ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

প্রায় ছয়শ কোটি মানুষের বাস এই পৃথিবীতে। প্রতিটি মানুষের আছে আলাদা আলাদা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কেউ নিঃস্বার্থ, ত্যাগী। আবার কেউ কেউ নিজের ভালো ছাড়া কিছুই বোঝে না। একমাত্র মহামানব ছাড়া আমরা সবাই কম বেশী স্বার্থপর। কেউ নিজের স্বার্থ দেখি অন্যের ক্ষতি না করে আবার কেউ নিজের স্বার্থে অন্যের বারোটা বাজাতেও দ্বিধা বোধ করিনা। এছাড়াও আর এক ধরণের স্বার্থপর আছেন, যাঁরা নিজের কিছু কষ্ট হবে জেনেও কোনো কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকেন পাছে অন্যেরা উপকৃত হয়। এঁদের আদর্শ হচ্ছে হোক না আমার সামান্য ক্ষতি কিন্তু আমিতো অন্যের বৃহৎ স্বার্থকে নস্যাৎ করতে পেরেছি!

সেই রকম একজন স্বার্থপরের ঘটনা বলি। আমরা দু’একটি দেশের জনা ছয়েক লোক একসাথে থাকি এই পরবাসে। আমাদের বাসাটি একটি ডুপ্লেক্স ভবন যাতে বৈঠক খানা, রসুই ঘর বাদেও গোটা সাতেক শোবার ঘর রয়েছে। বেশ বড় বাড়ি। এটার রক্ষনাবেক্ষন নিজেদেরই করতে হয়।  এখানে বাঁধা কিংবা ঠিকে বুয়ার চল নেই। আমরা যে যার মতো, সময় মতো ঘরদোর পরিষ্কার রাখি। আমরা মানে বাকি পাঁচ জন, ওই স্বার্থপর ব্যক্তিটি ছাড়া। ধরে নেই এই বুদ্ধিমান লোকটির নাম জনাব `ক’।  উনিও কাজ করেন, কিন্তু কিভাবে? নিচের বর্ণনায় তা চিত্রিত হবে।

আমাদের রান্নাঘরটি  বেশ বড়।  দুই অংশে বিভক্ত এই রান্না ঘরে দুটি উন্নত চুলা আছে।  একপাশের চুলা আমরা তিন জন ব্যবহার করি অন্যটি বাকি তিন জন। আমরা যখন রান্নাঘর পরিষ্কার করি তখন ঘরের দুটি অংশই করি কিন্তু জনাব ক যেদিন করেন (কালে ভদ্রে যদি করেন) তিনি শুধু একটি অংশের মেঝে পরিষ্কার করেই ক্ষান্ত হন।  আমাদের একজন উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ভাইজান পরিষ্কার যখন করলেনই তা এপাশটা করলেন না কেন? উনার উত্তরের বাংলা করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে `আমি তো ওই টাইলস গুলায় পারাই না’। জনাব ক বেশ হিসেবি মানুষ।  উনি যখন পেয়াঁজ কাটেন তখন কাটিং বোর্ডের একটি কোনা ব্যবহার করেন মাত্র এবং কাজ শেষে বোর্ডের সেই অংশটিই পরিষ্কার করেন যেটুকু উনি ব্যবহার করেছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না ? ছবির কাটিং বোর্ডটি তার প্রমাণ।  শুধু তাই না যে প্লেটে উনি তরকারি রাখেন সেই প্লেটটির শুধুমাত্র ব্যবহৃত অংশটুকুই পরিষ্কার করেন।

Board

লিকুইড সাবান কিনতে হবে বিধায় উনি হাত ধোয়ার কাজটিও রান্নাঘরের সিঙ্কে সেরে নেন, ডিশ ওয়াশিং লিকুইড দিয়ে । বহুবার বলা সত্বেও উনি ডিশ ওয়াশিং সিঙ্কে মুখ ধোয়া বা কুলি করা যখন বন্ধ করছেন না তখন আমরা নোটিশ টাঙাতে বাধ্য হলাম।

Basin

আমাদের এখানে শীতের সময় প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে। মাঝে মধ্যে মাইনাস দুই তিনেও নেমে যায়। ঘরের যে মূল দরজাটি আছে ওটি বন্ধ না রাখলে আমরা যারা নিচের তলায় থাকি তাদের মোটামুটি জমে যাবার অবস্থা। ক সাহেব যতবার বাইরে যান কিংবা ভেতরে আসেন কখনোই দরজা বন্ধ করবেন না। এদিকে আমাদের তো ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। বললাম ভাই দরজাটা দয়া করে বন্ধ করে দিয়েন।  উনার উত্তর এখানে তো চুরি চামারি হয় না দরজা খোলা থাকলে সমস্যা নেই।  বললাম ভাই প্রচন্ড ঠান্ডা এখন, আর দরজা খোলা থাকলে ঠান্ডা বাতাস আসে।  এবার আমার অবাক হবার পালা।  `আমি তো উপরের তলায় থাকি, ওখানে ঠান্ডা বাতাস যায় না’।  আবারো বাধ্য হলাম নোটিশ টাঙাতে।  দরোজায় আর এর তিন পাশের দেয়ালে নোটিশ টাঙিয়ে দিলাম।  কাজ হলো।

Door

এখন এখানে গরম চলছে।  এইদেশে শীত যেমন গরমও তেমন। দুটোই চরম।  গরমের সময় মূলত দুটি সমস্যা আমাদের বেশ ভোগায়। এক, পানির কষ্ট আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদ্যুৎ। প্রায় পানি থাকে না।  আমরা তখন সরকারী পানি অফিসে ফোন করি ট্রাকে করে পানি দিয়ে যেতে। এই ফোন করার কাজটি কখনো ক সাহেবকে করতে দেখিনি। একবার বলেছিলাম করতে উনি বললেন ফোনে চার্জ নেই। বিশ্বাস হলো না।  উনার দেশি একভাইকে বললাম ভাইজান আসল খবরটা বার করেন তো।  উনি যে খবর আনলেন তাতে অজ্ঞান হবার মতো অবস্থা।  ক সাহেব বলেছেন, পানি ছয়জনের লাগবে, তাহলে উনি কেন উনার ফোনের ক্রেডিট একা খরচ করবেন। কঠিন হিসাব!

যখন বিদ্যুৎ চলে যায় তখন জেনারেটর এর কানেকশনে আমাদের ঘর আলোকিত হয়, ঠান্ডা হয় । দুর্ভাগ্য বশতঃ জেনারেটর কক্ষটি আমাদের বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রোদের মধ্যে হেঁটে গিয়ে জেনারেটর এর সুইচ অন করে দিয়ে আসতে হয়। আবার এসি ছাড়া এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব না।  বাধ্য হয়েই দশ মিনিটের ওই কষ্টটা করতে হয়।  ক সাহেব আজ পর্যন্ত ওই সুইচ অন করতে যাননি। কারণ উনার অসুবিধা হয় না।  উনার ঘরটি আমাদের বাড়ির সামনের পার্কটির দিকে এবং জানালাটাও ওই পাশে, তাই বাতাস আসে এবং উনার একটা চার্জার ফ্যান আছে।  তাই ঘন্টা খানেক এসি না চললেও উনার অসুবিধা নেই।

আমাদের অফিসে ছুটির নিয়ম হচ্ছে, একজন এমপ্লয়ী প্রতিমাসে সর্বোচ্চ দুই দিন অসুস্থতা জনিত ছুটি নিতে পারবে। কেউ যদি অসুস্থ না হয়, তবে ওই ছুটি পরবর্তীতে যোগ হবে না।  বিশ্বাস করুন, ক সাহেব আজ পর্যন্ত একটি মাসও বাদ দেননি ওই দুই দিনের ছুটি, তা তিনি অসুস্থ হন আর না হন। প্রতি মাসেই উনার দুই দিনের সিক লীভ আছে।  একদিন বিষয়টি উপর মহলে ধরা পরে গেলো এবং ক সাহেবের প্রোফাইলে একটা লাল দাগ অঙ্কিত হলো।

ক সাহেবকে আমরা কোনোদিন কিছু খাওয়াতে পারিনি। আমরা যখন একা একা কিছু খাই, অন্যরা এসে গেলে তার দিকেও খাবার এগিয়ে দেই।  সেও স্বাচ্ছন্দে তা খাওয়া শুরু করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ক সাহেবকে শত অনুরোধেও কিছু মুখে দেয়াতে পারিনি। ঠিক তেমনি উনিও কখনো কিছু কাউকে আগ্রহ নিয়ে সেধেছেন কিনা মনে নেই। কারোর টা  খাবও না কাউকে দিবোওনা। উনি এই নীতিতে বিশ্বাসী।একবার হলো কি, আমাদের এক সহকর্মী চাকরী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তো আমরা ঠিক করলাম তার বিদায়ে কিছু একটা গিফট দেই।  সবাই মিলে ঠিক করলাম একসাথে ডিনার করে উপহারটা তার হাতে তুলে দিবো। ক সাহেবকে বললাম, উনি বললেন উনি যেতে পারবেন না।  বাধ্য হয়ে উনাকে ছাড়াই আমরা ডিনার সারলাম, উপহার তুলে দিলাম। পরে যখন ক সাহেব কে জানানো হলো যে, উপহারের কন্ট্রিবিউশন বাবদ উনাকে কত দিতে হবে? ক সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন। `আমিতো ডিনারে যায়নি, তাহলে টাকা দিবো কেন’?

দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই মানুষগুলো কখনো কারো আপন হতে পারে না। এদের কোনো বন্ধু নেই, শুভাকাঙ্খী নেই, হিতৈষী নেই। এরা একা, ভীষণ একা, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে একটি বিন্দুর মতো একা। আজ ক সাহেব চলে যাচ্ছেন। কেউ একবারের জন্যও বলে নাই, উনাকে একটা বিদায়ী সংবর্ধনা দেই। একটা কিছু উপহার দেই, যেটা দেখে উনি আমাদের মনে রাখবেন। ক সাহেবরা আসলে কিছুই মনে রাখেন না।  ক সাহেবরা হারিয়ে যান সময়ের অতল গহ্বরে। জীবনের শেষ মুহূর্ত কাটে নিঃসঙ্গতায়, একাকিত্বে আর সব হারানোর ভয়ে।

স্বার্থপরতা একটি রোগ। এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই আছে কেবল প্রতিষেধক। আর এই রোগ একবার ধরে গেলে পরবর্তীতে তা ক্রনিক আকার ধারণ করবে। পারিবারিক শিক্ষাই কেবল বাঁচাতে পারে এই রোগের হাত থেকে। ছেলেবেলা থেকেই সন্তানকে শিক্ষা দিন সবাইকে নিয়ে চলবার, মানুষের উপকার করবার। শুধু জি.পি.এ পাঁচ এর দিকে নজর না দিয়ে সন্তানকে মানুষ করুন মানুষের মতন।  না হলে আপনার জি.পি.এ. পাঁচ পাওয়া সন্তান হয়তো বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা প্রশাসক হবে কিন্তু নিজের স্বার্থ দেখতে গিয়ে রোগীকে করবে জবাই, ধ্বসে পড়বে শত কোটি টাকার সেতু অথবা গড়ে তুলবে অবৈধ সম্পদের পাহাড়। পরিশেষে পরিণত হবে ঘৃণার পাত্রে, পতিত হবে আস্তাকুঁড়ে। আর সবশেষে কতগুলো অর্বাচীনের হাতে সম্পদের মালিকানা সোঁপে  দিয়ে নিঃসঙ্গ মহাপ্রস্থান।

________________

সত্য ঘটনা অবলম্বনে।