ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

কাঁধে ছিল ব্যাগ, ওজন ছিল অনেক

২৫ জানুয়ারি ২০১২, ময়ুর বিহার,  দিল্লী। ‘বরুণ জৈন’ ছিল রিষভ পাবলিক স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তখন ঘড়িতে  দুপুর ১-৩০, স্কুল ছুটি হয়ে গেলে সবাই নীচে স্কুল লনে দাঁড়িয়ে ছিল। স্কুল বাসে উঠবে বলে- ছিল প্রতীক্ষায়। কাজিন ভাইটিও ছিল বরুণের সাথে। প্রথম বাসটি বলতে বলতেই চলে গেল। আচমকা বরুণের খেয়াল হল- কিছু একটা সে ক্লাসে ফেলে এসেছে, তাই দৌড়ে আবার স্কুলে ফেরত গেল বরুণ। আধাঘণ্টা পর স্কুল থেকে একটি ফোন পেলেন বরুণের বাবা। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানালেন- সম্ভবত তৃতীয় তলা থেকে পড়ে গিয়েছিল বরুণ। সাথে সাথে জীবন আনমল হাসপাতালে ভর্তি করা হল তাকে। বিকেল হতে হতে বরুণের শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে সংকটজনক হতে লাগল। উচ্চ চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হল দ্রুত। ঘাড়ে এবং মাথায় সিরিয়াস ইনজুরি। কে বরুণকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে  – বিদ্যালয় নিশ্চিত করে বলতে পারল না কিছুই। পুলিশ এসে স্কুলের ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে ফিরে গেলেন নিজ নিজ কাজে। ইতিমধ্যে মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল খবর।

পুলিশ তদন্ত ফলাফল

সেই সময় স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ফ্লোরে তখন অন্য কেউ ছিল না। তাই ধাক্কায় পড়ে গিয়ে বরুণের এমনটা হয়েছে -তা মনে করছি না আমরা। তার কাজিন ভাইটি  নীচ থেকে তাড়াতাড়ি নামার জন্য বলছিল। হতে পারে সেই সময় বরুণ তিন তলার সিঁড়ির রেলিং-এ হাত রেখে – নীচে তাকিয়ে বলতে চেয়েছিল ‘জাস্ট আ সেকেন্ড’। সম্ভবত বরুণের কাঁধে ছিল ভারী ব্যাগ, তাই কথা বলতে গিয়ে কিংবা নীচে দেখতে গিয়েই- ব্যাগের অত্যধিক ওজনে উল্টে পড়ে গিয়েছিল ‘বরুণ জৈন’। পরবর্তীতে পাশের একটি বিল্ডিং থেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় -পুলিশ এই সম্ভাবনাটির সত্যতা পেয়েছিলেন।  অবশ্য তার আগেই দিল্লীসহ গোটা ভারতের অভিভাবকরা ভেঙ্গে পড়েছিলেন কান্নায়। মৃত্যু দিয়ে প্রমাণ করে গেল ‘বরুণ জৈন’, কাঁধে ছিল প্রকাণ্ড এক ব্যাগ – তোমরা তা ভুলো না যেন!

পরবর্তীতে এই ঘটনায় অভিভাবক ও প্রশাসনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি  হয় ভারত জুড়ে। দিল্লী হাইকোর্ট – কোন শ্রেণির শিশুর কাঁধে সর্বোচ্চ কতটুকু ওজনের ব্যাগ চাপতে পারে – সেই বিষয়ে নীতিমালা ও নির্দেশনা  প্রণয়ন করে।  প্রি-স্কুল শিশুদের জন্য লিমিট বেঁধে দেয়া হয় -শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের বেশি কোন ভাবেই হতে পারবে না শিশুর ব্যাগের ওজন।

A (3)      

প্রাথমিকেই, শিশুর ব্যাগ ৭ কেজি

মতিঝিলের একটি বিখ্যাত স্কুলে- প্রথম শ্রেণির ছাত্রটির ব্যাগের ওজন পাওয়া গেল প্রায় তিন কেজি। আজিমপুরে মেয়েদের স্কুলে – দ্বিতীয় শ্রেণির দুইজন ছাত্রীর ব্যাগের ওজন যথাক্রমে তিন কেজি নয়শ গ্রাম এবং চার কেজি দুইশ গ্রাম। ইস্কাটনে মাঝারি মানের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের কেজি ক্লাসের শিশুটি কাঁধ থেকে ব্যাগ নামাতে পারছিল না। নামিয়ে দিলেন এক খালা। মাপলে নির্ঘাত পাওয়া যেত দুই কেজি কম-বেশি। শিশু রোজ রোজ বাড়ি থেকে যে ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসে তাতে শুধু স্কুলের বই আর খাতাই থাকে  তা নয়। কিছু কিছু বিদ্যালয় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে ব্যাগে এক সেট পোশাক থাকা বাধ্যতামূলক। টিফিন বক্স আর গলায় ঝোলানো পানির বোতল মিলে ওজন হয় চারশো গ্রাম। সিদ্ধেশ্বরীর একটি স্কুলে প্রায় প্রতিটি শিশুর ব্যাগে পাওয়া গেল বোর্ডের সমস্ত বই – যা তাদের প্রতিদিন পড়ানো হয় না, না আনলেও চলে -কিন্তু স্কুল নির্দেশ সকল বই ব্যাগে থাকা চাই।

ড্রয়িং খাতাটি ছিল আকারে অনেক বড়। সেটি ব্যাগে ঢোকানো যাচ্ছিল না,  তাই ড্রয়িং খাতাটি এসেছে শিশুর বগল তলায় চেপে। নামীদামী স্কুলগুলোয় ছুটির পর, বিকেলেই শুরু হয়ে যায় স্কুলের বাধ্যতামূলক কোচিং। তখন সাথে রাখতে হয় পাঠ্য বই এবং অবশ্যই গাইড বই। প্রতিটি গাইড বইয়ের ওজন কমবেশি এক কেজি। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ওজন পাওয়া গেল ছয় কেজি প্লাস, কারো কারো ব্যাগ প্রায় সাত কেজি।

ভারতের যশপাল কমিটি রিপোর্ট

অধ্যাপক যশ পাল সিং ভারতের পদ্মবিভূষণ খেতাব পাওয়া একজন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। যার নেতৃত্বে ভারতে গঠন করা হয়েছিল শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের  জন্য ‘ন্যাশনাল অ্যাডভাইসারি কমিটি’। ১৯৯৩ সালে সেই যশপাল কমিটি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট  বরাবরে ‘লার্নিং উইদাউট বার্ডেন’ নামে একটি রিপোর্ট জমা দেন। পরবর্তীতে যা ‘যশপাল কমিটি রিপোর্ট’ হিসাবে পরিচিতি পায়। সেই রিপোর্টে শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন সম্পর্কে  সুস্পষ্ট বেশ কয়েকটি সুপারিশ আছে। অন্যতম সুপারিশ সমূহ:

  • কোন বয়সে কোন উচ্চতার শিশুদের সর্বাধিক কতটা ওজনের স্কুল ব্যাগ বহন করা উচিত তা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হোক।

  • এ ব্যাপারে শিক্ষক, অভিভাবক, স্কুল পরিচালন কমিটির সদস্যদের বাধ্যতামূলক ভাবে সচেতন করে তোলা হোক।

  • দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের স্কুল ব্যাগ বহন করা একেবারেই নিষিদ্ধ করা হোক। তাদের স্কুল ব্যাগগুলি স্কুলেই রাখার ব্যবস্থা করা হোক, জরুরি ভিত্তিতে।

  • যে সব স্কুল এই নিয়ম মেনে চলবে না, তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হোক।
  • শিশুদের স্কুল ব্যাগগুলি স্কুলেই রাখার জন্য প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি ক্লাস রুমে ‘র‌্যাক’ বানানো হোক বা রাখা হোক আলমারি।

A (4)

ডাক্তাররা  কী বলছেন?

চার-পাঁচ বছরের একটি শিশুর মেরুদণ্ড যতটুকু ওজন বহনে সক্ষম, শিশুটির কাঁধে তার চাইতে অধিক ওজন চাপিয়ে দিচ্ছি আমরা। চিকিৎসাবিজ্ঞান এই বয়সে শিশুর কাঁধে যে কোন ওজন চাপানোরই ঘোর বিরোধী। শিশুর মেরুদণ্ড সাধারণত বার বছর বয়সে একটি উল্লেখযোগ্য ওজন বহনে সক্ষম হয়ে উঠে। প্রি-স্কুল সময় থেকেই  শিশুর মেরুদণ্ড ক্রমশ বিকাশ লাভ করতে থাকে,  আর ঠিক তখনই শিশুর কাঁধে একটি স্কুল ব্যাগ চাপিয়ে দেওয়া বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত এবং তা অন্যায় । তাতে শেষ পর্যন্ত শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের পরিপূর্ণ বিকাশ প্রক্রিয়াটি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডাক্তাররা বলছেন, খালি চোখে দেখে এই শারীরিক ক্ষতির পরিমাপ নির্ধারণ করা যাবে না এবং আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এই সময়ে শরীরের সাথে সাথে শিশুর মনোজগতেও সৃষ্টি হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া। স্কুল থেকে ফিরেই অধিকাংশ শিশু অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। প্রায় সময় তাকে ক্লান্ত দেখা যাচ্ছে এবং সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে – আহার গ্রহণ, বিনোদন ও খেলাধুলোয়। আনন্দ হাসি ও উচ্ছলতা মাঝে যে শিশুটির শিক্ষা জীবন শুরু হওয়ার কথা উল্টো রোজ রোজ স্কুলে যাওয়া-আসায় -শিশুটির কাছে  স্কুল হয়ে যাচ্ছে এক ভীতিকর পেরেশানির নাম।

দুবাই শহরের ফাতিমা সুহেইল, যার বয়স এখন ছাব্বিশ এবং ২০০৬ সালেই যার স্কুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। সেখান থেকে  দশ বছর পরে ফাতিমা সুহেইল বর্তমানে একজন ক্রনিক ব্যাক পেইন রোগী। অর্থোপেডিক সার্জন সঞ্জয় কুমার সুরিন বলছেন, দীর্ঘ স্কুল জীবনে অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুল করার কারণে  -ফাতিমার মেরুদণ্ড অস্বাভাবিক ভাবে বেঁকে গেছে। তাই পিঠে ব্যথা রোগটি এখন চিরস্থায়ী আকার ধারণ করেছে ফাতিমার জীবনে।

অধিকাংশ অভিভাবকদের শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তার মূল জায়গাটি  শিশুর প্রচলিত শারীরিক সমস্যা এবং এসব কারণেই তারা  ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। শিশুটি ব্যাক পেইন রোগে আক্রান্ত কিনা এই নিয়ে তারা জানেন না এবং জানতেও চান না। একজন চাইল্ড স্পেশালিষ্ট বলছিলেন, বর্তমানে পিঠে ও ঘাড়ে ব্যথা শিশুদের খুবই কমন একটি সমস্যা। রোজ রোজ ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে তাকে যেতেই হয় এবং শিশুটি জানে এর ব্যতয় হবার কোন উপায় নেই। তাই পারতপক্ষে তার কষ্ট এবং যন্ত্রণার ব্যাপারটি শিশু এখন আর অভিভাবকের সাথে শেয়ার করতেও আগ্রহী নয়।

A (2)

তাহলে এর চিকিৎসা কী?

ডাক্তার বলছেন- ওষুধ পত্র দিয়ে শিশুর সাময়িক চিকিৎসা করে দিলে তাতে আর কী সমাধান ! এই রোগের একমাত্র সমাধান- শিশুর কাঁধ থেকে প্রকাণ্ড স্কুল ব্যাগটি আগে নামানো । একটি প্রাণবন্ত শিশুর উদযাপন উপযোগী  শিক্ষা’র পরিবেশ নিশ্চিত করা , স্কুল এবং মন্ত্রনালয়ের প্রধানতম দায়িত্ব। এবং এই বিষয়ে অভিভাবকদেরও সোচ্চার হওয়া আবশ্যক । সার্কভুক্ত সবগুলো দেশ সাথে আরব বিশ্বে এই  সমস্যাটি প্রকট। বয়েস অনুযায়ী অবশ্যই শিশুদের ব্যাগের ওজন নির্ধারন করে দেয়া উচিত । এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ  ডাক্তারদের অভিমত – শ্রেনি ভেদে শিশুদের কাঁধের ব্যাগের ওজন যেন এর বেশি না হয়:

  • প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি: ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ১ কেজি।
  • তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণিঃ ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ২ কেজি।
  • পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণি: ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ৪ কেজি।
  • অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি: ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ৫ কেজি।

স্কুলব‌্যাগের ভার কমাতে আইন করার আদেশ হাইকোর্টের

৬ই ডিসেম্বর ২০১৬ ইং তারিখে , প্রাথমিকে শিশুর শরীরের ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ করতে ছয় মাসের মধ্যে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। সেইসঙ্গে ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন না করতে এবং করাতে বাংলা ও ইংরেজি মাধ‌্যমের সকল স্কুলে ৩০ দিনের মধ্যে একটি সার্কুলার জারি করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত বছর জারি করা একটি রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী মাসুদ হোসাইন দোলন, মোহাম্মদ জিয়াউল হক ও আনোয়ারুল করিম স্কুল শিশুদের ব্যাগ বহনে আইন, নীতিমালা বা বিধিমালা চেয়ে গত বছরের আগস্টে এই রিট আবেদন করেন।  অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ বহনের ফলে শিশুরা মেরুদণ্ড, কাঁধের ব্যথাসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠছে। এভাবে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। ফলে আদালত এই বিষয়টিকে বলেছেন ‘পাবলিক ইনজুরি’। শিশুদের স্কুলব‌্যাগের ওজন নিয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ২০১৪ সালে একটি সার্কুলার জারি করেছিল সরকার। সেই সার্কুলার প্রতিপালন না করায় আদালত হতাশা ব্যক্ত করেছে, জানান- রিটকারী মাসুদ হোসেন দোলন। [সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪.কম,স্কুলব‌্যাগের ভার কমাতে আইন করার আদেশ, ৭ ডিসেম্বর ২০১৬]

bag_0-001

আমার স্কুল, বীণা পাণি পাঠশালা

বিদ্যুৎ নেই আছে একটি পরিত্যক্ত রেলস্টেশন যেখানে আর ট্রেন থামেনা এখন। সেই স্টেশন থেকে যোজন যোজন দূরে  বাঁশ-ঝাড়-জঙ্গল আর তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে এক প্রত্যন্ত গ্রামে, না না সেখানে নয়! কবিতায় লেখা ছিল যে ‘তালপুকুর’, তার পশ্চিম-উত্তর পাড়ে কুমিল্লা শহরের বেশ বনেদি এলাকায় অবস্থিত ছিল -আমার প্রাইমারি স্কুল। অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলছে ইংরেজিতে ‘পাঠশালা’ মানে হচ্ছে – ‘ট্র্যাডিশনাল স্কুল হয়ার চিলড্রেন আর টট সংসক্রিট বাই ব্রামহিন্স’। আমার স্কুলটির তৎকালীন নাম ছিল ‘বীণা পাণি পাঠশালা’ সেখানে আমার পিসিমণি ‘ক্ষমা চক্রবর্তী’ ছিলেন আমার দিদিমণি। স্কুলের আয়তন ছিল অতি ক্ষুদ্র। এখন মনে হয় সেটিই ছিল সম্ভবত পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্কুল। স্কুলের বহিরাংশে  ছিল অর্ধেক গাঁথুনি আর অর্ধেক টিন, তাতে ছিল অসংখ্য ভাঙ্গাচোরা পথ। আওয়াজ ছাড়াই আমরা ঢুকে যেতে পারতাম এবং পালিয়েও যেতে পারতাম যখন খুশি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো না থাকায় স্কুলের ঘণ্টি পালা করে বাসায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল আমাদের। তাই কখন ছুটি হবে কখন বাজবে সেই ঘণ্টা -এসব নিয়ে তেমন কড়াকড়ি ছিল না। দিদিমণিকে খুশি করে নিজেদের ঘণ্টা নিজেদেরই বাজিয়ে দেবার সুবিধা ছিল পর্যাপ্ত।  অল্প বৃষ্টিতেই  টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির টিপ টিপ ফোঁটা পড়ত মাথায়। দিদিমণি তখন স্কুল ছুটি ঘোষণা করে দিলেও আমরা কিন্তু ঘণ্টা বাজাতে চাইতাম না – ক্লাসে বসে উদযাপন করতাম বৃষ্টি। এত এত সুযোগ সুবিধার পরেও আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত মাঝে মাঝে। শহরের নামীদামী স্কুল -মিশনারি কিংবা মর্ডানে যারা পড়ত, সেই সহপাঠীগণ আমাদের দেখলেই চেঁচিয়ে উঠত -‘বীণা পাণি পাঠশালা-আইতে যাইতে কানমলা’। অবশ্য আমাদের এইরকম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবার যথেষ্ট কারণও ছিল -আমাদের ছিল না কোন স্কুল ড্রেস, পায়ে থাকতো স্পঞ্জের স্যান্ডেল –আর আমাদের কাঁধে ছিল না কোন স্কুল ব্যাগ।

bag1

তখন মনে হত বাবা আমাদের লালনপালন করছেন নিতান্ত অবহেলায় আর অনাদরে – আসলে নিম্নমধ্যবিত্ত বাবার যে সেই সামর্থ্যটুকু ছিল না, সন্তানের এই সত্যটি জানা ছিল না তখন। নিয়তির নির্দিষ্ট নিয়মে সেই সন্তান আজ বাবা। একদিন বাবা স্কুল ব্যাগ কেনায় অসমর্থ ছিলেন তবুও তার সন্তান এতদিনে পারি দিয়ে ফেলেছে অনেকটুকু পথ। আর আজ, দুই হাজার সতের’র বাবা ততটা অসমর্থ নন – তথাপি তিনি নিশ্চিত জানেন না –তার শিশুটির অদূর ভবিষ্যৎ।

রুঘভেদ রাইকর ও পারিতোশ ডান্ডেকর

আইন বেঁচে আছে নীরবে, স্কুল বেঁচে আছে সরবে। ২০১৫’র জুলাই মাসে বোম্বে হাইকোর্ট অর্ডার দেয় -মহারাষ্ট্রের সব স্কুলে, কোন মতেই ব্যাগের ওজন শরীরের ওজনের দশ শতাংশর বেশি হতে পারবে না। কিন্তু ২০১৬ সালে এই আইনটি, আছে না তামাদি হয়ে গেছে তা বুঝে উঠবার উপায় থাকে না। স্কুল ব্যাগের ওজন সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নির্দেশনাটি মহারাষ্ট্রের স্কুলগুলোর কাছে তখন -হু কেয়ারস? অথচ রাজ্য সরকারের আইনে নিয়ম লংঘিত হলে স্কুলের নিবন্ধন বাতিলের মতো কঠিন শাস্তির বিধানটিও ছিল। কিন্তু সেই আইন বা নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেই যথানিয়মে চলছিল সব স্কুলগুলো।

আগস্ট মাস ২০১৬ ইং, মহারাষ্ট্র, চন্দ্রপুর জেলা। ‘বিদ্যা নিকেতন’ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির দুইজন ছাত্র। নাম রুঘভেদ রাইকরপারিতোশ ডান্ডেকর। তাদের বয়স ১২ বছর। দিনে দিনে ত্যক্ত বিরক্ত;  স্কুল ব্যগের বোঝা আর যেন টেনে উঠতে পারছিল না তারা। ছিল ক্ষুদে শিক্ষার্থী তথাপি রোজ স্কুলে যাওয়া আসার সময় তাদের কাঁধেই চড়ে বসত যে সিন্দাবাদের ভূত -নাম ছিল যার ‘স্কুল ব্যাগ’ -সেই ভূতকে ঘাড় থেকে না নামালে – আর যেন চলছিল না ! বিদ্যা শিক্ষা যতটুকু তার অধিক ছিল কুলিগিরি, তাই মেজাজ আর মানছিল না!

দিনটি ছিল ২২শে আগস্ট সোমবার। আচমকা  দুই শিক্ষার্থী, রুঘভেদ রাইকর ও পারিতোশ ডান্ডেকর, ডাক দিয়ে বসল এক সাংবাদিক সম্মেলন। বিষয় হচ্ছে – স্কুল ব্যাগ ওজন ও আমাদের যন্ত্রণা কথন। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে -সংবাদ সম্মেলন স্থলে ভিড় জমিয়ে ফেললেন- মিডিয়া ও সংবাদকর্মীগণ। রুঘভেদ রাইকর ও পারিতোশ ডান্ডেকর সাংবাদিক সম্মেলনে জানালো যে – প্রতিদিন তাদের স্কুলে নিয়ে আসতে হয় -৮টি সাবজেক্টের প্রায় দ্বিগুন সংখ্যক বই, সাথে থাকে হোম ওয়ার্ক খাতা, টিফিন বক্স, পানির বোতল এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেই ব্যাগের ওজন হয়ে যায় -কখনও প্রায় আট থেকে নয় কেজির মত। স্কুলে নেমে হেঁটে আসতে হয় অনেকটুকু পথ, তারপর সিঁড়ি ভেঙ্গে ক্লাস রুম পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট হয় তাদের। এই সমস্যা ভারতের প্রতিটি স্কুলের এক সার্বজনীন সমস্যা, শিক্ষার্থীরা এই সমস্যায় জর্জরিত ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। সময় সময় তারা ক্লাস টিচারকে ব্যাপারটি জানিয়েছে এবং স্কুল প্রিন্সিপালকে পর্যন্ত সাহস করে নোটিশ করেছে। কিন্তু এসবে স্কুলের কোন ভ্রুক্ষেপ পাওয়া গেল না, স্কুল চলছিল তার আপন নিয়মে। তাই  স্কুলের এহেন নীরবতায় বাধ্য হয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় ছিল না।

 

x-001

রুঘভেদ  ও পারিতোশ এর  সাংবাদিক সম্মেলন করার পরেই স্কুল কর্ত্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের টনক নড়ে উঠল। চন্দ্রপুর বিদ্যা নিকেতনের মহামান্য স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় উপাদান সমূহ যা এতদিন রোজ রোজ বেহুদা বাড়ি থেকে বয়ে নিয়ে আসতে হত -এসব রাখার জন্য লকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করল। স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিল -সব আইন তারা মেনে চলবে এবং হবে সবকিছু একশতে একশ।  সাংবাদিক সম্মেলন করার মাত্র দুই দিন পর অর্থাৎ ২৪শে আগস্ট বুধবার ২০১৬  সকালেই পালটে গেল স্কুলের চেহারা। আটচল্লিশ ঘন্টা বাদেই ঠ্যালার নাম হয়ে গেল বাবা জীবন।

“স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী

আমরা কি আর বইতে পারি?
এও কি একটা শাস্তি নয়?
কষ্ট হয়, কষ্ট হয়!
আমার কষ্ট বুঝতে চাও
দোহাই পড়ার চাপ কমাও
কষ্ট হয়, কষ্ট হয়।
পড়ার চাপে চেপ্টে গিয়ে,
কী করব এই শিক্ষা নিয়ে?
অমুক হও, তমুক হও,

অমুক হও, তমুক হও

কেউ বলে না মানুষ হও।”

(স্কুলের ব্যাগটা/ কবীর সুমন/ ১৯৯৬)

bag2

শিশুর কাঁধে ভারী স্কুল ব্যাগ চাপানো- শিক্ষা নয় অপরাধ

আমাদের হাইকোর্ট অতি সম্প্রতি স্কুল ব্যাগ নিয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছে -সেই খবরটিকে অনুপ্রেরণা হিসাবে বিবেচনা করে কদিন আগেই একটি রিপোর্ট করেছে কলকাতার আনন্দবাজার, সেখানে রাজ্য সরকারের প্রতি ফুটে উঠেছে ক্ষোভ ও হতাশা’র কথা:

 “… জন্মের ৪১ বছরের মধ্যেই তা করে দেখাল বাংলাদেশ। আর আমরা, তার পাশের দেশ ভারত, এই একাত্তরেও সেই বুড়ো খোকাটিই রয়ে গেলাম! করে দেখাতে পারলাম না! শিশুদের পিঠের বোঝাটা আর কিছুতেই কমাতে পারলাম না দেশের সর্বত্র। এমনকী, আমাদের রাজ্যেও!”

এদিকে অভিভাবকরা আছেন সেই স্বপ্নে বিভোর – সন্তান হবে বিদ্যার সাবমেরিন! আর ওদিকে শিশু প্রতীক্ষায় দুঃস্বপ্নের রাত কখন শেষ হয়, কখন যে হয় ভোর! বই পড়তে পড়তে, বোঝা বইতে বইতে সে বড্ডো পরিশ্রান্ত। এক স্কুল শেষ হতেই, বিকেলে শুরু আরেক স্কুল। অনেকে বলেন ইহা স্কুল হইতেও মহান, কোচিং সেন্টার যাহার নাম! সন্ধ্যার পর বাড়িতে আসবেন গৃহশিক্ষক- হাতে-কলমে হবে শিক্ষা। বিদ্যা একেবারে গুলিয়ে না খেলে  শিক্ষার্থী কেমনে হবে আইনস্টাইন! শিশুর সাথে  মা-বাবা-ড্রাইভার তারাও কিন্তু বসে নেই। আছেন সবাই দৌড়ের উপ্রে। মাথার ঘাম পায়ে নামে, শিক্ষা কিনি অনেক দামে। বছর ব্যাপী চলছে খেলা, জমজমাট বাণিজ্যমেলা! এক টুকরো মাঠ, রোদেলা দুপুর, আকাশ পুকুর কিংবা বিকেলের ঘুড়ি – চুরি হয়ে গেছে সব, হারানো শৈশব, আমাদের জীবনে ছিল যা একদা। যাবতীয় আনন্দ ফুর্তির গাড়ির চাকা  বন্ধ আছে, এখন তা আর চলছে না।

বলি, আমাদের চোখ কী বন্ধ, নাকি অন্ধ হয়ে গেছি হে! সাত আট বছরের  শিশুর কাঁধে এত্ত ভারী ব্যাগ- এ কিসের পড়াশুনো রে! এটি অপরাধ, এটি অন্যায় -কিন্তু কে নেবে কার দায়!  আমরা  তা জানছি না, জানলেও তা বলছি না।

ওহে মহামান্য রেসের ঘোড়া অভিভাবক, এবার তুমি থামো। ওহে অসামান্য রাষ্ট্র, এতদিন ঘুমিয়ে ছিলে এবার তুমি নামো। ওহে শিক্ষার শয়তানেরা, এবার তোমাদের দোকান-পাট একটু সাড়াই কর। বেহুদাই কপালে শনি নামিও না ভাই – যখন তখন, কখন কে হয়  -রাইকর কিংবা ডান্ডেকর – সেটাও কিন্তু জানছি না !

A (1)

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে?

৬ই ডিসেম্বর ২০১৬ ইং তারিখে হাইকোর্ট -১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন না করতে এবং করাতে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের সকল স্কুলে -৩০ দিনের মধ্যে একটি সার্কুলার জারি করতে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিল। সে অনুযায়ী  ২০১৭’র  জানুয়ারি ৬ তারিখের পরেই একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি আমরা দেখব সেই প্রত্যাশায় ছিলাম, হায়রে প্রত্যাশা!

আমাদের মহান প্রত্যশার দশ এখন গুঁড়ে বালি। বিডিনিউজ২৪.কম এ ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ এর   ছবিসহ প্রতিবেদন শিরোনাম – ভার কমছে না স্কুল ব্যাগের। ২০১৭ -তে এসেও শিশুর কাঁধে বোঝার ভার –আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে! কে জানে মাপলে হয়তো আগের চাইতে কেজি খানেক বেশিও হতে পারে! উল্লেখ্য ২০১৪ সালেও একবার স্কুলব‌্যাগ ওজনে সতর্ক হতে সার্কুলার জারি করেছিল সরকার- ভ্রুক্ষেপ করেনি কেউ। মিষ্টি কথায় এ চিড়ে ভিজবে না ভাই ! স্কুল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ানো এখন ভীষণ জরুরি !

তথ্যসূত্র:

(১) কাঁধে অত্যধিক ওজনের ব্যাগ, বরুণের মৃত্যুর কারণ –হিন্দুস্তান টাইমস
(২) রুঘভেদ রাইকর ও পারিতোশ ডান্ডেকর সংবাদ সম্মেলন –দ্য হিন্দু
(৩) আনন্দবাজার পত্রিকা, স্কুল ব্যাগের বোঝা কমছে বাংলাদেশে, এখানে তা কমবে কবে, উত্তর নেই, সুজয় চক্রবর্তী, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬