ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

একসময় বাঙলা জুড়ে এই স্কুলটির নামডাক ছিল খুব । কিন্তু ১৯৮২ সালে, আমি যখন জিলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলাম সগৌরবে,  ততদিনে স্কুলটি হারিয়ে ফেলেছে তার সব গৌরব। পূর্বপুরুষের টানে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে, সেই স্কুলটিই হয়ে গেল আমার অনিবার্য নিয়তি, ‘কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা’ ছিল যার নাম। আর কী অবাক ব্যাপার, শুধু পাঠশালায় পড়ে পড়েই শেষ হয়েছিল আমার সমগ্র স্কুল জীবন! কেননা আমার প্রাইমারি স্কুলটিরও নাম ছিল ‘বীণাপাণি পাঠশালা’ যেখানে অনেক সুবিধাদি ছিল বিদ্যমান, স্কুলের টিনের চাল আর বেড়ায় ছিল অসংখ্য ছিদ্র, খালি পায়ে স্কুলে চলে আসলেও, আমাদের বকতেন না স্কুলের দিদিমণিরা!

IMG_20100101_062132

কিন্তু এখানে এই ঈশ্বর পাঠশালা’য় – শ্রেণীকক্ষগুলো সব দালান কোঠা, অনেক উঁচুতে তার ছাদ আর সেখানে বসানো রেললাইন। স্কুলের একটি অংশ মূল রাস্তার দিকে খোলা, বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘এম ভট্টাচার্য্য এন্ড কোং’, সেখানে আলমারিতে সাজানো কোটি কোটি হোমিওপ্যাথিক শিশি । স্কুল অভ্যন্তরের সুবিস্তৃত পুরো এলাকাটির নাম রাখা হয়েছে ‘মহেশাঙ্গন’ , এখানে আছে ঘাটযুক্ত তিনটি বৃহৎ পুকুর । চারদিক খোলা , রেল স্টেশনে যেমন থাকে মাথার উপর -তেমন ছাওনি, তার সামনে কিছুটা উঁচুতে আছে মঞ্চ এর নাম ‘নাটমন্দির’। তৎকালীন ভারত বর্ষ ত্রিপুরা রাজ্যের উল্লেখযোগ্য সভা বক্তৃতাসমূহ এখানেই নাকি সম্পাদিত হয়েছিল! এখানে এসেছিলেন -এ. রসুল, নৃপেন বসু, মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, মৌলভী লিয়াকত হোসেন, ড.দীনেশচন্দ্র সেন, ড.নলিনী ভট্টশালী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম , সরোজিনী নাইডু, হেমপ্রভা ,ড.নীহাররঞ্জন রায়, সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফফার খান, মেঘনাদ সাহা, আনন্দশঙ্কর রায়, হুমায়ুন কবির প্রমুখ। তাই এই নাটমন্দির তলে,সারিবদ্ধ হয়ে বজ্রমুষ্টি হাতে বজ্রকন্ঠে যখন বলতে হত ‘আমিন’, তখন  গমগম শব্দে -ছমছম করত আমার গা, জানা গেল এই নিয়মটিকে বলে এসেম্বলি। স্কুলের এক প্রান্তে আছে  সুউচ্চ ব্যায়ামাগার , সেখানে বসানো শরীরচর্চার নানা সুবিধাদি। প্রশস্থ খেলার মাঠ, তার দুই প্রান্তে সাজানো গোলপোস্ট। ছাত্রদের থাকার জন্য  আছে ‘রামমালা ছাত্রাবাস’, যেখানে আইন খুব কড়াকড়ি । অনতিদূরে হাই সিকিউরিটি  জোনে একটি মেয়েদের স্কুল ‘নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়’। বেশ উঁচুতে, সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলে পাওয়া যেত একটি আশ্চর্যজনক ‘প্রার্থনা ঘর’ দেয়ালে নাম লেখা ‘দেবালয়’, সেই অদ্ভুত  প্রার্থনা ঘরের দেয়ালে সাঁটানো আছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী রূপ। আর আছে একটি সাদা ধবধবে সুরক্ষিত দ্বিতল বিল্ডিং, সাইনবোর্ডে নাম ‘রামমালা গ্রন্থাগার’। একজন ক্লাস সিক্সের ছাত্র তখন জানতো না ‘গ্রন্থাগার’ শব্দটির অর্থ , এবং এভাবেই ১৯৮৭ তে এসএসসি পরীক্ষায় পাশ হয়ে গেলেও, সেই ছাত্রটি জানতে পারল না ‘রামমালা গ্রন্থাগার’ আসলেই কী কী ছিল তার মানে!

B

“ছাত্রাবাসের সাথে যে গ্রন্থাগার-যুক্ত সেটিও বিস্ময়কর। মফস্বল টাউনে তুলনামূলক ধর্মালোচনার এরূপ সংগ্রহ আমি আর কোথাও দেখিনি ! জ্ঞানান্বেষী ও গবেষকের জন্য অমূল্য সম্পদ এখানে সঞ্চিত” –অধ্যাপক হুমায়ুন কবির , রাজনীতিবিদ , লেখক ও ভারতের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী , ২৮ মার্চ ১৯৩৮ইং।

দুই হাজার সতের মাইনাস উনিশ সাতাশি, আজ ত্রিশ বছর পর। শহরে পা দিয়েই, এই প্রথম বারের মতো অন্যত্র কোথাও না গিয়ে গট গট  ‘ঈশ্বর পাঠশালা’  আমার স্কুল, তার গেইট দিয়ে ঢুকে পড়লাম সোজা মহেশাঙ্গন এলাকায় । আজ আমি এসেছি একটি আত্মপরিচয়ের সংকট নিবৃত করতে । এ বড় পাপ হে! এ বড় লজ্জার! আর কিচ্ছু না, শুধু রামমালা গ্রন্থাগারের বইগুলো একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই! আচমকা দূর থেকেই দেখতে পেয়ে গেলাম, মনে মনে স্যারকেই আমি খুঁজছিলাম! স্যার আমাদের ইংরেজি, বাংলা ও সংস্কৃত পড়াতেন। ভীষণ বিরক্তিকর ছিল, সেই সব ক্লাস। পড়া না পারলে অপমান করতেন খুব -‘কিয়েরে ইস্কুলে আইয়োস তুরা, মেট্রিক পরীক্ষা আইজ বাদে কাইল, এই পড়াশুনা দি ভবিষ্যতে কেম্নে করি খাইবি তুরা?’ তিনি ছিলেন প্রায় সবার অপছন্দের শিক্ষক, তাই অপ্রকাশ্যে চলত নিন্দা ! কিন্তু দিনে দিনে আমি জেনে গেছি -আমার শরীরে , মেধা ও মননে -যদি একবিন্দু সম , সঠিক জ্ঞান এবং নীতি কোথাও থাকে কিছু -তা এই স্যারেরই অবদান ! কেননা পরে , কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, এই রকম নিবেদিত প্রাণ সঠিক শিক্ষক আমি আর পাইনি । কিন্তু হায়রে আমি জানতে পারিনি,  তিনি ছিলেন জ্ঞানেরই আধার !

দেবালয় সংলগ্ন ঘরে ‘পুঁথি বিভাগ’ সাইনবোর্ড , সেই ঘরের দরোজায় শরীর গুটিয়ে বসে আছেন তিনি।

স্যার, স্যার, স্যার ! তিনবার ডাকলাম । তিনি চোখ তুলে তাকালেন, যেন নির্মলেন্দু গুনের ‘হুলিয়া’ –

“আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,

চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ্দুর

আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন

একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে ।

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে”

J

রামমালা গ্রন্থাগার , মহেশ ভট্টাচার্য্যের ভবন।

তিনি ছিলেন আমার পিতারও শিক্ষক । জ্ঞানগর্ভ পকরপক পকরপক , পরে হোক -আগে তাঁর নামটি বলে নিতে চাই। রামমালা গ্রন্থাগার সম্পর্কিত যাবতীয়  নিবন্ধ ,প্রবন্ধ , কলাম , মতামত , সংবাদ পত্র এবং সুশীল আলোচনায় -তিনি উল্লেখিত হন অনাদরে । তাই পরের প্রজন্ম দ্বারা , তিনি মহাসমারোহে ইতিহাসে উল্লেখিত হবেন , সেই সম্ভাবনা খুব কম। শ্রদ্ধেয় ‘ইন্দ্র কুমার সিংহ’ নাম তাঁর ,তিনিই আমার স্যার ,আমরা ডাকতাম ,ইন্দুবাবু স্যার । বয়েস বর্তমানে  ছিয়াশি প্লাস। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ আমি যতটুকু কল্পনা করেছিলাম , তার চাইতেও অধিক তিনি ক্ষীণ ও ন্যুব্জ । অথচ যতটুকু ভেবেছিলাম ,তার অনেক অধিক তিনি উচ্চকণ্ঠ এখনও ! আমি জানি , মাটির দিকে তাকিয়ে তিনি হাঁটেন আগেরই মতন , চলাফেরা খুব ধীর , তথাপি রোজ দুই বেলা নিজ হাতে ‘রামমালা গ্রন্থাগার’-এর তালা খুলেন পরম মমতায় । সব বইগুনো নেড়ে চেড়ে দেখেন -আছে কিনা সব ঠিক ঠাক । এবং বরাবরের মত আজও  তিনি একা ! কোন বইটি কখন কেনা হয়েছে , কে তার লেখক, তার বিষয় এবং মুখবন্ধ আর কোন সেলফে তা আছে সাজানো -মুখস্থ সবকিছু । হায়রে , দ্বিতীয় আর কেউ  জানেনা কিছু ! একটি অমূল্য গ্রন্থাগারের ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য এ যে এক মারাত্মক অশনি সংকেত !

G

“I am greatly pleased with my visit to the Rammala Chhatrabash and its library founded by the famous Mahesh Chandra Bhattacharyya who is a man of great idea and has done many good deeds. His attempt may be said to have been successful only when it will be able to produce another Mahesh Chandra in future.”  Meghnad Saha , FRS (Fellow of the Royal Society)

তিনবার স্যার ডাকার পর এইবার ,হাঁটু গেড়ে বসলাম স্যারের পদতলে। একদা আমি তাঁর পরিবারের নিতান্ত আপনজন ছিলাম এবং আমাকে কিঞ্চিৎ মানসম্পন্ন  ছাত্র হিসাবেই তিনি জানতেন। আমার বাবা এবং জ্যাঠামশায়ের নাম বললাম , কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি। ঠিক ঠিক মনে করতে পারলেন সব এবং আমার ছোট ভাইটির সাথে মাঝে মাঝে কুশল বিনিময় হয় সেই কথাটিও জানালেন। এখানে, এই ঘরেই  সাজানো আছে র‍্যাকে , অমূল্য সেই সব হাতে লেখা পুঁথির পাণ্ডুলিপি সমূহ , সাদা কাপড়ে মোড়ানো । কথার ফাঁকে ফাঁকে ,দেখে দেখে , আমি  রীতিমত কাঁপছিলাম! স্যার চোখ তুলে তাকালেন সুতীব্র, আমি দেখলাম স্যারের চোখে গভীর আর্দ্রতা! তিনি কেমন করে যেন, বুঝে গেলেন আমাকে !

-এতো অবাক হওনের কী আছে?

-স্যার, আগে কোনদিন পুঁথিগুলো দেখিনি তো তাই দেখছিলাম !

-এতদিন দেহ নাই তাই, তাই অহন দেহনের কথা মনে পড়ছে, শুইনছো নি কথা !

-স্যার একটি পুঁথি কী  খুলে দেখতে পারি ?

-কী উদ্দেশ্য নিয়া আইছো আগে সেইডা কও ?

-না স্যার এমনিতেই , আপনারে দেকতে!

-মিছা কথা বল কেন? আমারে কেউ দেকতে আসেনা , আসে নিজ কামে।

শুনে খুব খারাপই লাগল । আসলেই তো ! বিদ্যার্জনের নাম -নিজে খাও, নিজে পরো ,আগে নিজে বাঁচো -জীবন হোক অস্থির এক ঘোড়দৌড় তোমার !

-ঢাকায় থাহো নাকি , ঢাকা’র অবস্থাও দেক্তাসি কুমিল্লারই মতো !

যেহেতু আমি মিথ্যাবাদী , সেহেতু আমি নীরব থাকি।

-বাংলা একাডেমি গ্রন্থবর্ষ স্মারক গ্রন্থ ২০০২, বুইজ্জনি ! সেখানে আমার একটি লেখা ছাপছে তারা।

-খুব ভালো কথা স্যার।

-সেখানে গ্রন্থাগারের সব ইতিহাস বলে দিছি আমি। লেখা ছাপানোর সাতমাস পরে একহাজার টাকা পাঠাইছিল তারা ।  লেখলে টাকা পাওন যায় জানতাম না। তুমি গ্রন্থাগার নিয়া আমারে আর কিছু জিগ্যাইও না ! অহনে বাড়ি যাও।

আমি কিন্তু উঠলাম না , আমি বসেই থাকলাম , আর স্যার বলবেন না বলেও , বলে গেলেন -অনেক কথা -ম্যাক্স-মুলার , কনফুসিয়াস , মহাত্মা-গান্ধি আর সেক্সপিয়র।

বই মেলায় এসেই বাংলা একাডেমিতে অনেক খুঁজে খুঁজে অবশেষে উদ্ধার করা গেল ‘গ্রন্থবর্ষ স্মারক গ্রন্থ ২০০২’।

p

“ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলার বিটঘর গ্রামের অধিবাসী মহাত্মা মহেশচন্দ্রের মাতামহ প্রাণকৃষ্ণ শিরোমণি ও পিতৃদেব ঈশ্বরদাস তর্কসিদ্ধান্ত খ্যাতিমান পণ্ডিত ছিলেন । ঈশ্বর দাস আজীবন নিজবাড়ির চতুষ্পাঠীতে নিরন্তর অধ্যাপনা করতেন। এক দিনের জন্যও জ্ঞানচর্চা থেকে বিরত হন নি। জ্যেষ্ঠভ্রাতা আনন্দচন্দ্র ভট্টাচার্য্য স্মৃতি , ব্যাকরণ ও ক্রিয়াকাণ্ডে বিশেষ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। এরূপ পারিবারিক আবেষ্টনহেতু মহেশচন্দ্রের চরিত্রেও শাস্ত্রানুশীলন ও জ্ঞান বিস্তারের প্রতি একটি গভীর শ্রদ্ধা এবং প্রবল অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। পিতৃদেব ঈশ্বর দাসের পুণ্যস্মৃতি সংরক্ষণার্থে মহেশচন্দ্র কাশীধামে ও নিজ বাসভবন কুমিল্লা মহেশাঙ্গনে ‘ঈশ্বর পাঠশালা টোল’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে কুমিল্লা মহেশ প্রাঙ্গণে ‘ঈশ্বর পাঠশালা বিদ্যালয়’ স্থাপন করে জ্ঞানপ্রচারে ব্রতী হন। মহেশচন্দ্রের ৩৫ বছর বয়সে তাঁর মাতা রামমালা দেবী দেহত্যাগ করেন । মহেশচন্দ্র মাতৃদেবীর পুন্যস্মৃতি সংরক্ষণকল্পে কুমিল্লায় ‘রামমালা ছাত্রাবাস’ , ‘রামমালা গ্রন্থাগার’ ও ‘রামমালা যাদুঘর’ স্থাপন করেন । ‘নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়’ এবং ‘নিবেদিতা ছাত্রীনিবাস’ও জ্ঞানবিস্তারে তাঁর অনন্য কীর্তি। অতি দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সমন্বিত জ্ঞান ভাণ্ডার ‘রামমালা’ থেকে জ্ঞান প্রচার, দানবীর মহেশচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান বলা যায়। কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা টোল স্থাপনের পরই প্রতিষ্ঠাতা মহাশয়ের কুমিল্লা বাড়ির বৈঠকখানায় ১৯১২ সালে টোলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সংস্কৃত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। টোলের অন্যতম পণ্ডিত সূর্যকান্ত স্মৃতিতীর্থ মহাশয় গ্রন্থাগারের কার্য পরিচালনা করতেন। এ সময় ৪/৫ টি আলমারিতে গ্রন্থগুলি রক্ষিত হতো। সংস্কৃত ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদি সাধারণ পাঠকদের বোধগম্য হতো না বিধায় স্থানীয় কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির অনুরোধে কিছু কিছু বাংলা পুস্তক এবং ‘প্রবাসী’ ও ‘ভারতবর্ষ’ প্রভৃতি প্রধান প্রধান মাসিক পত্রিকা রাখা হত থাকে। ক্রমে ক্রমে হস্তলিখিত প্রাচীন পুঁথিও সংগ্রহ শুরু হয়’ -গ্রন্থবর্ষ স্মারক গ্রন্থ ২০০২ , বাংলা একাডেমী, ইন্দ্র কুমার সিংহ  লিখিত “রামমালা গ্রন্থাগারঃ কুমিল্লা” নিবন্ধ থেকে।

দারিদ্র্য পীড়িত ছিলেন, হলেন দানবীর মহেশচন্দ্র

অর্থাভাবে যেহেতু বিদ্যাশিক্ষা অর্জন ছিল অসম্ভব , তার পরিবর্তে ভাগ্যান্বেষণে শৈশবেই কুমিল্লা চলে আসেন মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য । জানা যায়, ভালো রান্না করতে পারতেন , তাই কুমিল্লায় এসে প্রথমে কয়েকটি বাড়িতে পাচকের কাজ নেন। কিছুদিন পর এই কাজ করে তার হাতে কিছু টাকা-পয়সা জমলে তিনি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানেও তাকে অর্থের অভাবে কয়েক বছরের জন্য লেখাপড়া বন্ধ করে রাখতে হয়। পরে তিনি বিভিন্ন কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু অর্থকড়ি রোজগার করেন এবং ‘এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং’ নামে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান খোলেন। এবার তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। তিনি অনেক অর্থ বিত্তের মালিক হন। মূলত সে অর্থ দিয়েই তিনি স্কুল, ছাত্রাবাস, নাটমন্দির, ব্যায়ামাগার, গ্রন্থাগার একটি সম্পূর্ণ কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছিলেন।

aa

ইন্দ্র কুমার সিংহ স্যার জানালেন, মহেশচন্দ্রকে তিনি দেখেননি, শুধু শুনেই গেছেন!  মহেশচন্দ্র বলতেন -নিজের পায়েই নিজের দাঁড়ানো’র চেষ্টা সাথে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সৎ ও সঠিক জীবন যাপনে মনোনিবেশ করলেই – তোমার জাতি শক্তিশালী হয়ে উঠবে একদিন। এই সকল অনুপ্রেরণা ইন্দ্র কুমার সিংহ কে  উজ্জীবিত করেছে , তাছাড়া  রামমালা ছাত্রাবাসেই কেটেছে তাঁর শিক্ষা জীবন । ১৯২৬ সালে গ্রন্থাগারটি মহেশাঙ্গন থেকে শহরের দক্ষিণাংশ শাকতলায় রামমালা ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হয়। সেই বছরই রামমালা ছাত্রাবাসের ছাত্ররা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’কে সংবর্ধনা দেয় । গ্রন্থাগারে সাধারণ পাঠকদের উপযোগী বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা রাখা শুরু হয় তখন থেকে । ১৯২৮ সাল থেকে সেখানে ,ভারতীয় সংস্কৃতি এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’র বই সংগ্রহ করা হতে থাকে। ১৯৩৪ সালে  গ্রন্থাগারের জন্য পৃথক দালান নির্মিত হয়। শাকতলায় ২৪ একর জায়গায় নির্মিত হয় ‘রামমালা যাদুঘর’ ‘রামমালা গ্রন্থাগার’ ও ‘রামমালা ছাত্রাবাস’ । ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮১ হাজার টাকার পুস্তক ক্রয় করা হয়। সুমহান দারিদ্র্য একদিন , মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য’কে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত করেছিল, তাই গরীব মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান এবং উচ্চ শিক্ষার জন্যই নিবেদিত ছিল তাঁর সকল প্রচেষ্টা ।

iA

রামমালা ছাত্রাবাসের মূল আদর্শ ছিল: ‘সর্ব্বম আত্মবশং সুখম্ সর্ব্বং পরবশং দুঃখম্’  অর্থাৎ আত্মনির্ভরতা পরম সুখ ও পরনির্ভরতা পরম দুঃখ।

দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সালে , তৎকালীন পাকিস্তান সরকার , রামমালা গ্রন্থাগার ও ছাত্রাবাসের ৭২ বিঘা সম্পত্তি দখল করে নেয় । তখন বাধ্য হয়েই গ্রন্থাগারটিকে মহেশচন্দ্রর নিজ বাড়ি ‘মহেশাঙ্গনে স্থানান্তরিত করতে হয়। ট্রাস্টের পক্ষে হেরম্ব চন্দ্র ভট্টাচার্য্য  পাকিস্তান সরকারের রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করলে , ১৯৬৩ সালে মহামান্য আদালত , মহেশ চন্দ্রের সমুদয় সম্পত্তি ট্রাস্ট বরাবরে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে ,পাকিস্তান সরকার অমান্য করে সেই নির্দেশ। সেই সম্পত্তি স্বাধীন বাংলাদেশ আজও মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য’র অনুকূলে হস্তান্তরিত হয় নি।

রাসমোহন চক্রবর্ত্তী ছিলেন একজন পণ্ডিত প্রবর জ্ঞানী মানুষ ।  আমার জ্যাঠামশায় পরেশ চক্রবর্ত্তী ছিলেন প্রাক্তন ঈশ্বর পাঠশালা’র ছাত্র এবং রাসমোহন চক্রবর্ত্তীর খুব ঘনিষ্ঠ স্নেহধন্য , যাকে রাসমোহন চক্রবর্ত্তী পুত্রবৎ স্নেহ করতেন । পরেশ চক্রবর্ত্তী বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা নিবাসী , যিনি ভারত সরকার কর্ত্তৃক শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন । তাঁর কাছ থেকে জানা,  রাসমোহন চক্রবর্তী’র জন্ম হয়েছিল ১৮৯৯ সালে চাঁদপুর জেলায় । তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছিলেন ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে । হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ছিল ব্যাপক পড়াশুনো । ধর্মতত্ত্ব , দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে অনেক বই লিখেছেন তিনি । মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য গ্রন্থাগারের তত্ত্বাবধান ও যাবতীয় বিষয়াদি দেখভাল করার জন্য তাঁকে ডাকেন । রাসমোহন চক্রবর্তী সেই ডাকে সাড়া দিয়ে গ্রন্থাগারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন ।  রাসমোহন চক্রবর্ত্তী ১৯২৬ সালে রামমালা গ্রন্থাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত হন এবং ১৯৮২ সালে মৃত্যু বরণ করেন। এই সুদীর্ঘ ৫৬ বছর দিবাভাগের অধিকাংশ সময় রাসমোহন চক্রবর্ত্তী  গ্রন্থাগারের গবেষণা বিভাগে জ্ঞানানুশীলনে বিভোর থাকতেন । তিনি অকৃতদার ছিলেন , মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ‘রামমালা গ্রন্থাগার’ই ছিল তাঁর সব সাধ ও সাধনা।

E

যেহেতু “অজ্ঞানতাই সর্ববিধ দুঃখের মূল উৎস” তাই সঠিক জ্ঞান অন্বেষণের জন্যই জন্ম নিয়েছিল রামমালা গ্রন্থাগার। এর প্রধান তিনটি বিভাগ হচ্ছে ভাগ ১। গবেষণা বিভাগ ২। সাধারণ বিভাগ ও  ৩। পুঁথি বিভাগ । এই গ্রন্থাগারে গবেষণা ও সাধারণ বিভাগ মিলিয়ে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় বারো হাজার।

১। গবেষণা বিভাগঃ

ক) ভারতীয় সংস্কৃতি: সুবিশাল সাহিত্য সম্পদ ছিল প্রাচীন ভারতের সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন । মনে করা হয় এই এই বিশাল সাহিত্য-সম্ভারের একটি বড় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে, হারিয়ে যায় কালের গর্ভে । তাই ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ সমূহ এবং সেই সাথে তার ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থ গুলো সংরক্ষিত আছে এই বিভাগে ।

খ) বেদঃ ঋগবেদ , পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবৎ , স্মৃতি মনুসংহিতা,  তন্ত্র-উড্ডামেশ্বর তন্ত্রম , দর্শন- সর্বদর্শন সংগ্রহ , নাটক-অভিজ্ঞানম শকুন্তলম , ব্যাকরণ- পাণিধি , কোষ গ্রন্থ (সংস্কৃত পালি বাংলা ও ইংরেজি) , কালিদাস গ্রন্থাবলী, বৌদ্ধধর্ম- ত্রিপিটক মূল , জৈন ধর্ম , ভারতীয় বৈদ্যক(মেডিসিন) , জ্যোতিষ -হোরাবিজ্ঞান- রহস্যম , জ্যোতিষ -যোগ তত্ত্ব , সূর্য সিদ্ধান্ত , ন্যায় ও মীমাংসা , অর্থশাস্ত্র -নীতিশাস্ত্র , কৌটিল্য অনুবাদ, অলংকার সাহিত্য , দর্শন , কাব্য মীমাংসা , ছন্দ প্রাকৃত, পিঙ্গল সূত্র , বৈশেষিক , সাংখ্য ও পাতঞ্জল দর্শন , ক্লাসিক্যাল লিটারেচার, সংস্কৃত সাহিত্য ইতিহাস, প্রাচীন বৃহত্তর ভারত ইত্যাদি এবং ভারত বর্ষের ধর্ম সমাজ রাষ্ট্র শিক্ষা বিষয়ক অনেক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ।

গ) তুলনামূলক ধর্ম:  পৃথিবীতে সুপ্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি ধর্মের নামে যত রক্তপাত হয়েছে , রাজনৈতিক কারণে তার এক শতাংশও হয় নি। অথচ প্রত্যেক ধর্মের মূল বাণী ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবের কল্যাণ সাধন। কিন্তু সঠিক ভাবে ধর্মগ্রন্থ সমূহ পাঠ না করায় তার মূল অর্থটি অনুসৃত হয় নি এবং গড়ে উঠে নি মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন। এখানে আছে তুলনামূলক ধর্ম গ্রন্থ সমূহ-  হিন্দু, বৌদ্ধ , ইসলাম , শিখ, খৃস্টীয়,ইহুদি, পার্শি , কঙফুসীয়, তাও, মিশরীয় , ব্যাবিলনিয় , আসিরীয় প্রভৃতি ও পৃথিবীর প্রাচীন ও আধুনিক ধর্মসম্পর্কিত মূল গ্রন্থ , অনুবাদ ইত্যাদি। বিশ্বখ্যাত জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স-মূলার রচিত বিভিন্ন খণ্ড। হাদিস বঙ্গানুবাদ ভাই গিরিশচন্দ্র সেন , The Encyclopedia of Islam , বৈষ্ণব ধর্মের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সমূহ , চৈতন্য চরিতামৃত, শ্রীমদ্ভগবত গীতা মূল , অনুবাদ।

ঘ) সাহিত্যঃ রবীন্দ্র রচনাবলী , ঋষি অরবিন্দ রচনাবলী, শরৎসাহিত্য,  English drama, Epics, poems, prose, HG Well’s The Outline of History, People of All Nations, History of the World, Asoka and Inscriptions.

D

THE RELIGION OF ISLAM

২।  সাধারণ বিভাগঃ

এই বিভাগে গ্রন্থ সমূহ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত । সর্বসাধারণের পাঠোপযোগী ধর্ম , দর্শন , নীতিশাস্ত্র , প্রবন্ধ , গল্প উপন্যাস , জীবনী , ভ্রমণ বৃত্তান্ত। মহাত্মা গান্ধী রচিত ইংরেজি আত্মচরিত , সেক্সপিয়ারের গ্রন্থ সমূহ । বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজার , প্রবাসী, শনিবারের চিঠি, মৌচাক, পূর্বাশা যুগান্তর সবুজপত্র, মোহাম্মদী , ত্রিপুরা হিতৈষী , প্রবাসী ইত্যাদি এবং সংস্কৃত ও হিন্দি বিখ্যাত পত্রিকা সমূহ । ইংরেজি Calcutta Review, The Indian Historical Quarterly, Indian Culture, The Modern Review, The Journal of the Asiatic Society of Bengal, Prabuddha Bharat, The Philosophical Quarterly, Tine and Annie Besant Centenary Book ইত্যাদি।

৩। পুঁথি বিভাগ

এটি রামমালা গ্রন্থাগারের সবচাইতে সমৃদ্ধশালী বিভাগ । প্রাচীনকালে যখন ছাপাখানা ছিল না, তখন লেখালেখির জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল পুঁথি । প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথিগুলো সাধারণত ভূর্জছাল, কাপড়ের পট, তালপাতায় লেখা হত। তালপাতার পুঁথিগুলোর বেশীর ভাগই ছিল পূজোর পুঁথি। তেরেট নামে তাল জাতীয় এক প্রকার বৃক্ষের পাতায় লেখতেন অনেকে। ছিল ‘হরিতালী কাগজ’ নামে পরিচিত এক প্রকার তুলট কাগজ , যা  পুঁথি লেখার জন্য ছিল অনবদ্য । হস্তলিখিত প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য পুঁথি সমূহ এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত যা গ্রন্থাগারের এক অমূল্য সম্পদ। পুঁথি সমূহ বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষায় লিখিত। সংস্কৃত পুঁথি সমূহের বয়স তিনশ থেকে চারশ বছর । হস্তলিখিত পুঁথি সমূহ একদিন অনবদ্য ইতিহাস এবং অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে , যেন তৎকালেই তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন মহেশচন্দ্র । তাই সেই সময়ে তিনি পুঁথি সংগ্রহে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের কুমিল্লা নোয়াখালী সিলেট অঞ্চল থেকে পুঁথি সমূহ সংগৃহীত হয়। কোন কোন সদাশয় ব্যক্তি স্বেচ্ছায় পুঁথি দান করেন , কেউ কেউ দান করেন অর্থ এবং সেই অর্থে ক্রয় করা হয় পুঁথি । ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এই উপায়ে প্রায় সাতাশ জন ব্যক্তির কাছ থেকে পুঁথি গ্রহণ করে রামমালা গ্রন্থাগার। পুঁথি সমূহের বিষয় ছিল বেদ,তন্ত্র, কোষগ্রন্থ , কাব্য, ব্যাকরণ , ন্যায়, জ্যোতিষ , ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, রামায়ণ , মহাভারত, সত্যনারায়ণ পাঁচালী, সত্যপীরের পুঁথি , শনির পাঁচালী ইত্যাদি। গ্রন্থাগারের সংগ্রহে মোট পুঁথির সংখ্যা ৮০০০ , যার প্রায় ৬০০০ সংস্কৃত ভাষায় লেখা। হাতে লেখা বাংলা পুঁথি গুলোর অধিকাংশই বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক।  (সূত্রঃ রামমালা গ্রন্থাগারঃ কুমিল্লা” নিবন্ধ থেকে।)

New folder (2)4

“রামমালা গ্রন্থাগার বাংলার এক অনন্য ও অদ্বিতীয় গ্রন্থাগার” – অন্নদাশঙ্কর রায়।

রামমালা গ্রন্থাগার সহ অপরাপর সকল প্রতিষ্ঠান সমূহ মূলত ‘ট্রাস্টি বোর্ড’ দ্বারা চালিত হয় । একসময় পুরো ক্যাম্পাস ছিল প্রকৃত অর্থে একটি বিদ্যামন্দির -যার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞান বিকাশ। কিন্তু  এই ‘ট্রাস্টি বোর্ডে’ , মূল সত্ত্বাধিকারী কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে কয়েক গ্রুপে দ্বিধাবিভক্ত ।  দিন দিন  বোর্ড কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সুব্যবহার এবং অপব্যবহার দ্বারা উপেক্ষিত হতে হতে , বর্তমানে  রামমালা গ্রন্থাগারের অবস্থা তথৈবচ! মহেশাঙ্গন তথা ঈশ্বর পাঠশালা ক্যাম্পাসে স্থাপিত তৎকালীন সার্বজনীন দেবালয়’টি ইতোমধ্যে রূপান্তরিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ঠাকুরের পূজা অর্চনা মন্দির হিসাবে । ট্রাস্টি বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী এখানে প্রশাসন কিংবা অন্য কারো দেখভালে নিয়োজিত হবার ক্ষমতা সীমিত।তারা বলতে চান , যেহেতু  এটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান তাই এখানে দান গ্রহণ করবার কোন সুযোগ নেই । তাই আভ্যন্তরীণ উন্নয়নে বাইরের কোন অনুদান , সাহায্য কিংবা  কোন প্রকার সাপোর্ট নেয়ার উদ্যোগ এখানে তেমন করে গৃহীত হয় নি আজ পর্যন্ত । গ্রন্থাগারে নেই বইয়ের কোন ক্যাটালগ । একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ও ফোর্ড ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে ধাপে ধাপে  দুইহাজারের অধিক , হাতে লিখিত পুঁথি’র মাইক্রোফিল্ম করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট্রাল লাইব্রেরি পাণ্ডুলিপি বিভাগ জানায় -সেই সব মাইক্রোফিল্ম তারা ফাইনালি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে । দেশের প্রধান লাইব্রেরি যখন এইরূপ দায়িত্ব জ্ঞানহীন আচরণে নিয়োজিত ,তখন অভিভাবকহীন রামমালা গ্রন্থাগার সরকারের নির্দেশনা অনুধাবনে অক্ষম হবে -সেটাই স্বাভাবিক! এবং ঘটনা ঘটল সেই নিয়মেই ! ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে সংস্কৃতি সচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস রামমালা গ্রন্থাগার পরিদর্শন করলে , এইসকল দুর্লভ পুঁথি সমূহের তালিকা বানানো ও ডিজিটালি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মন্ত্রণালয়। সেই মোতাবেক এপ্রিল মাসে সংস্কৃতি-মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভা , পুঁথি সমূহ স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই সাথে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কাউকে আপাতত পুঁথি ব্যবহার না করার নির্দেশ প্রদান করে।  কিন্তু রামমালা কর্ত্তৃপক্ষ , বুঝে কিংবা না বুঝেই হোক এই নির্দেশনা’টি যথাযথ পালন করতে ব্যর্থ হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক খবর পেয়ে সারপ্রাইজ ভিজিটে এসে দেখেন -মহাসমারোহে চলছে পুঁথি সমূহ স্ক্যানিং এবং রিসার্চ-এর কাজ। কাজ করছেন ,আমেরিকার পেন্সিলভেনিয়া ইয়ুনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বেঞ্জামিন যে ফ্লেমিং ও বাংলা একাডেমির একজন সহকারী পরিচালক , সাথে বেশ কিছু দেশি ও বিদেশি। সাময়িক ভাবে সীল গালা করে দেওয়া হয় তখন গ্রন্থাগারের দরজা।

‘ইন্দ্র কুমার সিংহ’ স্যার যদিও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তথাপি  তিনি হিন্দু শাস্ত্র বিষয়ে একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত এবং সাম্প্রতিক কালে হিন্দু এবং বৌদ্ধ শাস্ত্র সমূহের ইতিহাস বিষয়ে , তাঁর সমকক্ষ জ্ঞানী মানুষ দেশে খুব কম আছেন -বলেই আমার বিশ্বাস। পণ্ডিত প্রবর রাসমোহন চক্রবর্ত্তী’র পর আরও অনেক রথী মহারথী এই গ্রন্থাগারের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন , কিন্তু এইরকম গভীর একাগ্রতায় রামমালা গ্রন্থাগারে’কে আগলে রাখেন নি কেউই। ইন্দ্র কুমার সিংহ এই গ্রন্থাগারের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ  করতে যেয়ে , গ্রন্থাগারে থাকা অমূল্য গ্রন্থ গুলো পড়ে কিংবা নেড়ে চেড়ে দেখাতেই – আজ তিনি ঋদ্ধ এবং জ্ঞান-লব্ধ হয়েছেন , অর্জিত হয়েছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা ! এই জ্ঞানলাভ কে তিনি জীবনের এক চরম সার্থকতা হিসাবে বিবেচনা করেন।

ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের  গৃহে জন্মগ্রহণ করেও জ্ঞান আহরণ না করে বৈশ্যবৃত্তি অবলম্বনে জীবন অতিবাহিত করেছেন বলে প্রতিষ্ঠাতা মহাশয়ের মনে একটি অব্যক্ত গভীর ব্যথা ছিল। গ্রন্থাগার পরিপূর্ণ অবয়ব ধারণ করলে প্রতিষ্ঠাতা মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য একরাত্রি রামমালা গ্রন্থের গবেষণা গৃহে যাপন করেন বলে কথিত আছে । ঐ রাত্রি তিনি কিভাবে যাপন করেন তা এখনও সম্পূর্ণ রহস্যাবৃত। তিনি বলেছেন “আপনারা গ্রন্থাগারের শাস্ত্র গ্রন্থ সংগ্রহ করিতে থাকুন, মৃত্যুকালে এই আকাঙ্ক্ষা লইয়া মরিব যেন পরবর্তী জন্মে এইখানে আসিয়া প্রাণভরে শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতে পারি”-  “রামমালা গ্রন্থাগারঃ কুমিল্লা” নিবন্ধ থেকে।

শ্রদ্ধেয় ‘ইন্দ্র কুমার সিংহ’ মূলত মাত্রাতিরিক্ত প্রচার বিমুখ এবং একজন অন্তর্মুখী মানুষ। তাঁর গভীর সান্নিধ্যে না আসলে এই জ্ঞানটুকুও অর্জন করা খুব মুশকিল। তাই বরাবরের মত জ্ঞানী এখানেও  মূর্খ দ্বারা পূজিত হন নি , বরং পরাজিত হয়েছেন । সাদরে গৃহীত না হয়ে বরং নিগৃহীত হয়েছেন দিনের পর দিন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর বসবাসের যে সুবিধাটি একসময় মালিকপক্ষ দিয়েছিল- তা বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের একাংশ আর দিতে রাজী নন। এই রকম একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষ ট্রাস্টি বোর্ড নামীয় যে ক্ষমতা , তার অ-ট্রাস্টিয় রাজনীতির শিকার ,  প্রতিপক্ষের  চক্ষুশূল হয়ে দিনানিপাত করছেন এখন । এবং অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে , তিনি পরিবার সন্তান নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন চরমতম অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতায় ! এই অংশটুকু লিখবার জন্য তিনি আমার উপর বিরাগভাজন হবেন- আমি তা জানি । কেননা অর্থ-যোগ প্রাপ্তি কিংবা সাময়িক সচ্ছলতায় শিক্ষক সমৃদ্ধ হন না -যখন শিক্ষকের ক্যান্ডেল আলোয়  জাতির ভবিষ্যৎ আলোকিত হয়ে যায় -শুধুমাত্র তখনই শিক্ষক সমৃদ্ধ হন , এমনটাই বিশ্বাস করেন ‘ইন্দ্র কুমার সিংহ’ ।

দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্ম-দর্শন বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনে , এই গ্রন্থাগার ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহুদিন ধরে । এবং খুবই আগ্রহোদ্দীপক খবর !  গ্রন্থাগার’টি  আজ পর্যন্ত বিদেশী পণ্ডিতদের পদভারে যতটুকু প্রকম্পিত হয়েছে , দেশী পণ্ডিত পদভারে ততটা মোটেই নয় !  আমেরিকা, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জাপান ও ভারত থেকে এসেছেন বেশী গবেষক।

F

“বাংলা একাডেমি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্ন রামমালা পাঠাগারের মতো প্রাচীন পুঁথির সংগ্রহশালা  দেশের আর কোথাও নেই” – সাইমন জাকারিয়া , সহকারী পরিচালক  বাংলা একাডেমি।

দানবীর, মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য , শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশকল্পে বিদ্যালয় ,ছাত্রাবাস ও গ্রন্থাগার সহ পুরো কমপ্লেক্সটি বানিয়েছিলেন। অথচ আজ প্রায় শতবর্ষ পরে তাঁর মহেশাঙ্গন এখন বিখ্যাত – শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণ আর অর্চনা-আরতি’র জন্য । হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব আর উদযাপনে ভট্টাচার্য্য মশায়ের পুরো প্রাঙ্গণ আলোয় আলোকিত হয়  -আর জ্ঞানের আলো ছড়াবার কথা ছিল যার , সেই রামমালা গ্রন্থাগার , পড়ে রয় এক কোনায় , অবহেলায় আর ভীষণ অন্ধকারে। যে ইতিহাস রাজনীতির কথা বলে , সেই ইতিহাস সংরক্ষণ কিংবা নতুন করে সেই ইতিহাসটি লিখে ফেলার কাজে আমরা বিশ্বসেরা । তাই সুপ্রাচীন দুষ্প্রাপ্য অমূল্য সম্পদ , যা এমনি এমনিই সংরক্ষিত হয়ে আছে- তা উদ্যোগের যেন কোন প্রয়োজন নেই  আর ! আমাদের কাছে ‘রামমালা গ্রন্থাগার’  হচ্ছে সেই মূল্যহীণ সম্পদ , যা থাকলে , না থাকলে কিংবা হারিয়ে গেলেও ক্ষমতার পালা বদলে ,তা তেমন কোন ভূমিকা পালন করে না। অতএব ‘রামমালা গ্রন্থাগার’ – সংরক্ষণের দায় , আসলেই কার ? ট্রাস্টি বোর্ড না সরকার ?  এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই ,  ‘ইন্দ্র কুমার সিংহ’ স্যারের পর এই গ্রন্থাগার’টির তত্ত্বাবধান রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়াটির ভবিষ্যৎ, দেখছি  শুধু  অন্ধকার !

মাইক্রোফিল্ম আর স্ক্যান করে গ্রন্থ সমূহ’র কপি সংরক্ষণ মূলত ,  দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো ছাড়া আর কিছুই নয়। এবং সেই কার্যাবলীও এখন পর্যন্ত শুরু করেনি রাষ্ট্র কিংবা ট্রাস্ট । এই প্রাচীন পুঁথি সমূহ সংরক্ষণের জন্য শীততাপ নিয়ন্ত্রিত উন্নত আর্কাইভ রুম দরকার । প্রতিটি পুঁথির  সময়কাল, বিষয়বস্তু, ভাষা, কালি ও কাগজ ইত্যাকার বিষয় সহ -এদের ডিজিটালি ক্লাসিফাই করা অত্যন্ত জরুরী । ট্রাস্টের আইন ও বিধিমালা কী, এই নিয়ে গবেষণায় কালক্ষেপন হয়ে গেছে অনেক ! এখন রাষ্ট্রের মূল কাজ -রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা , এবং তা যে কোন উপায়ে । আমাদের শুধু এতটুকু মনে রাখা উচিত -আজ শত বর্ষ পরেও , আমরা কিন্তু পারিনি গড়তে দ্বিতীয় এই রকম একটি গ্রন্থাগার !  পারিনি ফিরিয়ে দিতে তাঁকে তাঁর সম্পত্তি!  আর এখন শুধুমাত্র এর গুরুত্ব অনুধাবন না করতে পেরে ,  যদি তা সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হই – এ ভীষণ লজ্জার !  এই লজ্জা ট্রাস্টের, এই জাতির , এই লজ্জা আমার, এই লজ্জা দেশের !

A

The Rāmamālā Library  in Comilla, Bangladesh, is amongst the oldest still active traditional libraries in Bangladesh. It was founded in 1912 by the scholar and philanthropist Mahesh Chandra Bhattacharya.


ছবিঃ লেখক , ইন্টারনেট । ভিডিও কৃতজ্ঞতাঃ    Badruddoza Srabon