ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

পূর্ব সতর্কীকরণ:

এই লেখাটিকে দয়া করে কেউ সিরিয়াসলি নিবেন না।  এটি একটি নিছক রম্য রচনা। কাউকে আঘাত করা, চপেটাকঘাত করা কিংবা অসম্মানিত করা এই লেখা বা লেখকের উদ্দেশ্য নয়। দেশ এবং দেশের আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে সাধারণ একজন নাগরিকের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার উপায় আবিষ্কার করতে গিয়ে নতুন একটি পন্থার অবতারণা মাত্র। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ যা করে এ অনেকটা সেই রকম প্রক্রিয়া।

Bribeভূমিকা:

কথায় আছে কুকুরের লেজ ১০০ বছর চোঙার মধ্যে রাখলেও তা কখনো সোজা হয় না। কথাটি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি যখন আমার দেশের ঘুষখোর, দুর্নীতিগ্রস্ত নষ্ট মানুষগুলোকে দেখি। যখন দেখি ক্ষমতাবান, অসৎ, নীতিভ্রষ্ট মানুষ, দুর্বল মানুষের উপর কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে আর ভণ্ডামির মুখোশে নিজেকে নিয়ে যায় সীমাহীন উচ্চতায়।  জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি কত মানুষ কত ভাবে এইসব বিকৃত মানুষদের সঠিক পথে আনার জন্য কত চেষ্টা চরিত্র করে আসছেন। নীতি কথার নসিহত, সংবাদ পত্রে লেখালেখি, নাটক সিনেমার মাধ্যমে মুখোশ উন্মোচন এমনকি আইনের ভয়।  কিন্তু পরিশেষে যেই লাউ সেই কদু। চোরাই না শুনে ধর্মের কাহিনী। এদের না আছে ভয় না আছে লজ্জা। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও একই অবস্থা।  এই ৪৫ বছরে দেশে কত রথী মহারথী ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের আখের গোছালেন এই সব দুষ্ট মানুষগুলোর সাহায্য নিয়ে আর দিয়ে।  আজ এই ২০১৭ সালে এসে এই কথা হলফ করে বলতে পারি এদের পরিবর্তন নেই, এদের বিনাশ নেই।  আর তাই সময় এসেছে রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, আইন ব্যবস্থা, ক্ষমতার ধারক কিংবা বাহকদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতার আশা ত্যাগ করা। নিজেদের সাহায্য নিজেকেই  করতে হবে নিজেদের মতো করে। আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ঐসব দুষ্ট চক্রকে। এ কেবল দেয়া আর নেয়ার খেলা। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পদ্ধতিটি এক্ষেত্রে যুৎসই উপায় বলে গণ্য হবে। এই প্রকল্পের ট্যাগ লাইন হতে পারে `আমাদের তরে আমরা আমরা, উনাদের তরেও সকলে আমরা ‘।

প্রেক্ষাপট:

ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর `সার্ভিস সেক্টরে দুর্নীতি: জাতীয় পরিবার জরিপ ২০১৫‘ অনুসারে ২০১৪ সালে ৬৭.৮% পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছিল যার মধ্যে ৫৮.১% ঘুষ প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিল। এই ঘুষের গড় পরিমান ছিল ৪,৫৩৮ টাকা।

TIB

২০১৫ সালের জরিপে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেক্টরগুলি হলো: পাসপোর্ট (৭৭.৭%), আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৭৪.৬%), শিক্ষা (সরকারী ও এমপিও) (৬০.৮%), বিআরটিএ (৬০.১%), ভূমি প্রশাসন (৫৩.৪%) বিচার বিভাগীয় পরিষেবা (৪৮.২%), এবং স্বাস্থ্য (৩৭.৫%) । উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় কম আয়ের পরিবারের উপর দুর্নীতির চাপ বেশি। ৭১% উত্তরদাতা বলেন, তাঁরা ঘুষ প্রদান করেন কারণ, “আমরা যদি ঘুষ না দেই, তবে আমরা পরিষেবা পাবো না।”

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর টিআইবি জানায়, ঘুষ গ্রহণের জাতীয় আনুমানিক হিসাব প্রায় ৮,৮২৮ কোটি টাকা, যা ২০১৪-১৫ সালের জিডিপি’র 0.৬% এবং জাতীয় (সম্পূরক) বাজেটের ৩.৭%।

নিচের চার্ট থেকে আমরা ঘুষ দেয়ার কারণ সমূহ স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারবো এবং এর থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজতে গিয়ে সম্ভাব্য এই প্রকল্পের উপস্থাপনা।

Graph

 

প্রকল্পের নাম এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

প্রাথমিক ভাবে এই প্রকল্পের নাম `ঘুষ ব্যাংক প্রকল্প’ বলে গণ্য হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজন এবং এর পরিধির ব্যাপকতায় এই প্রকল্পের নাম সর্বসাধারণের স্বীদ্ধান্ত মোতাবেক পরিবর্তিত হতে পারে।  দেশে অর্থ লেনদেনকারী ব্যাংক ছাড়াও নানা রকমের ব্যাংক দৃষ্টিগোচর হয় যেমন মানুষের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে ব্লাড ব্যাংক, দৃষ্টিহীনের দৃষ্টি ফেরাতে আই ব্যাংক বা চক্ষু ব্যাংক কোনো কোনো দেশে স্পার্ম ব্যাংকের কথাও শোনা যায়। ঠিক সেইরকম নতুন একটি সংযোজন হচ্ছে ঘুষ ব্যাংক। উপরল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ব্যাতিত দেশের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এই ব্যাংকের সদস্য হবেন এবং নির্দিষ্ট অংকের মাসিক ডিপোজিটের মাধ্যমে স্ব স্ব একাউন্টকে সচল রাখবেন। এখানে কোনো সার্ভিস চার্জ, মুনাফা ইত্যাদি প্রযোজ্য হবে না। ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা ঘুষ প্রদান ব্যতিরেকে অন্য কোনো ফালতু কাজে ব্যয় করা যাবে না।  ব্যাংকের কাজ হবে, যখন সাধারণ নাগরিক উপরোল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ দ্বারা আক্রান্ত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত হবেন তখন উপদ্রুত ব্যক্তিকে রক্ষাকল্পে এবং ন্যায় বিচার প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে ঘুষ প্রদান করা। মনে রাখতে হবে এই ঘুষের অঙ্ক যেন অবশ্যই নিপীড়কের প্রস্তাবিত অংকের চাইতে বেশি হয়।

কাজের ক্ষেত্র বা স্কোপ অফ ওয়ার্ক:

প্রাথমিক পর্যায়ে ঘুষ ব্যাংকের কাজের ক্ষেত্র কিছুটা সংকুচিত থাকবে। এই পর্যায়ে শুধুমাত্র অতি জরুরী সমস্যা সমূহকে প্রাধান্য দেয়া হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনানুসারে এর পরিধি জরুরি এবং সাধারণ সমস্যা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। আপাতত নিচের সমস্যাগুলো অতি জরুরী বলে বিবেচিত হবে।

১। ধর্ষণ সংক্রান্ত সমস্যা

২। পরাক্রমশালী কর্তৃক অক্ষম হত্যা /মিথ্যা মামলা সমস্যা

৩। ক্ষমতাবান দ্বারা ক্ষমতাহীনের জমি অধিগ্রহণ সমস্যা

৪। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডোনেশন সংক্রান্ত সমস্যা

প্রকল্প পরিচালনা বা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট:

১৬ কোটি মানুষের এই দেশে মুষ্টিমেয় কিছু দুষ্ট ব্যতীত অনেক সৎ লোকের বাস। সেই সব সৎ লোকের মধ্য থেকে একটি পরিচালনা পরিষদ গঠন করে একাধিক বিভাগে প্রকল্পের কর্ম পরিচালিত হবে। প্রস্তাবিত বিভাগগুলো হচ্ছে :

১।  অর্থ বিভাগ: প্রকল্পের হিসাব পরিচালনা এবং নিরীক্ষণ

২। আইনি সহায়তা বিভাগ: উপদ্রুতকে আইনি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সঠিক আইনজ্ঞ নির্বাচন

৩। ইন্টেলিজেন্স বিভাগ: সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সঠিক ঘুষখোর অনুসন্ধান এবং নিপীড়ক কর্তৃক প্রস্তাবিত ঘুষের অংকের অনুসন্ধান

৪। পর্যবেক্ষণ বিভাগ: প্রতিটি নিবন্ধিত সমস্যার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ

৫। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও নতুন বিভাগ চালু করা যেতে পারে।

তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়:

সিআইএ’র ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুযায়ী ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৬২ লাখ, এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটির বয়স হচ্ছে ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। ধরে নিচ্ছি এই ১০ কোটি লোক উপার্জনক্ষম তবে সূত্র মতে আমাদের বেকারত্বের হার ৪০% সেই হিসাবে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা ৬ কোটি। এই ৬ কোটি লোকের অর্ধেক যদি মাসে ২৫ টাকা করে ঘুষ ব্যাংকে জমা করে তাহলে মাসে দাঁড়ায় ৭৫ কোটি টাকা আর বছরে ৯০০ কোটি টাকা। আর আমাদের দেশে বছরে ধর্ষণ, খুন, জমি দখল ইত্যাদির হার হচ্ছে:

ধর্ষণ: আনুমানিক ১২,৫০০ (২০০৬ সালের হিসাব মতে)

হত্যা: ১,৮২৫ (ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী দিনে ১০ টি খুন সেই হিসাবে বছরে ৩,৬৫০ টি , ধরে নিলাম এর ৫০% রাজনৈতিক এবং প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীর হাতে সংঘটিত হত্যাকান্ড যা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়।)

এছাড়াও রয়েছে জমি দখল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডোনেশন প্রদান হিসাব যা এই মুহূর্তে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। হিসাবের খাতিরে ধরে নেই বছরে শ’পাঁচেক জমিদখলের ঘটনা আর হাজার পঞ্চাশেক শিশু ডোনেশন না দিতে পেরে স্কুলে ভর্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এই হিসাব অনুযাযী আমরা একটা আয় ব্যয়ের কল্পনা প্রসূত ধারণা নিতে পারি নিচের ছক অনুযায়ী।

Income_Expensess

উপসংহার:

এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের কথা শুনে অনেকেই হয়তো বলবেন `ছি: ছি: এ তো ঘোর অন্যায়, ঘুষের মতো অনৈতিক কাজকে বৈধতা দেয়ার শামিল’। আরে ভাই ঘুষ যদি অবৈধই হতো তবে গত ৪৫ বছরে তা বন্ধ হয়নি কেন? রাষ্ট্রের কোন যায়গায় ঘুষ নাই? বিচার চাইতে যাবেন ঘুষ লাগবে, সরকারী হাসপাতালে সিট্ চাইবেন ঘুষ লাগবে, চাকরি দরকার ঘুষ লাগবে, ভালো পোস্টিং লাগবে ঘুষ দরকার, বাচ্চাকে স্কুল কলেজে ভর্তি করাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের সিট্ পেতে, বাড়ি তৈরী করতে প্ল্যান পাশ করাবেন ঘুষ লাগবে। ফিরিস্তি দিতে গেলে কাগজ আর কালিতে কুলোবে না।

সমস্যা হচ্ছে ঘুষ দেয়ার মতো ক্ষমতা বিধাতা সকলকে দেননি। আর এই অক্ষম লোকেরা ঘুষ না দিতে পেরে দিনে দিনে আরও অক্ষম হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সময় এসেছে এইসব লোকদের অক্ষমতাকে সবাই মিলে দূর করে তাদেরকে সমাজের মূলধারায়(!) নিয়ে আসা। কারো কারো টাকা আছে বলে ঘুষ দিয়ে বুক ফুলিয়ে বেড়াবে আর দরিদ্র মানুষ ঘুষ দিতে পারবে না এ মেনে নেওয়া যায় না। সমাজে সকলের সমান অধিকারের দরকার আছে। ঘুষ দিয়ে যদি বিচারকে প্রভাবিত করা যায় তবে ঘুষ দিয়ে ন্যায় বিচার কেনা যাবে না কেন, যেখানে ন্যায় বিচার পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই।

অতএব প্রস্তাবিত ঘুষ ব্যাংক প্রকল্প এই মুহূর্তে খুবই জরুরী এবং দরকারী বলে প্রতীয়মান হয়।

পাদটীকা: নিতান্ত আবেগতাড়িত হয়ে এই লেখার অবতারণা, বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই। কেউ যদি এই প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করে ধরা খান বা নোবেল প্রাইজ পেয়ে যান তাহলে লেখক দায়ী থাকবেন না।

————————

ছবি: গুগল থেকে নেয়া