ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

 

গত ১১ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলো বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের স্মরণোৎসব -২০১৭। অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগী ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এ উপলক্ষ্যে লালন শাহের আখড়ায়। ফকির লালন শাহ ছিলেন একজন সাধক। উইকিপিডিয়া তার পরিচয় তুলে ধরতে লিখেছে “লালন (জন্ম: ১৭৭৪ – মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর, ১৮৯০) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন বাঙালি; যিনি ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ, মহাত্মা লালন ইত্যাদি নামেও পরিচিত। তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। তিনি অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। লালনকে বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার গানের মাধ্যমেই উনিশ শতকে বাউল গান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।”

প্রায় এক কিলোমিটার ফাঁকে রাস্তার পাশে তোরণ

মাজার কমপ্লেক্সের ফটক

গত ১২ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমাদের পাড়ার কলেজ পড়ুয়া ছেলেরা লালনের আখড়ায় যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি বাড়ী থেকে বাহির হতেই তারা আমাকে বলল।যদিও আমাকে আগেই তারা বলেছিল কিন্তু সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পাড়ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম যে যাব। আমার বাড়ী পাবনা হওয়ায় পদ্মা পাড় হলেই কুষ্টিয়ার শিলাইদহ  কবি গুরুর কুঠি বাড়ী,সেখান থেকে সামান্য দুরত্বেই লালন ফকিরের মাজার। যাবার মাধ্যম হিসাবে ভ্যান গাড়ী রিজার্ভ নিলাম পদ্মা নদী পর্যন্ত, যেখানে পাবনার বাংলা বাজার নামক স্থান ছেড়ে যেতে হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর নদীর ভেতর তিন কিলোমিটার চর পায়ে হেটে পৌছালাম মূল নদীতে, যেখান থেকে ট্রলাম ছাড়ে। দুপুর ১.৩০ এ চরের মধ্যে হাঁটা ছিল খুব কঠিন কাজ। তবে সবাই একসাথে যেতে তেমন মানসিক বেগ পেতে হয় নাই! শারীরিক কষ্টের তো মাফ নেই! ট্রলারে উঠে কবি গুরুর শেলাইদহ পৌছালাম, তারপরে সেখান থেকে অটোরিক্সা নিয়ে ৩০ মিনিটের পথ পেড়িয়ে গেলাম লালনের আখড়ায়।

লালনের সমাধি

সমাধি স্থলে এক লালন গবেষক দলের শ্রদ্ধা নিবেদন

 

জাদুঘরের ভেতরে লালন ফকিরের চিত্রকর্মের পাশে আমি

প্রথমেই মূল মাজার কমপ্লেক্সে ঢুকলাম, দেখলাম সাইজির ভক্ত অনুরাগীরা সবখানে আছেন।মাজার কমপ্লেক্সের ভেতরে জাদুঘর আছে লালনের। সংগ্রহে তেমন কিছু নেই সেখানে। আমি ঢুঁকে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সেখান থেকে মাজারের বিপরীত পাশে মাঠে গেলাম যেখানে মঞ্চ করা হয়েছে লালনের গানের জন্য। মেলাও হচ্ছিলো সে মাঠে। বিস্তির্ন মাঠ জুড়ে মেলা আর সাধু সন্যাশীর আনাগোনা। সেখানে হরেক রকম মিষ্টি বিক্রি হতে দেখেছি। ফার্নিচারও বিক্রি হচ্ছে। মঞ্চের চারপাশে বসেছে শুধু সাধুরা, যারা গান গাচ্ছেন,গাঁজা সেবন করছেন। এ মাঠে খোলাখুলি ভাবে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা ও কোলকে।

মাজারে গান গাইছেন আগত বাউলেরা

 

এরপর চলে গেলাম গড়াই নদীর তীরে শ্মশান ঘাঁটে। সেখানেও গান গাচ্ছেন সাধু সন্যাসীরা, তারা গাঁজা সেবন করছেন খোলাখুলি ভাবে। গড়াই নদীর তীরে কিছুক্ষণ কাটানোর পর আবার ফিরে এলাম লালন ফকিরের মূল মাজার কমপ্লেক্সে। সেখানেও গান শুনলাম বহু সময়।

রাত ১২টা থেকে মঞ্চে গান গাইতে উঠলেন লালন গীতির দিকপাল ফরিদা পারভীন। মুগ্ধ হয়ে তার গান শুনলাম। গানের ফাঁকেফাঁকে বললেন নানান কথা। আমার খুব ইচ্ছে ছিল তার গান সরাসরি শোনার। সে রাতে আমার সেই ইচ্ছে পূরণ হলো। উনি মঞ্চ থেকে নামতে নামতে রাত প্রায় তিনটা বেজে গেলো। তারপর মঞ্চে গান গাইলেন নতুন শিল্পীরা। এভাবে ভোর হয়ে আসতে লাগলো। আমাদের ফিরে আসার সময় হয়ে গেলো। সবাই তখন ভীষণ ক্লান্ত। আবার অটোরিক্সা নিয়ে শিলাইদহ এলাম,ট্রলারে যখন উঠি তখন ভোড় পাঁচটা। পদ্মার বুক দিয়ে ভেসে আসছি, দোল পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ, হালকা বাতাস আর সাথে সব দারুণ স্মৃতি, কী যে অদ্ভুত ভাল লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। ট্রলার থেকে নেমে আবার তিন কিলোমিটার হেঁটে যখন পদ্মার পাড়ে উঠলাম তখন সকাল সাতটা। অটোরিক্সায় বাড়ী ফিরে এসে দেখি ঘড়িতে আটটা বাজে।

অনেক বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এলাম। জানলাম লালনকে আরেকটু গভীরভাবে। আমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সন্যাসী যেন আরেকটু প্রশ্রয় পেলো!

slide