ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

লেখার শিরোনাম হচ্ছে, “গৃহকর্মীরা যখন গৃহকর্তী” হতে চায়।” প্রথমেই তাঁর লেখার শিরোনামের প্রতিবাদ করছি, কারণ, গৃহকর্মীদের গৃহকর্তী হতে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, তাই এটি কটাক্ষ করে বলার কোনো সুযোগ নেই। তবে উনি যে ইঙ্গিতে বলেছেন, সেটি আরো ভয়ঙ্কর, যে প্রেক্ষাপটে বলেছেন, সেটি ভয়ঙ্করতম।

লেখাটি উনি লিখেছেন, মিরপুর ডিওএইচএসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তসলিম আহসানের স্ত্রী  আয়েশা লতিফ কর্তৃক শিশুগৃহকর্মী সাবিনা নির্যাতিত হওয়ার প্রেক্ষিতে।

প্রথমেই তিনি যে ভুলটি করেছেন, শিশুগৃহকর্মীর বিষয়টিকে সকল গৃহকর্মীদের সাথে মিলিয়ে ফেলে তিনি বিষয়টিকে অতি সাধারণ করে ফেলেছেন, এবং পক্ষান্তরে গৃহকর্মীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, যাতে শিশুগৃহকর্মী নির্যাতনের বিষয়টি অতি গৌন হয়ে গেছে।

সুপ্রীতি ধর

শুরুতে উনি লিখেছেন, “গত কদিন ধরে একজন কর্নেলের স্ত্রী আয়শা লতিফের গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর পড়ছি। ভয়াবহ নির্যাতন। আয়শা লতিফ নিজে ছয় মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা, এ সময় তার মনটা অনেক নরম থাকার কথা। কে জানে, হয়থ সে শারীরিক নানান জটিলয়তায় ভুগে ভুগে মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, নইলে এমন সুন্দর পরিপাটি থাকা একটা মানুষ সামান্য ডিম পোড়ানোর অভিযোগে কন্যাসম এক শিশুকে এমনভাবে মারতে পারে?”

উনি কি তাহলে বলতে চাইলেন সুন্দর এবং পরিপাটি মানুষ নির্যাতনকারী হতে পারে না? এটা একটা ভয়াবহ কথা। এর বিপরীত কথাটা চিন্তা করলেই ওনার বর্ণবাদী মানসিকতা ফুটে ওঠে। অর্থ দাঁড়ায়, অসুন্দর এবং অপরিপাটি (পোশাক পরিচ্ছদ যাদের সুন্দর রাখার সামার্থ বা ইচ্ছে নেই) মানুষ নির্যাতনকারী হয়।

এরপর ওনার এক বন্ধুর বোনের বরাত দিয়ে লিখেছেন, কীভাবে ওনার বন্ধুর বোনের শিশুটি শিশুগৃহকর্মী দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিল! উনি গৃহকর্মীদের সমালোচনা করতে গিয়ে শিশুশ্রমের সাফাই গেয়েছেন, একইসাথে তাদের অপরাধি বলতেও ছাড়েননি।

ওনার লেখার দ্বিতীয় অংশ

লেখার শেষে এসে তিনি যেটি বলেছেন, সেটি রীতিমত আতঙ্কিত হওয়ার মত বিষয়। উনি ওনার ছোট বেলার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, কীভাবে ওনারা পুরো পরিবার তেরো চৌদ্দ বছরের এক শিশু গৃহকর্মী দ্বারা নির্যাতীত হয়েছিলেন এবং ঐ শিশু তাদের বাসার সব পুরুষ মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করত! উনি লিখেছেন, “আমার জন্য বরাদ্দ দুধও আমার পেটে পড়ত না, মায়া বড়ি খেয়ে মাথা ঘুরত বলে লক্ষ্মী সেই দুধ খেয়ে ফেলত।”

কী ভয়ঙ্কর কাণ্ডজ্ঞানহীন স্মৃতিচারণ। একটি শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত করে, তার শিক্ষ-দীক্ষা-সীমাবদ্ধতা-অপরিপক্বতার কোনো দায়িত্ব না নিয়ে উল্টে তাকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে তাবত গৃহকর্মীদের দোষারোপ করতে চাওয়া!

লেখনিতে উনি পুরুষের (অনেকের পুরুষের) যৌনেচ্ছাকে পুঁজি করে গৃহকর্মীদের গৃহকর্তী হয়ে ওঠার বাসনার কথা বলেছেন। উনি লিখেছেন, গৃহকর্তী গৃহকর্তাকে আবিষ্কার করে রান্নাঘরে গৃহকর্মীর তেলচিটচিটে বিছানায়। বাক্যটিতে সুস্পষ্টভাবে গৃহকর্মীদের প্রতি তাচ্ছিল্য আছে, উনি গৃহকর্মীদের রান্নাঘরে তেল চিটচিটে বিছানায় ঘুমানো মেনে নিয়েই কথাগুলো বলেছেন, আবার একজায়গায় গৃহকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন!

উনি লিখেছেন, “বোকা মেয়েগুলো জানে না পুরুষের দৌড় ঐ বিছানা পর্যন্তই।” এই বাক্যটি লিখে উনি গৃহকর্মীদের অপমানের চূড়ান্ত করেছেন, বলতে চেয়েছেন, যে লোভে গৃহকর্মীরা গৃহকর্তার সাথে যায় সেটি পূরণ হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম কয়টি উদাহরণ উনি দেখাতে পারবেন? কিন্তু এরকম উদাহরণ অনেক আছে যে শিশু গৃহকর্মী গৃহকর্তা দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে উল্টে গৃহকর্তীর কাছে লাঞ্চিত হয়েছেন। গুগলে সার্চ দিলে এরকম খবর অনেক পাওয়া যাবে।

এটা খুবই হৃদয় বিদারক যে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা ওনার মত আধুনিক একজন নারী এভাবে একটা শ্রেণিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চূড়ান্ত করতে পারে! অথচ আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, ‘ইজ্জত’ বিষয়ে গৃহকর্মীরা খুবই সতর্ক এবং তারা গৃহে কাজ করতে ভয় পায় প্রধানত এই কারণে যে শারীরিকভাবে গৃহকর্তাদের দ্বারা নির্যাতীত হয়ে আবার উল্টে তাদেরই অপবাদের শিকার হতে হয়। বিস্ময়করভাবে সে কাজটি নারী অধিকার নিয়ে কাজকরা একজন গণমাধ্যমকর্মী করলেন খোলামেলাভাবে।

আমি ‘ওমেন চ্যাপ্টারের’ সম্পাদক সুপ্রীতি ধরকে কিছু কথা বলতে চাই-

১। প্রথমত, সমস্যাটা শিশুগৃহকর্মী নিয়ে, তাই ঢালাওভাবে গৃহকর্মীর প্রসঙ্গ টানাটা খুবই অপ্রাসঙ্গিক হয়নি কি? আপনি লিখেছেন, “আয়েশা লতিফের মেজাজ হয়ত খিটখিটে হয়ে গেছিল।” এ ধরনের উপলব্ধি ভালো, কিন্তু প্রেক্ষিত বিবেচনায় একজন শিশুনির্যাতনকারীকে এভাবে ডিফেন্ড করা যায় কি? তাতে অন্য নির্যাতনকারীরাও এক ধরনের আস্কারা পায়, কারণ, এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে ঘরে ঘরেই এ ধরনের শিশু নির্যাতন চলছে, ফাঁক গলে দু’একটি তার খবর হয় মাত্র।

২। একজন শিশুকে এভাবে কাজে লাগানোই তো প্রথমত অবৈধ এবং অমানবিক। শিশুগুলোর পিতা-মাতার দিক থেকে তা অারো বেশি অমানবিক এবং বেআইনী হওয়াও উচিৎ। আপনার “ওমেন চ্যাপ্টার” পত্রিকার দায়িত্ব থেকে যায় এদের নিয়ে কাজ করার, কারণ, নারী শিশু, যারা বিভিন্ন গৃহে এখন কর্মী, তারাই ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ নারী। আপনার “ওমেন চ্যাপ্টার” নিশ্চয়ই শুধু সমাজের “শিক্ষিত-সুন্দর-রুচিসম্পন্ন” নারীদের ক্ষোভের কথা বলার জন্য এবং চলার পথ সুগম করার জন্য নয়, এটি হওয়া উচিৎ সকল শ্রেণির নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য। গৃহকর্মী, পোশাক শ্রমিক, এদের কথাও খুব করে থাকা উচিৎ, কারণ, এরা সমাজের কর্মজীবী নারীদের বড় অংশ।

দুঃখজনক হচ্ছে আপনি আপনার লেখায় গৃহকর্মীদের কর্মজীবী নারী ভাবতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৩। গৃহকর্মী দিয়ে কাজ করানো চাকরির মত নয়, তাই এক্ষেত্রে অন্য পাঁচটা চাকরির সাথে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। অন্য কোনো চাকরি ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয় না, মধ্যরাতে শেষ হয় না। সকল চাকরিতে সপ্তাহে একদিন হলেও ছুটি থাকে। মাঝে মাঝে অন্যান্য ছুটি থাকে। কিন্তু বাসায় স্থায়ীভাবে যারা কাজ করে, দেখা যায়, তারা তিন মাস-ছয় মাস এক নাগাড়ে কাজ করছে।

আমি আজকেই একজন শিশু গৃহকর্মীর সাথে কথা বলেছি, সে বছরে মাত্র একবার বাড়ী যায়। প্রতি মাসের বেতন তার মনিব নাকি শিশুটির পিতার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরকম কিছু শিশুদের সাথে কথা বলে মিস/মিসেস সুপ্রীতি ধর অভিজ্ঞতা আরো ঋদ্ধ করবেন বলে মনে করি।

৪। থাকা খাওয়া বাদে পাঁচ হাজার টাকা বেতন কোনোভাবেই উচ্চ বেতন নয়। গৃহকর্মীরা রুম দখল করে থাকে না। তারা বাসার অতিরিক্ত (অব্যবহৃত) জায়গায় থাকে, তাই থাকা বাবদ কোনো টাকা বরাদ্দ ভাবার সুযোগ নেই।

খাওয়া যদি ৩০০০ টাকা ধরি (যদিও তারা অতিরিক্ত খাবারগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খায়), তাহলে ওনার কথা অনুযায়ী বয়স্ক গৃহকর্মীর মোট বেতন হয় ৮০০০ টাকা। একজন মানুষ ‘২৪ঘণ্টা’ ধরে কর্মচারী, চাইলে মধ্যরাতেও তাকে ডেকে তুলতে পারা যায় কাজের জন্য, তাহলে ৮০০০ টাকা বেতন কি খুব বেশি হয়ে গেল?

৫। সত্য হচ্ছে, শিশুগৃহকর্মীদের বেতন ৫০০ থেকে ২০০০ টাকার বেশি হয় না, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। কিন্ত শিশু বলে ধমকিয়ে-ধামকিয়ে তাদের দিয়ে কাজ করানো যায় বরং বেশি। সুপ্রিতী ধর আপনি বাংলাদেশের সমাজের কোনো খবর আসলে রাখেন না বলেই মনে হল। আপনার পত্রিকাটা নারীবাদী হলেও গৃহকর্মী ইস্যুতে আপনি হয়ে গেলেন খুবই সামান্তবাদী। নারী অবমাননা করতেও ছাড়লেন না!

৬। যেভাবে গৃহকর্মী নিয়ে আপনি আপনার অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন, সেটি নোংড়ামী, অপ্রয়োজনীয় এবং অবমাননাকর ঠেকছে আমার মত অনেকের কাছে। একজন তেরো চৌদ্দ বছরের কিশোরী গৃহকর্মী বাসায় রেখে তাকে সঠিকভাবে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা না করে তার কাছ থেকে কোনো নেতিবাচক আচরণ পেলে সে দায় আগে নিতে হবে সুপ্রীতি ধর আপনাকে, বা আপনাদের পরিবারের তখন বড় যারা ছিল তাদেরকে।

আপনার এ ধরনের স্মৃতিচারণ মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। একজন প্রভাবশালী মানুষ সম্পর্কে পারবেন এভাবে কথা বলতে কোনো প্রমাণ না দেখিয়ে? যেভাবে আপনি মেয়েটির ‘মায়া বড়ি’ খাওয়ার কথা লিখেছেন, তাতে আমরা যারপরেনাই বিস্মিত হয়েছি!

আমরা নারী অধিকার, অসলে নির্যাতিতের এবং বৈষম্যের শিকার মানুষদের নিয়ে কাজ করা একটি পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল লেখা আশা করি। পরিশেষে আপনার পত্রিকার শুভকামনা করছি, কারণ, আমি মনে করি আমাদের সমাজে নারী অধিকার নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।