ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

আমরা স্থান-কাল সমন্বিত করে তার মাঝে অবস্থিত গোটা মানব সমাজকে একটি মানব মূর্তি রূপে কল্পনা করতে পারি ।ভিন্ন ভিন্ন স্থান-কালের মানুষ ,ভিন্ন ভিন্ন জাতি,বর্ণ,ধর্ম,গোত্র,লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষকে সেই মানব মূর্তির বিভিন্ন অংশ বা অঙ্গ হিসাবে কল্পনা করতে পারি ।সকল স্থান-কালের ,সকল জাতির,বর্ণের,ধর্মের গোত্রের ,লিঙ্গের মহান বিজ্ঞানী, রাজনীতিক,কবি-সাহিত্যিক,চিত্র শিল্পী,সঙ্গিত শিল্পী ,শ্রমিক, কৃষককে সেই মানব মূর্তির গঠন,পুষ্টি এবং সৌন্দর্য্য বিকাশের কারিগর মনে করতে পারি । ব্যাক্তিবাদিতা নিন্দনীয় এবং সমষ্টিবাদিতা বা সমাজবাদিতা প্রশংসনীয়- এর মর্মমূলে আছে এই মানব মূর্তি ।অবচেতনে হোক আর সচেতনে হোক ব্যাক্তি মানুষের মনে এই মানব মূর্তির স্থান না থাকলে ব্যাক্তি মানুষ সমাজবদ্ধ হতে পারত না ,স্থান-কালের মানুষের কোন খবরও রাখত না ,ইতিহাস- পরম্পরার কোন খোঁজ-খবর করত না। শেষ বিচারে এই মানব মূর্তির বিকাশের জন্যই মানুষ শিক্ষা অর্জন করে , শিক্ষিত হয় , মননে-প্রজ্ঞায় বিকশিত হয় ।মানব মূর্তির পুষ্টি,সৌন্দর্য্য বিকাশের প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম মানব সন্তানের নিরন্তর ।সংগ্রাম এই জন্য যে, মানব সন্তান যেমন মানব মূর্তির পুষ্টি , সৌন্দর্য্য বিকাশে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায় তেমনই এর সৌন্দর্যহানি, বিকৃতি এবং এর ওপর কালিমা লেপনের কাজও কোন কোন মানব সন্তানই করে থাকে। তাই মানব মূর্তির বিকাশ আকাঙ্খী অধিকাংশ মানব সন্তানকে তার বিরূদ্ধে লাগাতার সংগ্রামও করতে হয় ।মানব মূর্তির এই বিকাশধারায় কোন স্থানে ,কোন কালে কোন অঙ্গকে অপর অঙ্গ অপেক্ষা বেশি বিকশিত বা বেশি সুন্দর মনে হতে পারে ।পক্ষান্তরে স্থানে-কালে কোন অঙ্গের পঙ্গুদশা হতে পারে।এই বেশি সুন্দর বা বেশি বিকাশ অন্য অবিকশিত এবং পঙ্গু অঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যতা হারিয়ে গোটা মূর্তিটিই অসুন্দর হয়ে পড়ে ।তখন স্থান-কালে জাতি-বর্ণ-ধর্ম-গোত্র-লিঙ্গ নির্বশেষে মানুষে মানুষে সমন্বিত হওয়ার সংগ্রাম চলে ।তখন কৃত্রিমতাকে অতিক্রম করে এবং প্রকৃতির মর্ম বুঝে সকল বৈষম্যকে পিছনে ফেলে মানব সমাজ মানুষ তত্ত্বে বিকশিত হওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম করে ।

না,আমার এ লেখা হুমায়ূন আহমেদের ওপর কোন আলোচনার জন্য নয় ।হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আলোচনা করা যায় এমনভাবে তাঁর লেখাগুলো পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি ।বিভিন্ন সময়ে আরো অনেকের লেখার মত হুমায়ূন আহমেদেরও কিছু লেখা পড়েছি।তাঁর নির্মিত এবং তাঁর লেখা উপন্যাস নিয়ে নির্মিত সিনেমা ,নাটক সব না হলেও কিছু কিছু অন্য অনেকের মত আমিও দেখেছি ।সেগুলো তাঁকে নিয়ে আলোচনা করার জন্য যথেষ্ট নয় ।আরো অনেকে যেমন জানেন এক্ষেত্রে আমার জানা তার চেয়ে বেশি কিছু নয় ।কিন্তু একটি বিষয় বলা যেতে পারে তা’ হলো ,যতটুকুই পড়েছি বা দেখেছি তাতে সেসব সময় বা এখনও কোন দিন মনে হয়নি হুমায়ূন আহমেদের সমকক্ষ কেউ বর্তমানেও নেই,বা অতীতে ছিলেন না বা ভবিষ্যতেও হবেন না ।এমন কথা তাঁর জীবদ্দশায় অন্য কারো মুখেও কোনদিন শুনেছি বলে মনে পড়ে না ।হুমায়ূন আহমেদ স্থান-কালের আরো অনেক মানুষের মত মানব মূর্তির বিকাশে কোন অঙ্গে তুলির আঁচড় দিয়েছেন ।অনেক মানুষের সাথে থাকলে তিনি ছোট হয়ে যাবেন কেন?সমকালে ,অতীতে বা ভবিষ্যতে তাঁর সমকক্ষ বা বড় কেউ থাকলে বা আবির্ভুত হলেই বা তিনি ছোট হবেন কেন? বহু মানুষ যদি তাঁর উচ্চতায় বা তাঁর চেয়ে বেশি উচ্চতার হন তবে তাঁর নিজের উচ্চতা কম হয়ে যাবে এমন ভাবতে হবে কেন ?তাঁর সকল কাজ তাঁর উচ্চতার শীর্ষবিন্দুতে থাকবে মাঝামাঝি বা নীচে কিছু থাকবে না এমনই বা ভাবতে হবে কেন?এমন কি রবীন্দ্রনাথের ছিল?নজরুলের,আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের , তলস্তয়ের?কারোরই কি হয় ?

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অনেক লেখা,অনেক কথা , অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে ।এসবের মধ্যে তাঁকে এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে জানা যায় বুঝা যায় এমন কোন লেখা বা আলোচনা পাওয়া দুষ্কর ।প্রশংসা কোন খারাপ কিছু নয় ।কিন্তু যাঁর প্রশংসা করা হচ্ছে প্রশংসা যদি তাঁকেই ছাড়িয়ে যায় তবে তা প্রশংসা না হয়ে স্তাবকতায় পরিণত হয় ।আমাদের দেশে এমনটি খুবই হয়ে থাকে।যদিও যাঁকে নিয়ে এসব হয়ে থাকে এতে তাঁর উচ্চতা বৃদ্ধির কিছু থাকে না ।এসব স্তাবকেরা যখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে , নজরুলকে নিয়ে বা অন্য কাউকে নিয়ে আলোচনা করেন বা লেখেন তখন তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে তেমন কোন কথা বলেন না ।সেগুলো কতকগুলো গড়পড়তা এবং স্তাবকতায় ভেসে যায় ।রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে একদিন এক নাট্যকর্মী এবং সাংষ্কৃতিক কর্মী বললেন বাঙালী পরিবারের রুচি এবং শিক্ষার পরিচয় নাকি পাওয়া যায় সেই পরিবারের বইয়ের তাকে সঞ্চয়িতা আছে কিনা এবং থাকলেও তা কত পুরাতন তা’ থেকে !এ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই ।শুধু এটুকু বলতে পারি এসব কথা বলে রবীন্দ্রনাথকে বড় করা যায় না এবং রবীন্দ্রনাথকে এমন টানাটানি করে বড় করারও কিছু নেই ।তিনি তাঁর সৃষ্টিতেই তাঁর উচ্চতায় আছেন।মানব মূর্তির বিকাশ একটি পরম্পরার বিষয় ,ধারাবাহিকতার বিষয় । কারো সৃষ্টির ওপর দাঁড়িয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নাম প্রগতি।কাজেই কারো সম্পর্কে বলতে গিয়ে যদি বলা হয় তাঁর মত কেউ ছিলেন না এবং হবেনও না, তবে তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে বলনেওয়ালার অজ্ঞতার বিষয়ে আর নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না ।স্তাবকতা দুই কারণে হতে পারে । কারো সৃষ্টি সম্পর্কে যখন বলার মত কিছুই জানা থাকে না, অথচ তাঁর সম্পর্কে বলতেই হবে, তখন স্তাবকতা ছাড়া আর কোন কথা খুঁজে পাওয়া যায় না।কথা ব্যবসায়ীরা এবং কলম ব্যবসায়ীরা এমন ধারার কথা বলে থাকেন এবং লিখে থাকেন । আর একটি ব্যাপার থাকে তা হলো মতলববাজী ।কোন জনপ্রিয় ব্যাক্তির পাশে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লক্ষ্যে এবং বিজ্ঞাপনী কৌশলে নিজের নামটার প্রচার করার মতলবে অনেকে এমন স্তাবক মার্কা কথা বলে থাকেন এবং লিখে থাকেন ।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর ওপর লেখা আলোচনায় যেসব বিষয় সাধারণভাবে পাওয়া যাচ্ছে তা হলো ,তিনি নতুন করে বাঙালীকে- বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষকে পড়তে শিখিয়েছেন,ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া বঙ্গ সন্তানদের ঘরে ফিরিয়েছেন,পশ্চিম বঙ্গের সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের সংষ্কৃতিকে রক্ষা করেছেন,ওপার বাংলার লেখক-সাহিত্যিকদের হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বিশেষ করে যুব সমাজকে রক্ষা করেছেন,প্রায় নিভতে বসা প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচিয়ে তুলেছেন ইত্যাদি ।এসব কথার মধ্য দিয়ে আর যাই হোক কারো সমালোচনা বা প্রশংসা কিছুই হয়না- স্তাবকতা ছাড়া ।বাংলাদেশের মানুষ একযোগে কবে পড়া বন্ধ করে বসেছিলেন এবং হুমায়ুন আহমেদ কোন একদিনে তাঁর সবগুলো লেখা মেলে ধরে তাঁদের পড়া শেখালেন এ প্রশ্নের জবাবে স্তাবকেরা কি বলবেন বলা মুশকিল ।কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন “ থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে ,দেখব এবার জগতটাকে”।কাজেই হুমায়ূন আহমেদ বঙ্গ সন্তানদের যদি ফিরিয়ে এনে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে থাকেন তবে তা’ আর যাই হোক প্রগতি নয় । হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশায় নিশ্চয় এমন কথা বলতেন না । কোনদিন বলেছেন বলে শোনা যায়নি ।আমাদের দেশের স্তাবকেরা এমনভাবে কথা বলেন যে,তা’ থেকে যাঁর সম্পর্কে বলছেন তাঁর সৃষ্টি বা কর্ম সম্পর্কে কোনভাবেই জানা যায় না ।এখানে স্তাবকদের লক্ষ্য থাকে জনপ্রিয় কোন ব্যাক্তিত্ত্বের সম্পর্কে এমন ধারার কথা বলে নিজেদের ঢোল পেটানো । এতে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিত্ত্বের কিছুই এসে যায় না কিন্তু সামগ্রিকভাবে সংষ্কৃতির মধ্যে স্তাবকতার উপাদান বাড়তে থাকে যা’ ভাল কোন দিক নির্দেশনা দেয় না । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এগুলো খুব বেশি হয়ে থাকে । বেশিরভাগ আলোচনা বা লেখাতেই তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে কিছুই থাকে না অথচ এসব আলোচনার বেশিরভাগ জুড়ে থাকে –‘রবীন্দ্রনাথের জন্ম না হলে বাংলা সাহিত্যের কি হতো’ জাতীয় কথা ।এগুলো কথা শুনে একজন মানুষ নির্বোধ বাগাড়ম্বর করে যাওয়ার কৌশল ছাড়া আর কি শিখতে পারে ? অমুকের জন্ম না হলে এই হতো না , তমুকের জন্ম না হলে সেই হত না ,অমুক একজনই হয় ,তমুক হাজার বছরে একটিও পাওয়া যাবে না ,অমুকের তুলনা অমুক নিজেই… ।এমন ধারার কথা বা লেখা যাঁর সম্পর্কেই বলা হোক না কেন তাঁর সম্পর্কে জানেন না এমন কারো সামনে তাঁর সৃষ্টি বা কর্মকে তুলে ধরতে পারে না। তাহলে এগুলো বলার অর্থ হলো স্তাবকদের নিজেদের জাহির করা ।

একটি কথা স্তাবকদের প্রায় সবাই বলছেন যখন নাকি বিদেশী সাহিত্যে যুব সমাজ আসক্ত হয়ে পড়ছিল বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের লেখকদের লেখায় বাংলাদেশ সয়লাব হয়ে যাচ্ছিল তখনই আবির্ভাব হলো হুমায়ূন আহমেদের ।এসব কথার মধ্য থেকে মনে হয় হুমায়ূন আহমেদ পশ্চিম বঙ্গের বা বিদেশী সাহিত্যিকদের ঠেকানোর জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তিনি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন এখানকার মুদ্রন শিল্পকে বাঁচানোর জন্য ইত্যাদি ।তাহলে এসব লোকের আলোচনায় হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম বলে কিছু থাকছে না । তাঁকে দেখা হচ্ছে একজন প্রকল্প বাস্তবায়ক হিসাবে।যে কারণে আমাদের দেশের এ ধরনের স্তাবকদের সবকিছুই বিদেশী হয় এমনকি নতুন আবিষ্কার “উত্তরীয়” পর্যন্ত ,ঠিক একই কারণে তাঁরা আবার যেসব বিষয়ের স্থান-কালের সীমানাই থাকা উচিত নয় সেই গুলোকে আটকে দিয়ে বা আটকে দেওয়ার মধ্যদিয়ে দেশপ্রেমের হুংকার ছাড়েন ।বই যদি বই হয় ,সাহিত্য যদি তা সাহিত্য হয় , সঙ্গীত যদি তা সঙ্গিত হয় তবে তা দেশ-কালের উর্ধ্বেই থাকার কথা ।কাজেই বইয়ের আগ্রাসন , সাহিত্যের আগ্রাসন, সঙ্গতের আগ্রাসন বলে কিছু থাকতে পারে না ।আর কোন কিছু যদি বই না হয় , সাহিত্যই না হয় , সঙ্গিতই না হয় তবে তারই বা দেশী বা বিদেশী হওয়াতে পার্থক্য কি হবে?দেশী পর্নোগ্রাফি ভাল ,বিদেশী পর্নোগ্রাফি খারাপ এমন করে কি আমরা বলতে পারি? যদি এমন হয় যে , দেশী পর্নোগ্রাফি ছেপে আমাদের প্রকাশনা শিল্পের রম-রমা অবস্থা সম্ভব তবে কি তাকেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা বিকাশ হিসেবে ধরতে হবে? দেশী হোক বা বিদেশী হোক কোন প্রকার পর্নোগ্রাফি ঠেকানো কি হুমায়ূন আহমেদের কাজ ? নাকি তিনি তা করেছেন কখনো? তাহলে বিদেশী সাহিত্যের আগ্রাসন থেকে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের যুব সমাজকে রক্ষা করেছেন এসব কথা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় ? এর মধ্য দিয়ে কি হুমায়ুনকে মূল্যায়ন করা যায় ?প্রকাশনা শিল্প বাঁচুক বা মরুক তাতে হুমায়ূন আহমেদের কি?আর এসবের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের মূল্যায়ন হচ্ছে কিভাবে ?

সমালোচনার মধ্যদিয়েই কারো সৃষ্টি টিকে থাকতে পারে এবং সমৃদ্ধ হতে পারে ।হুমায়ূন আহমেদের পাঠকের সংখ্যা বিশাল ।হুমায়ূন আহমেদের অকাল মৃত্যুতে তাঁরা ব্যথিত হয়েছেন , কষ্ট পেয়েছেন তাঁর প্রতি ভালবাসার টানে ছুটে গিয়েছেন তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে । এসব পাঠকদের মুখে কষ্টের কথা শোনা গেছে , ভালবাসার কথা শোনা গেছে কিন্তু স্তাবকতা মার্কা কোন কথা শোনা যায়নি ।তাঁরা কখনো বলেননি –‘আমরা ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ঘরে ঢুকিয়েছেন বা আমরা পড়তে ভুলে গিয়েছিলাম তিনিই আমাদের পড়তে শিখিয়েছেন বা আমরা বিদেশী সাহিত্যে আসক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সেই আসক্তির হাত থেকে বাঁচিয়ছেন’।স্তাবকতা যাঁরা করছেন তাঁদের ‘শব্দ’, ‘বাক্য’ মনে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরী করে তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের লেখা আদৌ পড়েছেন কিনা ।না-ই পড়তে পারেন ,কিন্তু কারো জনপ্রিয়তার স্রোতের সাথে নিজের নামটা যুক্ত করার জন্য স্তাবকতার আশ্রয় নিলে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি হয় বটে কিন্তু সমাজের এবং মানব মূর্তির জন্য ভাল কিছু হয় না ।

সাধারণভাবে স্তাবকতা খারাপ হলেও সব মানুষের স্তাবকতা সমাজের মধ্যে সমান মাত্রার প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না ।যাঁদের সমাজের মধ্যে একটা পরিচয় আছে , সমাজের অনেক মানুষ যাঁদের কথায়-লেখায় প্রভাবিত হতে পারে তাঁদের কথা বলার ক্ষেত্রে বা লেখার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ।এসব মানুষের স্তাবকতায় সমাজের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয় ।কোন মানুষ মারা গেলে অনেকেই তাঁর স্মৃতিচারণ করেন । চারপাশের কাছের মানুষের কাছে তাঁর অনেক স্মৃতি থাকে । কোন স্মৃতি থাকে মজার , কোন স্মৃতি থাকে বেদনার ।মজার হোক বা বেদনারই হোক যিনি স্মৃতিচারণ করেন তিনি কিন্তু নিছক মজা বা বেদনা দেওয়ার জন্য তা করেন না ।তিনি তা করেন মানুষের কাছে পরিচিত মানুষটিকে আরো আপন করার জন্য এবং সমাজে শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য ।কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তি হুমায়ূন আহমেদের ‘মজার স্মৃতি’ বর্ণনা করতে গিয়ে এমন সব কথা লিখেছেন যার অধিকাংশই তাঁর সাথেকার কোন স্মৃতি নয় ।তাতে সমস্যা নয় ।সমস্যা হলো এসব স্মৃতির অধিকাংশই আমাদেরকে কিছু শেখায় না । যা শেখায় তা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয় ।এর মধ্যদিয়ে ক্ষতি যা হয় তা হলো শ্রদ্ধাভাজন মানুষটি একটি গড়পড়তা কথার মানুষে পরিণত হন ।সমাজে যার ক্ষতি কম নয়।এসবের মধ্য দিয়ে এমন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগণ সমাজের মধ্যে মোহের সংস্কৃতি , লোভের সংস্কৃতি তৈরীতে ভুমিকা রাখেন । স্মৃতিচারণ আর নিছক স্মৃতিচারণ থাকে না, তা’ পরিণত হয় স্তাবকতায় ।

এসব স্মৃতিচারণে বা স্তাবকতায় যেহেতু আলোচনা-সমালোচনা বলে কিছুই থাকে না এবং এগুলো করা হয়ে থাকে কারো জনপ্রিয়তার স্রোতে নিজেদেরকে শামিল করার জন্য বা কতকগুলো অর্থনৈতিক বিবেচনা থেকে ,তাই এসব খুবই ক্ষণস্থায়ী হয় ।এদেশে অনেক মহান সাহিত্যিক, কবি,উপন্যাসিক , নাট্যকার জন্মগ্রহন করেছেন । তাঁদের অধিকাংশেরই জন্ম দিবস , মৃত্যু দিবস কোন্ দিক দিয়ে চলে যায় এসব ‘সমালোচক(?)’গণ জাননেনও না ।কবি শামসুর রাহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,সেলিম আল দীন ,জীবনানন্দ দাশ,মাইকেল মধুসূদন দত্ত , সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ … এরকম আরো অনেক নাম বলা যেতে পারে যাঁদের নামটি তেমনভাবে উচ্চারণ হতেও শোনা যায় না ।তাই আজ যাঁরা হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার সাথে নিজেদের নামটি যুক্ত করতে বা কতকগুলো অর্থনৈতিক বিবেচনা থেকে তাঁকে নিয়ে স্তুতি মূলক আবোল-তাবোল লিখছেন এবং বলছেন তাঁদের কাছ থেকে হুমায়ূন আহমেদের অপসৃত হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না ।

জনপ্রিয়তার ,বিশেষ করে কিছু লোক এবং প্রচার মাধ্যমের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় প্রচারিত জনপ্রিয়তার বেশ কিছু অসুবিধা আছে ।এ ধরনের জনপ্রিয় লোকের মৃত্যুর পর প্রচার মাধ্যমগুলোর এমনই মাতম শুরু হয় যার মধ্য দিয়ে কেবল স্তাবকেরাই তাঁর সম্পর্কে বলতে লেগে যায় । এর মধ্যদিয়ে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন কোনভাবেই হতে পারে না । জনপ্রিয়তার স্রোতে তাঁর ভাল বা সাধারণ সকল কাজই একই গতিতে প্রবাহিত হতে থাকে । এর মধ্যে অবশ্য ব্যবসায়িক স্বার্থ নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকে ।ফলে একসময় তাঁর সকল কাজই গতানুগতিক ধারায় পর্যবসিত হয় । ভাল কাজগুলো বিশেষভাবে কখনোই আলোচনায় আসতে পারে না । তাই এ ধরণের জনপ্রিয়তা কিছু লোকের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহৃৎ হলেও শেষ বিচারে তা তাঁর সৃষ্টির মূল্যায়নের অন্তরায়ই হয়ে ওঠে ।শুধু সৃষ্টির মূল্যায়নই নয় জীবদ্দশায়ও এ ধরণের জনপ্রিয়তা তাঁর বিচ্যুতি ঘটাতে পারে ।জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে যেতে পারেন ।জনপ্রিয়তা তাঁকে উদ্ধত করে তুলতে পারে ।জীবদ্দশায়ও তিনি স্তাবক দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন ।প্রকৃত বন্ধুর মত তাঁর বিচ্যুতির সমালোচক বলে কেউ তাঁর পাশে থাকে না ।তিনি তখন তাঁর অবস্থান বদলে সহজেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারেন । স্থূলতায়, তারল্যে,গতানুগতিকতায় নানাভাবে সে স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পেতে পারে ।শুধু তাঁর সৃষ্টি কর্মেই নয় ব্যাক্তিগত বা সামাজিক জীবনেও তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারেন ।স্তাবকেরা তাঁর সকল স্বেচ্ছাচারী কাজকেই বাহবা দিয়ে চলে ।এতে সমাজের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হয় ।কারণ এসব জনপ্রিয় লোকেরা যেসব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সমাজে তার প্রভাব নিতান্তই ফেলনা নয় ।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তির স্মৃতিচারণমূলক লেখায় একটি বিষয় দেখে খুবই অবাক হলাম ।তিনি এস্টাবলিশমেন্টের বিরূদ্ধে হরদম লিখে চলেছেন,বৈষয়িকতার বিরূদ্ধে লিখে চলেছেন ভাল। সেই তিনি কি করে তাঁর লেখায় বলে বসতে পারেন –হুমায়ূন আহমেদ বৈষয়িক ছিলেন না ?হুমায়ুন আহমেদ বৈষয়িক না হলে বাংলাদেশে বৈষয়িক কে ?বৈষয়িক হওয়াকে তিনি ‘পাপ’ মনে করতে পারেন কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ নিশ্চয় তা মনে করতেন না ।এ ধরণের কথা বলে তিনি তাঁর নিজের অবস্থানকে এবং তিনি যে দর্শন ধারণ করেন বলে প্রচার করেন তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় ?হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত এমনই সব স্তাবকতা পূর্ণ লেখা এবং কথা চলছে যা থেকে আমরা তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু জানতে পারি না ।