ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ তখন স্বাধীন, অসংখ্য বিপর্যস্ত শিশু পড়ে আছে শহরের রাস্তায় রাস্তায়। ‘কানাডিয়ান চ্যারিটি ফ্যামিলিস ফর চিলড্রেন’ নামে ছোট একটি প্রতিষ্ঠান সেই সময় একটি শিশু-হোম স্থাপন করল ঢাকায়।  ১৯৭৭ সালে বৃটিশ ভিত্তিক সংগঠন ‘ফ্যামিলিস ফর চিলড্রেন’ শিশু-হোমটির দেখভালে নিয়োজিত হল। ১৯৮১ সালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একজন স্ট্যুঅর্ডেস্, তিনি তখন মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে এসে এসে কাজ করে যান সেই শিশু-হোমে। তারপর একদিন, ঢাকায় অবস্থিত সেই শিশু-হোমটি সরিয়ে নিতে তাগাদা দিলেন বাড়িওয়ালা। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের সেই স্ট্যুঅর্ডেস্, তার বস ‘গ্যারি’ সাথে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের অন্য ডিরেক্টররাও এর স্থানান্তর নিয়ে মাথা ঘামাতে লাগলেন। ঢাকার অদূরে কোথাও স্থায়ীভাবে একটা কিছু করার প্ল্যান নিলেন তারা। পছন্দ মত উঁচু একটি জায়গাও মিলে গেল এবং ফ্যামিলিস ফর চিলড্রেন সেই জমিটি ক্রয় করে ফেললো পরে পরেই। ঠিক এই ভাবেই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, তার কন্ট্রাক্টর নানা বিদেশি-দেশি সংগঠনের আর্থিক সহযোগিতায় সম্পূর্ণ অলাভজনক সেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করল, সময়টি ছিল ১৯৮৯ সাল। ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, সেখানেই গড়ে উঠতে শুরু করল সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের সুবিধা দেবার জন্য অনন্য এক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান- যার বর্তমান নাম  শ্রীপুর ভিলেজ। সম্ভাবনাময় চাকুরী, নিকট আপনজন, নিজ জন্মভূমি এবং সুদীর্ঘ অতীত সব কিছু – ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুললেন এই ‘শ্রীপুর শিশুপল্লী’। প্রমাণিত হল যদি চায়, স্বপ্নের চাইতেও বড় হয়ে যায় কেউ। এক নিবেদিত প্রাণ নারী  ‘প্যাট কের’ যার নাম।

 

a-3
[Sreepur founder “Mother” Pat Kerr with some of the school’s children]

শ্রীপুরের অবস্থান ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ মাইল। রাজধানীর মতো গ্যাঞ্জামযুক্ত তা নয়, বেশ নিরিবিলি কোলাহল-মুক্ত যতটুকু দেখা গেল। হাইওয়ে থেকে ত্রিশ টাকা লাগবে রিক্সা ভাড়া। দুই মাইল মত রাস্তা রিক্সা করেই  পৌঁছে যাওয়া যায় সহজে। আশেপাশে আছে ধানের ক্ষেত, সেখানে আছে বেখাপ্পা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। দেখা গেল নানা রঙের ছাতা সদৃশ দোকান। ‘শ্রীপুর ভিলেজ’ প্রবেশ পথেই এদের অবস্থান। এখানে বর্তমানে আছেন ১৫০ জন মা, একদা যাদের জীবনে নির্যাতন আর নিপীড়ন নেমে এসেছিল অনিবার্য,  অনেকেই বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছিলেন পতিতাবৃত্তি। এখানে বর্তমানে আছে প্রায় ৫৪০ জন  শিশু।

এখন গোধূলি বেলায় সূর্য ম্রিয়মাণ।  স্কুল শেষ।  সামনের আঙ্গিনায় পাওয়া গেল প্রায় ত্রিশ জন। দেখলাম শিশুরা হাসছে, খেলছে এবং সবার হাসি হাসি মুখ। আমি দ্য গার্ডিয়ান সাংবাদিক ‘মার্ক সিকোম্ব’ – তাদের এটেনশন চাইলাম। একটি ছেলে, তার হাতে ছিল একটি ফল, সে  আমাকে তা অফার করে বসল অবলীলায়। একটু পরেই আমি তখন গুড বাই বলতে উদ্যত, দুই জন নতুন বন্ধু- একজন ছেলে, আরেকটি মেয়ে, হাত চেপে ধরল আমার। আমাকে পেয়ে তাদের সবাইকে ভীষণ খুশি দেখাচ্ছিল।  এখানে তারা সবাই লালিত-পালিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে, আছে পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুবিধা, বিদ্যার্জনের জন্য স্কুল লাইব্রেরি। আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় – যা অতীতে তাদের জীবনে ছিল অনুপস্থিত- আদর আর ভালোবাসা যার নাম।

 

a-2
[The Sreepur team warming up for a practice match at Mirpur national stadium.]

প্রত্যেকের জন্য আছে সুষম খাদ্য, বেঁচে থাকার জন্য যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সতের একর জায়গায় নিজেদের জমিতে উৎপাদিত হচ্ছে আম, কলা, নারকেল, পেঁপে, পেয়ারা, লিচু আরও জানি কত কিছু! শাক-সবজি আছে, পুকুর ভরা মাছ এবং গোয়ালে বিশটি গরু, গভীর নলকূপ থেকে আসছে সুপেয় পানি। মায়েরা করবে সূচিশিল্প, কারুকাজ আর আর রান্নাবান্না বিদ্যাশিক্ষা তাদের জীবনের এক অপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ এবং তা গুরুত্বহীন – লাগে তা কোন দরকারে!  তাদের হাত থাকে বাঁধা, চোখ যদিও বা থাকে খোলা তবুও সমাজ চায় -তারা থাকুক না অন্ধকারে! অর্থনৈতিক ভাবে তারা নিজে নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলবে, দাঁড়াবে সমাজে মাথা  উঁচু করে এবং অবশ্যই নিজের পায়ে নিজে – প্রতিনিয়ত এই মন্ত্রে তাদের উজ্জীবিত করে তোলেন  ‘প্যাট কের’।

a-1
[Rising stars of the Sreepur cricket team. From left: Chumki Akter and Ismat Ara.]

২০১২ সালে আমরা মেয়েদের নিয়ে একটি ক্রিকেট দল তৈরি করি , চাইছিলাম একটি দলবদ্ধ আয়োজন। চেয়েছি এমন কিছু খেলা -যেখানে মুসলিম মেয়েদের পোশাকে একটি শালীনতা বজায় থাকে এবং খেলাগুলো যেন এমন হয় -যেখানে শারীরিক সংঘর্ষের কোন অবকাশ নেই। আর তেমনটা ভেবেই আমি ফুটবল ও কাবাডিকে বাদ দিয়ে দিয়েছি,  যদিও কাবাডি এখানে জাতীয় খেলা। তাই বেছে নিয়েছিলাম ক্রিকেট। মেয়েরা ক্রিকেট খেললে তাদের মনোবল চাঙ্গা হবে, তারা ডিসিপ্লিন শিখবে, পরস্পরের প্রতি আস্থা অর্জন এবং শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হবে তাদের। প্রথম প্রথম তারা রেগে গেলে ব্যাট ছুঁড়ে ফেলে দিত, ধীরে ধীরে তারা অর্জন করেছে -প্রতিপক্ষের প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন। ক্রিকেট আদতেই অসভ্যকে সভ্য করার খেলা, এখানে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পূর্ণ পজিটিভ রূপ পরিগ্রহ করবে একদিন। আমি ক্রিকেট ফ্যান বা লাভার কিছুই নই  কিংবা নির্দিষ্ট অন্য কোন খেলার প্রতি আমি  ভীষণ অনুরাগী, ব্যাপারটি তাও নয়। লন্ডন ২০১২ অলিম্পিক মশালটি বহন করার ডাক পেয়েছিলাম, আমি মনে করি সেটি ছিল আমার জন্য যথেষ্ট সম্মানের একটি ব্যাপার,  বললেন ‘প্যাট ক্যার।

a-9

বাড়ির অদূরে ঢাকা শহরেরই আশেপাশে কোথাও, সেটি ছিল একটি মেলার ঘটনা। সৎ মায়ের সাথে তারা দুই বোন এসেছিল সেই মেলায়। বড় বোন চুমকি নাগরদোলায় চড়বে আবদার করল মায়ের কাছে,  মা তুলে দিলেন। নাগর দোলা থেকে নেমে বড় বোন চুমকি অনেক করল খোঁজাখুঁজি, মেলায় ছিল হাজার হাজার মানুষ। কোথাও আর খুঁজে পেল না তার মাকে। এক কোণায় বোনটিকে খুঁজে পেল -দাঁড়িয়ে কাঁদছে তার ছোট বোন বৃষ্টি। ছোট বোনকে সাথে নিয়ে তারপরও অনেক সময় এদিকওদিক অনেক খুঁজে বেড়াল। মা তাদের হারিয়ে গেছে কিংবা বলা যেতে পারে এভাবেই তারা হারিয়ে ফেলল মা। তারপর সেখান থেকে কেউ একজন তাদের নিয়ে আসলো – ‘শ্রীপুর ভিলেজ’ হল তাদের ঠিকানা। শ্রীপুর ভিলেজের সাথে ইংল্যান্ড দলের সম্পর্কটি একদম নতুন ছিল না।  ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল, বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল সেটা ২০০৩ সালের ঘটনা। এনড্রু ফ্লিনটফ ছিলেন দলের অধিনায়ক। চুমকির বয়স তখন পাঁচ বছর, তাই তার জানবার কোন কারণ ছিল না, কার কোলে উঠেছিল সে।  মিডিয়ার কল্যাণে সেই সময় সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল ছবিটি। সেই চুমকি আক্তার বর্তমানে শ্রীপুর গার্লস ক্রিকেট টিমের একজন অন্যতম প্লেয়ার।

a-6

“আমি যখন আমার মামার বাড়িতে আমার মা’র সাথে ছিলাম, তিনি ছিলেন আমার সৎ মা। তিনি আমাকে খুব মারধর করতেন। পরে আমি সেখান থেকে চলে আসি। কিন্তু সেখানে আমার পড়াশুনা না করিয়ে আমাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছিল তারা। পরে আমি সেখান থেকে পালিয়ে এসে রাস্তায় ইচ্ছা মতো কান্না করছিলাম… পরে আমি এই ভিলেজে চলে আসি একদিন ” – সুমি।

বাংলাদেশের গ্রাম, এখানে থাকে অভাব অনটন আর বঞ্চনা, এর মাঝেই  এখানে জন্ম নেয় লাখ লাখ মেয়ে শিশু । মাত্র দশ বছর বয়সেই দারিদ্র-ক্লিষ্ট এক ভবিষ্যৎ এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে।  আর তার দু’বছর বাদেই একদিন হুট করে তাকে বসে যেতে হয়  বিয়ের পিঁড়িতে, প্রচলিত রীতি মোতাবেক তার কাছে জানতে চাওয়া হয় না কিছুই! স্কুল বই আর পড়াশুনা  সব শেষ। দাসীবৃত্তি কিংবা হতে পারে তার চাইতেও কঠিন দুঃসহ কোন জীবন। ঠিক এই রকম একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিল মেয়েটি তখন। সেটি ছিল কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর, বাংলাদেশের উত্তরের এক গ্রাম, হিমালয়ের ছায়া ঢাকা এমনটাও বলা যেতে পারে। রাজধানী থেকে এর অবস্থান অনেক দূরে, অবহেলিত বঞ্চিত এবং দারিদ্র্য পূর্ণ এক জনপদ। সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অপ্রতুল, বড় বড় গাড়ি কিংবা ছোট কার এসব নেই কিছু। মৌসুমের একটা সময় পানিতে তলিয়ে যায় এখানে গ্রাম। তখন গ্রামের মানুষের হাতে কাজ নেই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোর জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্যোগ -বাংলায় এই অবস্থাটির নাম নাম ‘মঙ্গা’। ২০০১ সালে এই গ্রামেই  জন্ম হয় সেই মেয়েটির। ২০১১ সালে তার মা অঞ্জুর সাথে মেয়েটি তখন একা বাস করে ঘরে । মা অঞ্জু নানাবিধ শারীরিক এবং মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত , বাবা চলে গেছিলেন অন্য ঘরে এবং বড় দুই ভাইও ফেলে গেছে মাকে। একদিন মরে গেল তার বাবা। পাশের বাড়ির ছেলেরা হামলা করে বসল বাসায়, মেয়েটি হল ভীত সন্ত্রস্ত, বিপদাপন্ন হল তার জীবন। এলাকার একটি এনজিওর কাছে স্থানীয় লোকজন শরণাপন্ন হলেন এবং সহযোগিতা প্রার্থনা করলেন। সেই এনজিওটি মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসল এখানে।

 

a-4-001
[The Sreepur girls with England’s Steven Finn.]

মেয়েটির জীবনে শুরু হল নতুন এক জীবনের গল্প

কিন্তু মেয়েটির মধ্যে কোন মিনিমাম শৃংখলাবোধ ছিল না প্রথম প্রথম।  স্কুলে যাবার ছিল না কোন আগ্রহ। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই কেমন করে যেন ক্রিকেট খেলতে আগ্রহী হয়ে উঠল মেয়েটি।  একদিন আমি অবাক হয়ে দেখলাম মেয়েটি ছেলেদের সাথে খেলছে, সাধারণত এটি একটি বিরল ব্যাপার। প্যাট কের তখন জানতে চেয়েছিলেন- তোমাকে ছেলেরা দলে নিচ্ছে কেন ? বলল- তারা দেখেছে আমি বোলিং এবং ব্যাটিং দুইটিতেই তাদের চাইতে কোন অংশে কম নই, তাই আমাকে নিয়েছে।

“বাংলাদেশে যখন একটি কন্যা শিশু জন্ম গ্রহণ করে, সবাই ভাবে এটি একটি বোঝা। আমি যখন এখানে আসি, আমি দেখি মাত্র তিনটি মেয়ে ক্রিকেট ভালো খেলে, কিন্তু একটি দল বানাতে গেলে মিনিমাম পনের জন চাই। তখন আমি এখানে বাকীদেরও বোঝাই। বলি তোমরা ক্রিকেট খেললে তোমাদের ভবিষ্যৎ অনেক ভালো হবে। তারপর আস্তে আস্তে মেয়েদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রথম প্রথম তারা খুব লজ্জা পাচ্ছিল যখন তাদের পড়তে হচ্ছিল হ্যালমেট এবং এই রকম ট্র্যাক-সুট টাইপ পোশাক যা তারা আগে পড়েনি। বাংলাদেশে পনের থেকে ষোল বছর বয়সেই এই সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, তখন তাদের  আর কিছুই করার থাকে না। এই মেয়েগুলো এখন খুবই ভালো করছে, তাদের ভাগ্য তারা নিজেরাই পরিবর্তন করবে আমার বিশ্বাস।” 

বলছিলেন সাথিরা জাকির জেসী, ২০০৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেটের যিনি এক আলোচিত নাম। ২০১৪ সাল থেকে তিনি আছেন এদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোচ। মেয়েটির খেলা দেখে তিনি জানিয়েছিলেন, সঠিক পরিচর্যা করলে ভবিষ্যতে খুব ভালো ক্রিকেটার হবার সম্ভাবনা আছে তার। তাই মেয়েটিকে পাঠিয়ে দেয়া হল বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে।  বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের একটি বড় অংশ যেখান থেকে এসেছে। এখন সেখানে সে  দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মেয়েটির মধ্যে আছে দুর্দান্ত ক্রিকেটিয় প্রতিভা!  ব্রিলিয়ান্ট খেলছে এখন, ফাস্ট বোলিং করে, তার ব্যাটিং ও ফিল্ডিং দুটোই  দুর্দান্ত! সাথিরা জাকির জেসী বাংলাদেশ রেডিও টিভির প্রথম নারী ধারাভাষ্যকার ও বিশেষজ্ঞ যিনি প্রাক্তন ক্রিকেটারও বটে,  বললেন- আমি ভীষণ আশাবাদী।

a-8-001

শ্রীপুর ভিলেজে মেয়েটি যখন প্রথম এসেছিল, তার পাঁচ বছর পরের কথা, ২০১৬ সাল । আজ তার পড়নে নীল-হলুদ জার্সি, শের-এ-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যদিও সে কিঞ্চিৎ নার্ভাস, তথাপি সে দৃঢ় চিত্ত। একদিন আন্তর্জাতিক ইংল্যান্ড  ক্রিকেট দলের অধিনায়ক জস বাটলার এসে বললেন- ‘আমি তোমাকে টিভিতে দেখবার জন্য অপেক্ষায় আছি’।  উলিপুরের আকাশে নিদেন পক্ষে একটি ঘুড়ি পর্যন্ত উড়াবার সাধ জাগেনি মনে, সেই মেয়েটি শ্রীপুর গার্লস ক্রিকেট টিমের এখন একজন স্টার প্লেয়ার। বিশ্ব ক্রিকেট আকাশে  বাংলাদেশের তারা হয়ে জ্বলে উঠবে সে। জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ থাকবে তার মাথায়। ইসমত আরার বয়েস এখন পনের। খুব স্বাভাবিক শান্ত হয়ে  সেই মেয়েটি ‘ইসমত আরা’ যার নাম, জস বাটলারকে  জবাব দিল ‘এটা আমার স্বপ্ন’।

“I feel the power when I have a bat or a ball in my hands”

“আমি শক্তি পাই যখন আমার হাতে ব্যাট কিংবা বল থাকে”

উপরের গল্পটির শিরোনাম হতে পারে ‘ছিল সম্ভব না, এখন  তা সম্ভাবনা’

আমি ইসমত আরাকে নিয়ে খুবই এক্সাইটেড এবং গর্বিত।  বিশ্ব এখন তার সামনে উন্মুক্ত। আর ক্রিকেট এখন আমাদের এই ভিলেজে গুরুত্বহীন কোন ব্যাপার নয় । এমনকি যে সব মেয়েরা এখানে ক্রিকেট খেলে না, তারাও এই খেলায় জীবনে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। তাই এখান থেকে কোন মেয়ে যখন জাতীয় দলে খেলার উপযোগী হয়ে উঠে তখন এটি একটি বিরাট ব্যাপার হয়ে যায়। দ্য গার্ডিয়ান সাংবাদিক ‘মার্ক সিকোম্ব’ কে ‘প্যাট কের’ বিনীত ভাবে বললেন,  আমি খুব খুশী  যে তুমি আমাকে নয় আমার মেয়েদের নিয়ে লিখছ (I am so glad you are writing about my girls and not about me)।

 

২০১১ সালের গরম কালে ইসমত একা গিয়েছিল তার গ্রামের বাড়ি এবং সেটা ছিল গ্রামে তার প্রথম প্রত্যাবর্তন। অনেক দিন পর মাকে দেখে কান্না আর কষ্ট জেগে উঠেছিল তার বুকে। মা জানতে চেয়েছিলেন -‘তুই কোথায় কোথায় থাকিস সব সময়, আমি যে তোর সাথে থাকতে চাইরে মা’। নিয়তির কী নিদারুণ পরিহাস! একদিন এই অক্ষম ‘মা’ তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি। হায়রে ! আর ইতোমধ্যে পাল্টে গেছে জীবনের সবটাই,  ফেলে আসা সেই সব দুর্যোগ, সেই সব অন্ধকারের দিন। সেই ইসমত আরা আমি নই, আমার নতুন মায়ের নাম হয়ে গেছে এখন প্যাট ।

 

সূত্রঃ

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়  মার্ক সিকোম্ব  লিখিত  Breaking boundaries: Bangladesh’s women cricketers -এর ছায়া অনুসারে লিখিত এবং অন্যান্য তথ্য ‘শ্রীপুর ভিলেজ’ ওয়েব সাইট থেকে ।

[Photograph: Sarker Protick for the Observer]