ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

image-3559
বাংলায় প্রথম কুরআনের অনুবাদ করেছিলেন কে? আমাদের দেশের নাম করা কোন পীর নন। অনুবাদ করেছিলেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী পণ্ডিত। পরবর্তীতে যিনি ব্রাহ্ম ধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করেন। আমরা যাকে ভাই গিরিশ চন্দ্র নামে জানি। উদ্দেশ্য ছিল মহা পবিত্র কুরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার সাধন।

এই মহান মানুষটি শুধু যে মহা পবিত্র কুরানেরই অনুবাদ করেন তা নয়। তিনি মিশকাত শরীফের প্রায় অধিকাংশ হাদিস, তাজকিরাতুল আউলিয়া, দিওয়ান-ই-হাফিজ, গুলিস্তাঁ, বুস্তাঁ, মকতুব্বত-ই-মাকদুস, শারফ উদ্দিন মুনিবী, মসনভী-ই-রুমী, কিমিয়া-ই-সাদত, গুলশান-ই-আসরার সহ বহু ইসলামি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন।

তৎকালীন মুসলমান আলেমসমাজ এই মহৎকর্ম সম্পাদন করার জন্য এই অজ্ঞাতনামা অনুবাদকের প্রশংসা করে ব্রাহ্মসমাজের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। যা আমাদের বর্তমান আলেম সমাজের কাছ থেকে চিন্তাই করা যায় না।

তাঁদের প্রশংসাপূর্ণ পত্রের অংশবিশেষ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

আমরা বিশ্বাস ও জাতিতে মুসলমান। আপনি নিঃস্বার্থভাবে জনহিত সাধনের জন্য যে এতাদৃশ চেষ্টা ও কষ্ট সহকারে আমাদিগের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার সাধনে নিযুক্ত হইয়াছেন, এজন্য আমাদের অত্যুত্তম ও আন্তরিক বহু কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি দেয়। কুরআনের উপরিউক্ত অংশের অনুবাদ এতদূর উৎকৃষ্ট ও বিস্ময়কর হইয়াছে যে, আমাদিগের ইচ্ছা, অনুবাদক সাধারণ সমীপে স্বীয় নাম প্রকাশ করেন। যখন তিনি লোক মন্ডলীয় এতো দৃশ্য উৎকৃষ্ট সেবা করিতে সক্ষম হইবেন, তখন সেই সকল লোকের নিকট আত্ম-পরিচয় দিয়া তাঁহার উপযুক্ত সম্ভ্রম করা উচিত।

এ ছাড়াও গিরীশ চন্দ্র রচনা করেন জীবনীগ্রন্থঃ

*ইমাম হাসান ও হোসাইন। প্রকাশকাল ১ জানুয়ারি, ১৯০১।
*চারিজন ধর্মনেতা [প্রথম চার খলিফা, তথা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)]-এর জীবনী। প্রকাশকাল ২৫ জুলাই, ১৯০৬।
*চারি সাধ্বী মোসলমান নারী (হযরত খোদেজা, ফাতেমা, আয়েশা ও রাবেয়ার জীবনী।) মৃত্যুর পর প্রকাশিত।

আজকাল এ দেশে যারা নিজেদের পীর বলে দাবী করেন তারা দাবী তুলছেন হিন্দুদের তৈরি কাব্য বর্জনের। যদিও তাদের শিক্ষা সূচনা হয়েছিল সীতানাথ বসাক এর আদর্শ লিপি পাঠের মধ্য হতে। তারাও বেড়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে নানান কবি সাহিত্যিকের সৃষ্ট পাঠ পড়েই। আর তাতে তাদের ধর্ম কর্মে কোন ব্যাঘাত ঘটেছে কিনা তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, তারা পড়েছেন সত্য তবে হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সে কারণেই নিজেদেরকে ক্ষুদ্র মানসিকতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে সক্ষম হন নি। আশ্চর্যের বিষয় হল তাদের এই দাবী মানার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বেশ উৎসাহী হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই এনসিটিবি রেখেছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব এরপরেই আঘাতটা আসবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত এর উপরে! আমাদের সরকার বাহাদুর তখন কি করবেন?

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এর লেখা “দুঃখের তুলনা” কবিতাটি (একদা ছিল না জুতা চরণও যুগলে/ দহিল হৃদয় মম সেই ক্ষোভানলে ….) অনেক আগেই পাঠ্যসূচি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন দেখছি যতীন্দ্র মোহন বাগচী-এর কবিতা ‘কাজলা দিদি’ কেও সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেন এ সব সাহিত্য পাঠ থেকে শিশু কিশোরদের দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে? বাঙালির বাঙালিয়ানা এই পীর মহাজনদের কাছে কোনোদিনই ভাল লাগেনি যদিও এই বাঙলার আলো জলেই তাদের বেড়ে ওঠা। এই বাঙলার আল ক্ষেত ধরেই তাদের ছুটে চলা। তারা বাংলায় মোনাজাত করেন না উর্দুতে করেন; এমন কি হিন্দিতেও। কেন?

তারা বাংলা শ্লোক বলেন না, উর্দু শের তাদের খুব পছন্দ! উর্দু তো মহানবী(সঃ) এর ভাষাও নয়। তাহলে কেন তাদের এমন উর্দু প্রীতি? তারা জল বলতে নারাজ, বলবেন পানি। পানি তো মুলত উর্দু শব্দ কেন এক্ষেত্রে বাংলা ‘জল’ বলা যাবে না? সাধারন ভাবে মনে হবে এটা হয় উর্দু প্রিতি নয়ত বাংলার অবমাননা, আসলে তা নয় এটাও ঐ সংকির্নতা। কেননা জল শব্দটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ব্যবহার করে। তারা তো ‘বাংলা’ শব্দটিও ব্যবহার করে তাই বলে কি আমরা বাংলার স্থলে অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করব? সেটাও নিশ্চয়ই তারা উর্দু থেকেই নিতেই বলবেন? তাহলে আর বাহান্ন কেন? কেন ভাষা আন্দোলন? কেন সেদিনের আত্মত্যাগ?

এরপরে কি তারা ভাই গিরীশ চন্দ্রকেও বর্জন করতে বলবেন? অসম্ভব কিছু নয়। তৎকালীন ভারতবর্ষের আলেম সমাজ যা মেনে নিতে পেরেছিলেন বর্তমান আলেম সমাজ তার কিয়দংশ পর্যন্ত মেনে নিতে অক্ষম। সেই মানসিক উচ্চতা ক্রমশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। একটি সৎ উপদেশ, একটি মানবতার উক্তি। একটি উচ্চ মাগীয় সাহিত্য যেখানেই থাকুক না কেন। যিনিই রচনা করুন না কেন। তা গ্রহণ করতে তাদের এত বাধে কেন?

আমাদের ভয়টা এই কূপমন্ডুকদের নিয়ে নয় আমাদের ভয়টা যারা সামান্য স্বার্থে এই কূপমন্ডুকদের পদলেহন করে চলেছেন তাদের নিয়ে। আমরা যেন ক্রমশ এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ছুটে চলেছি। ইসলামের কথা বলবেন, বলুন না। তাই বলে হীনমন্যতা কেন? ইসলাম কি মানুষকে কূপমন্ডুকতা শেখায়? মহানবীর শিক্ষা তা নয়। পাকিস্তান যে নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই একই নীতির নব সংস্করণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছি না।

বর্তমান সরকার হয়ত যৌক্তিক কারণেই প্রথম থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য খাতকেই প্রধান এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করেছিল তবে এখন মনে হচ্ছে সমান্তরালভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়া জরুরী। আমাদের অনাগত ভবিষ্যৎ যেন বিভ্রান্ত না হয়। তারা যেন একটি সঠিক দিক নির্দেশনা নিয়েই বেড়ে ওঠে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা কারিকুলামে না আছে দেশপ্রেম আর মানব প্রেমের বার্তা; না আছে ধর্মের মূল ধারণা। অথচ এ দুই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিৎ ধর্মীয় অনুশাষন মেনে চলার পাশাপাশি আবহমান বাঙলার চিরায়ত সংস্কৃতি ধারণ করে কিভাবে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে হবে সে শিক্ষা দান। আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, আমাদের সহিষ্ণুতা, আমাদের সহজিয়া জীবনাচরণই বাঙলার প্রাণ। সে প্রাণের উচ্ছ্বাসে আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠুক বড় মনের মানুষ হয়ে। ভাল মানুষ হয়ে। তাদের মধ্যে গড়ে উঠুক পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহবস্থানের মত সুশীল মানসিকতা। তারা ধার্মিক হোক, কূপমন্ডুক বা সংকীর্ণতা যেন তাদের স্পর্শ না করে।

kmgmehadi@gmail.com