ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

“I wanted to be successful, not famous.” – George Harrison

কম্পিউটার চেপে বাংলায় একটা কিছু লিখে ফেলার টেকনোলজি , খুলনা শহরে তখনও নতুন , প্রেসে ছাপালে সম্ভব কিন্তু সেটা অনেক টাকার মামলা ! আর সে কাজ করতেও চাচ্ছিলাম না –হাতে লিখে ফটোকপি করে ফেলা সম্ভব -কিন্তু দেয়াল পত্রিকা , ওয়াল চিকায় আর পোস্টারে – এতো এতো লিখেছি , নিজের হাতের লেখা আর দেখতে চাইছি না । অনেক খুঁজে শহরে পেলাম – নতুন প্রযুক্তি নাম ‘ইলেক্ট্রনিক টাইপ রাইটার’ –হরফ গুলো কম্পিউটার ছাপা অক্ষরের মতো। প্রতি পাতা ১২ টাকা দরে ১৮ পেজ ২১৬ টাকা । কিন্তু  যুক্তাক্ষর টাইপ করতে যেয়ে দেখা দিল ভয়াবহ সমস্যা। টাইপিস্ট বলে দিলো –‘এ কাম জম্মের পেরেশানি , ভাইডি মাপ চাই’ অনেক অনুনয় বিনয় করে শেষ হলো , খরচ দাঁড়ালো ৪০০ টাকা। মূল কাজ ফটোকপি  এখনও বাকী , অথচ বাজেট সর্বসাকুল্যে ৫০০ টাকা।

ক্যাম্পাসে সদা সর্বদা স্যারদের রক্তচক্ষু , সাথে কঠোর অনুশাসন, এর মধ্যেই  প্রতিদিন চলছে ক্লাস টেস্ট আর সেশানাল । ভীষণ একঘেয়ে এবং বৈচিত্রহীন জীবন , কতো কতো কিছু করতে না পারার মাঝে ,আছে তবু একটা কিছু করার ‘স্বপ্ন’ । আছে অর্থনৈতিক সংকট , আছে অস্থিরতা । আপনারা অনেক কবিরাই আপনাদের কবিতার জন্য যেমন কোন রয়্যালটি চান নি , তেমনি ১০ টাকা শুভেচ্ছা মূল্য দিয়ে সেটি কেনাতেও তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেন নি।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মাঝে সেটা ছিল নিতান্তই গুরুত্বহীণ একটি ঘটনা । জানুয়ারী ১৯৯২ইং , মাঘ ১৩৯৮ বাং । বি আই টি ,খুলনা (বর্তমানে কুয়েট) । জন্ম নিয়েছিল একটি সাহিত্য  সংকলন নাম ছিল  ‘ক্র্যাচ’ , সে কথা আপনাদের মনে থাকবার কথা নয়।

 

“Don’t criticize what you can’t understand.” – Bob Dylan

a

২৫ কিংবা ২৬ বছর আগে কোন একদিন লাইব্রেরীতে বসে পত্রিকা থেকে টুকে নেয়ার সময় একটি স্টোরি লিখে এনেছিলাম , তাতে ‘বব ডিলান’ নামীয় একজনের কিছু কথা ছিল এবং সেই  ‘অজানা স্টোরি’টি ছাপবো বলে পরে নিজ স্বার্থ চরিতার্থে একটি সংকলন ছেপেছিলাম । ‘বব ডিলান’ মানে আমি এতটুকুই জানি।

অথচ আপনি এখন অনায়াসেই গুগুল মেরে বলে দিতে পারেন ‘বব ডিলান’ আদতে কী ছিলেন -একজন মৎস্য শিকারী , নভোচারী নাকি তায়েকান্দো খেলোয়ার ? স্যরি মাপ করবেন – আমি লেটেস্টটা জানি না । একাত্তুরে তারা কী কী করেছিলেন তা  কিছুটা  জানি মাত্র , আপনার এসব জানায় আগ্রহ নেই । আপনি মহামান্য ফেসবুকার , আপনি জানেন এলেন গিন্সবার্গ একজন ‘গে’ ছিলেন । বব ডিলান  বাংলাদেশ কনসার্ট-এর নাম করে কালেকশনের পুরো টাকা মেরে দিয়েছিলেন। আপনি জানেন , জোয়ান ব্যেজ  যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার  কোন মানবতাবাদী নন ,  তিনি ছিলেন  ডেভিড হ্যারিস , জন লেনন , বব ডিলান এবং সর্বোপরি স্টিভ জবস এর একজন প্রাক্তন প্রেমিকা। দাদা ভাই , আপনি অনেক জানেন ,আপনাকে স্যালূট জানাতে চাই।

“I went to jail for 11 days for disturbing the peace; I was trying to disturb the war.” –Joan Baez.

 

*নীচের লেখাটি  “ক্র্যাচ” থেকে  সম্পূর্ণ কপি  এবং পেস্ট , মূল লেখায় বানান ভুল এবং তথ্যে কোন গরমিল থাকলে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনার অনুরোধ । ‘ক্র্যাচ’ বানানটি অভ্রতে সংকলনটির মতো  ‘ক’ যোগে লেখা গেল না * 

1

“ক্র্যাচ” , প্রথম সংখ্যা

মাঘ ১৩৯৮ বাং

“অন্যদেশ- অজানা সংগ্রাম”

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ সব’চে বড়ো ঘটনা। সেই উত্তাল সময়ে দেশের ভেতর গড়ে উঠেছে সশস্ত্র প্রতিরোধের দুর্গ । মুক্তিযোদ্ধার বুকে  প্রতিশোধের আগুন- নতুন পতাকা চাই। নতুন মানচিত্র চাই ; ঘর থেকে যখোন  বেড়িয়েছি খালি হাতে আর ফিরবো না । এ আগুন তখোণ কেবল বাংলাদেশেই ঘাপটি মেরে ছিল না , পৃথিবীর তাবৎ বাতাসেও সে ছড়িয়ে পড়েছিল , খ্যাত-অখ্যাত অসংখ্য মানুষ আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহায্য সহযোগিতার হাত । পাকিস্তানীদের নির্মম গণহত্যা ছুঁয়ে গিয়েছিল প্রত্যেকটি সচেতন মানুষের হৃদপিণ্ড । দেশের সাহসী সংস্কৃতি সেবীরা যখন সম্মিলিত কন্ঠে মুক্তির গান , মুক্তির কবিতা উচ্চারণ করছিলেন তখন আন্তর্জাতিক পরিসরেও একই সুর , একই কথা উচ্চারিত হচ্ছিল।

একাত্তুরের বিশে নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় নিয়ুঅর্কের সেন্ট জর্জ চার্চে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে বর্তমান বিশ্বের প্রধান দুই কবি এলান গীন্‌সবার্গ এবং রুশ আন্দ্রে ভজনেসেনস্কী একই মঞ্চে উঠে কবিতা পাঠ করেছিলেন।

মার্কিন যুদ্ধ বিরোধী কবি গীন্‌সবার্গ একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এসেছিলেন বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। শরনার্থী শিবিরের নিদারুণ দুর্দশা তাকে আলোড়িত করেছিলো। নিজের ভেতরের সেই আলোড়ন থেকেই জন্ম নিয়েছিলো তার বিখ্যাত কবিতা “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড”-এর , কবিতার কিছু অংশ-

Millions of souls nineteen seventy one
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan ….. 

Wet processions Families walk
Stunted boys big heads don’t talk
Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise.

2

কবি নিজেই পরে এই কবিতার সুর দিয়ে গান করেছেন। তার হৃদয়ে এখনো লেপটে আছে সেই বাংলাদেশ , সেই মুক্তিযুদ্ধ- সেই গান তার প্রিয় গান ছিলো।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অগণিত শিল্পী-সাহিত্যিক-লেখক-বুদ্ধিজীবি বহু অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন । সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয়েছিল একাত্তুরের পহেলা আগস্টে –নিয়ুঅর্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে –“দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” সেটা ছিল এক অবিস্মরণীয় সংগীত সন্ধ্যা, যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্বখ্যাত সেঁতার বাদক পন্ডিত রবি শংকর আর বিটল্‌স গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান জর্জ হ্যারিসন

সেই অনুষ্ঠানেই টানা ছ’টি গান গেয়েছিলেন প্রতিবাদী গানের রাজা বব্‌ ডিলান। এ অনুষ্ঠানেই তিনি গেয়েছিলেন তার সেই পঞ্চাশ লাইনের দীর্ঘ গান “এ হার্ড রেন ইজ গোননা ফল”

এ অনুষ্ঠানেই জন্যে জর্জ হ্যারিসন লিখলেন নতুন গান-

“দু’ চোখে দুঃখ নিয়ে বন্ধু এলো কাছে সাহায্য চাই, দেশ বুঝি যায় ভেসে

যদিও অনুভব করতে পারি নাই তার দুঃখ

তবু জানতাম আমার কাছে প্রয়াসের প্রয়োজন”

বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের উপর পাকিস্তানীদের অমানুষিক বর্বরতা চরম ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী শিল্পী জোয়ান ব্যেজ কেও , ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  যুদ্ধের বিরুদ্ধে যার প্রতিবাদী ভুমিকা বিশ্ববিদিত। মানবতাবাদী এই শিল্পী তার হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা এক করে লিখেছিলেন এক অসামান্য গান।  জোয়ান ব্যেজের এই “বাংলাদেশ” গানের সুরকার তিনি নিজেই , গেয়েছেনও তিনি ।

বাংলাদেশ’- জোয়ান ব্যেজ

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কাহিনী

সেতো আইন প্রসূত আদেশ পালনে সিদ্ধ

অন্ধদের হাতে

নতুন করে গড়া সেই প্রাচীন কাহিনী

যে আইনের উপর নির্ভরশীল জাতি সমূহ

যে আইন মাতৃভূমির জন্য দাবি করে আত্মত্যাগ।

 

3

কোরাসঃ

বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

পশ্চিম দিগন্তে সূর্য অস্ত যায়

লক্ষ মানুষ নিহত হয় বাংলাদেশে

আমারা পাশে দাঁড়িয়ে দেখি

ক্রুশবিদ্ধ পরিবার , কিশোরী মাতার অসহায় শূন্য দৃষ্টি

তার শিশু লড়াই করছে ঝড়-বৃষ্টি আর কলেরার সাথে।

ছাত্রাবাস সন্ত্রাস

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খুন হচ্ছে সৈনিকের হাতে,

নিদ্রমগ্ন ছাত্ররা তাদের বিছানায় সৈনিকের গুলিতে

ভয়ার্ত চিৎকার , হিমঠান্ডা পরিবেশে , রক্তাপ্লুত বিছানা বালিশ।

কোরাসঃ

বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

ফৌজি অফিসারের রক্তদানের আহ্বান

কি অদ্ভুত শোনায়- স্বেচ্ছায় রক্তদান

ওরা অনেক করেছে , দিয়েছে শরীরের প্রতিটি রক্তকণা

আঘাত কিংবা রক্তপাতের বেদনাকে

গ্রাহ্য করেনি কখনো।

তাইতো বাংলাদেশের কাহিনী

সেতো আইন প্রসূত আদেশ পালনে সিদ্ধ

অন্ধদের হাতে

নতুন করে গড়া সেই প্রাচীন কাহিনী

যে আইনের উপর নির্ভরশীল জাতি সমূহ

যে আইন মাতৃভূমির জন্য দাবি করে আত্মত্যাগ”

4

এভাবে দীর্ঘ ন’মাসের যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সম্পৃক্ত ছিলো অন্যদেশের অন্য সংগ্রাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা  যুদ্ধে এসব মানবতাবাদী শিল্পীর অসামান্য অবদানের কথা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে, যতোদিন বাংলাদেশ আছে ততোদিন , যতোদিন এদেশের মানুষ আছে ততোদিন।

সূত্রঃ আজকের কাগজ।