ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

এই ঈদে যখন সাত দিনের ছুটি পাওয়া গেলো আমি আর সুমন ঠিক করলাম দেশে গিয়ে ঈদ করবো। এখনো বেতন হয়নি, টাকা পয়সা তেমন একটা নেই। ব্যাক পেইন এর কারণে ইকোনোমি ক্লাসে প্রায় নয় ঘন্টা ট্রাভেল করা খুবই কষ্টের, তার উপর রোজা রেখে।  পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এই কষ্টটুকু মেনে নিতেই হলো।  মনে মনে ভাবলাম আল্লাহ ভরসা। সুমন আবার এক কাঠি সরেশ। মাগরিবের নামাজে বসে আল্লাহকে ডাইরেক্ট রিকোয়েস্ট ‘হে আল্লাহ আরামে পৌঁছে দিও।’

এয়ারপোর্টে চেক-ইন কাউন্টারে পাসপোর্ট দিতেই ফিলিপিনো এটেন্ডেন্ট বললো ‘স্যার আপনাদের টিকেট বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড হয়েছে’। নিজের অধিক খুশি হওয়া ভাবকে সংযত রেখে বললাম `থ্যাঙ্ক ইউ’। আমি সুমনের দিকে আর সুমন আমার দিকে বেকুবের মতো কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম।  উপলব্ধি হলো – রোজাদারের মর্যাদা আল্লাহর কাছে কেমন? ব্যক্তিগত ভাবে আমি যতই খারাপ হইনা কেন, রোজা রাখার ক্ষেত্রে আমার মধ্যে কোনো লোক দেখানো ভাব কিংবা ভন্ডামী ছিল না, সেটা আমি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেই বলতে পারি। একজন রোজাদারের কষ্ট আল্লাহ কিভাবে লাঘব করেন তার জ্বলন্ত প্রমান আজ হাতে নাতে পেলাম। আল্লাহকে ধন্যবাদ।

এরপর আসা যাক মানুষের কাছে সম্মানের বিষয়ে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই মানুষের কাছে সম্মানের, কোনো মুসলমানের বা খ্রিষ্টানের কিংবা হিন্দুর কাছে নয়।

আসন গ্রহণ করার পরেই ট্রেইন্ড হাসি দিয়ে ওয়েলকাম ড্রিংক নিয়ে হাজির বিমানবালা। বললাম `উই আর ফাস্টিং’। ছোট্ট ছোট্ট চোখের কোরিয়ান মেয়েটার চোখ দুটো মনে হয় আরও ছোট হয়ে গেলো। বললাম, আমাদেরকে ইফতারের সময়ে খাবার পরিবেশন করতে। `সিওর স্যার, লেট্ মি টক টু ক্যাপ্টেন’ বলেই দ্রুত চলে গেলো। বিজনেস ক্লাসে আমরা সহ মোট আঠারো জন যাত্রী। আমরা ছাড়া বাকিরা রোজা রাখেননি (যাত্রার সময় রোজা রাখা ফরজ নয়, সুতরাং এতে দোষের কিছু নেই বা ওঁদের খাটো করে দেখারও কিছু নেই)। সবাই যে যার মতো খাচ্ছেন আর আমরা অপেক্ষায় আছি ইফতারের সময়ের। কোরিয়ান মেয়েটি এইবার এসে বললো, `ক্যাপ্টেন আমাকে জানাবেন তোমাদের ইফতারের সময় হলে’। কৌতূহলী মেয়েটা মনে হলো রোজার ব্যাপারে বিশদ জানতে কিছুটা আগ্রহী।  তার অতি সাধারণ প্রশ্নগুলোর যথাসম্ভব উত্তর দিলাম। টানা সতেরো ঘন্টা না খেয়ে উপবাস, এমনকি পানি পর্যন্ত পান না করার ব্যাপারটি মেয়েটাকে যথেষ্ট অবাক করলো বলে মনে হয়।  আবারও প্রশ্ন `শুধু ধর্ম বলেছে বলে তোমরা এতক্ষন না খেয়ে আছো’? বললাম `হ্যাঁ, শুধু ধর্মের কারণেই, ঈশ্বরে বিশ্বাস করি বলেই না খেয়ে আছি’। মেয়েটা চোখে মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে বলল `তোমাদের সম্মান করি’। বুঝলাম এই সম্মান আমাকে বা সুমনকে নয়, এই সম্মান ও করেছে শুধুমাত্র দুইজন রোজাদারকে। অন্য যাত্রীদেরও এরা সম্মান করছে তবে তা পেশাদারিত্বের কারণে আর তাই জনে জনে গিয়ে বলতে হচ্ছে না যে আমরা তোমাদের সম্মান করি।

ইফতারির আধাঘন্টা আগে মেয়েটি আবার এলো, মিষ্টি হেসে বললো `ক্যাপ্টেন বলেছে আধাঘন্টা পরে তোমরা খেতে পারবে’। এরপর দশ মিনিট আগে আমাদের আস্বস্ত করতে আবার এসে বললো `আর মাত্র দশ মিনিট’। মনে হচ্ছে ও নিজেই বোধ হয় রোজা রেখেছে।  আমাদের থেকে ওর আগ্রহ বেশী।

এইবার পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে দুই হাতে দুটো সুদৃশ্য প্যাকেট নিয়ে হাজির।  `এখনো পাঁচ মিনিট, স্যার’ বলেই একগাল হাসি। প্যাকেট থেকে খাবারগুলো বের করে ট্রেতে সাজিয়ে দিতে লাগলো।  বললো `এইগুলো শুধু ইফতারির জন্য, এইটা শেষ করলে ডিনার সার্ভ করবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো আর মাত্র এক  মিনিট।

প্রচুর সুস্বাদু খাবার ইফতারির মেনুতে, সাথে আছে শীতল জুস্।  আমরা খাচ্ছি, কোরিয়ান কন্যা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষন পর পর জিজ্ঞেস করে স্যার আরেক গ্লাস জুস্ এনে দেই? কফি দেই? ওর অতি আপ্যায়ন কিছুটা লজ্জায় ফেলে দিচ্ছিলো।

রাসূলুল্লাহ (সা:) এর হাদীসটি মনে পড়ে গেলো `রোজা যেহেতু কেবল আল্লাহ’র উদ্দেশ্যে রাখা হয় তাই এর পুরস্কার আল্লাহ স্বয়ং দান করবেন‘। মনে পড়ে গেলো পবিত্র কোরানের বাণী `ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী আদ` – নিশ্চয় আল্লাহ ভঙ্গ করেন না অঙ্গীকার

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা অনেকেই মনে করি ধর্ম পালন একটি সেকেলে ব্যাপার। অশিক্ষিত মূর্খরা এইসব ধর্মের মধ্যে ডুবে থাকবে।  উপরে বর্ণিত ঘটনা দুটিতে অনেকেই  যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করবেন।  কেউ কেউ বলবেন এটি পুরোই কাকতালীয় ব্যাপার। হতে পারে কাকতালীয় তবে অনেক কাকতালীয় ঘটনা বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত করে, যারা বিশ্বাস করে।

প্রতিটা ধর্মের আচার আচরণ ব্যক্তি মানুষকে শুদ্ধ করে, নির্ভার করে।  যিনি যেই ধর্মই পালন করেন না কেন, তিনি যদি বিশ্বাস নিয়ে এর মধ্যে বাস করেন এবং এর রীতিগুলো স্বেচ্ছায় পালন করেন তবে শান্তি শুধু নিজের জন্যই নয় বরং সমস্ত মানব জাতির মঙ্গল।

বিস্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।