ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

এখনকার সমসাময়িক বিষয় রোহিঙ্গা নিয়ে কিছু ভাবনা আপনাদের সাথে বিনিময় করব বলে আমার এই লেখা, প্রথমেই আসুন আমরা জেনে নেই রোহিঙ্গা আসলে কারা। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের লাগোয়া বার্মার আরাকান রাজ্যের দুটি বড় জাতিগোষ্ঠী অধিবাসীর একটি হচ্ছে রোহিঙ্গা, যারা ধর্ম মতে মুসলিম, অপরটি রাখাইন যারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। যদিও রোহিঙ্গা শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে অনেক বির্তক আছে তবে রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদ খলিলুর রহমানের মতে রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে আরবি শব্দ ‘রহম’ থেকে, যার পেছনের গল্প হলোঃ- খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে কিছু আরব জাতিগোষ্ঠীর লোক সম্ভবত বনিক শ্রেনীর, একটি জাহাজে করে সমুদ্র পথে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন, কিন্ত দুর্ভাগ্য বশতঃ তাদের জাহাজ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে আরাকানের নিকটবর্তী রামরী নামক দ্বীপের ঊপকূলে পৌছায়, অতঃপর তারা আরাকানের রাজা কর্তৃক আটক হন এবং তিনি তাদের হত্যা করার আদেশ দেন। তখন আরব বনিকেরা তাদের নিজেদের ভাষায় রাজার কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করে চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘রহম’ ‘রহম’। সেই থেকে তাদের রহম বলে ডাকা হতো, কালক্রমে ‘রহম’ থেকে ‘রোহাং’ এবং পরবর্তীতে তা ‘রোহিঙ্গা’ এর রূপ নেয়। কারও কারও মতে পুরাতন আরাকান রাজ্যের পূর্ব নাম ছিল মরোহং সেই থেকে রোহাং এবং এর অধিবাসীরা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। কিন্ত বার্মার ইতিহাসবিদেরা তা স্বীকার করেন না তাদের মতে রোহিঙ্গারা বাঙ্গালী জাতিগোষ্ঠীর লোক যারা জীবন জীবিকার তাগিদে উপনিবেশিক আমলে এই অঞ্চলে চলে আসেন।

Arakan

রোহিঙ্গারা তাদের নিজেস্ব ‘রোহিঙ্গা’ ভাষায় কথা বলে যার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার খানিকটা মিল পাওয়া যায়। এমনকি লিখিত ভাবে প্রকাশের জন্য তাদের নিজেস্ব অক্ষরও আছে যার সাথে বাংলার কোন মিল নেই।

রোহিঙ্গা এবং রাখাইনদের মাঝে জাতিগত দাঙ্গার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ও পুরানো। রোহিঙ্গারা দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করেও কখনো এর যথায্থ নাগরিকের মর্যাদা পায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় এই দাঙ্গা আরও ভয়াবহ আকার ধারন করে, যখন জাপানিরা বার্মা আক্রমন করে বসে, ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটে এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, ফলে বার্মার কোন কোন অঞ্চলে শাসন ব্যাবস্থায় এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি, হয় সেই সুযোগে এই দুই জাতিগোষ্টির দাঙ্গায় উভয় পক্ষের হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। পরে জাপানিরা যখন বার্মার নিয়ন্ত্রন নেয় তখন ব্রিটিশ সৈন্যদের পক্ষ অবলম্বন করার জন্য জাপানি বাহিনী ও রাখাইনদের দ্বারা রোহিঙ্গারা ব্যাপক ভাবে খুন, ধর্ষন ও নির্যাতনের শিকার হয়। সেই সময় প্রায় ৪০০০০ জন রোহিঙ্গা আরাকান ছেড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে।

নির্যাতনের সকল মাত্রা ছেড়ে যায় বার্মার সামরিক জান্তার সময়, ১৯৭৮ সালে বার্মার সামরিক জান্তা অপারেশন ‘নাগামিন’ (Dragon King) নামে অভিযান শুরু করে যার লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক নাগরিককে যাচাই বাছাই করে বের করা তারা সেই দেশের, নাকি ভিন দেশের নাগরিক। ফলাফল হলো ভয়াবহ সামরিক সরকারের সরাসরি নির্যাতনের শিকার হলো মুসলিম ধর্মালম্বী রোহিঙ্গারা- ব্যাপক ভাবে হত্যা, ধর্ষন, লুটতরাজ চলতে থাকল, সেই সাথে জায়গায় জায়গায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া হলো। সেই সময় ২০০০০০ এর ও বেশী রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। এরপর আবার ১৯৯১-৯২ সালে নির্যাতনের আরেক মাত্রা শুরু হয় সেই সময় বার্মিজ সেনাবাহিনী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু করে যাতে রোহিঙ্গাদের ধরে ধরে বিনা পারিশ্রমিকে মানবেতর ভাবে খাটানো হয় সেই সাথে চলতে থাকে গুম, খুন, ধর্ষন ও বিভিন্ন প্রকারের অমানবিক নির্যাতন। ফলে আরেক দফা শরণার্থীর ঢেউ ভেঙ্গে পরে বাংলাদেশের উপর, সেই দফায় বিভিন্ন ভাবে প্রায় ২৫০০০০ এর অধিক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে।

এইসব রোহিঙ্গারা জাতি সংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশের শরনার্থী শিবির গুলোতে আশ্রয় পায়। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও বার্মার সরকার এদের ফিরিয়ে নেয়নি বরং এইরকম ভাব করেছে যেন এরা তাদের দেশেরই নাগরিক না। এইদিকে দীর্ঘ সময় সুবিধা বঞ্চিত হয়ে থাকলে যা হয়, শরনার্থী শিবির থেকে অনেকে পালিয়ে যেয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যেতে থাকে, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে মাদক চোরাচালান। আর এখন তো সবারই জানা আছে ‘ইয়াবা’ নামক বিভীষিকার নাম, আমাদের দেশের যুব সমাজের একটা বড় অংশ এই ভয়াবহতার শিকার যার প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হচ্ছে বার্মা এবং মাধ্যম হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এছাড়া আমাদের আইন প্রয়োগ কারী সংস্থার দূর্নীতি ও উদাসীনতার কারনে, অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসর্পোট নিয়ে বিভিন্ন দেশে যেয়ে নানা রকম অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে আর নাম হচ্ছে আমাদের দেশের। সৌদি আরব যেখান থেকে আমাদের রেমিটেন্সের একটা বড় অংশ আসতো এই রোহিঙ্গাদের কারনে সেখানে লোক নিয়োগ একপ্রকার বন্ধের পথে। এ ছাড়া আরও অনেক সামাজিক সমস্যা তো রয়েছেই।

প্রথমত আমরা একটা গরিব দেশ, আমরা আমাদের নিজেদের লোকদেরই অনেক ক্ষেত্রে ন্যূন্যতম সুবিধা দিতে পারি না, সেখানে বছরের পর বছর আমাদের পক্ষে অন্যদেশের সমস্যা বয়ে বেড়ানো সম্ভব না, অনেকে বলবে জাতি সংঘ এর ব্যায়ভার নেয়, তা ঠিক ব্যয়ভার নেয় কিন্ত দায়ভার না, তা ছাড়া একটা সময় পরে সবাই একধরনের উদাসীনতা দেখাতে থাকে এবং যথারিতি আমরা গড্ডায় পরে যাই। অনেকে বলবে ১৯৭১ এ আমরা এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম তা ঠিক কিন্ত তখন প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন এবং যুদ্ধের পরেই আমাদের সব লোকই আবার ফিরে এসেছিল। কিন্ত এ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না একবার আমাদের সীমান্তে প্রবেশ করলেই বার্মার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী বানিয়ে দিচ্ছে। আমি লেখার শুরুতেই রোহিঙ্গাদের ইতিহাস বলেছি এই কারনেই যে সেই দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারব, রোহিঙ্গাদের বার্মার সরকার কখনোই তাদের আপন ভাবতে পারেনি, তারা সবসময় চেয়েছে জাতিগত শুদ্ধি করতে এবং এটা তাদের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ, তারা সময় সময় এক একটা গণ্ডগোল বাধিয়ে এদের দেশ থেকে উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেছে। এমনকি অং সান সুচি’র সাম্প্রতিক কোন বক্তব্যেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে কোন প্রকার বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি।

রোহিঙ্গাদের সাথে যা করা হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে অমানবিক, মানবিক কারনেই এরা যে কোন জায়গায় আশ্রয় পাবার দাবীদার, কিন্ত কি মূল্যে আমাদের সেটা ভেবে দেখতে হবে। বছরের পর বছর এরা শরনার্থী হিসেবে আসতেই থাকবে এবং আমরা আশ্রয় দিতেই থাকব সেটা আমরা কেনো বিশ্বের কোন দেশের পক্ষেই সম্ভব না আর এটা কোন সমাধানও নয়। বরং জাতি সংঘের উচিৎ এই সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান করা, সেটা বার্মাকে বুঝিয়ে হোক আর শান্তিরক্ষী পাঠিয়েই হোক। বার্মাকে বুঝতে হবে তার সমস্যা তাকেই সমাধান করতে হবে অন্যের ঘাড়ে ঝেড়ে ফেলে কখনোই কোন সমস্যার সমাধান করা যায় না।