ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

banglar-potchitra
লুঙ্গি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয় এটা আমাদের আরাম সংস্কৃতির অংশ। আরাম প্রিয় বাঙালি খুব সহজেই সকল আরাম উপকরণকে নিজেদের সংস্কৃতির অংশ করে নিতে পারঙ্গম। কিন্তু ধুতি অনেক ঝামেলার জিনিস তাই বাঙালি ওটা ত্যাগ করেছে, বিষয়টি যদি এমন হত তাহলে বলার কিছু ছিল না।
বিষয়টা ভিন্নতর, এখানে আমরা যত বেশি মুসলমান হয়েছি(!) তত বেশি নিজস্ব সংস্কৃতিকে দুরে ঠেলে দিতে চেয়েছি। আশ্চর্যের বিষয় হল নিজস্ব সংস্কৃতিকে এই যে দূরে ঠেলেছি এর পেছনে ছিল না ধর্মীয় কোন নির্দেশনাও।

ইসলামে পোশাকের কোন কোড অব কন্ডাক্ট নেই। আছে দেহ ঢেকে রাখার নির্দেশনা। যার সাথে ধুতি সাংঘর্ষিক ছিল না, যার সাথে শাড়িও সাংঘর্ষিক নয়। অথচ হিন্দুর পোশাক বলে আমরা একে ত্যাগ করতে চেয়েছি। হাস্যকর বিষয় হল হিন্দুদের ব্যবহৃত ধুতি ত্যাগ করে আমরা বৌদ্ধদের ব্যবহৃত লুঙ্গিকে তুলে নিয়েছি, খৃষ্টানদের ব্যবহৃত প্যান্টকে গ্রহণ করেছি। এই গ্রহণ নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। আমার প্রশ্ন হল কেন একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বির দোহাই দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতিকে দুরে ঠেলে দেয়া হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি এ দেশে ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে হিন্দুদের প্রতি তথা বাংলার প্রতি হিংসাত্মক মনোভাবও একইভাবে ছড়ানো হয়েছিল?

এটা স্বীকার করে নেয়াটা হবে অন্যায় অপবাদ। কেননা এ দেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সূফীবাদের মাধ্যমে। যারা আত্তীকরণের পক্ষে, দূরে ঠেলে দেয়া বা হিংসা প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা ভালবাসতে শিখিয়েছেন, ঘৃণা করতে নয়। তারা ভালবেসে, সেবা দিয়েই মানুষকে জয় করেছিলেন। এ দেশে শত শত বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থেকেছে এই সূফীবাদের শিক্ষার কারনেই। সমস্যাটা শুরু হয়েছে যখন এ দেশীয় ইসলামের মধ্যে উগ্র মতবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তখন থেকে। আর সে ক্ষেত্রেও প্রথমেই দায় পাকিস্তানীদের। তারাই শিখিয়েছে ঘৃণা তারাই শিখিয়েছে উত্তম অধম ইত্যাদি। তারা মুসলমানদের প্রতীকী করতে চেয়েছে পোশাকে। তারা আলাদা করতে চেয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। আর সেকারনেই আমরা সবাইকে গ্রহণ করতে পারলেও কেবল হিন্দুদেরকে গ্রহণ করতে পারছি না। অথচ নজরুলের ভাষায় হিন্দু-মুসলিম ছিল একই বৃন্তে ফোটা দুটি ফুল।
দুটি ফুল দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেশ ছিল, যা ছিল প্রতিক্রিয়াশীলদের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায়। বাঙালির বাঙালিয়ানাকে নিঃশেষ করার জন্য প্রয়োজন ছিল তার স্বকিয়তা থেকে দূরে রাখা। সেটা করতে গিয়েই ধর্মীয় বিভাজনকে টেনে আনা হল। আসলে হিন্দুর নাম করে আমাদের সরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে নিজস্বতা থেকে। আমরা বিশ্বের যে প্রান্তেই চোখ রাখি দেখব, ইসলামকে তারা গ্রহণ করেছে নিজস্ব পোষাকে, নিজস্ব ঢংয়ে। ইসলামের মূল অনুশাসনের সাথে যা কিছু সাংঘর্ষিক একজন মুসলমান হিসেবে নিশ্চয়ই সে তা পরিত্যাগ করতে বাধ্য। কিন্তু ইসলামের নাম করে এই যে, এ দেশের মুসলমানদের বাঙালিয়ানা থেকে সরিয়ে আনার প্রয়াস এটা একটি সুনিপুণ ষড়যন্ত্রের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

লুঙ্গি এবং ধুতি এই দুই-ই ভারতীয় উপমহাদেশীয় পোশাক। বড় জোড় বলা যায় একটি হিন্দুদের দ্বারা অন্যটি বৌদ্ধদের দ্বারা বহুল ব্যবহৃত। একই সাথে তৎকালীন মুসলমানদেরও। পরবর্তীতে যখন ভারতবর্ষে মুসলমানদের আধিক্য দেখা গেল তখন তারা ধুতি ছেড়ে লুঙ্গী এবং ঢোলা পাজামায় গিয়ে ঢুকলেন। কোন যুক্তিতে তারা ধুতিকে হিন্দুদের পোশাক আর লুঙ্গী ও ঢোলা পাজামাকে নিজেদের পোশাক বানিয়ে নিলেন তা গবেষণার বিষয়।

এরপরে যখন ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের জন্ম হল তখন দেখা গেল পূর্ব বঙ্গের মুসলিম নারীরাও শাড়িকে ছেড়ে সালোয়ার কামিজের মধ্যে ঢুকে যেতে লাগলেন। এখানেও তারা পুরুষের মত ইসলামকে নয় মূলত পাকিস্তানীদের অনুসরণ করতে শুরু করলেন। আর এরপর যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল তখন দেখা গেল আত্তীকরণের আরেক রূপ। এরা শাড়ী পড়েন আবার মাথায় স্কার্ফ জড়ান। তারা বোরখা পড়েন; কেউ মুখ ঢেকে, কেউ চোখ ঢেকে আবার কেউ মুখ খোলা রেখে।

ইসলাম কি বলে?
ইসলামে মহিলাদের যেভাবে আব্রু করতে বলা হয়েছে তার সাথে আধুনিক পোষাকের মধ্যে আবায়াটাই সবথেকে বেশি সাযুজ্যপুর্ন। কিন্তু এখানে আমরা দেখতে পাই ঐ আবায়াটাই সবথেকে কম ব্যবহৃত হয়। বোরখা বা আবায়া তারা যেটাই পরুন না কেন তার নিচে শাড়ী কোনভাবেই ইসলামের সাথে অসংগতিপূর্ন নয় তাহলে তা ফেলে সালোয়ার কামিজের প্রতি এত মোহ কেন? মুসলমানদের এই পোশাকি মুসলিম হওয়া থেকে যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে।

তাহলে, বাঙালির আদি পোশাক কী?
এর সঠিক উত্তর জানতে হলে আমাদের ১৭০০ থেকে ১৮০০ সালের দিকে চোখ ফেরাতে হবে। তবেই কেবল প্রকৃত উত্তরটি পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে আঁকা পটচিত্র ইতিহাসে এর অক্ষয় স্বাক্ষর। তখন দ্বিমাত্রিক পট চিত্র আকার রেওয়াজ ছিল । যার অনেক চিত্র এখন সংরক্ষিত রয়েছে। যেখান থেকে মুঘল আমল বা তার পরবর্তী ইংরেজ আমলে বাংলার মানুষের পোশাকের পরিচয় মেলে।

তখনকার সময়ে বাংলার অবস্থাপন্ন গৃহস্থ পুরুষের প্রধান পোশাক ছিল ধুতি, শর্ট পাঞ্জাবি (‘ব্যাপারী পাঞ্জাবি’ নামে যেটা পরিচিত, দুই পাশে আর বুকে পাঞ্জাবির মতো পকেট), হাতাকটা ফতুয়া ও ঢোলা পাজামা। মূল কম্বিনেশন ছিল পাজামার সঙ্গে ব্যাপারী পাঞ্জাবি আর ধুতির সঙ্গে ব্যাপারী পাঞ্জাবি ও হাতাকটা ফতুয়া দুটোই।

আর মহিলাদের বেলায় ছিল শাড়ী। তখনকার সময়ে মহিলারা বক্ষবন্ধনীর মত করে একখণ্ড কাপড় বুকে পেঁচিয়ে নিতেন যাকে বলা হত কাঁচুলি। এই কাঁচুলিকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নারীরা ব্লাউজের রূপদান করে। কাজেই ব্লাউজকেও নির্দ্বিধায় বাঙালি পোশাক বলাই যায়।

চলবে……।