ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার শৈশব জীবন কেটেছে নিজ গ্রামেই। আমার জীবনের প্রথম পর্ব ছিল খুব আকর্ষণীয় এবং উপভোগ্য। এ সময়ের সব কিছুই ছিল কৌতূহলের বিষয়। সবাই একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন যে, শৈশবে গ্রামের জীবন আর শহরের জীবনের পার্থক্য কতটুকু। আমার শৈশবের দুরন্তপনার মধ্যে ছিলঃ গাছে চড়া, পানিতে ড্রাইভ দিয়ে সাঁতার কাটা, দল বেঁধে দুর্গম জঙ্গলে গিয়ে গাছে উঠে ফল আনা ও পাখির বাসা দেখা, অগ্রহায়ণ মাসে ধানক্ষেতের ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান তুলে সংগ্রহ করা, জাল দিয়ে ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, নিজে ঘুড্ডি বানিয়ে উড়ানো ইত্যাদি। আর এ কাজগুলো করার উপযুক্ত পরিবেশও ছিল আমার গ্রামে। যেমনঃ বাড়ির পিছনে গভীর জঙ্গল, তার পর দিগন্তজোড়া মাঠ, বাড়ির সামনে নদীর পর বিস্তৃত মাঠ, তার পর আবার নদী। গ্রামের পশ্চিমে বিশাল বড় ফিলওয়ার বিল। এটিকে একটি মৎস্য ভাণ্ডার বলা যায় । বিলের পর আবার নদী। গ্রামের উত্তরে তাকালে দিগন্তজোড়া নীল পাহাড় আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলতে গেলে খাল-বিল, নদী-নালা, বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বতে বেষ্টিত আমার গ্রাম।

আমি এবং আমার ছোটভাই সোহাগ অগ্রহায়ণ মাস আসলেই দোয়া করতাম যে, ইঁদুর যেন সব ধান কেটে গর্তে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা যাতে বেশি ধান উঠিয়ে আনতে পারি। হেড কামলার কাছ থেকে আগেই জেনে নিতাম কোনদিন ইঁদুরে কাটা ধানক্ষেত কাটবে। আগে থেকেই গর্ত থেকে ধান উঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে রাখতাম। ধানকাটা শেষ হলে আমরা কুদাল দিয়ে গর্ত কাটা শুরু করলাম। ইঁদুরগুলো অসংখ্য গর্ত করে ধান রাখে । প্রথম দিন দুই পাইলা ধান উঠিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি চলে গেলাম। প্রত্যক বছর এভাবে অনেক ধান সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতাম। তখন চার মন ধান বিক্রি করলে তিনশত টাকা হত। এ টাকা দুজনে ভাগ করে নিয়ে যার যার ইচ্ছেমত খরচ করতাম।

পরের দিন সকালে উঠে আবার চলে গেলাম ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান উঠাতে। ইঁদুরের গর্তে অনেক গুলো মুখ থাকে। এছাড়া মাটির নিচে অনেক গুলো কোঠর থাকে। বড় কোঠর গুলোতে প্রচুর ধানের ছড়া জমা করে রাখে। কিছু কোঠরে নিজেরা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বসবাস করে। সব কোঠরে ধান পাওয়া যায় না। কোদাল দিয়ে অনেক মাটি কেটে ধানের কোঠর গুলো বের করতে হয়। এক দিকে ধান গুলো সংগ্রহ করতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে বিপদের সম্ভাবনাও আছে। যেমনঃ ইঁদুর হাতে কামড় দিতে পারে। এছাড়া ভয়ংকর বিপদ হল সাপে ছোবল দিতে পারে। ইঁদুরের বাচ্চা খাওয়ার জন্য সাপ গর্তে ঢুকে ওঁত পেতে থাকে। ইঁদুরকে ধরতে না পারলেও বাচ্চা গুলোকে সহজেই খেয়ে ফেলে। তাই সাপ এখানে অবস্থান করে। তখন দুরন্ত বালক হিসেবে এসব ভয়ের পরোয়া করতাম না । ভয়ের চেয়ে ধান তোলার আগ্রহই বেশি থাকত।

মাটি কেটে গর্ত থেকে বারবার ধান উঠাচ্ছি। অন্য একটি গর্তে হাতদিয়ে প্যাঁচানো ঠাণ্ডা একটা কিছু অনুভব করলাম। ভয়ে দ্রুত হাত বের করে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওরে বাবা! এটা কী! মস্তবড় সাপ! গর্ত থেকে বের হয়ে দে ছুট। দেখে শরীর শিউরে উঠল। এইদিন আর গর্ত থেকে ধান উঠাতে সাহস পেলাম না। বাড়িতে গিয়ে এ ঘটনা আর কাওকে বলিনি। কারণ, এটা শোনার পর আর কোনদিন ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান উঠাতে দিবে না। এর পরও আরো অনেক ধান উঠিয়েছি কিন্তু গর্তে হাত দেইনি। বেশি করে মাটি কেটে, ধান দেখা গেলে, পরে সাপ আছে কিনা তা ভাল করে নিশ্চিত হয়ে ধান তুলে এনেছি।