে তা নিয়ে এলো।  এইবার সেই দই দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর লোকটি চলে গেলে মিষ্টি দইয়ের লোভে পিঁপড়ার কাফেলা এসে পড়লো। এখন তো মহিলার অবস্থা আরও ভয়ানক।  আবার ফ্রি ল্যান্সারকে তলব।  ঘটনা কী ? তুমি তো বললে পিঁপড়া মরে যাবে কিন্তু এখন তো দেখি পিঁপড়ার পার্টি চলছে।  পিঁপড়া বিশেষজ্ঞ একগাল হেসে উত্তর দিলেন এই ওষুধটা মাটির নিচের পিঁপড়াকে উপরে আসতে দাওয়াত দিয়েছে এখন পঞ্চাশ ডলার দাও আরেকটা ওষুধ কিনতে, একবারে সব পিঁপড়া খতম।  ভদ্রমহিলা লোকটার প্রতিভায় খুশি হয়ে আবার পঞ্চাশ ডলার বের করে দিলেন। বলা বাহুল্য এই ফ্রি ল্যান্সারের দেশে নাকি দুইটা বৌ আছে।

যাই হোক, এইবার আব্দুর রহমানের কথায় আসা যাক।  এই সমস্ত বাংলাদেশীদের পাশে আব্দুর রহমান একদমই বেমানান। একদিন সকালে হঠাৎ আমার বন্ধু সুমনের হার্ট এটাক করলে আমি দ্রুত তাকে হাসপাতলে নিয়ে গেলাম।  বেশ বড় কার্ডিয়াক হাসপাতাল। ভাষাগত সমস্যার কারণে আমি যখন হিমশিম খাচ্ছি তখন দেবদূতের মতো আব্দুর রহমানের আবির্ভাব। আব্দুর রহমান এই হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়। আমরা বাংলাদেশী জানতে পেরে আব্দুর রহমানের তৎপরতা শুরু হয়ে গেলো। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম পুরো হাসপাতাল জুড়ে আব্দুর রহমানের একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে।  বড় ডাক্তার থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী সবার সাথেই আব্দুর রহমানের সখ্যতা। ইমার্জেন্সি বিভাগে কর্মরত আব্দুর রহমানের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। সবাই মোটামুটি তার উপর আস্থা রাখে। ডাক্তার কিংবা নার্স সবার মুখেই শুধু `আব্দুর রহমান ওয়েন’? `আব্দুর রহমান ওয়ারা’। (আব্দুর রহমান কোথায়? আব্দুর রহমান আসো)। আব্দুর রহমান আমার দেখা প্রথম বাংলাদেশী যে কিনা আমাকে তৃতীয় প্রশ্নটা করেনি। সুমনকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। সাথে আব্দুর রহমান।  স্থানীয় যে লোকটা সুমন কে অপারেশন থিয়েটারে রিসিভ করলো, আব্দুর রহমান তাকে বলে দিলো স্পেশাল কেয়ার নিতে। এরপর ডাক্তার আমাকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো ওষুধ পত্র নিয়ে আসতে আর অপারেশনের খরচ ক্যাশিয়ারের কাছে জমা দিতে।  ক্যাশে গিয়ে তো মাথায় হাত, সব মিলিয়ে তিন হাজার সাতশো মার্কিন ডলার। আমার কাছে এতো টাকা নাই, বললাম তোমরা শুরু করো আমি টাকা এক ঘন্টা পরে দিচ্ছি।  ওরা বললো তাহলে একজন কফিল (সিকিউরিটি) লাগবে।  আব্দুর রহমান পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বললো আমি কফিল। ঝামেলা মিটে গেলো।

আব্দুর রহমানের কল্যানে আমরা মোটামুটি ভালোই সেবা পাচ্ছি। সুমন অপারেশন থিয়েটারে, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আব্দুর রহমান আমাকে এসে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে।  হাসপাতালের গুণগান করছে, এই হাসপাতাল নাকি কুর্দিস্তানের সবচেয়ে বড় হার্টের হাসপাতাল। ডাক্তাররা সব বিদেশ থেকে লেখাপড়া করা। এখানে অপারেশনে মৃত্যুহার নাই বললেই চলে এইসব। ঘন্টা দুয়েক পরে সুমনকে বেডে ট্রান্সফার করলে এবং ডাক্তারের হাস্যমুখ আমাকে নিশ্চিন্ত করলো।  এরমধ্যে আব্দুর রহমান খবর নিয়ে এসেছে, আর কোনো ভয় নাই। একটা রিং পড়ানো হয়েছে আর বাকি দুইটা ব্লক ওষুধে সেরে যাবে। আমি যে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি সেটাও খেয়াল হতো না, যদি না আব্দুর রহমান ক্যান্টিন থেকে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতো।  `ভাইজান, এখন আর টেনশন নাই, কিছু মুখে দেন, আপনি তো মনে হয় সকাল থেইক্যা না খাইয়া রইসেন’।

আজকের মত আব্দুর রহমানের ডিউটি শেষ। এই সুযোগে আব্দুর রহমানের সাথে আলাপ জমিয়ে তুললাম।  এই হাসপাতালের বয়স এগারো বছর আর আব্দুর রহমানের চাকরির বয়সও এগারো বছর। তার মানে উদ্বোধনের দিন থেকে আব্দুর রহমান এখন পর্যন্ত এখানে কাজ করে যাচ্ছে সম্মানের সাথে। এই হাসপাতালে সর্বমোট পনেরো জন বাংলাদেশী আছে। কেউ কাজ করে ক্লিনারের, কেউ ক্যান্টিনে আর কয়েকজন আছে ওয়ার্ড বয় আব্দুর রহমানের মতো। দু’একজনের সাথে পরিচয় হলো। সবাই অন্যদের মতো, কেউ আব্দুর রহমানের মতো নয়। আমাকে দেখিয়ে আব্দুর রহমান একজনকে বললো, `এই ভাই বাংলাদেশী, আর উনারা ফাস্টলিংকে কাম করেন’। (ফাস্টলিংক এখানে খুব নামকরা কোম্পানি, আমরা যেখানে কাজ করি)। আব্দুর রহমানের চোখে মুখে গর্ব, ওর দেশের মানুষ ফাস্টলিংকে বড় চাকরি করে। কিন্তু ওই লোকটার মনে হয় আব্দুর রহমানের গর্ব পছন্দ হলো না। `ফাস্টলিংকে কাম করে তো কী হইসে? আমরাও তো হাসপাতালে কাম করি, তাই কি আমরা ডাক্তার হয়া গেসি’? বেচারা আব্দুর রহমান চুপসে গেলো।

আব্দুর রহমানের বাড়ি চৌমুহুনী জেলায়। বয়স সাতাশ আটাশ হবে। সংসারে বাবা, মা, ভাই আর বোন। বাড়ির বড় ছেলে। পুরো সংসার চলে আব্দুর রহমানের উপার্জনে। এগারো বছরে যা উপার্জন করেছে তা থেকে একবার তিন লাখ টাকা নষ্ট হয়েছে ছোট ভাইকে বিদেশে পাঠাবে বলে। মানুষরূপী কিছু দানব তার কষ্টের টাকায় বড়লোক হয়েছে। এরপর আবার সাত লাখ টাকা দিয়ে ভাইকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, `বিয়ে শাদী করেননি’? `না ভাই এখনো কইরা উঠতে পারি নাই। এখন মোটামুটি সমস্যা কমসে। ভাইটা উপার্জন করা শুরু করসে। আল্লাহ চাইলে সামনের ছুটিতে করমু? আগে সংসারটারে খাড়া কইরা নিলাম’। বলেই একখানা লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিলো।

দাযিত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আব্দুর রহমান। সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ, বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভাই বোনের প্রতি দায়িত্ববোধ সর্বোপরি নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। আর প্রবাসে এসে প্রমান করলো দেশের সম্মানের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধ। তার সাথে যতক্ষণ কথা বলেছি, একটিবারের জন্যও তার মুখে কোনো অভাব অনটনের কথা, সমস্যার কথা শুনিনি। বরং মনে হয়েছে তার যতটুকু আছে তা নিয়েই সে সুখী। এখানে যে কোনো আমোদ আহ্লাদ খুবই সহজলভ্য। আব্দুর রহমান সিগারেট খায় না, মদ খায়না, নেই কোনো আজেবাজে অভ্যাস। (দুই দিনের আলাপে এটা প্রমান করা যায় না, তবে তার আচরণ এবং কথা বার্তায় এটা পরিষ্কার বোঝা যায়)। আমি দেখেছি কাজের ফাঁকে সে ঠিকই নামাজের সময় বের করে নিয়েছে।

আব্দুর রহমান আর অন্য বাংলাদেশীরা হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকে।  সেখানেই রান্না বান্না, থাকা খাওয়া। আমাকে এসে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করে গেলো আমি যেন রাতে হোটেলে না খাই। ও আমার খাবার নিয়ে আসবে। আমি বার বার নিষেধ করা সত্বেও শুনলো না। গরুর মাংস, সব্জী আর ভাত নিয়ে রাতের বেলায় হাজির। খুব লজ্জা লাগছিলো এইভাবে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ আমাদের জন্য এতো করছে বলে। আব্দুর রহমান বোধ হয় আমার চোখের ভাষা পড়তে পারছিলো। `ভাই আমরা কেউ কাউরে চিনি না, কিন্তু আমরা এক দেশের।  সেই কারণে আপনারা আমার ভাই। আপনারা খাইলে আমি খুব খুশি হোইমু’।

সন্দেহ করা মানুষের একটা মজ্জাগত রোগ। আমিও ব্যতিক্রম নই। মনের মাঝে দু’একবার সন্দেহ উঁকি দিয়ে উঠে। ও কি ভালো কোনো বকশিশের আশায় এতো কিছু করছে? খারাপ মানুষ দেখতে দেখতে নিজের মনও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে, নিজের গালে নিজে যদি কষে চড় লাগাতে পারতাম!  মনে হচ্ছে, আমিওতো সেই তাদের মতো ভন্ড। পোশাকে কিংবা চলনে বলনে ভালো মানুষ সাজার অভিনয় আর ভিতরে ভিতরে সাক্ষাৎ অমানুষ। আব্দুর রহমানের মতো নির্লোভ, নিঃস্বার্থ মানুষকে সন্দেহ ! ছিঃ।

যেদিন সুমনকে ডিসচার্জ করে, সেইদিন সুমন অত্যন্ত খুশি হয়ে আব্দুর রহমানের পকেটে একটা একশো ডলারের নোট গুঁজে দিতে গেলো। আব্দুর রহমান যেন বজ্রাহত হলো। তার চোখে লজ্জা, ক্ষোভ, বেদনা। `এইটা আপনি কী করেন ভাই? না, না, কোনো ভাবেই না।  এইটা করবেন না। অসম্ভব এইটা আমি নিতে পারবো না’। সুমনও নাছোড় বান্দা। `এইটা কোনো বকশিস না, তুমি আমাকে ভাই বলসো, তাই বড় ভাই ছোট ভাইকে দিচ্ছি কিছু কেনার জন্য। তোমার যা মন চায় তাই কিনবা।’   আব্দুর রহমান কোনো ভাবেই নিবে না। মোটামুটি ধস্তাধস্তির পর্যায়। এরমধ্যে ডাক্তার এবং নার্সের চোখ আমাদের দিকে, আব্দুর রহমান বুঝতে পেরেছে ওরা যদি দৃশ্যটা দেখে তাহলে আরো লজ্জাজনক হবে বিধায় অনিচ্ছা সত্বেও চুপ করে গেলো। কিন্তু চোখের কোনের পানি লুকাতে পারলো না। আব্দুর রহমান আমাদেরকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো। আমরা স্পষ্ট বুঝলাম টাকাটা ওর আত্মসম্মানে আঘাত করেছে।  এইভাবে টাকা না দিয়ে ওকে আসলে একটা ভালো কিছু উপহার দিলেই ভালো হতো। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, আমাদের কারোরই আর ফেরার উপায় ছিল না।

হাসপাতাল থেকে চলে এসেছি এক সপ্তাহ হলো। এরমধ্যে আব্দুর রহমান দু’একবার ফোন করে খোঁজ খবর নিয়েছে। পরবর্তী চেকাপের ব্যবস্থা নিজে থেকেই করে রেখেছে এবং সেই দিনও একইরকম সহযোগিতা। সুমন আর নিজের ছোট ভাইকে টাকা দিয়ে কষ্ট দেবার চেষ্টাও করেনি।

আমাদের প্রতি আলাদা কেয়ার নিতে গিয়ে আব্দুর রহমানকে অন্য রুগীদের বেলায় কোনো অবহেলা করতে দেখিনি। দুইদিনে বুঝলাম, ও আসলে সব রুগিকেই আমাদের মতোই গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর প্রত্যেকেই মনে করছে আমাকে বেশ যত্ন করছে।  সত্যিকারের সেবার মনোভাব একজন হাসপাতাল কর্মীর কাছ থেকে পাওয়া আমাদের দেশে যে কি দুর্লভ ব্যাপার তা ভুক্তভোগীরা ভালোই বলতে পারবেন।

আব্দুর রহমানরা আমাদের দেশের সত্যিকারের প্রতিনিধি। আমি জানি না আমাদের সম্মানিত রাষ্ট্রদূতগণ কিভাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন? কিভাবে প্রবাসে দেশের মানুষের বিপদে এগিয়ে আসেন? তবে এটুকু জানি এই আব্দুর রহমানরা হচ্ছেন আসল রাষ্ট্রদূত। এদের কর্ম, এদের সততা আর এদের মানবিকতায় অন্য দেশগুলো চিনে নেয় বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মূল্যবোধকে আর বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে।

আব্দুর রহমানরা বেঁচে থাকুন যুগ যুগ ধরে।  পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত।